মিষ্টির ভিড়ে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মতলবের ক্ষীর



মহিউদ্দিন আহমেদ
মিষ্টির ভিড়ে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মতলবের ক্ষীর

মিষ্টির ভিড়ে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মতলবের ক্ষীর

  • Font increase
  • Font Decrease

রসনা বিলাসে মিষ্টি জাতীয় খাবার যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালীর খাবারের পাতে ভিন্নরকম একটি স্থান করে নিয়েছে। শেষ পাতে একটু মিষ্টান্ন নিয়ে রসানেক তৃপ্ত করে আসছে বহুটা সময় ধরে। এখন তো রীতিমত অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান জাতীয় খাবার পুরো দেশজুড়ে নিজ নিজ ঐতিহ্যে দেশ থেকে বিদেশে মিষ্টান্ন প্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তেমনই একটি মিষ্টান্ন জাতীয় খাবারের নাম চাঁদপুর জেলার মতলবের ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর। শত বছরেরও অধিক সময় ধরে খাঁটি দুধে তৈরি এখানকার ক্ষীর গুণে ও মানে এখনো অটুট। ইংরেজ শাসনামল থেকে শুরু করে চলমান ২০২১ সালে এসেও এর আবেদন এতটুকুও কমেনি কারো কাছে।

বিয়ে কিংবা বেড়ানো, রাজনীতি অথবা সামাজিকতা সবখানেই মতলবের ক্ষীর নিজ গুনে সমুন্নত। দুর দুরান্ত থেকে মানুষজন আসেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য মতলবের ক্ষীর সংগ্রহ করার জন্য। রাজনীতির মাঠে উপঢৌকন হিসেবে মতলবের ক্ষীর চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশ বরেণ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ঘরে। সামাজিকতা রক্ষায় মতলবের অধিবাসীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তাদের আত্নীয়স্বজনকে উপহার হিসেবে ক্ষীর পাঠানো বহু পুরনো রীতি।

ঐতিহ্যবাহী এ ক্ষীর অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করা হতো যা এখনও চলমান আছে। এর চাহিদা তুঙ্গে থাকায় মতলব উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা মতলব বাজারে দুধ এনে বিক্রি করতেন আর স্থানীয় ময়রারা সেগুলো সংগ্রহ করতেন। ওই সময় মতলবের ঘোষপাড়া ছিল ক্ষীর, দধি ও ঘি তৈরির আস্তানা। সে সুবাদে কয়েকটি ঘোষ পরিবারের সদস্য অল্প দামে দুধ কিনে উন্নতমানের ক্ষীর তৈরি করতেন। ওই সময় থেকেই মতলবের ক্ষীর তৈরির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

গুণ, মান ও স্বাদের কারণে ব্রিটিশ আমলে এখানকার জমিদার ও ইংরেজদের কাছে এই ক্ষীর খুবই প্রিয় ছিল বলে জানালেন মতলবের স্থানীয় বাসিন্দা মাঈনউদ্দিন আহমেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, তখন ক্ষীর দিয়ে বিয়ে,পূজা-পার্বণে অতিথীদের আপ্যায়ন করা হতো।

মতলব উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত মতলবের ইতিবৃত্ত বইয়ে এই ক্ষীরের উল্লেখ আছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ওই বইয়ের ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মতলবের ক্ষীর খুবই প্রসিদ্ধ। সারা দেশে ক্ষীরের ব্যাপক চাহিদা ও কদরের কারণে একসময় অনেক হিন্দু পরিবার ক্ষীর তৈরি এবং ক্ষীরের পাত্র বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকত। এখনো এই ক্ষীরের চাহিদা সর্বত্র।’তাছাড়া জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি’তেও বয়ান করা হয়েছে এই ক্ষীরের সুনামের কথা।

মতলবের ক্ষীরের হালচাল নিয়ে বার্তা২৪.কম এর সাথে কথা হয় প্রসিদ্ধ ক্ষীর ব্যবসায়ী প্রয়াত গান্ধীচরণ ঘোষের ছেলে সজল ঘোষের সঙ্গে। তিনি বলেন, মতলব হচ্ছে ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত। আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে মণে মণে ক্ষীর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করতেন আমার প্রয়াত পিতা গান্ধীচরণ ঘোষ। বিশেষ করে দেশের বাইরেও মতলবের ক্ষীরের চাহিদা ছিল বেশি। এখনও এর চাহিদা অব্যাহত আছে। আমাদের এ পেশাটি এখনও ধরে রেখেছি। আগে দুধের দামও কম ছিল, আমরা ভাল ক্ষীর তৈরি করতে পারতাম। এখন সবকিছুর দামই বেড়ে যাচ্ছে। তখন আমার কাকা বেনু ঘোষ, হরিপদ ঘোষ ও প্রভাত ঘোষসহ অনেকে ক্ষীর বিক্রি করতেন। এখন তো ভাল ক্ষীরের কেজি ৫০০-৬০০ টাকা। দুধের কেজিও ৬০-৭০ টাকা। আগের মতো ব্যবসায়ীরাও বাজারে দুধ নিয়ে আসেন না। এলেও ভাল দুধ পাওয়া যায় না। যার ফলে আমাদেরও বেশি দামে দুধ কিনে ক্ষীর, মিষ্টি তৈরি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমানে তেমন গাভীর দুধ না পাওয়ায় এবং ক্ষীর তৈরির অন্য দ্রব্যসামগ্রী সহজলভ্য না হওয়ায় ক্ষীরের দাম তুলনামূলক একটু বেশি।

উপজেলা সদরের কলেজ রোডে অবস্থিত ক্ষীর বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নন্দকেবিন। দোকানের মালিক বাসু ঘোষ বার্তা২৪.কম’কে জানান, পাঁচটি কারণে এখানকার ক্ষীর গুণে ও মানে সেরা। প্রথমত, গৃহস্থের কাছ থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ দিয়ে এই ক্ষীর বানানো হয়। দ্বিতীয়ত, দুধ ও চিনি মিশ্রণের অনুপাতে হেরফের হয় না। এক কেজি ক্ষীর বানাতে পাঁচ কেজি দুধ ও ৫০-৬০ গ্রাম চিনি মেশানো হয়। তৃতীয়ত, ক্ষীরে ময়দা বা আটা মেশানো হয় না। চতুর্থত, দুধের ননি ওঠানো হয় না। ননিসহ ক্ষীর বানানো হয়। পঞ্চমত, লাকড়ির চুলায় ক্ষীর তৈরি করা হয়।

উপজেলা সদর বাজারের আনন্দ ক্ষীর-ঘরের মালিক উৎপল ঘোষ শুধুমাত্র ক্ষীর ও ঘী বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই উপজেলা সদরের ঘোষপাড়া এলাকার গান্ধী ঘোষের পূর্বসূরিরা ক্ষীর তৈরি শুরু করেন। খাঁটি ও স্বাদের কারণে তখন এলাকায় এই ক্ষীরের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দেখাদেখি কলাদী ও বাইশপুর গ্রামের দাসপাড়ার আরও ১৫-২০টি হিন্দু পরিবার এ কাজে নামে। বর্তমানে ঘোষপাড়ার সুনীল ঘোষ, মিলন ঘোষ, গান্ধী ঘোষ, অনিক কুমার ঘোষ, উৎপল ঘোষ এবং দাসপাড়ার মাখনলাল ঘোষ, নির্মল ঘোষসহ কয়েকটি পরিবার ক্ষীরের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

উৎপল ঘোষ জানান, প্রতিদিন সকালে গৃহস্থের কাছ থেকে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে রাখা হয়। দুপুরে এসব দুধ বড় পাত্রে রেখে চুলায় দুই ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয়। ক্ষীর তৈরি হলে ছোট ছোট পাত্রে আলাদাভাবে রাখা হয়। পরে মাটির পাত্রে ক্ষীর রেখে ফ্যানের বাতাসে কিছুক্ষণ রাখার পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়।

প্রবীণ ক্ষীর ব্যবসায়ী বিমল মুহুরি বলেন, বর্তমানে এক কেজি দুধের দাম ৬০-৭০ টাকা। চিনিসহ অন্যান্য খরচ মিলে এক কেজি ক্ষীর বানাতে খরচ পড়ে ৪০০ টাকা। প্রতি কেজি ক্ষীরের দাম পড়ে ৪৫০-৪৬০ টাকা।

মতলবের ঘোষপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষীর ব্যবসায়ীদের পরিবারের সদস্যরা ক্ষীর তৈরির কাজে ব্যস্ত। ক্ষীর ব্যবসায়ী মিলন চন্দ্র ঘোষ জানান, মতলব ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত। অথচ এখন আর প্রকৃত ক্ষীর ইচ্ছা করলেই তৈরি করতে পারি না। কারণ বাজারে দুধের দাম বেশি এবং চাহিদানুযায়ী দুধও পাওয়া যায় না। তার পরও আমার পূর্বপুরুষ বাপ-চাচারা এ ব্যবসা করে আসছেন, আমরাও করছি।

মতলবের ক্ষীরের বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষিকা নাসরিন জাহান নীপা বার্তা২৪.কম কে বলেন, আমাদের ক্ষীরের সমাদর দেশব্যাপী থাকায় এবং বিক্রি ভালো হওয়ায় ক্ষীরের মানের ব্যাপারে প্রস্তুতকারকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করি। মাঝে মাঝেই ক্ষীরের মান নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। তবে আমরা বিশ্বাস করি আমাদের এই ক্ষীর শুধুমাত্র একটি পণ্য নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। তাই কোনভাবেই যেন এর মান পরে না যায় সে বিষয়ে সবাইকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়া এসে লেগেছে মতলবের ক্ষীরতেও। তাই সরাসরি দোকানে বিক্রির পাশাপাশি অনেকে দোকান থেকে ক্ষীর সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন অনলাইনে। ফলে আগের থেকেও খুব দ্রুত প্রসার ঘটছে মুখরোচক এই মিষ্টান্নটির।