শিকারেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সবুজ ঘুঘু



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
মাটিতে এভাবে নেমে খাবার সংগ্রহ করে সবুজ ঘুঘু। ছবি: ড. কামরুল হাসান

মাটিতে এভাবে নেমে খাবার সংগ্রহ করে সবুজ ঘুঘু। ছবি: ড. কামরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

শুধু গহিন বন নয়। সাধারণ সবুজে ঘেরা বনের নির্জন পথ পাখিদের বিচরণ ভূমি। বিশেষ করে ঘুঘু জাতীয় পাখিদের। ওরা এমন নির্জন পথের মাঝে মাটিতে নেমে খুটে খুটে খায়। মাটির মাঝে পড়ে থাকা শস্যদানা জাতীয় খাবার তাদের প্রিয় খাদ্য। সেগুলোই তারা মাটিতে নেমে আগেভাগে খেয়ে ফেলে। মাটি থেকে এই খুটে খুটে খাওয়া দৃশ্য বড় ভালো লাগার। দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন কী দৃশ্য দেখতে কী যে ভালো লাগে!

ভোরের দিকে গহিন বনের নির্জন পথে এই পাখিদের দেখা যায়। দু-একটি দলে মিলিত হয়ে তারা মাটির থেকে খুটে খুটে খাবার খেতে আসে। হঠাৎ ছুটে চলা গাড়ির শব্দে ওরা খাবারে বিরতি টেনে চলে যায় অন্যদিকে। পাহাড়ি ভোর কিংবা সকাল এই দুটো মুহুর্তকে তাদের উপস্থিতি দিয়ে প্রতিদিনের মতো স্বাগত জানায় – ‘সবুজ ঘুঘু’রা। সকালের স্নিগ্ধতায় এরা প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য হয়ে ধরা দেয়। তাদের সবুজাভ রঙের বর্ণছটায় শুভ্রসকাল আপন মুগ্ধতা ফিরে পায়।

তবে সারাদেশ থেকেই আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে সবুজ ঘুঘু। বিশেষজ্ঞের মতে অবাধ শিকার এ পাখিটিকে বিপন্ন করার পেছনে অন্যতম কারণ। এর ইংরেজি নাম Emeraled Dove এবং বৈজ্ঞানিক নাম Chalcophaps indica।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তালিকায় সবুজ ঘুঘু ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্থ’ পাখি।

সারাদেশ থেকেই কমে যাচ্ছে সবুজ ঘুঘু। ছবি: ড. কামরুল হাসান

সারাদেশ থেকেই কমে যাচ্ছে সবুজ ঘুঘু। ছবি: ড. কামরুল হাসান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, এক সময় সবুজ ঘুঘু সারাদেশে ভালো পরিমাণেই ছিল। আমাদের গ্রামগঞ্জের বাড়ির পেছনের যে সকল বাঁশঝাড় বা গাছগাছালিপূর্ণ অংশগুলো ছিল যেখানে এদের দেখা যেত। এখন দেখা যায় না বললেই চলে। ভালো করে খুঁজলেও এখন আপনি একটাকে পাবেন কি না সন্দেহ আছে। বর্তমানে তাদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

প্রজনন সম্পর্কে তিনি বলেন, সবুজ ঘুঘুর ‘ব্রিডিং টাইম’টা (প্রজনন সময়) একটু ঝুঁকিপূর্ণ। অন্য পাখি যেমন তাদের বাসার পাশে কেউ গেলে বা পাখি বাসা দেখলে পাখিরা তাদের বাসাতে ফিরে আসে বা তাদের বাসাটি পরিত্যক্ত করে চলে যায় না, কিন্তু সবুজ ঘুঘুর বেলায় তা নয়। প্রজনন মৌসুমে তাদের বাসার আশেপাশে কেউ গেলে বা সে যদি ‘ডিসটার্ব ফিল’ করে তবে তারা বাসাটি পরিত্যক্ত করে অন্যত্র চলে যায়। 

শারীরিক বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবুজ ঘুঘুর পিঠের দিক এবং ডানা ধাতব সবুজ বা পান্না রঙের। সূর্যের আলো পড়লেই ঝকঝক করে পুরো অংশটি। মাথা এবং ঘাড় ধূসরাভ। ঠোঁট লাল এবং পা ও পাতা সিঁদুরে লাল। পেটের দিক গোলাপি ধূসর বা উজ্জ্বল গোলাপি। এদের উচ্চতা প্রায় ২৭ সেন্টিমিটার।

সবুজ ঘুঘুর খাবার তালিকা এবং প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে ড. কামরুল বলেন, মূলত সবুজ বনের বাসিন্দা। বাঁশবন পাতা ও পাতাঝরা বনে সচরাচর একাকী ছায়াঘেরা বনের নির্জন জায়গায় একা কিংবা জোড়ায় খাবার খুঁজে বেড়ায়। মাটিতে পড়ে থাকা ফল ও তার বিচি, শস্যদানা, বীজ, কীটপতঙ্গ, উইপোকা খেতে দেখা যায়। খুব সকালবেলা এবং শেষবেলা খাবার খুঁজে বেড়ায় বাকি সময় গাছের ডালে বসে সময় কাটায়। এরা খুব সতর্ক ও লাজুক স্বভাবের কোন রকম শব্দ পেলে দ্রুত বেগে উড়ে পালায়। সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনগুলোতে তাদের দেখা যায়।

এই পাখিটির বড় থ্রেড (ঝুকি) হচ্ছে হান্টিং (শিকার)। চা বাগান বা গ্রামের দিকে ফাদ পেতে বা ঘুঘু দিয়ে ঘুঘুকে শিকার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও এয়ারগান বন্দুক দিয়েও এদের শিকার করা হয়। অবাদে হান্টিং (শিকার) করার কারণে এদের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে বলে জানান বন্যপ্রাণি গবেষক ড. কামরুল হাসান।