শ্যাওড়াপাড়া ‘টু’বনশ্রী, পাবলিক বাসের জনতা



মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নভেম্বরের শেষে অন্ধকার নামার পর ৭টা ৪০ মিনিটকে এখন রাতই বললেই চলে। আমি শ্যাওড়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে বনশ্রীর ‘এ’ ব্লকে নিজ বাসায় ফিরে যাব বলে অপেক্ষা করছি। এই সাড়ে এগারো কিলোমিটারের জন্য সিএনজি ভাড়া চাইল ৪০০ টাকা। তাই সামনে আসা ‘আলিফ’ পরিবহনটিকেই বেছে নিলাম।

এই শহরে পাবলিক বাসের যাত্রী নামানো বা উঠানোর কোনো নিয়মনীতি নেই। তাই ভিনদেশি কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনাদের এখানে বাস স্টপেজ কোথায়?’ আমি এক কথায় জবাব দেই, এখানে কোনো বাস স্টপেজ নেই। এখানে লাফ দিয়ে বাসে উঠতে এবং নামতে হয়। আজ মিরপুর থেকে যাত্রীর চাপ একটু কম বোঝা যাচ্ছিল। বাসের সামনে সাদা কাগজে প্রিন্ট করে লেখা রয়েছে ‘ডিজেল চালিত’। আর পরিবহনটি যে বনশ্রী যাবে সেটিও গন্তব্য স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখ রয়েছে। হাত পাঁচেক দূরে থাকতেই বাসের হেলপারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সিট আছে?’ উত্তরে  ‘হ্যাঁ’ শুনতে পেয়ে উঠে গেলাম। চলে গেলাম বাসের পেছনের দিকে।

আমার প্রায়ই মনে হয় ‘নির্মাণ কাজ’ হচ্ছে ঢাকা শহরের এক নির্মোহ সৌন্দর্য। সৌন্দর্য যেমন চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হয়, তেমনি এই শহরের যেকোনো স্থানে নির্মান কাজ শুরু হলে সেটি পুরো শহরেই যেন ছড়িয়ে দেয়ার একটা তাগিদ থাকে কর্তৃপক্ষের। হয়তো কোথাও কম, কোথাও বেশি। তাই মিরপুর এবং শহরের যতটুকু পথে মেট্রোরেলের কাজ চলছে, সেখানে হয়তো ধুলো প্রতি এক কিলোমিটারে ১ মণ করে উড়ছে, অন্য স্থানে হয়তো ২০ কেজি করে উড়ছে। পার্থক্য এটুকুর চেয়ে খুব বেশি বলা যায় না।


বাসে উঠার আগে যেহেতু নিচের দিকে সিলিন্ডার রয়েছে কি না, সেটি পরীক্ষা করা হয়নি, তাই ‘ডিজেল চালিত’ কথাটাই বিশ্বাস শান্তিপূর্ণ। শহরের বাস মালিকদের সঙ্গে সরকার এবং যাত্রীদের সিটিং সার্ভিস বা গেইটলক নিয়ে খুব কথা কাটাকাটি চলছে। কিন্তু এতো ঘনবসতির এই শহরে বাসে এতোগুলো সিট না রেখে বেশি করে দাঁড়ানোর জায়গা রাখলেই ভালো হতো। শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী এবং বয়স্কদের জন্য নির্দিষ্ট আসন রাখা প্রয়োজন। এসব ভাবতে ভাবতে বাস যে কখন আঁগারগাও চলে আসলো, খেয়ালই নেই। পাশে এসে বসলেন নীল শার্ট গায়ে দেয়া এক প্রৌঢ় বয়সী ভদ্রলোক। এখান থেকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় পর্যন্ত এই সড়কে কেউ বাসে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষা করে না সাধারণত। তাই যানজট এটুকু পথে নাই, ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে চলে এলাম।

জাহাঙ্গীর গেটের সিগন্যালে আর বেশি সময় যানজটে থাকতে হলো না। কিন্তু মহাখালী রেলগেটের সিগন্যালটি পার হতে বেশ সময় লেগে গেলো। আর বাসটি পথের ধারে, মাঝখানে, কোনাকুনিভাবে, সকলভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করলো। এর মধ্যেই পাশের আসনের ভদ্রলোকের কথা কানে আসছিল কিছুক্ষণ পর পর। নিজে নিজে কথা বলছেন তিনি। ‘এই জন্যই এই বাসে উঠি না’, ‘এর চাইতে ক্যান্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে আসলে ভাল হতো’, ‘এটা নাকি আবার সিটিং বাস!’, এই ধরনের আরো অনেক অভিযোগ। রাত যখন ৮টা ৫০ মিনিট তখন বাস মহাখালী ওয়ারলেস গেটের দিকে যাচ্ছে। তিতুমীর কলেজের সামনের পথটা কিছুটা অন্ধকার। বাসে বসে থাকলে আসলেই শহরটাকে অন্যভাবে দেখা যায়। এই যেমন ডিবিসি টেলিভিশন চ্যানেলের অপর পার্শ্বের সড়কের পাশে কলম্বিয়া মার্কেট আছে। এটা এর আগে আমি জানতাম না। অথচ এই শহরে দুই দশকের বেশি সময় পার করছি। অবশ্য পরে এই শহরে জন্ম নেয়া অনেককেও জিজ্ঞাসা করে দেখলাম তারাও জানে না।


এই বাসে আমি মনে মনে কোনো একজনকে খুঁজছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে তার দেখা পেলাম। দুই ধরনের প্যাকেজ নিয়ে বাসে উঠেছেন তিনি। একটা ব্যাগে সবজি কাটা, চায়ের ছাকুনি, ডিম গোলানোর মেশিন সহ মোট ৫টি ছোট যন্ত্র ১০০ টাকায় বিক্রির জন্য। আরেকটি প্যাকেজ রয়েছে ৮টি বইয়ের মূল্য ১০০ টাকা।

এরই মধ্যে পেছন থেকে সিট পরিবর্তন করে সামনের দিকে বসেছি আমি। সামনের সিটের একজন যাত্রী বইগুলো নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলেন। বললেন, ছবিগুলো পরিস্কার না বইয়ের। পেছন থেকে আরেক নারী বইগুলো উল্টিয়ে দেখে বললেন, সরকারই তো বই ফ্রি দেয়। তাহলে আর বই কিনবো কেন? নারী যাত্রীর কথাগুলো শুনে আমারই বিরক্ত লাগলো। তবে মধ্যবয়সী বিক্রেতা একটি ইয়র্কার ছুড়লেন।ওই নারী যাত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন, এখনই যদি সব ফ্রি খুঁজতে থাকেন, আজীবনই ফ্রি’র পেছনে দৌড়াতে হবে। আর বইগুলো শুধু শিশুদের জন্য নয়, মা বাবারাও পড়তে পারবেন।


আগাঁরগাওয়ের পর আবার এখানেও চেকার উঠলো। মূলত বাসের যাত্রী সংখ্যা কত গুনতে। তবে সম্ভবত এটা সিটিং পরিবহন হওয়াতে বাসে দাঁড়িয়ে লোক নেয়ার নিয়ম নেই। অথচ প্রায় অর্ধেক বাসেই লোক দাঁড়ানো। চেকারের হাতের মুঠিতে ২০ টাকা গুজে দেয়াতেই যাত্রী সংখ্যা কমিয়ে লিখে নিল চেকার। এসব যাত্রী বান্ধব পন্থা এই দেশের যানবাহন সেক্টরের উদ্ভাবনী শক্তিকেই নির্দেশ করে।

গুলশন এক গোল চক্কর পার হয়ে আলিফ পরিবহন যখন মেরুল বাড্ডার পথে তখন দেখলাম পথের দুই পাশে নান্দনিক গুলশান লেক দেখা যাচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে কিন্তু পথের উপরে দোকানের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এই রাজধানীর কোনো প্রধান সড়কই আমার কাছে সরু মনে হয় না। বরং দখল হয়ে আছে হকার আর অবৈধ স্থাপনায়। হকারদের ভ্যান বা টুকরিতে এখন শীতের কাপড়ই বেশি।


ঢাকার যে স্থানে পৌঁছালে আপনার নাকে কাঁচা কাঠের গন্ধ আসবে, সে স্থানটি যে বাড্ডা ছাড়া কিছু নয়, সেটি নিশ্চিত হবেন। এখানে এখনো রাস্তার দু’পাশে বড় জায়গা নিয়ে কয়েকটি স’মিল রয়েছে। শহরের সবচেয়ে ধীর গতির সড়কের একটি এই প্রগতি সরণি। যেখানে ঠেলা গাড়ি থেকে শুরু করে দূর পাল্লার বাস পর্যন্ত চলে। তাই বাসের গতি হয়ে গেলো আরো ধীর।রামপুরা ব্রিজ পাড় হয়ে যখন বাস উত্তর দিকে মোড় নিল, ভাবলাম এবার নেমে যাই। সময় তখন ৯টা বেজে ৫০ মিনিট। প্রায় ২ ঘন্টা ১০ মিনিট বাসে। একবার মনে হলো চালক বা হেলপারকে বলি একটু ফুটপাথের কিনারে বাসটা থামাতে, শরীরটা বেশি ভাল নয়। পরেই মনে আসলো, এটা বললে ধাক্কা দিয়ে নামাতে পারে। বরং পেছন দিকে লক্ষ্য রেখে লাফ দিয়ে ওঠা নামার কৌশল কাজে লাগানোই ভাল।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় পান্না কায়সারকে খেলাঘরের শুভেচ্ছা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

  • Font increase
  • Font Decrease

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সভাপতি মণ্ডলীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা হাজির হন।

প্রথমে খেলাঘরের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান সংগঠনের নেতাকর্মী ও ভাইবোনরা।

এসময় শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন, আমার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা। সে লক্ষে আরো বেশি বেশি কাজ করে যাব। আগামী প্রজন্মকে যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তোলা যায় তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে ঠিক অন্যরকম।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে খেলাঘরের মাধ্যমে সারাদেশে আরো বেশি কাজ করতে চাই। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নতুন নতুন বই ও গবেষণার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এসময় উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রণয় সাহা, প্রেসিডিয়াম সদস্য মামুন মোর্শেদ, রাজেন্দ্র চন্দ্র দেব মন্টু, সাংবাদিক অশোকেশ রায়, সাংবাদিক রাজন ভট্টাচার্য, আশরাফিয়া আলী আহমেদ নান্তু, হাফিজুর রহমান মিন্টু, আব্দুল মান্নান, কোহিনুর আক্তার শিল্পী, নাদিয়া রহমান মেঘলা প্রমুখ।

গত রবিবার বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা হয়। এবারে পান্না কায়সার সহ ১৫ গুণীজনকে পুরস্কার সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হবে। অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করবেন।

;

শীতের সকালে কৃষকের খাবার



ফটো স্টোরি, বার্তা২৪.কম
শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

  • Font increase
  • Font Decrease

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কৃষকের খাবার-দাবার। কাজের ফাঁকে সকালে নাস্তা আর দুপুরের খাবার সারেন তারা। এই প্রথা চলে আসছে আদিকাল থেকে।


ভোর বা সকালে কৃষক ও শ্রমিক চলে যান মাঠের ক্ষেতের কাজে। কাঁধে থাকে লাঙ্গল-জোয়াল, মই।কারো হাতে কাস্তে বা হাসুয়া। কেউবা কোদাল হাতে মাঠে চলে যায়। রোদ, ঝড়-বৃষ্টিতে একমনে কাজ করেন তারা।


সকালে বাড়ি ছাড়েন বলে নাস্তা ও দুপুরের খাবারটি মাঠে সারেন তারা।

কৃষাণ বধূরা গামছায় বেঁধে নাস্তা নেন। কোনো সময় দুপুরে খাবার পোটলায় বেঁধে প্রিয় মানুষটির খাবার নিয়ে যান। সঙ্গে থাকে বাসি তরকারি, ভর্তা, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ।


তরকারি বাসি কিংবা টাটকা এবং পদ যাই থাক পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ থাকতেই হবে পাতে। কর্মজীবী মানুষটির অপেক্ষায় থাকেন খাবারের।


অবশেষে আসে সেই মহেদ্রক্ষণ। কাজের ফাঁকে মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কিংবা উঁচু জায়গায় বসে খাবার খান। খাওয়া-দাওয়া শেষে কৃষাণী বধূ বাড়ির পানে ফিরেন।

;

খেজুর রস-গুড়ে ব্যস্ত গাছিরা



শিরিন সুলতানা কেয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুয়াশামাখা ভোর। এক হাতে হাঁড়ি নিয়ে ৪০ ফুট লম্বা খেজুর গাছে তর তর করে উঠে গেলেন আবদুল হান্নান। রসে টইটুম্বুর গাছের হাঁড়িটা ধরলেন এক হাতে। আরেক হাতে গাছে লাগিয়ে দিলেন ফাঁকা হাঁড়িটা। নেমে এসে সাইকেলে লাগানো জারকিনে ঢেলে দিলেন হাঁড়ির রস।

হান্নানের সঙ্গে দেখা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামে। ২১ জানুয়ারি, সকাল ৭টায়। একটু কথা বলতে চাইলে হান্নান বললেন, ‘এখুন কথা বুলার সুমায় নাই যে ভাই। আরও ২০টা গাছের রস নামান্যা বাকি।’ সত্যিই খেজুরের রস নিয়ে রোজ ভোরে হান্নানের খুব ব্যস্ততা। রস নামান, সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানান। খেজুরে আলাপ করার সময় কোথায়!


হান্নান একা নন। রাজশাহীর পুঠিয়া, চারঘাট আর বাঘা উপজেলার অসংখ্য গাছির ব্যস্ততা এখন খেজুর রস এবং গুড় নিয়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঘের শীত গায়ে মেখে তাঁরা এখন বেরিয়ে পড়ছেন সাইকেল নিয়ে। একটার পর একটা গাছের রস নামিয়ে ফিরছেন বাড়ি। তারপর রস জ্বাল দিয়ে শুরু হচ্ছে গুড় বানানোর কাজ। এই কাজটা অবশ্য করে দিচ্ছেন বাড়ির নারীরা। পুরুষেরা আবার সেই গুড় বেচে আসছেন হাটে।

রসের জন্য খেজুর গাছ কাটা, হাঁড়ি লাগানো, রস নামানো, গুড় বানানো ও বেচে আসার কাজটা করছেন শিক্ষিত তরুণেরাও। এই যেমন ফতেপুর গ্রামের রতন আলী শান্ত স্নাতক দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র হয়েও এসব কাজ করছেন। কুয়াশামাখা ভোরে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের এই ছাত্রকেও সেদিন গাছ থেকে নামতে দেখা গেল হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে। বললেন, ‘অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কাজই করি। রোজগারও ভাল।’


ভোরের মিষ্টি রোদে তাউয়ার দু’পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাপড় ধরে ছিলেন কালুহাটি গ্রামের মাসুরা বেগম আর তাঁর ছেলের বউ শিউলী খাতুন। কাপড়ের ওপর বড় জারকিন থেকে খেজুরের রস ঢেলে দিচ্ছিলেন মাসুরার ছেলে শহিদ রানা। জ্বাল দেওয়ার আগে সবাই এভাবেই রস ছেঁকে নেন কাপড়ে। চুলোর কাছে যেতেই বাড়ি থেকে চেয়ার এনে বসতে দিলেন মাসুরা। ‘এক গ্লাস রস খান’ বলে গ্লাসভর্তি করে খেতে দিলেন খেজুর রস। সকালে গাছিদের বাড়িতে কেউ গেলে এভাবেই খেজুর রস আর মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। অতিথিদের জন্য খেজুরের জ্বাল দেওয়া রস দিয়ে রান্না হয় পায়েস। খাঁটি খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো হয় নানারকম শীতের পিঠা।

গাছিদের সবারই যে নিজের খেজুরের গাছ আছে তা নয়। মালিকদের কাছ থেকে তাঁরা এক মৌসুমের জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় গাছ ইজারা নেন। তারপর গাছ কেটে প্রস্তুত করেন শীতের শুরুতেই। রস নামার সময় হলে গাছে গাছে নলির সঙ্গে বেঁধে দেন মাটির হাঁড়ি। গাছিরা এসব হাঁড়িকে বলেন ‘কোর’। টলটলে রস পেতে কোরের ভেতরে মাখিয়ে দেন কিছুটা চুন। ভোরে রস নামাতে গাছিরা সাইকেলে বাঁধা জারকিন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বাড়িতে রস আনার পর কাপড়ে ছেঁকে তা দেওয়া হয় চুলোয় বসানো তাউয়ায়।

তারপর বাড়ির নারীরা জ্বাল দিতে থাকেন চুলোয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাষ্প হয়ে উড়তে থাকে রস। আর বাষ্পের সঙ্গে উড়ে যায় খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ। জ্বাল দিতে দিতে একটা সময় তাউয়ায় থাকে শুধু নালি গুড়। অনেকে এই নালি গুড়ই বয়ামে ভরে বিক্রি করেন। কেউ কেউ আবার এই নালিকেই ফর্মাই বসিয়ে করেন খেজুর গুড়ের পাটালি। পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘার বাড়ির উঠোনে উঠোনে চলে এমন কর্মযজ্ঞ। এসব এলাকার প্রায় চার লাখ খেজুর গাছ থেকে আট হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

রাজশাহীতে শুধু যে খাঁটি খেজুর গুড় তৈরি হয় তা নয়। কেউ কেউ চিনি মিশিয়েও করেন খেজুর গুড়। তাই খাঁটি খেজুর গুড় দিয়ে পায়েস খাওয়ার আশায় অনেকেরই গুড়ে বালি হয়। তবে ইদানিং গ্রামের তরুণরা অনলাইনে গুড় বিক্রি করছেন। তাঁরা গাছিদের সঙ্গে চুক্তি করে ক্রেতাদের জন্য চিনিমুক্ত খাঁটি গুড়ই তৈরি করে নিচ্ছেন। সে কথা জানিয়ে বাঘার ভানুকর গ্রামের আফতাব আলী বললেন, ‘যাঁরা অনলাইনের লাইগি গুড় কিনে তাঁরা তো বেশি ট্যাকাই দ্যায়। লাভও ভালই হয়। তাইলি পারে গুড়ে চিনি মিশিয়্যা লাভ আছে?’

আফতাব জানালেন, হাটে চিনিযুক্ত গুড় পাইকারীতে বিক্রি হয় ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। আর তিনি খাঁটি গুড় বেচেন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। হাটে যেদিন গুড় বেচেন সেদিন বাজার করে আনেন। বাড়িতে ভাল রান্না হয়। ঈদ ঈদ ভাব থাকে বাড়িতে।

;

বিড়ালের মৃত্যুতে আর্দ্র হৃদয়



মায়াবতী মৃন্ময়ী, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবিরের গৃহপালিত বিড়ালগুলো। বার্তা২৪.কম

ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবিরের গৃহপালিত বিড়ালগুলো। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্তন্যপায়ীদের মধ্যে পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়ালের কদর সবচেয়ে বেশি। বিড়াল শান্তশিষ্ট প্রাণী, তার মেজাজ-মর্জিও অন্যসব পোষা প্রাণী থেকে আলাদা। বিড়ালের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ যুগ যুগ ধরে অব্যাহত। পাহাড় ও অরণ্যের মেলবন্ধনের অনিন্দ্য ভূমিতট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় বহুমাত্রিক প্রাণবৈচিত্র্যে অভাব নেই। অবাধে ঘুরে বেড়ায় নানা বন্য প্রাণী। বিভিন্ন বাড়িতে রয়েছে পোষা প্রাণীও। যার মধ্যে বিড়ালের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

মানব সমাজে ঠিক কবে থেকে বিড়ালকে পোষা প্রাণী হিসেবে রাখার প্রচলন শুরু হয়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে শুরু করে নবী করিম (সা.)-এর জামানায় অনেকেই বিড়াল পুষতেন। এমনকি সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী (৫৩৭৫টি হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন) সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-কে 'বিড়ালের পিতা' বলে ডেকেছেন স্বয়ং নবী করিম (সা.)। তিনিও বিশ্ববাসীর কাছে আবু হুরায়রা বা  'বিড়ালের পিতা' নামে পরিচিত, যদিও তার প্রকৃত নাম আবদুর রহমান ইবনে সাখর।

আবু হুরায়রা বা 'বিড়ালের বাবা' নামটির পেছনে একটি মজার কাহিনী রয়েছে। একদিন হজরত আবু হুরায়রা (রা.) জামার আস্তিনের নিচে একটি বিড়ালছানা নিয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। সে সময় বিড়ালটি হঠাৎ করে সবার সামনে বেরিয়ে পড়ল। এ অবস্থা দেখে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে রসিকতা করে, ‘হে বিড়ালের পিতা’ বলে সম্বোধন করলেন। এরপর থেকে তিনি আবু হুরায়রা নামে খ্যাতি লাভ করেন। আর সেদিন থেকে তিনি নিজেকে আবু হুরায়রা নামেই পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন।


উপরোক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, ইসলামে বিড়াল পালনে কোনো বাধা নেই। যারা মসজিদের হারাম কিংবা মসজিদে নববিতে যান, তারা সেখানে প্রচুর বিড়াল ছোটাছুটি করতে দেখেন। আগত মুসল্লিরাও তাদের পানি কিংবা খাবার দিয়ে থাকেন।

অনেকেই জানতে চান, বিড়াল পালা কি জায়েজ? এর উত্তরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, হ্যাঁ, বিড়াল পালা বৈধ। তবে তাকে কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া যাবে না। বিড়াল পুষতে চাইলে অবশ্যই তাকে পর্যাপ্ত খাদ্য-পানীয় সরবরাহ করতে হবে। বিড়ালের প্রতি যথাযথ দয়া-অনুগ্রহ দেখাতে হবে। বিড়ালকে কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া যাবে না। শুধু বিড়াল নয় কোনো প্রাণীর ওপর কোনো ধরনের অমানবিক নির্যাতন কিংবা অবিচার করলে গোনাহগার হতে হবে।

প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে রয়েছে যে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জনৈক মহিলাকে বিড়ালের প্রতি অমানবিক আচরণের কারণে আজাব দেওয়া হয়। সে বিড়ালটি বন্দি করে রাখে, এ অবস্থায় বিড়ালটি মারা যায়। এমনকি বন্দি করে রেখে পানাহার করায়নি এবং ছেড়েও দেয়নি, যাতে করে বিড়ালটি জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বাঁচতে পারে।’ (সহিহ মুসলিম : ৫৭৪৫)

বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, ‘এ হাদিস থেকে বিড়াল পালা ও বিড়ালকে বেঁধে রাখা জায়েজ বলে প্রমাণিত হয়, যদি তাকে খানাপিনা দেওয়ার ব্যাপারে ত্রুটি না করা হয়।’ (ফাতহুল বারি : ৬/৪১২)


এ ছাড়া আরও কিছু হাদিস রয়েছে, যা থেকে বিড়াল পালন জায়েজ প্রমাণিত হয়। সুতরাং পৃথিবীতে বিড়ালসহ আল্লাহর যত সৃষ্টি রয়েছে, সবকিছুর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করতে হবে। কেননা, নবী করিম (সা.) নিজেও তা করেছেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন অজু করতেন তখন নিজের অজুর পাত্র থেকে বিড়ালকে পানি পান করাতেন। এ সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দয়াবানদের ওপর দয়াময় আল্লাহও দয়া করেন। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ : ৪৯৪১)

দুনিয়ায় আল্লাহর যত সৃষ্টি রয়েছে সবকিছুর প্রতি দয়া অনুগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে, মানুষের পরম বন্ধু বিড়ালের প্রতি ভালোবাসা বা মমত্ববোধ দেখাতে হবে। সমাজের অনেকেই আছে, যারা বিড়াল দেখলে তাড়িয়ে দেয়, অকারণে পেটায়, গায়ে গরম পানি ছুড়ে মারে এসব পাপের কাজ; যা মোটেও কাম্য নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বিড়ালের প্রতি স্নেহ ও প্রেমের অম্লান দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। একটি বিড়ালের আকস্মিক মৃত্যুতে মানবিক বেদনার ধারাও লক্ষ্য করা গেছে। রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের বরিষ্ঠ অধ্যাপক, সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবির জানান, 'আমাদের বাসার বিড়ালটা আজ (শুক্রবার) বেলা পৌনে বারোটার দিকে মারা গিয়েছে। তাকে আমি ডাকতাম "ঘুষুমা" বলে, আমার মেয়ে ডাকত "পেঙ্গু" আর আমার স্ত্রী, আনোয়ারা ম্যাডাম, "এনজো" বলে ডাকতেন। সে একটা হুলো বিড়াল ছিল। তার বয়স হয়েছিল মাত্র দশ মাস।'

তিনি জানান, 'আমাদের ক্যাম্পাসস্থ বাসায় প্রথমে বিড়ালটা মায়ের আশ্রয়স্থল হয়। এরপর এই বাসাতেই বাচ্চাটার জন্ম হয়। বাসাতেই বড় হয়। ম্যাডামের উদ্যোগে বাসার সবার আদরে, যত্নে, ভালোবাসায়, বাসার একজন সদস্য হিসাবে। আমাদের সবার প্রতি তার দাবী ছিল আলাদা।'

শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) সকালে রুটিন অনুযায়ী আমি তাকে দুধ ও টোস্ট বিস্কুট খেতে দেই। উল্লেখ্য, ও শীতে আমার কম্বলের নীচে ঘুমাত।

তারপর রুটিনমতোই বাসা থেকে বের হয়ে তিন রাত পরে ভয়ংকর অসুস্থ ও কাহিল অবস্থায় রাত পৌনে একটার দিকে বাসার দরজায় বসে কান্না করতে থাকে। এটা অস্বাভাবিক রকমের ব্যতিক্রম ছিল। একটানা এতদিন কখনো সে বাইরে থাকেনি। দিনে চার-পাঁচবার সে বাসায় আসতো, খেতো। তো, ওর কান্না শুনে ম্যাডাম ওকে ভেতরে নিয়ে আসেন। অবশেষে সে বাসায় এলো বলে মনে স্বস্তি পেলেও তার পরিস্থিতি দেখে ভয় পেলাম, কষ্ট হলো। বাঁচবে তো! এমন অলক্ষুণে চিন্তা মাথায় এসে গেল। আমি নিজেই তখন অনেক অসুস্থ। ভয় বেড়ে গেল যখন দেখলাম সে ঠিকমত হাঁটতে পারছেনা, সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। কিছুই খাচ্ছিলনা দেখে মনের ভিতরটা আৎকে উঠল। তবুও আশায় বুক বেঁধে রইলাম। কলিগ/ক্যাম্পাসের ভাতিজা পিলু (প্রাণীবিদ্যা বিভাগের আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী)'র সাথে পরামর্শক্রমে হাটহাজারীতে প্রাণিসম্পদ অফিসে ডাক্তার দিয়ে দেখানো হলো। কিন্তু সবার ভালোবাসা নিয়ে, সবাইকে ভালোবাসায় কাঁদিয়ে আমাদের "ঘুষুমা"/"পেঙ্গু"/"এনজো" এই নিষ্ঠুর দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। জানান প্রফেসর কবির।

বিড়ালের মৃত্যুতে বাড়ির কারোই মন ভালো নেই। যারা বিড়ালটিকে দেখেছেন, তারা সবাই মর্মাহত। ঘটনাটি যারা শুনেছেন, তারাও বেদনাহত।  অবলা প্রাণী ও গৃহপালিত পশুর প্রতি মমত্বের চেতনায় দীপ্ত এই ঘটনা ক্যাম্পাস জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। একটি বিড়ালের মৃত্যুতে আর্দ্র হয়েছে বহু হৃদয়।

;