বুকপকেটে জাপানি সূর্য



মোস্তফা মহসীন
টোকিওর রাস্তায় লেখক

টোকিওর রাস্তায় লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

শেষ বিকেলে অনেকটা পথ হেঁটে এসে যখন মিস্টার তাকেও তাবিদার বাড়ির কল বেল টিপছি, তখন আকাশটা সবুজাভ-হলুদ মেরুপ্রভায় কী এক অনিন্দ্য রূপসী হয়ে উঠেছে। কাঠের তৈরি জাপানের এ ধরনের বাড়ির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ছাদ। এগুলো প্রার্থনারত ব্যক্তির হাতের মতোই দেখতে অনেকটা। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে একধরনের ধপ ধপ শব্দ কানে বাজে। জাপানে এ ধরনের বাড়িগুলোকে মিনকা বলা হয়ে থাকে। একসময় এগুলো ছিল কৃষক, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের বাসস্থান। যদিও আজকাল এই অভিব্যক্তি হারিয়ে যাচ্ছে জাপানে। এখন ঐতিহ্যবাহী সব সম্ভ্রান্ত বাড়িগুলোকেই মিনকা বলে উল্লেখ করা হয়।

শরীরে শীতের দাপট ঘনীভূত হলে দস্তানা ছাড়াই দরজার হাতলে হাত দিয়ে এই শীত কতটা শক্তিমান, তা পরখ করতে না করতেই ‘কোননেচিওয়া’ উচ্চারণে জাপানি কায়দায় অভিবাদন। পরম আন্তরিকতায় ঘরে প্রবেশে উদ্ধুদ্ধ করলেন তাকেও তাবিদা।

বসার ঘরটি যেন জাপানি আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের নিখুঁত উপমা। আরামদায়ক ভিক্টোরিয়ান সোফা আর দেয়ালজুড়ে প্রণত আলংকারিক ওয়াল পেইন্ট স্টিকারের সঙ্গে জাপানি গাছ ও পাখির ভুবনভোলানো ছবি।

একটু পরপর জ্বালাতন করা প্রিয় কুকুরটিকে সামলে রেখে এসে ধূসর হিমশীতল চোখের তাকেও তাবিদা আমার পাশে এসে বসলেন। গল্প জুড়ে দিলেন অকৃত্রিম মমতায়। পেশায় এনজিও গবেষক তাবিদা জানালেন, জাপান-বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের কথা। তাঁর নিজ হাতে পরিবেশন করা জাপানের জনপ্রিয় চা সেনচাতে চুমুক দিতে দিতে বললাম, রবীন্দ্রনাথও জাপানি চায়ের অনুরক্ত ছিলেন; রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জাপান যাত্রী’ বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন ধৈর্য, নিষ্ঠা, মনোসংযোগ ব্যতীত সুপেয় জাপানি চা তৈরি করা যায় না। শুনে তাবিদা হো হো করে হেসে উঠলেন!

শপিংমলের বিউটিএরিয়ায় লেখক

জাপান সম্পর্কে বাংলাভাষীদের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান ভ্রমণ, এ প্রসঙ্গে যোগ করলেন রবীন্দ্রপ্রেমী তাবিদা। প্রসঙ্গের বাঁকবদল করে জানতে চাইলাম, জাপানে অতিরিক্ত কাজের ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা বা যেটাকে বলা হয় ‘কারোশি’ বা মাত্রাধিক চাপ থেকে শ্রমিক বা কর্মচারীর মৃত্যু, এটা কেন খুব ঊর্ধ্বমুখী? এর কারণ হিসেবে জানালেন, এখানে ২০ ভাগ কর্মচারী প্রতি মাসে ৮০ ঘণ্টা ওভারটাইম করেন। এর জন্য করপোরেট কালচারও নীতিগতভাবে দায়ী। এ ছাড়া আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিচ্ছিন্নতা বা একা থাকার মানসিকতাকেও দুষলেন।

শেষমেশ তুললাম, বাংলাদেশ ও জাপানের পতাকার সাদৃশ্য। এবারও অবিকল হাসির ছটার দেখা মেলে তাঁর চোখেমুখে, সঙ্গে যেন কৃতজ্ঞতার নিবেদন। জানালেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলারের মন্ত্রিপরিষদ এবং যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিচার করা হয় ‘নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে’; আর জাপানের সমরবিদ জেনারেল হিদেকি তোজোর বিচার করা হয় ‘টোকিও ট্রাইব্যুনালে’। ১১ দেশের ১১ প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হয় ‘টোকিও ট্রায়াল’। এ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রধান বিচারপতি ছিলেন ড. রাধা বিনোদ পাল।

বিচারের একপর্যায়ে রাধা বিনোদ পাল বাদে অন্য সব বিচারপতি জেনারেল তোজোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ফাঁসিতে ঝোলানোর রায় দেন। অন্যান্য বিচারপতির ধারণা ছিল, বিচারপতি পালও মিত্রশক্তির পক্ষে অনুগত থাকবেন। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের সেই ঐতিহাসিক রায় মিত্রশক্তি, এমনকি বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল। তাঁর প্রজ্ঞা আর দৃঢ় কৌশলগত কারণে জাপানিরা বেঁচে যায় অনেক বড় ক্ষতি থেকে।

জাপানিরা যা করেছিল, তার পেছনে অল্প কয়েকজনের হাত থাকলেও মিত্রশক্তি চেয়েছিল পুরো জাতির ঘাড়েই এর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে, যেটি রাধা বিনোদ পালের কারণে সম্ভব হয়নি। এ রায় বিশ্বনন্দিত ঐতিহাসিক রায়ের মর্যাদা লাভ করে। তাই জাপানের সম্রাট হিরোহিতো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, যত দিন জাপান থাকবে, তত দিন বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃশর্ত বন্ধু। মুগ্ধতায় আবিষ্ট আমি তন্ময় হয়ে গেলাম। এ রকম গল্প কোনো ভিনদেশির কাছ থেকে শুনতে কার না ভালো লাগে!

কাজলদার সঙ্গে আমার কিনশিখোতেই প্রথম সাক্ষাৎ। সরাসরি আলাপ। জায়গাটা টোকিও সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে মাত্র ১০ মিনিট দূরত্বের। কিনশিখো হচ্ছে টোকিওর বৃহত্তম বাণিজ্যিক এলাকা। কিনশিখো যেতে হলে আপনাকে জেআর সবুলাইন বা টোকিওর মেট্রো ট্রেনে চড়ত হবে। ট্রেনটি হলুদ রঙের। সময়সচেতন জাপানিরা একটি বর্ণময় জাতিও। ইতিমধ্যে তাদের পোশাক, আভিজাত্য দেখে আর ট্রেনে চড়েই হরদম বুঝে গেছি। কিনশিখো বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় চারপাশের এলাকা মূলত শপিংভিত্তিক।

কিছু পুতুলে দেখলাম জাপানি শহরের দৈনন্দিন জীবনের মানুষও রয়েছেন

এ ছাড়া দেখা পাওয়া গেল স্থাপত্যের সৌন্দর্যঘেরা পার্ক, দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, তিনটি বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোর, দুটি সিনেমা থিয়েটার, অসংখ্য গৃহস্থালি সরঞ্জামের দোকান, নাইট ক্লাব আর সঙ্গে বার। কাজলদার সঙ্গে মধ্যরাতে বাংলাদেশের গল্প করতে করতেই তাঁর নিজ মালিকানাধীন বারে ঢুকলাম। বার গার্ল এসে অভ্যর্থনা জানালেন। টেবিলে টেবিলে দেখছি, আগন্তুকের রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ঢেলে দিচ্ছেন। এই বার গার্লরা আবার পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড, রোমানিয়া, রাশিয়া, লাটভিয়া থেকে আসা। এখানে খদ্দেরকে যত বেশি সময় টেবিলে বসিয়ে রাখা যায়, ততই লাভ! গোপন তথ্যটি আমার কাছে ফাঁস করে দিলেন শ্রীলঙ্কান বিক্রয়কর্মী রেবেকা গুনাশেকারা।

কথাচ্ছলে সেই রাতে আধুনিক জাপানি সমাজের জীবনদর্শন থেকে জীবনাচরণ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে কাজলদা টেনে আনলেন সমকামিতা ও পরকীয়ার প্রসঙ্গটি। জানালেন, দুটিতেই জাপানিরা বেশ পটু। পরকীয়ায় আসক্তি এত তীব্র যে এমনও হয়েছে, প্রমোদে মজে সারা মাসের মাইনে দিয়ে গেছে বার গার্লদের। তাঁদের খুব পছন্দ শ্বেতাঙ্গ পরনারী! জানালেন, এখানে ৪০ ভাগ বিবাহিত পুরুষই এই দোষে দুষ্ট।

টোকিওর বিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল ‘হিলটন’

টোকিওর বিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল ‘হিলটন’। সিনজুকুতে অবস্থিত এই অভিজাত হোটেলে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবীদের সেমিনার। বিরতিতে প্রিমিয়াম লাউঞ্জের ফুডকোর্টে চলছে বহুজাতিক আইনজীবীদের চিন্তার বিনিময়। একই সাথে হাড্ডিসার আবার কেউ কেউ বেশ নাদুস –নুদুস। দেখছিলাম নানা বয়সী লোকেদের মিলনমেলা। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আড্ডা চলছে একই সঙ্গে ভোজন বিলাসিতা।

সেখানেই সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ইয়োশি ইয়োকোইয়ামার সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য। তিনি জানালেন, জাপানে সমকামিতা মধ্যযুগ থেকে চলমান। তবে আইনি বৈধতা পায় ১৮৮০ সালে। চতুর্দশ শতকে জাপানে সামুরাই সম্প্রদায়ের অনেকে তাদের গৃহে আশ্রিত বালকদের শয্যাসঙ্গী হিসেবে নিতে পছন্দ করত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ভালোবাসার মানুষটি হতো একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর। তাঁদের মধ্যে নাকি কেউ কেউ মনে করতেন, নারী এমনই এক সৃষ্টি, যার আসলে কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই।

তিনি মত দেন, জাপান এলজিবিটিদের নিয়ে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সহনশীল রাষ্ট্র। যদিও খোলামেলাভাবে সমকামী ঘোষণা করার ব্যাপারে এখনো সমাজে ট্যাবু রয়ে গেছে। জাপানে সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ে অবৈধ হলেও এখানে পৌরসভা থেকে একটি পার্টনারশিপ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, যাতে কিনা সমকামী জুটির বাড়িভাড়া পেতে, চিকিৎসা নিতে এবং একত্রে বসবাসে কোনো অসুবিধা হয় না।

এই পর্যায়ে তিনি নাকাজিমা-বাউমান যুগলকে ডেকে আনলেন। নাকাজিমা জাপানি হলেও বাউমান জার্মান নাগরিক, তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় জাপানে অবস্থান করছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আসন্ন ডিসেম্বরে তাঁর ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে। দেখা গেল এ নিয়ে তাঁর পার্টনার নাকাজিমা ভীষণ উদ্বিগ্ন, এখন কী হবে? তাঁদের আইনজীবী ইয়োকোইয়ামা জানালেন, উপায় এখন একটাই। যে ২৫টি দেশে সমকামী বিয়ে বৈধ, সেগুলোর যেকোনো একটি দেশে গিয়ে বিয়েটা সম্পন্ন করতে হবে। তারপর নাকাজিমা ভিসার আবেদন করলে বাউমান জাপানে চলে আসতে পারবেন।

আগন্তক হয়ে থাকার মধ্যে এক ধরনের সুপ্ত আনন্দ থাকে। জীবনকে ভীষণ উপভোগ্য করে তুলতে এই যেমন বিদেশ-বিভুঁইয়ে ইচ্ছে করেই পথ হারিয়ে ফেলি! ঢুকে পড়তে জাপানী তরুণীদের হৃদয়-নগরে! যে অচেনা নারী আমাকে দেখে এক গাল হাসে, তাঁর কাছে ছুটি নীড়-হারানো পাখি আমি। ঠিকানা খুঁজে পেতে পরিচয়পর্ব সারি। মুগ্ধতা মাখানো সারল্যে আমার দিকে চোখের পলক বাড়িয়ে দেন, মিচিকো সাকুরা; ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নৃ-বিজ্ঞানে“ মাস্টার্স সেরে এখন চাকরি করা এই কর্মজীবী নারী। আড়চোখে দেখছিলাম তার ক্ষীণ কটি, উদ্ধত স্তন এবং পেটানো শরীর ; যা ভারতীয় উপমহাদেশের পুরুষ মানুষকে লোভি করে তোলার জন্য বলতেই হবে যথেষ্ঠ। তার সঙ্গে ডেনিম জ্যাকেট, প্রজাপতি টি শার্ট এবং প্লেড স্কার্ট যেন একটি নিখুঁত ফ্যাশনেবল আইকন।

ওটা বিমানবন্দর নয় টোকিও স্কাইট্রি

অতঃপর তিনি যেন তাঁর পুরোনো ভাষা ভুলে গেলেন এবং যত দূর সম্ভব ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা চালিয়ে যেতে থাকলেন। আলাপে বুঝলাম, টোকিওর সরু গলি, চোরাগলি, অন্ধগলি, সুনসান গলি সবই তাঁর নখদর্পণে। তিনি আমাকে নিয়ে ফুটপাতের উল্টো পাশে এসে দাঁড়ালেন। মেশিনে কয়েন ফেলামাত্রই অপর প্রান্ত থেকে ছলাৎ করে বেরিয়ে এল দুটি স্ট্রবেরি ড্রিংকস। সামনের সারিতে তিনটি, পেছনের সারিতে আরও তিনটি, দেখলাম মোট ছয়টি বাড়ি । বাড়িগুলোর ভেতরে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট। তবে প্রতিটি বাড়ির সামনেই চোখধাঁধানো ফুলের বাগান। ফুটপাতের টাইলস দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন এইমাত্র এসে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে! তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে সায় দিলে জাপানি জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কে আমার কৌতূহল অনন্য মাত্রা পায়, আমি প্রশ্নের ঝাঁপি খুলি:

লেখক: পৃথিবীতে বহু রাষ্ট্র, তবু জাপানিদের কেন আলাদা করে পরিশ্রমী জাতি বলা হয়

মিচিকো সাকুরা: জাপানে একটি কোম্পানিতে আমাদের দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যেতে হয়, যা অন্য দেশগুলোয় নেই। ফলে কোম্পানিতে কে কত দিন কাজ করেছে, তার ওপর নির্ভর করে বেতন বৃদ্ধি ও প্রমোশন। মনিব অনেক বেশি কাজ চাপিয়ে দিলেও ধৈর্য ধরে আমরা সেই কাজ করি। কেন? আমরা সবাই কাজ নষ্ট করতে চাই না। সময় অমূল্য ভেবে এমনকি ছুটির দিনেও আমরা কাজ করতে থাকি।

লেখক: পরিবারের চেয়ে কেন এখানে কর্মজীবনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়?

মিচিকো সাকুরা: কাজ করা নিয়ে জাপানি সমাজের নিজস্ব কিছু মনোভাব রয়েছে। জাপানে পুরো জীবন এক কোম্পানিতে কাজ করে যাওয়া হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম। জাপানে অতিরিক্ত কাজ করার মানে হচ্ছে, নির্ধারিত কাজে তুমি ফাঁকি দিয়েছ। ওভারটাইমের জন্য বাড়তি বেতন বাস্তবে দেওয়া হয় না। আর পরিবারকে কেন গুরুত্ব দেবে না; পরিবারকে সুখী রাখতেই তো জাপানিরা বেশি কাজ করে!

লেখক: আচ্ছা, অভিবাদনের সময় কেন তোমরা মাথা নোয়াও?

মিচিকো সাকুরা: এখানে অভিবাদনের সময় প্রথাগতভাবে মাথা নুইয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হয়। অর্থাৎ তুমি কার সামনে কতটা নত হবে, তা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির সামাজিক পদমর্যাদার ওপর। বয়োজ্যেষ্ঠ বা উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির নিকট গভীরভাবে মাথা নোয়াতে হয়। আর যদি ওই ব্যক্তি তোমার সমবয়সী বা কম বয়সী হন, তাহলে কম মাথা নোয়ালেই চলে। অভিবাদন জানানোর সময় ব্যক্তির চোখের দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকাতে হয়। দুই বাহু জোরালোভাবে দেহের সঙ্গে মিশিয়ে রেখে যতটা সম্ভব নিচু হতে হবে।

লেখক: জাপানে হ্যান্ডশেক কেন বর্জনীয়?

মিচিকো সাকুরা: জাপানে স্পর্শকাতর স্থানে যোগাযোগ ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এটা বর্জনীয়।

লেখক: জাপানে খাওয়ার সময় লোকেরা স্লারপিং বা শব্দ করে কেন?

মিচিকো সাকুরা: এখানে এটি বিশ্বাস করা হয় যে কোনো ব্যক্তি যদি নিঃশব্দে এবং চুপচাপ খায়, তবে তার খাবার পছন্দ হয়নি। এটি খাবারের প্রশংসা করার রীতি হিসেবে দেখা হয়, অন্যথায় কুক অত্যন্ত বিরক্ত হবেন যে তাঁর রান্না তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

বিস্ময়কর, জাপানে যতই ঘুরছি ততই জ্ঞানসমুদ্রে ভেসে যাচ্ছি। নিজের শখ, চিন্তাধারা অনেক কিছুরই বিনিময় শেষে সে সন্ধ্যায় মিচিকো সাকুরাকে ই–মেইল অ্যাড্রেস এবং ঠিকানা দিয়ে ঢুকে পড়লাম একটি সুপার শপে। টয়োটা, নিশান, হিটাচি, মিতসুবিশি, সনি, সিটিজেন, ক্যাসিও বিশ্বে বিস্তর কদর রয়েছে এসব গাড়ি, ইলেকট্রনিক গ্যাজেটস আর ঘড়ির ব্র্যান্ডের। কিন্তু আমার আগ্রহ জাপানের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পে। এ ছাড়া বউয়েরও আবদার বলে কথা! হোয়াটসঅ্যাপে আগের রাতে বলেছে, যার জন্যই যা কিছু উপহার হিসেবে নিই না কেন, তাতে ওর ওজর-আপত্তি নেই; কিন্তু ওর পুতুল চাই-ই চাই।

দেখছিলাম থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা শ্রেণির পুতুল। কিছু পুতুল শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিছু পুতুলে আছে রাজকীয় আদালত, যোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনাদের চরিত্র। কিছু পুতুলে আছে রূপকথার চরিত্র। কিছু পুতুলে দেখলাম জাপানি শহরের দৈনন্দিন জীবনের মানুষও রয়েছেন। ঘুরতে ঘুরতে আমার ভালো লাগল এক লাল টুকটুকে রাজকন্যাকে। যে করেই হোক সেটাকে আমার লাল-সবুজের দেশে উড়িয়ে আনতেই হবে। কর্কশ সেলসম্যান ১৫ পিস একসঙ্গে ছাড়া বিক্রি করতে রাজি নন, আবার দামও বেশ চড়া। পোষাল না।

রাস্তায় রাস্তায় এত্তো এত্তো জাপানি মুখ দেখতে দেখতে ভাবছি, জাপানিদের চেহারার সঙ্গে কোরিয়ান ও চীনাদের পার্থক্যটা আসলে কোথায়? জাপানি মুখ সাধারণত চীনের চেয়ে দীর্ঘতর; বিপরীতে চীনে দেখা যায় গোলাকৃতির মুখ। জাপানের বাসিন্দাদের মুখ আরও প্রসারিত ডিম্বাকৃতির? আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নাক। চীনাদের মধ্যে এটি প্রায়ই সমতল দেখা যায়। চীনের মানুষের চুল হয় শক্ত ও পুষ্ট। অন্যদিকে জাপানিদের নরম ও রেশম কোমল। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোই জাতিগতভাবে চীন ও কোরিয়ার সঙ্গে জাপানিদের পার্থক্য গড়ে দেয়।

রাতে বাসায় ঘুম আসছিল না। রিমোট কন্ট্রোলের বাটন টিপে টিভি চ্যানেলগুলো দেখে নিচ্ছিলাম আগ্রহভরে। কাজলদা জানালেন, জাপানিরা ভীষণ জাতীয়তাবাদী। সেখানে বিবিসি, সিএনএন, আল–জাজিরার দাপট নেই; ওদের সবচেয়ে জনপ্রিয় চ্যানেল এনএইচকে। এমনকি সুনামির সময়ও মানুষ এনএইচকে দেখে; এর কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা।

গুণগত মান ও নিজস্বতার দাপটে নিজেদের ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করে না। বিদেশি কোনো কিছু জাপানে বাজারজাত করতে হলে, জাপানিদের পছন্দসহ, অঘোষিত মানদণ্ড রক্ষা করতে হয়! না করতে পারলে, বিনিয়োগের পথেই ব্যবসা মারা যাবে। চাপাবাজি ও হেলাফেলার সুযোগ এখানে নেই। টিভি অনুষ্ঠান তো পরের কথা; ম্যাগডোনাল্ডস, কেএফসি, কোকাকোলার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোকেও তাদের পণ্য এবং সেবা জাপানিদের মতো করে সাজাতে হয়।

জাপানি শিশুরা ঘুম থেকে উঠেই টিভি দেখতে বসে যায়। বাড়ির কাজ বাকি না থাকলে, শিশুরা সাধারণত সকালে বই নিয়ে বসে না। টিভি দেখে আরাম করে, সকালের নাশতা করেই দলবেঁধে স্কুলে চলে যায়। টিভির শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানগুলো পাঁচ বছরের শিশুদের এত আনন্দের যে অনেক সময় শিশুরা সব ভুলে শুধু টিভি দেখতে চায়। প্রায়ই স্কুলে যেতে গড়িমসি করে, বিলম্ব করে। রাতে ঘুমানোর আগপর্যন্ত শিশু–কিশোররা, বিশেষত রাত আটটা পর্যন্ত বেশ মজা করে টিভি দেখে।

গভীর পর্যবেক্ষণে দেখছি সারা বাড়িবার্তি পুতুল! শান্ত-সৌম্য পরিবেশে মনে হচ্ছিল এগুলোই বেশি মানানসই। কাজলদা বললেন, জাপানের অসংখ্য পুরুষ সিলিকন রোমান্সের দিকে ঝুঁকছে ও এদের সংখ্যাটাও দিন দিন বাড়ছে। প্রতিবছর দেশটিতে প্রায় দুই হাজারের মতো ‘সেক্স ডল’ বিক্রি হয়। দাম অন্তত ছয় হাজার ডলার। জানালাম, পুতুলপ্রীতিতে বাঙালিরাও পিছিয়ে নেই। অন্যতম ঘরোয়া শিল্পকর্ম। মায়েরা বালিকাদের খেলার জন্য পুতুল বানিয়ে দেন। বাংলাদেশে পুতুল নিয়ে অবসেশন ছোট-বড় কমবেশি সবারই।

ইতিহাস বলে পাপেট্রি বা পুতুল নাচের শুরুটা আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের মাটিতেই। তখনকার দার্শনিক পতঞ্জলির লেখাতে ‘পুতুলবাজি’ কথাটা পাওয়া গিয়েছিল। মুচকি হাসিতে এতক্ষণ আলোচনা শুনছিলেন এবারে আর তর সইল না; পুতুল আলোচনায় আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন কাজলদার ‘জাপানিজ ওয়াইফ’ কোমিয়া নাসাকি। তিনি জানালেন, জাপানে একটি গ্রাম আছে যার নাম ‘নাগেরো’ আস্ত সেই গ্রামটিই এখন পুতুল গ্রাম। গ্রামে যে-ই আসেন, সেই গ্রামের পথে পথে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বয়সী পুতুল দেখে তাজ্জব বনে যান। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে যায় ফসলের মাঠে কোনো ব্যস্ত কৃষকরূপী পুতুলকে। নদীর ধারে ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়বে হয়তো ঢিলেঢালা প্যান্ট আর চেক শার্ট গায়ে, মাথায় টুপি পরিহিত একজন পুতুল মাছ ধরায় ব্যস্ত, দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সত্যিকার এক মানুষ।

জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুশি

পরদিন লাঞ্চ করতে গেলাম সুশির জন্য প্রসিদ্ধ চুও নামক স্থানে। এটা টোকিওতে গিনজা এলাকায় অবস্থিত। সুপ্রসিদ্ধ সেই হোটেলের নাম সুকিয়াবাশি জিরো। এখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানও সুশির স্বাদ নিয়েছেন। এসেছেন বারাক ওবামাও। প্রথমে সুগন্ধি স্টিকি রাইস বা আঠালো ভাত বয়স্ক সামুদ্রিক মাছের মধ্যে আবদ্ধ করে উমিমি তৈরি করা হয়। একবার শোষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সবজি দেওয়া হয় এবং নানা রকম ফলের ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। এটি জাপান ছাড়াও সারা বিশ্ব থেকে জাপানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়।

এ ছাড়া জাপানে থাকাকালীন কিছু জনপ্রিয় খাবার আমি চেটেপুটে খেয়েছি—এর মধ্যে শুকিয়াকি, সাবু সাবু, গরুর মাংসের ওয়াগিউ বেশ সুস্বাদু। আমার মনে হয়েছে যে কারও ভালো লাগতে পারে।

আমার এক সপ্তাহের ভ্রমণের মধ্যেই চলে আসে পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রবাসীদের অনেকেই দেখলাম কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়েছেন। কিনশিখোর স্থানীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের পর, আমি তাই টোকিও স্কাই ট্রি দেখার জন্য উন্মুখ হই। আমাকে সঙ্গ দেন কাজলদা এবং তাঁর বন্ধু হক রোকন।

স্কাই ট্রি অভ্যর্থনায় লিফলেট পড়ে জানলাম, এটি একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভবনও। অনেকে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবেও অভিহিত করে থাকে। কিন্তু না, এটি শুধু সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার। সবচেয়ে উঁচু ভবন হলো দুবাইয়ে অবস্থিত ‘বুর্জ খলিফা’ ভবনটি। সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের ওপরে যখন উঠলাম; মনে হলো ঝকঝকে নভোযান চড়ে দক্ষিণ আকাশের মাথা ক্রস করে যেন উত্তর আকাশ বরাবর নেমে এলাম। নানা দেশের মানুষের ভিড়, জটলা, গোপন শূন্যতাকে উড়িয়ে দিচ্ছে বহুকণ্ঠ কোরাসের যৌথ সুর।

এই টাওয়ারে হয়তো জীবনে দ্বিতীয়বার আসা হবে না, লিফটে প্রতিটি ফ্লোর একবার করে ঢুঁ মেরে, ছবি তুলছি আর দেখছি কৌতূহলী চোখ। ওদের কত প্রশ্ন, কত বার্তা! মনে হলো, অনুভূতিকে আসলে কখনো বেঁধে রাখতে নেই। যখন নিচে অবতরণ করলাম, দেখলাম স্কাই ট্রি একসময় দিগন্ত পেরিয়ে অনেক দূর দেশে হারিয়ে গেল। অবশ্য উল্লসিত অনুভূতিতে এর আগেই ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলাম।

তখনো বেলা মাত্র তিনটা। সূর্যালোক অ্যাপার্টমেন্টের কাচ ছাদ ভেদ করে ঠিকরে ধুয়ে দিচ্ছিল পরিচর্যিত বাগানগুলো। কাজলদা বললেন, এবার বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম তারপর তোমার জন্য শপিং করতে বেরোব। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে কাজলদা সিঁড়ি ভেঙেই রোজ রোজ অ্যাপার্টমেন্টের চারতলায় ওঠেন।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটা উপকারী ভেবে দুজনেই একসঙ্গে সিঁড়ি ভাঙছিলাম। এমন সময় ডাউন-স্টেয়ার্সে দেখা হলো ধূসর রঙের ওভারকোট পরা কোমিয়া নাসাকির সঙ্গে। তিনি কাজলদাকে মুচকি হেসে জাপানি ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, মিচিকো সাকুরাটা কে? কাজলদা ত্বরিত উত্তর দিলেন, কেন, কী হয়েছে? কোমিয়া নাসাকি বললেন, এক ব্যাগভর্তি পুতুল পাঠিয়েছে সঙ্গে একটি চিরকুট! কাজলদা আমার দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললেন—সারপ্রাইজ!

চিরকুট পড়ে তিন জোড়া চোখের পাতা থেকে ছড়িয়ে পরে যে মুগ্ধতা, তাতে যেন পাখির ডানা ঝাপটানোর আনন্দ...আবার এ যেন সঠিক শব্দটা খুঁজে না পেয়ে কৃতজ্ঞতায় চোখের পাপড়ির নত হওয়ারও ইঙ্গিত!

একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস বিদায়ের মুহূর্তকে আলিঙ্গন করলে, ভাবি টোকিওর লাল সূর্যটা কি হৃদয় থেকে ডুব দিলো? না! কোমিয়া নাসকির থমথমে মুখখানা দেখে আমার চোখও ছলছল করে উঠলো। মনেও কি ধড়ফড়? প্রতিটি বিদায় মুহূর্ত বুঝিবা এরকম সঘন! কেমন এক ইন্দ্রজাল যে ঘোরের মধ্যে থাকা একটি সপ্তাহ অল্পতেই ফুরিয়ে গিয়েও ফুরোলো না!গলার স্বর ভেঙে গেলে মুখ থেকে শব্দও বেরোয় না। ধীর পায়ে ট্যাক্সিতে ওঠতে ওঠতে ভিক্টোরি চিহ্ন দেখালাম। গেটের বাইরে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাদা ধবধবে কুকুরটাকে গলায় চেইন বেঁধে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন; তিনিও আমার লাগেজের বহর দেখে চোখে চোখ রেখে কি যেন বোঝাতে চাইলেন, গোলাপি গালের অনিন্দ্যকান্ত কিশোরটি দূরন্ত গতির  বাইসাইকেল থেকে নেমে বিদায়ী সম্ভাষণ জানালো।

একটা প্রবল দুলুনিতে বুঝলাম প্লেন উঠে গেছে ভূমি থেকে অনেক অনেক উপরে। দেখছি,নীচে সারাটা জাপানের সবুজ জমিন মানচিত্রের মতো বিছিয়ে আছে, মাঝখানে ঐশ্বর্যনয নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুজি পাহাড়। একসময় ঘুম পেয়ে গেল। কল্পনার তুলিতে…দেখে যাচ্ছি…আমি আবারো ফিরে আসবো জাপানে। শিশিরের পালক ছুঁয়ে, চকচকে পালিশ করা জাপানি কালো বুটে হলুদপাতা মাড়িয়ে…মিচিকো সাকুরাকে সঙ্গী করে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে জাপান সাগরের গভীরতা পরখ করে, অসংখ্য ভক্তিপূর্ণ বৌদ্ধদের মোমের আলোয় শেষবারের মতো নিজের প্রার্থনাটুকু সেরে নিতে!