কাজী নজরুল ও মৎস্যজীবী আন্দোলন



ড. রূপকুমার বর্মণ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) তাঁর মাত্র ৪৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে রেখে গেছেন গান, কবিতা ও কথা সাহিত্যের অফুরন্ত ভান্ডার। স্বাধীনতা, বিদ্রোহ, প্রেম, ভক্তি ও মানবমুক্তি বিষয়ক নজরুলের কবিতা ও গান তাঁর সমকাল ও ভাবীকালের প্রেরণার উৎস। সাধারণ থেকে অতি সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া, শোষণ, বঞ্চনা তথা পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত সমাজের কথা তুলে ধরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী কবি।

কুলি, মজুর, শ্রমিক ও কৃষকদের শোষণের  বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা নজরুলের কবিতা ও গান শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিক রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা শ্রমিক কৃষক দলের (Workers and Peasants Party) সক্রিয় কর্মী নজরুল কৃষক, শ্রমিক, বিপ্লবী ও দেশসেবকদের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। কৃষক ও কারখানা শ্রমিকদের পাশাপাশি বাংলার মৎস্যজীবীদের জীবনসংগ্রামও কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ১৯২৬ এর ৮ই মার্চ নদিয়ার কৃষ্ণনগরে বসে কবি সৃষ্টি করেছিলেন ‘জেলেদের গান’ নামে এক উদ্দীপণা ও প্রতিবাদে ভরা শ্রমজীবী মানুষের এক অপূর্ব প্রতিবাদী সঙ্গীত।

‘জেলেদের গান’ প্রথম প্রকাশিত হয় লাঙ্গল- এ (১৮ই মার্চ ১৯২৬, বাংলা ৪ঠা চৈত্র, ১৩৩২)। পরের বছর ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে এটি সংকলিত হয় ‘ধীবরদের গান’ নামে। এই গানটির রচনার প্রেক্ষাপটও খুব চমকপ্রদ। একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে     তখন সবেমাত্র  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে (১৯১৯) বিশ্বশান্তি রক্ষায় তৈরি হয়েছে জাতি সংঘ (বা League of Nations) এর মতো সংগঠন। এই সংঘের অন্যতম শাখা সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labour Organisation)। এর অব্যবহিত পরেই এই সংস্থায় যোগ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার তোরজোড় শুরু হয়। এমনকি পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির উপনিবেশগুলোও এব্যাপারে পিছিয়ে ছিল না।

১৯২০ সালেই ভারতে গড়ে ওঠে All India Trade Union Congress (AITUC) এর মত শ্রমিক সংগঠন। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের আবহ (১৯২০-১৯২২) ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পরিমন্ডলে ব্রিটিশ-ভারতের অন্যান্য শ্রমজীবীদের মতো বাংলার মৎস্যজীবীরাও গড়ে তোলেন ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলন (All Bengal and Assam Provincial Fishermen Conference)।

১৯২০ এর দশকে বরিশালের রমনীমোহন বিশ্বাসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি বাংলার মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন ও শ্রমিক হিসাবে তাদের প্রাপ্য আধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। অচিরেই শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কৃষ্ণনগরের হেমন্ত সরকার (১৮৯৭-১৯৫২) বাংলার মৎস্যজীবীদের একতাবদ্ধ করতে এগিয়ে আসেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সহপাঠি ও বন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক তথা বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেমন্ত সরকারের আহ্বানে কবি নজরুল কৃষ্ণনগরে হাজির হন। ১৯২৬ এর ১০ই মার্চ নজরুল, হেমন্ত সরকার, বসন্ত কুমার মজুমদার ও হেমপ্রভা মজুমদারের সঙ্গে মাদারিপুরে পৌঁছান । ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনের’ তৃতীয় অধিবেশনে (মাদারিপুর, ১১-১২ মার্চ, ১৯২৬) উদ্ধোধনী সঙ্গীত রূপে ‘জেলেদের গানটি’ নিজের সুরে গেয়ে শোনান কবি নজরুল। তিনি গেয়ে ওঠেন:

আমরা নীচে পড়ে রইব না আর

শোনরে ও ভাই জেলে

এবার উঠবরে সব ঠেলে ।

এ বিশ্ব সভায় উঠল সবাইরে

ঐ মুঠে মজুর হেলে

এবার উঠব রে সব ঠেলে ।

সমগ্র বিশ্ব যখন কৃষক ও শ্রমিক সবাই নিজ নিজ অধিকারের দাবিতে জেগে উঠেছে সেই সময় মৎস্যজীবীদের জন্য নজরুলের উদাত্ত আহ্বান সম্মেলনে উপস্থিত সকলের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। নজরুল তাঁদের  মনে করিয়ে দিলেন:

ও ভাই আমরা জলের জল-দেবতা

বরুন মোদের মিতা,

মোদের মৎস্যগন্ধার ছেলে ব্যাসদেব

গাইল ভারত-গীতা ।

আমরা দাঁড়ের ঘায়ে পায়ের তলে

জলতরঙ্গ বাজাই জলেরে

আমরা জলের মত জল কেটে যাই,

কাটব দানব পেলে।

এবার উঠবরে সব ঠেলে ।

কবি তৎকালীন বাংলার সাত লক্ষ মৎস্যজীবী (মল্ল ক্ষত্রিয়) দের আঁশবটি হাতে অসুর-নিধনে এগিয়ে যেতে বলেছিলেন তাঁর রচিত এই গানটিতে। ।

বাংলাদেশের জাতীয় কবির এই গান নিঃসন্দেহে মৎস্যজীবীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৪২ এ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে গেলে মৎস্যজীবীদের আন্দোলনের সঙ্গে কবি আর যুক্ত থাকতে পারেননি। তবে কবির অকৃত্রিম বন্ধু হেমন্ত সরকার তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত (১৯৫২) বাংলার (বিশেষ করে নদীয়া জেলার) ‘মৎস্যজীবী আন্দোলনের’ সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন।

‘জেলেদের গানটি’র রচনার পর প্রায় একশো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন ঔপনিবেশিক আমলের মতো উৎপাদন ব্যবস্থা আর নেই। মাছ ধরা ও মাছ চাষ (pisciculture) এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও বৃহৎ পুঁজির দখলে চলে গেছে। মূলধনের অভাবে মাছচাষ বা সমুদ্র থেকে মাছ ধরার (Marine fishing) কাজে প্রথাগত মৎস্যজীবীরা আজ পরিণত হয়েছেন জল মজুরে (water labourers)। বাংলার (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) নদীনালা ও খালবিলগুলি তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অপ্রতুল মনে হওয়ায় তাঁরা ক্রমাগত অন্যান্য পেশা গ্রহণ করার চেষ্টা করে চলেছেন।

ভারত ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রেই মৎস্যজীবীদের শিক্ষিত শ্রেণি উচ্চতর পেশা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই শ্রেণি প্রথাগত মৎস্যজীবীদের থেকে নিজের দুরত্ব ক্রমশই বাড়িয়ে চলেছে। তবে তাঁদের একটা অংশ এখনও মাছধরা, মাছ বিক্রি বা আড়ৎদার হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। তাই রশিকবিল, তিস্তা, তোর্ষা, মহানন্দা, ভাগীরথী, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা, তিতাস, হুগলী , জলঙ্গি, মাথাভাঙ্গা বা  চূর্নী নদীতে কান পাতলে এখনোও এই প্রথাগত মৎস্যজীবীবিদের জাল ফেলার শব্দ শোনা যাবে। স্বাভাবিকভাবেই নজরুলের লেখা শতবর্ষ উত্তীর্ণ ‘ধীবরদের গান’ এখনও প্রাসঙ্গিক।

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও  আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ।