মুঘল আমলেও চালু ছিল কলকাতার যে সড়ক



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
চিৎপুর রোডে ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদ। বার্তা২৪.কম

চিৎপুর রোডে ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদ। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে গড়া কলোনিয়াল শহর কলকাতা বয়সে ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুর্শিদাবাদের চেয়ে নবীন হলেও সেখানে একটি সড়ক আছে, যা চালু ছিল মুঘল আমলেও। কলকাতার সবচেয়ে পুরনো সড়ক কোনটি, তা খুঁজতে গিয়ে জেনেছি তথ্যটি। অজিতকুমার বসুর 'কলিকাতার রাজপথ সমাজে ও সংস্কৃতিতে' (আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড) বইটিতে তথ্যটি পেয়ে অবাক হওয়ার চেয়ে বিস্মিত হয়েছি বেশি। কারণ, কলকাতা গেলে অবধারিতভাবে ঐ সড়কে আমাকে যেতে হয়। অথচ কখনও টের পাইনি সড়কের ঐতিহাসিক প্রাচীনত্ব।

লোকমুখে রাস্তাটির নাম চিৎপুর রোড, ধর্মতলা থেকে বড়বাজার যেতেই এর দেখা পাওয়া যায়। এখন অবশ্য আনুষ্ঠানিক নাম রবীন্দ্র সরণি, যা চালু ছিল মুঘল আমলেও। কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেব জোব চার্নক আসার অনেক আগে থেকে এই একটি মাত্র সড়ক ছিল তৎকালীন অজপাড়া কলকাতায়।

'ক্যালকাটা রিভিউ' (Vol. 3, 1845) থেকে জানা যায়, বাংলার নবাবি বাহিনীর এক সেনাপতির রোষে পড়ে 'চিতে ডাকাত' নামে এক স্থানীয় দুর্বৃত্ত। ১৮ শতকের প্রথমার্ধে ঘটেছিল রোমাঞ্চকর ঘটনাটি। অভিজাতদের আক্রমণ করতো চিতে ডাকাতের দলবল। পরবর্তীকালে চিতে ডাকাতকে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। চিৎপুর সড়কটির সঙ্গে মিশে আছে চিতে ডাকাতের নাম ও স্মৃতি।

১৮২১ সালের ১২ জুলাই 'সমাচার দর্পণ' পত্রিকার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ রয়েছে এই রাস্তার। বলা আছে, কলিকাতার (তখন কলকাতা নাম হয়নি) জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্থানীয় লোকেরা তখনও বাঘ নিয়ে আলোচনা করছেন। চিৎপুর অঞ্চলে বাঘ ঘুরে বেড়াত অল্প কিছু সময় আগেই। হিংস্র জন্তু-জানোয়ারে ভর্তি গভীর অরণ্যের মাঝখানে চিৎপুর রোড দিয়েই নবাবি রাজধানী মুর্শিদাবাদের সঙ্গে সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলিকাতা গ্রাম এবং দক্ষিণের প্রধান সংযোগ ছিল। বাগবাজার খাল থেকে বাগবাজার স্ট্রিট পর্যন্ত ছিল রাস্তার প্রথম অংশ। বাগবাজার স্ট্রিট থেকে মেছুয়াবাজার স্ট্রিট অবধি আপার চিৎপুর রোড। লোয়ার চিৎপুর রোড চলে গিয়েছিল বৌবাজার স্ট্রিট এবং লালবাজার স্ট্রিট পর্যন্ত।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালে কলকাতা আক্রমণ করলে সেনাপতি মির জাফরের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার জন হলওয়েলের সংঘর্ষ যেখানে হয়, সেই ‘বারুদখানা’-র স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বলে। এখানেই ছিল ‘পেরিং সাহেবের বাগান’। ক্যাপটেন পেরিন ছিলেন প্রচুর জাহাজের মালিক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তারা বাড়ির মহিলাদের নিয়ে তার বাগানে ঘুরতে আসতেন। ব্রিটিশরা সুতানুটি ছেড়ে বিদায় নিলে দেখাশোনার অভাবে বাগান নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ১৭৫২ নাগাদ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

`কলকাতা’ এবং ‘ক্যালকাটা’ নামের উৎস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে অনেক। তবে গবেষকরা বলেন, ‘কালীঘাট’-এর সঙ্গে নামটির কোনও যোগ নেই। বেশিরভাগ পণ্ডিতই একমত যে ‘খাল’ এবং ‘কাটা’ – দুটি শব্দের বিকৃতি ঘটে এমন নাম এসেছে। গোবিন্দপুর এবং কলিকাতা গ্রামের মাঝখানে বয়ে যাওয়া এক প্রাকৃতিক খালই নামটির উৎস।

রামমোহন রায় প্রমুখের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্মের সংস্কারবাদী আদি ব্রাহ্ম সমাজের মতো প্রতিষ্ঠান, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মতো বনেদি পরিবার, ঐতিহাসিক নাখেদা মসজিদ, বনেদি খাবারের জাকারিয়া স্ট্রিট, পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বৃহৎ মার্কেটপ্লেস বড়বাজার চিৎপুর রোডের ইতিহাসে আবর্তিত গৌরবের অংশ।

কলকাতার এই সড়কে বিনোদনের আয়োজনও অফুরন্ত। ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার, জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ, একের পর এক মদের দোকান, এমনকি গণিকালয়ও রয়েছে সড়কটি ঘিরে। আবার এই রাস্তা দিয়েই যদুনাথ মল্লিকের বাড়ি যেতেন রামকৃষ্ণ পরমহংস।

মধ্য কলকাতা আর উত্তরের সেতুবন্ধ চিৎপুর রোডে শুধু বাঙালি বা হিন্দু-মুসলিম নয়, মাড়েয়ারি, গুজরাতি, জৈন, পার্সি তথা তাবৎ জাতি-গোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায়। বহুবিচিত্র মানুষ ও সংস্কৃতির মিশ্রণে চিৎপুর রোড  তিলোত্তমা কলকাতার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আর সর্বভারতীয় অবয়বের এক মিনি সংস্করণ।