বই চাই নাকি বউ চাই; ঝগড়া লেগেই থাকতো!



আনিসুর বুলবুল
রফিকুল ইসলাম।

রফিকুল ইসলাম।

  • Font increase
  • Font Decrease

বাড়িতে চাল নেই। অথচ বই কিনে নিয়ে গেছেন ঠিকই! বইয়ের জন্য বউয়ের কাছে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে মাঝে মধ্যেই। একবার ঢাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে এসে পুরো টাকার বই কিনে নিয়ে গেছেন তিনি। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ তাকে মাতাল করে। বইমেলা শুরু হলে তাকে আর কেউ আটকে রাখতে পারে না। সেই কৈশোর থেকে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে শুরু। আজ তার সংগ্রহে প্রায় ১২ হাজার বই!

বাড়িতে এতো বেশি বই আর বইয়ের সেল্ফ যে পরিবারের লোকদের শোবার জায়গাই হচ্ছিলো না! বই চাই নাকি বউ চাই; ঝগড়া লেগেই থাকতো! অবশেষে দোকান ভাড়া করে বইগুলো স্থানান্তর করা হয় বাজারে।

বলছি একজন বই পাগলের কথা। যার কাছে বই-ই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বইয়ের ঘ্রাণে যিনি ঘুমান- তিনি রফিকুল ইসলাম। মানিকগঞ্জের শিবালয় ইউনিয়ন পরিষদের ০১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার।

একজন ইউপি মেম্বার হলেও বই পড়া, কেনা, সংগ্রহ এবং মানুষকে বই পড়িয়ে তার আনন্দ। এর পেছনে কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থ একটাই। তা হলো বইয়ের নেশা। আরিচা ঘাটে ভাড়া করা একটি দোকানে গড়ে তুলেছেন তার ব্যক্তিগত পাঠাগার। পাঠাগারের নাম দিয়েছেন ছেলের নামে 'রোহান পাঠাগার'। নামে ব্যক্তিগত হলেও এ পাঠাগার সবার জন্য বই পড়া ও সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ এই পাঠাগার থেকে বই সংগ্রহ ও বই পড়তে পারেন।

তার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৪ সনে। তখন আমরা এক সঙ্গে স্থানীয় একটি সাপ্তাহিকে লেখালেখি করতাম। তখন তার বাসায় গিয়ে আমি একটি বুক সেল্ফ দেখে এসেছিলাম। তারপর সম্প্রতি যখন তার পাঠাগারে যাই; আমি তো অবাক! চারিদিকে শুধু বই আর বই! পুরো ঘরটির চারপাশ বোঝাই বই!

রফিকুল ইসলাম বলেন, ভালো বই মানুষকে সৃজনশীল করে। মনের অন্ধকার, অজ্ঞতা দূর করে মানুষকে নির্মল আনন্দ দেয়। বইয়ের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, সে বন্ধুত্বে থাকে গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে যুগযুগ ধরে স্মরণ করে রাখে পাঠকের হৃদয় ও মনকে। বই পড়লে মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন এবং নতুন কিছু চিন্তার আবির্ভাব ঘটে।

তিনি আরও বলেন, এমন অনেক দিন গেছে সংসার চলছে না; বাজার করতে গিয়ে বই কিনে নিয়ে এসেছি। বাইরে থেকে আসলেই বউ আগে ব্যাগ চেক করতো! বউ-ছেলের জন্য জামা কিনতে গিয়েও বই কিনে নিয়ে আসতাম। একটা সময় বই নিয়ে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া লেগেই থাকতো!

রফিক জানান, আসলে পাঠাগার করার চিন্তা করে বই সংগ্রহ করা হয়নি। বই কিনতে কিনতে এক সময় দেখি বাসায় বই রাখার জায়গা হচ্ছে না। তখন সিদ্ধান্ত নেই বইগুলো ভাড়া করা ঘরে নিয়ে আসতে। তারপর লোকজনের জানাজানি হলে সিদ্ধান্ত নিই পাঠাগার করার।

তিনি বলেন, বর্তমানে পাঠাগারে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে। আমার ইচ্ছা ২৫ হাজার বই সংগ্রহের। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের পাঠকরা এখান থেকে বই সংগ্রহ করেন। পড়া শেষে আবার বই ফেরত দিয়ে যান। বই পড়ার জন্য কোনো টাকা নেয়া হয় না।

তিনি তার স্বপ্নের পাঠাগারটি টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার ও শিক্ষানুরাগী হৃদয়বানদের সহযোগিতা কামনা করেন।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে পাঠাগারটিতে। শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বইও রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি বই ছাড়াও প্রচুর ধর্মীয়গ্রন্থ রয়েছে পাঠাগারটিতে।

সম্প্রতি মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়, একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হক, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আফজাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম পাঠাগার পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া মানিকগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানিয়া সুলতানা, শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানা পাঠাগারটি পরিদর্শন করেছেন।

রোহান পাঠাগার থেকে সব ধরনের পাঠকের বইয়ের চাহিদা পূরণ হবে বলে জানান স্থানীয় সাংবাদিক শাজাহান বিশ্বাস, শহিদুল ইসলাম ও মারুফ হোসেন। তারা বলেন, যে কোনো সৃজনশীল পাঠক এখানে এসে সাহিত্য চর্চা করাসহ মন ও মননকে তৃপ্ত করতে পারবেন। জ্ঞানকে পরিশীলিত, শাণিত এবং সমৃদ্ধ করতে পারবেন। অনন্য এই উদ্যোগটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক এটাই হলো মূল বিষয়।

শিবালয় উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউর রহমান খান জানু বলেন, রোহান পাঠাগার উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে। নিজের টাকায় রফিক মেম্বার মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন।

রোহান লাইব্রেরি উন্নয়নে এবং সুনামের সঙ্গে টিকে থাকার জন্য শিবালয় উপজেলার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।