তিলা ঘুঘুর মধুর ডাকে চিরন্তন অনুভূতি



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
শহরের পরিবেশের আপন মনে ডাকছে তিলাঘুঘু। ছবি: আলমগীর হোসেন

শহরের পরিবেশের আপন মনে ডাকছে তিলাঘুঘু। ছবি: আলমগীর হোসেন

  • Font increase
  • Font Decrease

পাখির ডাক– পরম শান্তির এক অনুভূতি। গাছের ডালে বসে কোনো পাখি যখন আপন মনে প্রাকৃতিকভাবে ডাকে - তখন সে ডাক শোনার মাঝে ভীষণরকম এক ভালোলাগা, প্রচন্ড এক স্বস্তি বিরাজ করে। মুহূর্তে চারপাশটা সৌন্দর্যে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ক্লান্তিহীন বিরামহীন ডাক যেন বাংলাদেশে বিচরণকারী প্রায় সাতশ’ পাখিদের এক উজ্জ্বল প্রাকৃতিক প্রতিনিধি। যার শরীরের লোমশ আবরণের পরতে পরতে বুনো গন্ধমাখা। যার চকিত চাহনিতে খুঁজে পাওয়া যায় আরণ্যক জীবনের নিভৃত কোনো গল্প। এমন ডাক ক্ষণিক অবসরের চিরশোভাময় পরিবেশের জন্ম দিয়ে থাকে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য। শহরে বা উন্নত নগরসভ্যতায় যারা থাকেন – তাদের খুব কম মানুষেরই সৌভাগ্য হয় সেই ডাক শোনার। আবার কেউ কেউ শোনেনওবা। কিন্তু সেই চিরন্তন ভালোলাগাটুকু তার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলে না। তার অন্তুঃপুরে সৌন্দর্য ছড়ায় না। আবার কারো কারো বেলায় সেটা মারাত্মকভাবে আপন সৌন্দর্যবোধের মাঝে দারুণ প্রভাব ফেলে।

ভ্রমণক্লান্ত কোন পাখি যখন অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে কোনো গাছে এসে বসে - তখন তার বিশ্রামশান্তির প্রয়োজন হয়। তখন সে বিশ্রাম নিতে নিতে তার প্রিয়দের খোঁজে নিজস্ব আহ্বান বাতাসে ছড়ায়। আবার কোনো পাখির যখন একটা বিশেষ জায়গা বা একটা বিশেষ স্থান বড় বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে – তখন সে ঠিক এখানে প্রতিদিনই আসে। নিজের মতো করে আপন মনে সাথীকে ডাকে। যদি কোনো সাথী তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেই প্রিয়তম স্থানে কিছুটা সময় তার সাথে কাটায়।

মধুময় ডাকের অন্যতম এক পাখি তিলাঘুঘু। ছবি: আলমগীর হোসেন

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, মধুময় ডাকের অন্যতম এক পাখি তিলাঘুঘু। Spotted Dove এদের ইংরেজি নাম । এরা সারাদেশেই আছে এবং সহজে দেখা মেলে। এদের ডাক খুব মধুর: ‘ক্রকক্রউক-ক্রকু-ক্র-ক্রো, ক্রকক্রউক-ক্রকু-ক্র-ক্রো...’ অনেকটা এভাবে ডাকে।

তিলা-ঘুঘুর দৈহিক গঠন ও বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘এরা আকারে আমাদের কবুতরের মতো – প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় ১২০ গ্রাম। এর মাথার চাঁদি ও কান ঢাকনি ধূসর, ঘাড়ের পিছনের উপরিভাগ পাটল বর্ণের। ঘাড়ের পিছনের নিচের ভাগ ও ঘাড়ের পাশ সাদা-কালো তিলা পট্টি। বাদামি পিঠ ও ডানায় পীতাভ তিলা রয়েছে। উড়ার সময় ডানার ফিকে ধূসর ফিতা লেজের বাইরের সাদা দিক চোখে পড়ে। দেহের নিচের দিক আঙুর-কালচে। গলা ও বুক ফিকে এবং লেজতল ঢাকনি সাদাটে। চোখ ফিকে কালচে বাদামি। চোখের পাতা ও চোখের পলকের মুক্ত পট্টি অনুজ্জ্বর গাঢ় লাল। চঞ্চু (ঠোঁট) কালচে শিং-রঙা। পা ও পায়ে পাতা নীল-লালে মেশানো এবং নখ বাদামি। ছেলে এবং মেয়ে পাখির চেহারা অভিন্ন।’

অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা-ঢাকনিতে অতি সুক্ষ্ম ডোরা এবং ডানার পালক-ঢাকনির প্রান্তদেশ লালচে। ঘাড়ে তিলার পট্টি নেই বলে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ তিলা-ঘুঘু পাখিদের প্রসঙ্গে জানান তিনি।

এ পাখিটির বিচরণ ও খাদ্য সম্পর্কে ইনাম আল হক বলেন, তিলাঘুঘু আর্দ্র পাতাঝড়া বন, বাগান, কুঞ্জবন, আবাদি জমি, গ্রাম বা শহরের নির্জন রাস্তা কিংবা গাছে গাছে বিচরণ করে। সাধারণত জোড়া বা ছোট দলে থাকে। তবে কখনো কখনো একাকীও দেখা যায় তাদের। তৃণভূমি, খামার, চাষের জন্য কর্ষিত জমি, রাস্তাঘাট ও বনের ধারে খাবার খায়। তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে বীজ ও নানান ধরণের শস্যদানা।

প্রজননকাল সম্পর্কে এ পাখি গবেষক বলেন, ছেলে পাখিরা মেয়ে পাখিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই ক্রমগত ডাকতে থাকে। এপ্রিল-জুলাই এদের প্রজনন মৌসুম। এ সময় ছেলেপাখিরা মেয়ের পাশে মাথা নাচিয়ে অবিরাম কোমল সুরে ডাকে। কাটাওয়ালা ঝোপ, বাশঝাড়, খেজুর ও অন্যান্য ছোট গাছে বা গাছভর্তি ঝুলানো টবে কাঠির বাসা বানিয়ে এরা ২-৩টি ডিম পাড়ে। ১৩-১৪ দিন পর ডিম ফুটে ছানা বের হয়।

তিলাঘুঘু বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া থেকে ফিলিপাইন এবং পুরো ভারত উপমহাদেশসহ এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায় বলে জানান পাখি বিশারদ ইনাম আল হক।