আবার আসিবো ফিরে



নোমান মিয়া
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

৫৬৩ দিন!  মাসের হিসেবে ১৮ মাসেরও অধিক! দেখা হয় না দুচোখ দিয়ে ক্লাসরুম, ফুডকোর্ট, টং, শহীদ মিনার, হলের ক্যান্টিন, এক কিলো, লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া আরো কত কি! খেলা হয় না হ্যান্ডবল গ্রাউন্ডে ও  সেন্ট্রাল ফিল্ডে, যোগ দেওয়া হয় না বিভিন্ন সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানে, শিখা হয় না টিচার ও সিনিয়রদের কাছ থেকে নতুন নিয়ম কলা-কৌশল। শুনিনা এখন আর আড্ডায় বসে কবি বন্ধুর নতুন কবিতা, হয় না আর সিনিয়র জুনিয়র একসাথে আড্ডা, বৈশ্বিক রাজনীতি  ও পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক,  মিডনাইটে বার্বিকিউ পার্টি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সময়টা  ফ্যাকাশে বর্ণের রং ধারণ করে একই জায়গায় স্থির।  দূরে থেকেও বন্ধুবান্ধবদের সাথে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ থাকায় কিছুটা সময় কাটে আনন্দঘন স্মৃতিপটে।  অতীতের সেই সোনালী সময়গুলোর স্মৃতিচারণায় গুনতে থাকি প্রহর।

কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা নিতান্তই একটা সংগ্রাম,ত্যাগ- তিতিক্ষার নাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবে রূপায়িত হয়, ঠিক তখনই বেজে উঠে মর্মর, বেদনাহত ধ্বনি।  সেই মর্মের ধ্বনিটা কোনো অশনি সংকেত নয়। তা প্রিয়জনদেরকে ছেড়ে দূরে থাকার বেদনা, পুরনো বন্ধুবান্ধবদেরকে ছেড়ে নতুনদের খোঁজার সঠিক দিগন্তের উন্মোচন করা । মনে সংশয় ঘটে, আমি কি পাবো নতুনদেরকে আমার সেই পুরনো বন্ধুবান্ধবের মতো, পারবো কি না নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে। কেমন হবে ক্লাস, কেমন হবে টিচারদের সহানুভূতি,  চালাতে পারবো কি নিজেকে আমার মতো এক অজপাড়াগাঁয় থেকে বেড়িয়ে আসা ছেলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বিদ্যালয়ের সাথে! নানান সংশয় আচ্ছাদিতো চিন্তাভাবনা। 

এসব অনিশ্চিত চিন্তাভাবনা নিঃশেষ হয়েছে শিক্ষক, সিনিয়র, বন্ধুসুলুভ সহপাঠীদের উপস্থিতিতে। সময় কেটেছে ক্যাম্পাসে মাত্র ৪৫ দিন। কিন্তু ক্যাম্পাস মনে হয়েছে চিরচেনা। ক্যাম্পাসে আসা আমার মতো বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বানিয়ে নিয়েছে দ্বিতীয় পরিবার। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। পরিচিতি হয়েছি বৈচিত্র্যতায় পূর্ণ এক মেলবন্ধনের সাথে । 

সকাল আটটায়  ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে, স্যার পরে ঢুকতে দিবেনা, এই ভয়ে ঘুমের রাজ্য ভূমিকম্প হতো আটটা বাজার অনেক আগেই। শীতের সকালটা কেটেছে  ক্যাম্পাসের নির্মলতার সাথেই। সকালের সূর্যের বর্ণীল রশ্মী রাঙিয়ে দিতো ক্যাম্পাসকে। এ রূপ মনে প্রস্ফুটিত করেছে নতুন আশা ও স্বপ্নের। তাই ক্যাম্পাস যেনো হৃদয়ের গভীরে পুঁথিত এক সদ্য রোপিত বীজ। এই স্নিগ্ধতা মহীরুহে পরিণত হবে অনাগত দিনগুলোতে। 

ক্লাস শেষে সিনিয়র ভাইদের ট্রিট, ব্যাচমেটদর সাথে আড্ডা, গ্রপিং সেলফি, পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দিয়ে দলবেঁধে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাওয়া এ যেনো কিছুই মনে হইনি। কারণ তৃষার্ত আত্মা এগুলো উপভোগ করে যেনো আরও চাই বলে বলে অস্থির। 

ডিপার্টমেন্টের খেলা!  এ যেনো আরেক উপভোগ অধ্যায়ের নাম। অন্য ডিপার্টমেন্টের সাথে খেলা হলেই, এ যেনো নেমে এল নির্বাচনী মিছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। জয় পেলে তো একটা স্লোগানই কানে বাজে আমাদের ডিপার্টমেন্টই সেরা! সেরা!

হলের ডাইনিং এর খিচুড়িটা সকালে খুব জমতো। ক্লাসের যাওয়ার আগে না খেয়ে গেলে স্যারের লেকচারটাই যেন অতৃপ্তি লাগতো। দুপুরের দিকে ক্যাফেটেরিয়ায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বন্ধুদেরকে নিয়ে হতো একরাশ মশকারা । আমারও শেষ রক্ষা হতো না তাদের সেই চায়ের আসরের হাসি-তামাশায়-ঠাট্টায়। 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বন্ধুরা সত্যেই চমকে দেওয়ার মতো। 

শুরুর দিকে ক্যাম্পাসে ব্যাচমেটদের মধ্যে বিরাজ করতো ভাষার বৈচিত্রতা। সিলেটি, নোয়াখালী, রংপুর, বরিশাল, ভোলা, কক্সবাজর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা এইসব এলাকার বন্ধুরা চমকে দিতো আঞ্চলিক কথায় ও গানে।

সহপাঠীদের কারও বার্থডে হলে তার উপর দিয়ে যেতো সুনামির নতুন আগ্রাসন। কেক ফ্লেভার থেকে রেহাই পেতোনা তার অবয়ব, রক্ষা হত না তার মানিব্যাগের। খাওয়া চলতো দিনভর।

ক্লাসের সিআর (ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ) সে ছিলো আর একটা দমকা হাওয়া। সবাই যখন ক্লাস করার ধৈর্য্য সহকারে বসে আছে ঠিক সেই সময় সে শুনিয়ে দিতো স্যারের ব্যস্ততার কথা। বেচারা সিআর!  কি আর করবে সব দখল সহ্য করতে হয় তাকেই। 

ক্যাম্পাসের সেই ৪৫ দিনই ছিলো নতুন পরিবেশ, পরিস্থিতি, নিয়ম-কানুন,নতুন অভিজ্ঞতা। নিত্যনিতুন কিছু সংরক্ষিত হতো ব্যাক্তিগত নোটবুকের  তারিখ খচিত পৃষ্ঠাতে। 

মহামারীর কঠিন সময়টা বদলে দিলো অনেক কিছু। নানান সম্পর্কের হয়েছে পরিবর্তন। এখনও যোগাযোগ হয়, দেখা হয় ক্যাম্পাসকে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে নয়, গুগল, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ওয়াটসএপ এর মতো   সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও খবরের কাগজে। দেখি কিন্তু নেই সেই পুরনো চাঞ্চল্যতা। 

তবে ক্যাম্পাস আবার খুলবে, আবার সেই পুরনো স্মৃতিগুলোর সাথে নতুন কিছুর সম্মিলন ঘটবে, সেই প্রতীক্ষায় গুনছি প্রহর। নোটবুকের বাকী পৃষ্ঠা গুলোতে লিপিবদ্ধ হবে নতুন কোনো অজানা দৃশ্যপট।ক্যাম্পাসের নীরবতা ও ভূতুরে পরিবেশে প্রাণ ফিরাতে আমরা আবার আসিবো ফিরে। আবার আসিবো ফিরে নতুনদেরকে বরণ করে নিতে। আবার আসিবো ফিরে কালের স্বাক্ষী হয়ে। 

তাই গাইতেই হয় বন্ধনার গান-

 

          আবার আসিবো ফিরে এই অঙ্গনে

           মেলবন্ধনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করিতে

           যা হয় নি বলা, হয় নি করা ঐ কদিনে। 

           আবার আসিবো ফিরে ওই হলের ক্যান্টিনে

           খিচুরির সাথে ডিম ভাজিটা ডালের সাথে মিশাতে

           আবার আসিবো ফিরে আড্ডার আসরে

           কে কি করেছে তা নিয়ে নতুন সুর বাঁধিতে। 

           আবার আসবো ফিরে ওই রাতের ল্যাম্পপোস্টের নিচে

           নতুন পরিকল্পনার বীজ রোপন করিতে। 

           আবার আসিবে ফিরে প্রান ফিরিয়ে দিতে

            আমার প্রিয়ো ক্যাম্পাসকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, ১ম বর্ষ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)