শক্ত ঠোঁটের পরিযায়ী ‘খয়রা-লাটোরা’



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
আপন মনে গাছের ডালে বসে আছে খয়রা-লাটোরা (পুরুষ)। ছবি: ইনাম আল হক

আপন মনে গাছের ডালে বসে আছে খয়রা-লাটোরা (পুরুষ)। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

সন্ধ্যা নেমে আসার আর কিছুক্ষণ বাকি। ইতোমধ্যে পাখিরা তাদের রাত্রীযাপনের স্থানটিকে নির্বাচন করে ফেলেছে। বিরামহীন হাঁকডাক আর চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে সান্ধপ্রকৃতিকে স্মরণীয় করে তুলছে। বিস্তৃত হাইল হাওরের বাইক্কা বিলের প্রবেশ পথের অংশটি এভাবেই নানান পাখিদের কূজনে গভীর মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল।

কলতানেমুখর পাখিদের ভিড়ে একটি পাখিকে বারবার তার ব্যস্ততা নিয়ে ছুটতে দেখা গেল। বাদামি দেহের চঞ্চলতা নিয়ে সে মৃদু সন্ধ্যায় ছুটাছুটি করছে। ব্যস্ততা আর দৌঁড়ঝাপ দেখে চিনে নিতে অসুবিধে হলো না ১৯ সেন্টিমিটারের ‘খয়রা লাটোরা’ পাখিটিকে। এর ইংরেজি নাম Brown Shrike এবং বৈজ্ঞানিক নাম Lanius cristatus।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ‘খয়রা-লাটোরা সবার বাড়ির আশেপাশেই রয়েছে। যেখানে একটু খোলা মাঠ সেখানে আছে। বিশেষ করে পানি বা জলাশয়ের আশেপাশে। বাইক্কা বিলে গেলেই এই পাখিটি সবচেয়ে বেশি চোখে পাড়বে। এই পাখিটিকে মানুষ সহজে চিনতে পারে।’

প্রজাতিটির উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এরা শীতের আগেই আমাদের দেশে চলে আসে। অক্টোবর থেকেই আসাতে শুরু করে। নভেম্বরের শেষে বা ডিসেম্বরের শুরুই এ পাখিটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে। এই পরিযায়ী পাখি আমাদের দেশে আগেভাগেই চলে আসে এবং ফিরে যায়ও দেরি করে। পরিযায়ী হাঁসরা যেমন আমাদের দেশে আসে দেরি করে এবং চলেও যায় তাড়াতাড়ি এরা কিন্তু হাঁসেদের মতো নয়। হাঁসেরা হয়তো দুই মাস থাকে। খয়রা-লাটোরা আমাদের দেশে ৬ মাস, ৭ মাস প্রায় থাকে। তারপর চলে যায় চীনের একেবারে উত্তরে বা রাশিয়াতে কিংবা সাইরেবরি পর্যন্ত ওরা যায়। সেখানেই ওরা বাসা বাঁধে এবং ছানা তোলে। আবার প্রতি বছরের অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশের দিকে উড়াল দেয়।

ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনাম এই কয়েকটা দেশেই ওরা বিচরণ করে। এ আবার কিন্তু এই অঞ্চলের বাইরে কোথায় যায় না। পাকিস্তান বা পশ্চিম ভারতে এদের দেখা যায় না বলে জানান ইনাম আল হক।

ওদের খাদ্য তালিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব পোকা আছে ঘাসের মধ্যে ওগুলোই ওরা খায়। সেজন্য ওরা একটা লাঠির উপর বসে থাকে এবং চোখ রাখে মাঠের ঘাসের মধ্যে। ওখানে যেসকল পোকা খুঁজে পায় সেগুলোই দ্রুত উড়ে এসে খেয়ে থাকে। খয়রা-লাটোরাদের রয়েছে ঠোঁট অনেক শক্ত।

খয়রা-লাটোরা (স্ত্রী) এর তীক্ষ্ম দৃষ্টি শিকারের দিকে। ছবি: ইনাম আল হক

খয়রা-লাটোরা (স্ত্রী) এর তীক্ষ্ম দৃষ্টি শিকারের দিকে। ছবি: ইনাম আল হক

অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ইনাম আল হক বলেন, আমরা বাইক্কা বিলের এই প্রজাতির পাখিগুলোকে ধরে ওদের পায়ে অতিক্ষুদ্র রিং যখন পড়িয়েছিলাম তখন দেখেছি ওর ঠোঁট অন্য পাখির তুলনায় অনেক শক্ত! ওকে হাত দিয়ে সাবধানতাবশত যত্ন করে না ধরলে সে খুব জোরে কামড় দিয়ে হাতে রক্ত বের করতে দিতে পারে। ওকে ধরার মাত্রই দেখবেন ও আপনার হাতের চামড়া কেটে ফেলবে। ওর ঘাড়ের পেশিতেও অনেক জোর রয়েছে। ফলে সে জোরে চাপ দিয়ে ঠোঁটগুজে হাত কেটে দিতে পারে।

ওদের শিকার ধরার একটি বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, বড় ঘাসের কোনো বড় পোকা বা টিকটিকিসহ অন্যান্য ছোট্ট সরীসৃপ প্রাণী ধরলে ঠোঁটে করে নিয়ে গাছের কাটার মধ্যে গেঁথে ফেলে। তারপর ছিঁড়ে ছিঁড়ে আয়েশ করে খায় এবং তার ছানাকেও খাওয়ায়। গাছের কাটায় ঝুলিয়ে দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় বলে একে ‘কসাই পাখি’ও বলে। এটা ওরা ওদের প্রজননভূমিতেই বেশি করে থাকে।

শারীরিক গঠনের ভিন্নতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ছেলে এবং মেয়ে পাখির শারীরিক রঙে একটু পার্থক্য রয়েছে। মেয়ে পাখিটির বগল ও বুকে আঁইশের মতো দাগ থাকে। পালের শেষপ্রান্তে ছোট ছোট দাগ আছে বলে আঁইশের মতো মনে হয়। আর ছেলেটার পেট আর পিঠ হালকা খয়েরি।

খয়রা-লাটোরা কৃষিজমির আশেপাশেই রয়েছে। আমাদের কৃষিজমির পোকামাড়ক দমনে এই পাখিটির বড় একটি ভূমিকা রয়েছে বলে জানান প্রখ্যাত পাখিবিদ ইনাম আল হক।