‘খাদ্যতালিকা’ দিয়েই যে পাখির নাম



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
গাছের উপর দলীয়ভাবে বাসা করে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

গাছের উপর দলীয়ভাবে বাসা করে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের প্রকৃতি নানা প্রজাতির পাখিদের মাতৃস্নেহতুল্য। অর্থাৎ মা যেভাবে সন্তানদের খাদ্যসম্ভার, নিরাপত্তা দিয়ে বড় করে তুলেন, তেমনি। তাই তো ঋতুবৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশে পাখির কোনো শেষ নেই। অসংখ্য।

কিছু কিছু পাখিকে আবার বিজ্ঞানীরা তার প্রিয়খাবারের সাথে সংগতিরেখে নামকরণ করেছেন। তেমনি একটি বিশেষ পাখি নিয়ে আমাদের আজকের প্রবন্ধ। বাংলার কাদাময়, জলময় প্রকৃতির সাথে এ পাখিটি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এর নাম ‘এশীয় শামখোল’। ইংরেজিতে Asian Openbill বলে। শামুকখোল বা এশীয় শামুকখোল এ দুটি বাংলা নামেও তাকে কেউ কেউ উল্লেখ করে থাকেন।  

এরা দেখতে বকের মতো। তবে অনেক বড়। গায়ের রঙ ধূসর সাদা। এরা বাংলাদেশের বড় জলচর পাখিদের একটি। ৬৮ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। প্রতিটা পাখার দৈর্ঘ্য চুয়াল্লিশ সেন্টিমিটার। ঝাঁক বেঁধে চলে। একেক ঝাঁকে ৪০ থেকে ৬০টি পাখি থাকে। জলচর পাখি। নদী, হাওড়-বাওড়, মিঠাপানির জলাশয়, হ্রদ, ধানক্ষেত ও উপকূলীয় বনে এদের দেখা যায়। এদের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ঠোঁট। ইয়া বড় আর ভারী ঠোঁট। চৌদ্দ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। দুই ঠোঁটের মাঝখানে ফাঁক থাকে। তবে বাসা বাঁধার সময় শরীর একদম সাদা হয়ে যায়। লেজ ও পাখার শেষভাগ কালো রঙের।

আবাসিক জলচর পাখি এশীয় শামুখোল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

 

এশীয় শামুকখোল শামুক খেতে খুবই ভালবাসে। একটা শামুক পেলে ঠোঁট দিয়ে শামুকের খোল ভাঙে। তারপর সেটা ওপরে তুলে আকাশের দিকে মুখ করে গিলে ফেলে। এজন্য এর নামকরণ ‘শামুকখোল’। তবে এরা শুধু শামুকই খায় না। মাছ, কাকড়া, ছোট ছোট প্রাণী, ব্যাঙ ইত্যাদিও খায়।

এরা যেসব এলাকায় থাকে সেসব এলাকা বিরাট একটা কলোনি গড়ে তোলে। একেকটা বড় গাছে একটা করে ঝাঁক বাস করে। তবে গাছ যদি আরও বড় হয় তবে ঝাঁকও অনেক বড় হয়। একবার খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, বগুড়ার বিহার হাটের দুটি অশ্বত্থ গাছে প্রায় ৪০০ পাখি বাস করে। এরা সারাবছর একই জায়গায় কাটিয়ে দেয়। তবে খাবারের অভাব হলে অন্য জায়গায় চলে যায়। বাসা বাঁধার সময় এরা পানকৌড়ি ও বকের সাথে বিরাট কলোনি গড়ে তেলো। কলোনিতে বাস করার কারণ হলো বাচ্চাদের নিরাপত্তা। চিল, বাজ পাখি, কাক কিংবা মানুষ এদের ছানাদের ক্ষতি করতে এলে ঝাঁকবেঁধে তেড়ে আসে।

বড় পাখিদের বাসাও বড় হয়।  বড় বড় আমগাছ, শিমুলগাছ, বট ও অশ্বত্থ গাছের উঁচু ডালে বাসা বাঁধে। এক একটা গাছে ২০ থেকে ৩০ বাসা দেখা যায়। কোনো কোনো গাছে একশোরও বেশি বাসা থাকে। গাছের শুকনো ডাল, কঞ্চি ও লতাপাতার সমন্বয়ে বাসা তৈরি করে শামুকখোল পাখি। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি মিলে দশ-বারোদিন ধরে বাসা তৈরি করে। বাসার দৈর্ঘ্য পাঁচফুট পর্যন্ত হয়। জুলাই-আগস্ট মাসে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিম মুরগির ডিমের চেয়ে বড়। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দুজন মিলে ডিমে তা দেয়। ২৫ দিন লাগে ডিম ফুটে ছানা বেরুতে। ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়স হলে ছানারা উড়তে শেখে।

সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে পাখিটি। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস করে কৃত্রিম মাছের খামারসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে তাদের বিচরণভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে কমেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই প্রজাতির ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দারুণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। যারা এ জাতীয় পাখিদের আশ্রয়দানকারী বাড়ি কিংবা বাড়ির মালিকগণকে পুরস্কৃত করে থাকে। সুতরাং আপনার বাসার গাছে পাখিরা বাসা বাধলে তাকে বিরক্ত করবেন না। অথবা তাদের ছানাকে কখনোই ধরে আনার চেষ্টা করবেন না। তাতে করে পাখিরা একবার ভয় পেয়ে গেলে আর সেখানে বাসা বাধবে না। কালক্রমে সেই হতভাগ্য বাড়ির মালিক বঞ্চিত হবেন সরকারের পুরস্কার বা পরিবেশ সংরক্ষণের স্বীকৃতি থেকে।