বাংলা লোকসংগীতের বিশ্বায়ন



ড. রূপকুমার বর্মণ
বাংলার চিরায়ত লোকশিল্পী। ছবি: সংগৃহীত

বাংলার চিরায়ত লোকশিল্পী। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা ও বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম চালিকা শক্তি হল তাদের বৈচিত্র্যময় লোকসংগীত। মাঠেঘাটে কাজের সাথে সাথে লোকসংগীতের অবিরাম ধারা বয়ে চলেছে বাংলার (বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) সর্বত্র। বাউল, ফকির ও মরমী সাধক থেকে শুরু করে লোকসংগীত ও দেহতত্বের গান শোনা যায় অন্ধ ভিক্ষাজীবীর গলায়। বাঁশের বাঁশি, একতারা, দোতারা, সারিন্দা ও হরেক রকমের বাদ্যযন্ত্রের সাথে লোকসংগীতের মুর্চ্ছনা বাংলার মূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদ। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, সারি, জারি, ভাওয়াইয়া, বাউল, ভক্তিগীতি, দরবেশী, রাখালিয়া, মুর্শিদা, গম্ভীরা, ঝুমুড়, পূর্বালী, গোয়ালপাড়িয়া বা সিলেটি লোকসংগীত গ্রামীণ বাংলা ও বাঙালী মধ্যবিত্তের গন্ডী ছেড়ে আজ বিশ্বায়নের সংগীত জগতে পা রেখেছে।

সম্প্রতি “আইলরে নোয়া দামান আসমানের তারা” বা “জীবনখাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ লাগাইয়া”র মত সিলেটি ঘরানার লোকসঙ্গীতের আদলে সৃষ্ট গানগুলি সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব ও অন্যান্য অন্তর্জালিয় মাধ্যমের দৌলতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাঙ্গালীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বাংলা লোকসংগীতের ভূবনায়িত পণ্যে পরিণত হওয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে আমাদের তাকাতে হবে খানিকটা পেছনের দিকে। আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাংলা জনজীবনের গান, মরমী ভক্তিগীতি, কীর্তন, বাউল এবং লালন ফকির (আনুমানিক.১৭৭৪-১৮৯০), রাধারমন দত্ত (১৮৩৩-১৯১৫ ), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), শাহ আব্দুল করিম (১৯১৬-২০০৯) ও অন্যান্য সাধকের গান বিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই রেডিও, রেকর্ড ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাত ধরে গ্রামের মেঠোরাস্তা বা নদীর তীর ছেড়ে শহরমুখী হতে থাকে। পাশাপাশি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ও কবি নজরুলের (১৮৯৯-১৯৭৬) গানে বাউল ও অন্যান্য লোকসংগীতের সুরের ব্যবহার বাংলার লোকসংগীতকে তথাকথিত ভদ্রলোকদের দরবারে পৌঁছে দেয়।

বিশ শতকের মাঝামাঝি বামপন্থী ভাবধারা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীর প্রচারে বাংলার লোকসংগীতের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭), নিবারণ পন্ডিত (১৯১২-১৯৮৪) ও তাঁদের মতো বামপন্থী ঘরনার শিল্পী ও গীতিকারদের সুযোগ্য পরিচালনায় পূর্ববাংলার কীর্তন ও ভাটিয়ালীর সুর রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। লোককবি নিবারণ পণ্ডিতের “হরি তোমার অপার লীলা বোঝা হইল ভার” (১৯৩৯) ও “চল একসাথে চল গড়বো মোরা রাঙা দুনিয়া”(১৯৪৫) বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের “মাউন্ট ব্যাটেন মঙ্গলকাব্য (১৯৪৮)” ১৯৪০-র দশকে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

বিশ শতকের মধ্যপর্বে রেডিও ও রেকর্ডের সৌজন্যে বহু লোকসংগীত গ্রামীণ জীবনের নীরব ও শান্ত পরিবেশ থেকে কোলাহলপূর্ণ শহর ও মহানগরে পৌঁছে গিয়েছিল। তাছাড়া বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া লোকসঙ্গীতের রেকর্ড শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। আব্বাস উদ্দিন আহমেদ (১৯০১-১৯৫৯), শচীন কর্তা/শচীন দেব বর্মণ, (১৯০৬-১৯৭৫), কেদার চক্রবর্তী, হরিশ পাল, টগর অধিকারী (১৯১৪-১৯৭২), নির্মলেন্দু চৌধুরী (১৯২২-১৯৮১), অমর পাল (১৯২২-২০১৯), আব্দুল আলীম (১৯৩১-১৯৭৪), অংশুমান রায় (১৯৩৬-১৯৯০), পুর্ণদাস বাউল, কৃষ্ণা চক্রবর্তী ও অন্যান্য শিল্পীদের কন্ঠে বাংলার লোকসংগীত ১৯৪৭-পরবর্তী ভারত ও বাংলাদেশ (পূর্ববাংলা/পূর্ব পাকিস্তান) উভয় দেশেই বহুল প্রচলিত হয়েছিল।

এদের মত স্বনামধন্য শিল্পীর প্রচেষ্টা বাংলার কৃষক ও মাঝি-মাল্লাদের সুরকে ভদ্র সমাজের ‘সংগীত জলসা’ ও ‘ড্রয়ংরুমে’ পৌঁছে দিয়েছিল। শচীন কর্তার “তোরা কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া”, “কালো সাপে দংশে আমায়” ও “আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল” এর মতো আব্বাস উদ্দিনের গাওয়া “ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে” “নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে”; প্রতিমা বরুয়ার (১৯৩৪-২০০২) গোয়ালপাড়িয়া গান, অমর পালের ভাটিয়ালি ও ভক্তিসংগীত, আব্দুল আলীমের গাওয়া “নবী মোর পরশমনি” বা নীনা হামিদের কন্ঠে “আমার সোনার ময়না পাখি” ও ফরিদা পারভীনের গাওয়া “লালন ফকিরের গান”’ স্বপ্না চক্রবর্তীর গলায় “বড়লোকের বেটি লো” বা “বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা”, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ও রথীন্দ্রনাথ রায়ের গাওয়া পল্লীগীতি এবং বাংলার আরোও অনেক লোকসঙ্গীত উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে ঠাই পেয়েছে। একইসঙ্গে বাংলা লোকসঙ্গীতের সুরের সঙ্গে উপমহাদেশের অন্যান্য লোকসংগীতের সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলার মেঠো সুরকে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন অনেকেই। তাই হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও ভুপেন হাজারিকার (১৯২৬-২০১১) প্রচেষ্টায় ‘ভাটিয়ালি’ ও ‘বিহুর’ মিশ্রনে সৃষ্ট ‘রাধা-রংমন’ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

লক্ষ করার বিষয় হলো বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে হিন্দি বা বাংলা সিনেমায় যেমন পাশ্চাত্য সংগীতের বহু সুর ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি বাংলার লোকসংগীতের সুরও ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সিনেমায় ব্যবহার করেছেন অনেক স্বনামধন্য সংগীত ও চিত্রপরিচালক। শচীন দেব বর্মণ, সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২), ঋত্বিক কুমার ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) ও সদ্য প্রয়াত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১৯৪৪-২০২১) বাংলার বিভিন্ন জেলার লোকসঙ্গীতকে সিনেমায় ব্যবহার করে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় ব্যবহৃত “নৌকার ভারে গঙ্গা বোঝাই”, “লীলাবালি লীলাবালি ভর যুবতী” বা “নামাজ আমার হইল না আদায়” এর মতো গানে যেমন পূর্ববঙ্গের সুর বেজে ওঠেছে তেমনি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমায় “কালো জলে কুচলা চলে” বা “ফুল গাছটি লাগাইছিলাম” এর মত গানগুলিতে শোনা যায় রাঢ বাংলার ঝুমুরের মূর্চ্ছনা।

তবে বিশ শতকের শেষ দশক থেকে বাংলা লোকসংগীত একটা আলাদা একটা মাত্রা পেতে শুরু করেছে। বাণিজ্যিক সিনেমায় লোকসঙ্গীতের ব্যবহার করার প্রবণতা যেমন বেড়েছে তেমনি বিভিন্ন ‘বাংলা ব্যান্ড’ লোকসঙ্গীতকে নতুন করে পরিবেশন করতে শুরু করেছে। ফলে লালন ফকির, রাধারমণ দত্ত, হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম ও অন্যান্য গীতিকারদের রচিত গান এবং প্রচলিত পল্লীগীতি আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সাবেকি বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। ‘বিসর্জন’ ও ‘প্রাক্তন’ সিনেমায় ব্যবহৃত গানগুলি একটু মন দিয়ে শুনলে এ বিষয়টি সহজেই হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব।

একুশ শতকের গোড়ায় সরকারি টেলিভিশন ছাড়াও ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত বিভিন্ন চ্যানেলগুলো লোকসঙ্গীতের প্রচারে সহায়ক হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেরই টিভি চ্যানেলগুলোর পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের সংগীতের অনুষ্ঠান হারিয়ে যাওয়া লোকসংগীতকে নতুন আঙ্গিকে শ্রোতাদের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন ধারাবাহিকেও বাংলার লোকসঙ্গীতের ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। একই সঙ্গে নজরুল ইসলাম বাবু, মমতাজ, স্বপন বসু, সুখবিলাশ বর্মা, অভিজিৎ বসু, সুভাষ চত্রবর্তী, সাত্যকি ব্যানার্জি, সৌরভ মনি ও তাঁদের মতো অনেক শিল্পী ও শ্রষ্ঠা বাংলা লোকসঙ্গীতের এই নতুন অধ্যায়কে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তবে এই নতুন অধ্যায় শুধুমাত্র বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডন, ওয়াশিংটন, ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়াও মধ্য এশিয়ার শিল্পীও তাঁর মতো করে আজ “ভ্রমর কইয়ো গিয়া” গেয়ে ওঠেন।

বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবস্থার দ্রুত বিকাশ ও ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্লাটফর্মের সৌজন্যে বাংলার লোকসংগীতগুলো অতি দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে সারা পৃথিবীর বাঙালীদের মধ্যে। সামাজিক গণমাধ্যমও এই কাজে সদর্থক ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাই বাংলা লোকসংগীতের আদলে সৃষ্ট (ভাটিয়ালী, সিলেটি, ভাওয়াইয়া, ঝুমুর, বাউল, ইত্যাদি) গানগুলো শোনা যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র।

এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয় যে তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে ওঠা আধুনিক ঘরানার লোকসংগীতগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। এই গানগুলির রেকর্ড বা ভিডিওতে অনেক ক্ষেত্রেই মূল গীতিকার, গায়ক ও সুরকারের নাম গোপন থেকে যাচ্ছে। ফলে শাহ আব্দুল করিম, রতন কাহার, হরিরাম কালিন্দী, পন্ডিত রামকানাই দাশ, ধনেশ্বর রায় ও তাঁদের মতো অনেকেই দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছেন। তবে আশার কথা এই যে, বাংলা লোকসংগীত আজ বিশ্বায়িত পণ্যে পরিণত হয়েছে যা বিশ্বের যে কোনও সংগীত ঘরানারা সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে!

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক।