শান্তিচুক্তির দুইযুগ: শীতার্ত পাহাড়ে 'সমুখে শান্তি পারাবার'



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
পাহাড়ে 'সমুখে শান্তি পারাবার'। বার্তা২৪.কম

পাহাড়ে 'সমুখে শান্তি পারাবার'। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ক্যালেন্ডার নির্ধারিত ঋতুচক্রের হিসাবে নয়, পাহাড়ে শীত নামে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে। নভেম্বর (২০২১)-এর শেষে চলছে অগ্রহায়ণ মানে মধ্য হেমন্ত। শহরে শীত 'আসি আসি' করলেও পাহাড়, ঝরনা, ঝিরি ও কৃত্রিম লেক সমৃদ্ধ পার্বত্য জনপদ দস্তুরমত শীতকাতুরে হয়ে রয়েছে। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের শীতার্ত পাহাড়ি প্রকৃতির সবুজে-শ্যামলে আচ্ছাদিত অবয়ব দেখে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের গানের কলি: 'সমুখে শান্তি পারাবার'। যেন, ৩৬০ ডিগ্রি উন্মুক্ত দিগন্তের পুরোটাই পার্বত্য সবুজের অতলান্ত শান্তির নকশি চাদরে জড়ানো।

সামনেই ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্পর্শ করবে দুইযুগ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী-ভ্রাতৃঘাতী সশস্ত্র সন্ত্রাস ও হিংসার অবসানে শান্তিচুক্তি পাহাড়ে এনেছে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের বাতাবরণ। যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মানবিকভাবে অতি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এসেছে ইতিবাচক রূপান্তর।

রাঙামাটির প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও করোনাকালের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাস করতে পেরেছে পাপিয়া চাকমা। বিগত প্রায় দেড় বছর ক্যাম্পাসে না গিয়েও সচল থেকেছে তার শিক্ষাজীবনের যাবতীয় কার্যক্রম। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটের অকল্পনীয় সুযোগ পেয়ে উদ্ভাসিত পাপিয়ার মতো পার্বত্য তারুণ্য।

রাস্তা নির্মিত হয়েছে দুর্গম ও বিপদ সঙ্কুল প্রাকৃতিক পরিবেশকে জয় করে। খাগড়াছড়ির পর্যটকস্থল সাজেকের পথে মসৃণে পথে সহজ যাতায়তের সুবিধা পাচ্ছেন অসংখ্য ভ্রমণ পিয়াসু মানুষ। দেখতে পাচ্ছেন পার্বত্য সৌন্দর্যের অদেখা ভূগোল।

কত অনিন্দ্য সুন্দর জায়গা আছে পাহাড়ের কোণে কোণে, তা বলে শেষ করা যাবে না। খাগড়াছড়ির আলুটিলা, আলুটিলা গুহা, কমলক ঝর্ণা, কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদ, তকবাক হাকর (গুহা), তৈদুছড়া ঝর্ণা, দীঘিনালা ঝুলন্ত ব্রিজ, পানছড়ি রাবার ড্যাম, পুরাতন চা বাগান, রিছাং ঝর্ণা এবং আরো কতকিছু। রাঙামাটিতে লেক, সেতু, বনানীর অপরূপ সৌন্দর্যের তুলনা নেই। বান্দরবানের শৈল শিখর চিম্বুক, উপত্যকা-সদৃশ্য থানচী, বগা লেক প্রাকৃতিক শোভার অবারিত জগতের মতো।

যোগাযোগের সুবিধার জন্য পর্যটনের মতোই উৎপন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে কৃষক উৎপাদনকারীর। বেড়েছে বিপণনের সুবিধা। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, স্বাস্থ্য ও নানাবিধ সুযোগ চলে এসেছে হাতের নাগালের মধ্যে। কথা হলে এমন অভিব্যক্তিই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানের সাধারণ মানুষের মুখে।

শান্তিচুক্তির প্রধান অর্জন দীর্ঘ সংঘাত ও সশস্ত্র নাশকতার অবসান। শান্তি, সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের বাতাবরণ তৈরি করেছে শান্তিচুক্তি। 'চুক্তির আগে ও পরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সর্বক্ষেত্রে পাঁচগুণ এগিয়েছে পার্বত্যাঞ্চল। রাস্তাঘাটের পরিমাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংখ্যায় তা স্পষ্ট', বললেন পাহাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উপেন্দ্র ত্রিপুরা।

পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্য আগের চেয়ে বেশি আস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা। তাদের মতে, 'পাহাড়ের বাসিন্দারা আগের চেয়ে শান্তিতে আছে।'

তবে, প্রায়শই প্রত্যন্ত পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে বিভিন্ন অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার ঘটনা ঘটছে। হত্যা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজি পাহাড়ের শান্তি বিনষ্ট করছে। কোনো কোনো মহল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হানিকর কাজ করছে। অস্ত্রধারী গ্রুপগুলোর নিজের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনায় বিষিয়ে উঠছে শান্তির পরিবেশ।

সর্বশেষ একটি সন্ত্রাসী ঘটনায় রাঙামাটির সদর উপজেলাধীন বন্দুকভাঙ্গা এলাকায় প্রতিপক্ষ স্বজাতীয় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে জেএসএস-এর আবিষ্কার চাকমা (৪০) নিহত হয়েছেন। নিহতের বাড়ি বাঘাইছড়ির সারোয়াতলী ইউনিয়নের সিজক এলাকায়। তার পিতা মিন্টু চাকমা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। মঙ্গলবার (৩০ নভেম্বর) ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনকালীন প্রতিপক্ষের অতর্কিত সশস্ত্র হামলায় আবিষ্কার চাকমা নিহত হন। তিনি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং একাধিক মামলার আসামি বলে স্থানীয় ও নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব্শীল সূত্রে জানা গেছে।

এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী ঘটনায় পার্বত্যাঞ্চলের শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে সঙ্কটের ঘূর্নাবর্ত। যদিও এইসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন, তথাপি বৃহত্তর পাহাড়ের সর্বস্তরের বাসিন্দাদের মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তার মনোভাব সুসংহত রাখার প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। আশাবাদী মানুষ সন্ত্রাস ও সংঘাত নয়, চায় শান্তি, সমৃদ্ধি, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন। যেমনটি ধ্বনিত হয়েছে  রবীন্দ্রনাথের অম্লান সঙ্গীতের চিরায়ত বাণীতে: 'সমুখে শান্তিপারাবার/ভাসাও তরণী হে কর্ণধার/ তুমি হবে চিরসাথি/লও লও হে ক্রোড় পাতি/অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার/মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা তোমার দয়া/হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার/হয় যেন মর্তের বন্ধনক্ষয়/বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়/পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয়/মহা-অজানার।'

ফলে শান্তির জন্য কর্ণধার রূপে মানুষকেই স্ব স্ব অবস্থান থেকে সচেষ্ট হতে হবে, শুভবোধের সম্মিলিত শক্তিতে এগিয়ে আসতে হবে শান্তির মহাসড়কে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

‘গৈইলত থাকি, মোক ঘর করি দেয় কাই’



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের সুরিরডারা গ্রামের বাসিন্দা মহেছেনা বেগম। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ায় অসহায় জীবন যাপন করছেন এই ষাটোর্ধ্ব নারী। সন্তানরা থেকেও নেই। ফলে গোয়ালঘরে গরুর সাথে কয়েকমাস ধরে বসবাস করছেন মহেছেনা বেগম।

জানা যায়, তার স্বামী ছেড়ে গেছেন প্রায় ছয় বছর আগে। এরপর দুই ছেলে নিয়ে স্বামীর বাড়িতেই বসবাস করছিলেন মহেছেনা। ৫/৬ মাস আগে বড় ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। সাথে নিজের করা ঘরটাও ভেঙে নিয়ে গেলেও নিজের প্রথম পক্ষের ছেলেকে রেখে যান মা মহেছেনার কাছে। গৃহহীন মহেছেনার আশ্রয় হয় ছোট ছেলের গোয়াল ঘরে, গরুর সাথে। এই তীব্র শীতেও দশ বছর বয়সের নাতিসহ গরুর সাথে একই ঘরে বসবাস ষাটোর্ধ্ব মহেছেনার।

মহেছেনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গোয়াল ঘরের একদিকে একটি মাঁচান আর একদিকে শোবার বিছানা। মাঝখানের কোনায় গরু রাখার স্থান। গোবর-মূত্রের গন্ধ নিয়ে সেই ঘরেই বসবাস মহেছেনার। যেন নিজ ভূমিতে পরবাসী তিনি। ছোট ছেলে বাড়িতে থাকলেও স্বল্প আয়ে মায়ের জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়ার ‘সামর্থ’ নেই তার। বিকল্প না থাকায় ছেলের গোয়ালঘরে আশ্রয় হয়েছে মহেছেনার।

মহেছেনা বলেন, ‘বড় বেটা প্রথম বউ ছাড়ি দিয়া ফির বিয়া করি অন্যটেই থাকে। নাতিটাক মোর কাছত রাখি গেইছে। ছোট বেটা দিন আনি দিন খায়। মোক ঘর করি দেয় কাই? নাতিটাক নিয়া ছোট বেটার গৈইলত (গোয়ালে) থাকি।’

গরুর গোবর আর মূত্রের গন্ধে সমস্যা হয় কি না, এমন প্রশ্নে মহেছেনা বলেন, ‘ সমস্যা হয় কিন্তু কী করমো বাবা, ঘর করারতো সামর্থ নাই!’

অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের ও নাতির খাবার জোগান মহেছেনা। নিজের বয়স কত সেটাও ঠিকমতো বলতে পারেন না। তবে গোয়ালঘরে থাকা নিয়ে তাঁর ছোট ছেলের প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। বরং ছেলের জন্য অনেকটা সাফাই গাইলেন ষাটোর্ধ্ব এই নারী।

‘নাতিসহ যাওয়ার আর জায়গা নাই। মাইনষের বাড়িত কামাই করি আনি নাতিসহ খাঙ। ছোট বেটা নিজে চইলবার পায় না মোক কেমন করি দিবে। উয়ারও (ওরও) একটায় ঘর। কাইয়ো ঘরও দেয়না, সাহায্যও করে না।’

মহেছেনার ছোট ছেলে কাজে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মহেছেনা যে বাড়িতে কাজ করেন সেই বাড়ির বড় ছেলে মারুফ আহমেদ মহেছেনা ও তার নাতির জন্য আলাদা ঘর করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সেজন্য সমাজের সামর্থবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মারুফ আহমেদ বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনের সাড়া পেয়েছি। আরও কিছু সহায়তা দরকার। সকলের সহায়তা পেলে আগামী মাসেই মহেছেনা ও তার নাতির জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।’

;

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় পান্না কায়সারকে খেলাঘরের শুভেচ্ছা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

  • Font increase
  • Font Decrease

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সভাপতি মণ্ডলীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা হাজির হন।

প্রথমে খেলাঘরের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান সংগঠনের নেতাকর্মী ও ভাইবোনরা।

এসময় শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন, আমার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা। সে লক্ষে আরো বেশি বেশি কাজ করে যাব। আগামী প্রজন্মকে যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তোলা যায় তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে ঠিক অন্যরকম।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে খেলাঘরের মাধ্যমে সারাদেশে আরো বেশি কাজ করতে চাই। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নতুন নতুন বই ও গবেষণার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এসময় উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রণয় সাহা, প্রেসিডিয়াম সদস্য মামুন মোর্শেদ, রাজেন্দ্র চন্দ্র দেব মন্টু, সাংবাদিক অশোকেশ রায়, সাংবাদিক রাজন ভট্টাচার্য, আশরাফিয়া আলী আহমেদ নান্তু, হাফিজুর রহমান মিন্টু, আব্দুল মান্নান, কোহিনুর আক্তার শিল্পী, নাদিয়া রহমান মেঘলা প্রমুখ।

গত রবিবার বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা হয়। এবারে পান্না কায়সার সহ ১৫ গুণীজনকে পুরস্কার সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হবে। অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করবেন।

;

শীতের সকালে কৃষকের খাবার



ফটো স্টোরি, বার্তা২৪.কম
শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

  • Font increase
  • Font Decrease

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কৃষকের খাবার-দাবার। কাজের ফাঁকে সকালে নাস্তা আর দুপুরের খাবার সারেন তারা। এই প্রথা চলে আসছে আদিকাল থেকে।


ভোর বা সকালে কৃষক ও শ্রমিক চলে যান মাঠের ক্ষেতের কাজে। কাঁধে থাকে লাঙ্গল-জোয়াল, মই।কারো হাতে কাস্তে বা হাসুয়া। কেউবা কোদাল হাতে মাঠে চলে যায়। রোদ, ঝড়-বৃষ্টিতে একমনে কাজ করেন তারা।


সকালে বাড়ি ছাড়েন বলে নাস্তা ও দুপুরের খাবারটি মাঠে সারেন তারা।

কৃষাণ বধূরা গামছায় বেঁধে নাস্তা নেন। কোনো সময় দুপুরে খাবার পোটলায় বেঁধে প্রিয় মানুষটির খাবার নিয়ে যান। সঙ্গে থাকে বাসি তরকারি, ভর্তা, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ।


তরকারি বাসি কিংবা টাটকা এবং পদ যাই থাক পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ থাকতেই হবে পাতে। কর্মজীবী মানুষটির অপেক্ষায় থাকেন খাবারের।


অবশেষে আসে সেই মহেদ্রক্ষণ। কাজের ফাঁকে মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কিংবা উঁচু জায়গায় বসে খাবার খান। খাওয়া-দাওয়া শেষে কৃষাণী বধূ বাড়ির পানে ফিরেন।

;

খেজুর রস-গুড়ে ব্যস্ত গাছিরা



শিরিন সুলতানা কেয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুয়াশামাখা ভোর। এক হাতে হাঁড়ি নিয়ে ৪০ ফুট লম্বা খেজুর গাছে তর তর করে উঠে গেলেন আবদুল হান্নান। রসে টইটুম্বুর গাছের হাঁড়িটা ধরলেন এক হাতে। আরেক হাতে গাছে লাগিয়ে দিলেন ফাঁকা হাঁড়িটা। নেমে এসে সাইকেলে লাগানো জারকিনে ঢেলে দিলেন হাঁড়ির রস।

হান্নানের সঙ্গে দেখা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামে। ২১ জানুয়ারি, সকাল ৭টায়। একটু কথা বলতে চাইলে হান্নান বললেন, ‘এখুন কথা বুলার সুমায় নাই যে ভাই। আরও ২০টা গাছের রস নামান্যা বাকি।’ সত্যিই খেজুরের রস নিয়ে রোজ ভোরে হান্নানের খুব ব্যস্ততা। রস নামান, সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানান। খেজুরে আলাপ করার সময় কোথায়!


হান্নান একা নন। রাজশাহীর পুঠিয়া, চারঘাট আর বাঘা উপজেলার অসংখ্য গাছির ব্যস্ততা এখন খেজুর রস এবং গুড় নিয়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঘের শীত গায়ে মেখে তাঁরা এখন বেরিয়ে পড়ছেন সাইকেল নিয়ে। একটার পর একটা গাছের রস নামিয়ে ফিরছেন বাড়ি। তারপর রস জ্বাল দিয়ে শুরু হচ্ছে গুড় বানানোর কাজ। এই কাজটা অবশ্য করে দিচ্ছেন বাড়ির নারীরা। পুরুষেরা আবার সেই গুড় বেচে আসছেন হাটে।

রসের জন্য খেজুর গাছ কাটা, হাঁড়ি লাগানো, রস নামানো, গুড় বানানো ও বেচে আসার কাজটা করছেন শিক্ষিত তরুণেরাও। এই যেমন ফতেপুর গ্রামের রতন আলী শান্ত স্নাতক দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র হয়েও এসব কাজ করছেন। কুয়াশামাখা ভোরে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের এই ছাত্রকেও সেদিন গাছ থেকে নামতে দেখা গেল হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে। বললেন, ‘অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কাজই করি। রোজগারও ভাল।’


ভোরের মিষ্টি রোদে তাউয়ার দু’পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাপড় ধরে ছিলেন কালুহাটি গ্রামের মাসুরা বেগম আর তাঁর ছেলের বউ শিউলী খাতুন। কাপড়ের ওপর বড় জারকিন থেকে খেজুরের রস ঢেলে দিচ্ছিলেন মাসুরার ছেলে শহিদ রানা। জ্বাল দেওয়ার আগে সবাই এভাবেই রস ছেঁকে নেন কাপড়ে। চুলোর কাছে যেতেই বাড়ি থেকে চেয়ার এনে বসতে দিলেন মাসুরা। ‘এক গ্লাস রস খান’ বলে গ্লাসভর্তি করে খেতে দিলেন খেজুর রস। সকালে গাছিদের বাড়িতে কেউ গেলে এভাবেই খেজুর রস আর মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। অতিথিদের জন্য খেজুরের জ্বাল দেওয়া রস দিয়ে রান্না হয় পায়েস। খাঁটি খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো হয় নানারকম শীতের পিঠা।

গাছিদের সবারই যে নিজের খেজুরের গাছ আছে তা নয়। মালিকদের কাছ থেকে তাঁরা এক মৌসুমের জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় গাছ ইজারা নেন। তারপর গাছ কেটে প্রস্তুত করেন শীতের শুরুতেই। রস নামার সময় হলে গাছে গাছে নলির সঙ্গে বেঁধে দেন মাটির হাঁড়ি। গাছিরা এসব হাঁড়িকে বলেন ‘কোর’। টলটলে রস পেতে কোরের ভেতরে মাখিয়ে দেন কিছুটা চুন। ভোরে রস নামাতে গাছিরা সাইকেলে বাঁধা জারকিন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বাড়িতে রস আনার পর কাপড়ে ছেঁকে তা দেওয়া হয় চুলোয় বসানো তাউয়ায়।

তারপর বাড়ির নারীরা জ্বাল দিতে থাকেন চুলোয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাষ্প হয়ে উড়তে থাকে রস। আর বাষ্পের সঙ্গে উড়ে যায় খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ। জ্বাল দিতে দিতে একটা সময় তাউয়ায় থাকে শুধু নালি গুড়। অনেকে এই নালি গুড়ই বয়ামে ভরে বিক্রি করেন। কেউ কেউ আবার এই নালিকেই ফর্মাই বসিয়ে করেন খেজুর গুড়ের পাটালি। পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘার বাড়ির উঠোনে উঠোনে চলে এমন কর্মযজ্ঞ। এসব এলাকার প্রায় চার লাখ খেজুর গাছ থেকে আট হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

রাজশাহীতে শুধু যে খাঁটি খেজুর গুড় তৈরি হয় তা নয়। কেউ কেউ চিনি মিশিয়েও করেন খেজুর গুড়। তাই খাঁটি খেজুর গুড় দিয়ে পায়েস খাওয়ার আশায় অনেকেরই গুড়ে বালি হয়। তবে ইদানিং গ্রামের তরুণরা অনলাইনে গুড় বিক্রি করছেন। তাঁরা গাছিদের সঙ্গে চুক্তি করে ক্রেতাদের জন্য চিনিমুক্ত খাঁটি গুড়ই তৈরি করে নিচ্ছেন। সে কথা জানিয়ে বাঘার ভানুকর গ্রামের আফতাব আলী বললেন, ‘যাঁরা অনলাইনের লাইগি গুড় কিনে তাঁরা তো বেশি ট্যাকাই দ্যায়। লাভও ভালই হয়। তাইলি পারে গুড়ে চিনি মিশিয়্যা লাভ আছে?’

আফতাব জানালেন, হাটে চিনিযুক্ত গুড় পাইকারীতে বিক্রি হয় ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। আর তিনি খাঁটি গুড় বেচেন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। হাটে যেদিন গুড় বেচেন সেদিন বাজার করে আনেন। বাড়িতে ভাল রান্না হয়। ঈদ ঈদ ভাব থাকে বাড়িতে।

;