‘গৈইলত থাকি, মোক ঘর করি দেয় কাই’



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের সুরিরডারা গ্রামের বাসিন্দা মহেছেনা বেগম। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ায় অসহায় জীবন যাপন করছেন এই ষাটোর্ধ্ব নারী। সন্তানরা থেকেও নেই। ফলে গোয়ালঘরে গরুর সাথে কয়েকমাস ধরে বসবাস করছেন মহেছেনা বেগম।

জানা যায়, তার স্বামী ছেড়ে গেছেন প্রায় ছয় বছর আগে। এরপর দুই ছেলে নিয়ে স্বামীর বাড়িতেই বসবাস করছিলেন মহেছেনা। ৫/৬ মাস আগে বড় ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। সাথে নিজের করা ঘরটাও ভেঙে নিয়ে গেলেও নিজের প্রথম পক্ষের ছেলেকে রেখে যান মা মহেছেনার কাছে। গৃহহীন মহেছেনার আশ্রয় হয় ছোট ছেলের গোয়াল ঘরে, গরুর সাথে। এই তীব্র শীতেও দশ বছর বয়সের নাতিসহ গরুর সাথে একই ঘরে বসবাস ষাটোর্ধ্ব মহেছেনার।

মহেছেনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গোয়াল ঘরের একদিকে একটি মাঁচান আর একদিকে শোবার বিছানা। মাঝখানের কোনায় গরু রাখার স্থান। গোবর-মূত্রের গন্ধ নিয়ে সেই ঘরেই বসবাস মহেছেনার। যেন নিজ ভূমিতে পরবাসী তিনি। ছোট ছেলে বাড়িতে থাকলেও স্বল্প আয়ে মায়ের জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়ার ‘সামর্থ’ নেই তার। বিকল্প না থাকায় ছেলের গোয়ালঘরে আশ্রয় হয়েছে মহেছেনার।

মহেছেনা বলেন, ‘বড় বেটা প্রথম বউ ছাড়ি দিয়া ফির বিয়া করি অন্যটেই থাকে। নাতিটাক মোর কাছত রাখি গেইছে। ছোট বেটা দিন আনি দিন খায়। মোক ঘর করি দেয় কাই? নাতিটাক নিয়া ছোট বেটার গৈইলত (গোয়ালে) থাকি।’

গরুর গোবর আর মূত্রের গন্ধে সমস্যা হয় কি না, এমন প্রশ্নে মহেছেনা বলেন, ‘ সমস্যা হয় কিন্তু কী করমো বাবা, ঘর করারতো সামর্থ নাই!’

অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের ও নাতির খাবার জোগান মহেছেনা। নিজের বয়স কত সেটাও ঠিকমতো বলতে পারেন না। তবে গোয়ালঘরে থাকা নিয়ে তাঁর ছোট ছেলের প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। বরং ছেলের জন্য অনেকটা সাফাই গাইলেন ষাটোর্ধ্ব এই নারী।

‘নাতিসহ যাওয়ার আর জায়গা নাই। মাইনষের বাড়িত কামাই করি আনি নাতিসহ খাঙ। ছোট বেটা নিজে চইলবার পায় না মোক কেমন করি দিবে। উয়ারও (ওরও) একটায় ঘর। কাইয়ো ঘরও দেয়না, সাহায্যও করে না।’

মহেছেনার ছোট ছেলে কাজে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মহেছেনা যে বাড়িতে কাজ করেন সেই বাড়ির বড় ছেলে মারুফ আহমেদ মহেছেনা ও তার নাতির জন্য আলাদা ঘর করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সেজন্য সমাজের সামর্থবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মারুফ আহমেদ বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনের সাড়া পেয়েছি। আরও কিছু সহায়তা দরকার। সকলের সহায়তা পেলে আগামী মাসেই মহেছেনা ও তার নাতির জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।’

ফুলমাথা-টিয়া এখন সংকটাপন্ন



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ডালের শেষ মাথায় বসে আছে ফুলমাথা-টিয়া। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

ডালের শেষ মাথায় বসে আছে ফুলমাথা-টিয়া। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশমুখে একঝাঁক টিয়ার ডাক। নির্জনতা ভেঙে ডেকে ওঠে একত্রে। কমে আসা আলোয় নীড়ে ফিরতে ব্যস্ত ওরা। অন্যান্য সঙ্গীদের অনুসারি হতে চাচ্ছে তাদের কেউ কেউ। তাই তাদের এমন সম্মিলিত শব্দধ্বনি!

পাখিটির নাম ‘ফুলমাথা-টিয়া’। তবে আরও একটি বাংলা নাম হলো হীরামন পাখি। এর ইংরেজি নাম Blossom-headed Parakeet এবং বৈজ্ঞানিক নাম Psittacula roseata। ছবিতে প্রকাশিত পাখিটি পুরুষ ফুলমাথা-টিয়া। একই প্রজাতির পাঁচ-দশটি পাখির ছোট দলে এদের দেখা যায়।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ফুলমাথা-টিয়া চা বাগান সংলগ্ন বন আর পাহাড়ি পরিবেশের বিরল পাখি। একে আপনি অন্য কোথাও পাবেন না। এরা বৃক্ষবহুল এলাকার পাখি। শুধু সিলেট বিভাগের চিরসবুজ ও চা বাগানেই এদের পাওয়া যায়। কৃষ্ণচূঁড়া, শিমুল প্রভৃতির মোটা মোটা ফুলের রসালো পাপড়ি, বিভিন্ন ফল, কিছু পাতা, কুঁড়ি, ফুলের মিষ্টি রস, শস্যদানা এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে।

বিকেলের পড়ন্ত আলোয় রাঙা ফুলমাথা-টিয়া। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

এদের দৈহিক বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখিটির মাথা গোপালি; দেহের প্রায় পুরোটাই ঘাস-সবুজ। মাথার চাঁদির সামনের অংশ ঘাড় গোলাপি-লাল। ঠোঁটের উপরটা ফিকে-কমলা এবং ঠোঁটের নিচ বাদামী। চোখ হলদে। থুতনি ও গলায় কালো লাইন। আর স্ত্রী পাখিটি ফিকে-ধূসর নীল মাথা ও থুতনি ছাড়া পুরু দেহই সবুজ। তবে গলার পিছনটা হলদে-সবুজ ও ঠোঁট ফ্যাকাসে।

পূর্ব থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ফুলমাথা-টিয়ার বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে বলে জানান ইনাম আল হক।

পরিবেশ ধ্বংস সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশে বনের সংখ্যা এমনিতেই কম। এক্কেবারে হাতে গোনা। তারপরও যেটুকু রয়েছে তাও নানাভাবে ক্রমশ উজার ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই এই ফুলমাথা-টিয়াসহ নানা জাতের পাখি ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে প্রাকৃতিক বনগুলো যে কোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

সৃজিত বাগান নয়; আমরা বারবার প্রাকৃতিক বনের কথা বলেছি এবং মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। অর্থাৎ বছরের পর বছর ধরে শতসহস্র ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-লতাগুল্মের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে যে প্রাকৃতিক বন। প্রাকৃতিক বন কখনই মানুষ সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষ শুধু পারে এই প্রাকৃতিক বনগুলোকে রক্ষা ও সম্প্রসারণ করতে। মানুষের তৈরি বন হলো সৃজিত বাগান। এই প্রাকৃতিক বনই দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বন থাকলে এই ফুলমাথা-টিয়া পাখিগুলোও থেকে যাবে বলে জানান পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

;

জাবি ক্যাম্পাস জুড়ে আগুন রঙা কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্য



আব্দুল্লাহ আল নোমান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাভার (ঢাকা)
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের শুরুতে আকাশকে আবির রঙা করে ফোটে কৃষ্ণচূড়া, আর বাতাসে ভাসে তার পাপড়ি। ঢাকার অদূরে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাস জুড়েই আগুন রঙা সেই কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্য আলো ছড়াচ্ছে। গাছে গাছে নয়ানভিরাম রাঙা ফুলের মায়া। দূর থেকে দেখলে মনে হবে গাছগুলোতে আগুন লেগেছে, কাছে গেলে চোখ আটকে থাকে রক্তিম আভার ফুলের সমাহারে। গাছের নিচে অজস্র ঝড়াপাপড়ি যেন বিছিয়ে রাখে লাল গালিচা।

দূর থেকে দেখলে মনে হবে গাছগুলোতে আগুন লেগেছে

সবুজ জাবি চত্বরে গাঢ় লালের বিস্তার যেন বাংলাদেশের সবুজ প্রান্তরে রক্তিম সূর্যের প্রতীক আর বাংলাদেশের জাতীয় পতাকারই প্রতিনিধিত্ব করছে। অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশের মধ্যে এ চত্বর যেন এক টুকরো বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। কৃষ্ণচূড়া যেন সূর্যের সবটুকু উত্তাপকে শুষে নিয়ে সৌন্দর্যের এক অভিনব উত্তাপ ছড়াচ্ছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। সে উত্তাপেই পুড়ে যাচ্ছে সৌন্দর্য বিলাসীসহ সকল ক্যাম্পাসবাসী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলাভবন থেকে শুরু করে বিশমাইল গেট পর্যন্ত রাস্তার অসংখ্য গাছ এ ফুলের রক্তিম আভায় ছেয়ে গেছে। আঁকাবাঁকা পথে ঝাঁক বাঁধা লাল কৃষ্ণচূড়ার মিতালি দেখে মনে হয় যেন গাছের পাতাগুলোতে আগুন লেগেছে। গন্ধহীন এ ফুলে পাপড়ি থাকে পাঁচটি। নমনীয় কোমল, মাঝে লম্বা পরাগ। ফুটন্ত কৃষ্ণচূড়া ফুলের মনোরম দৃশ্য দেখে যে কেউ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেই!



ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার, বটতলা, পরিবহন চত্বর, মুন্নী সরণী, কয়েকটি অনুষদসহ বিভিন্ন হলের সামনের খোলা জায়গা, কোথায় নেই এই কৃষ্ণচূড়া! দেখে মনে হতেই পারে এ যেন কৃষ্ণচূড়ার ক্যাম্পাস। তবে রাধাচূড়া, সোনালু আর জারুল ফুলও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের শিক্ষার্থী তানজিনা আমান তানজুম বলেন, ক্যাম্পাসে যেদিকে তাকাই মনে হয় কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোতে আগুন লেগেছে। কিছুদূর পরপরই একেকটা গাছ আর তাতে উজ্জ্বল লাল টুকটুকে ফুল। মনে হয় প্রকৃতিতে আধিপত্য বিস্তার তারাই করছে। কৃষ্ণচূড়ার নজরকাড়া এসব ছবি ঘুরছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপেও। ঈদের ছুটিতে অনেক শিক্ষার্থী এখন বাড়ি আছেন। তাদের মধ্যে একজন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ঐন্দ্রিলা মজুমদার অর্ণা।

আবির রঙা করে ফোটে কৃষ্ণচূড়া, আর বাতাসে ভাসে তার পাপড়ি।

অর্ণা বলেন, ঈদের ছুটিতে এখনও বাড়িতে আছি। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া ফুলের ছবি দেখে মন খুবই অস্থির হয়েছে। কবে ছুটি শেষ হবে, আর ক্যাম্পাসে যাব, এই অপেক্ষায় আছি। আগুনের মতো লাল দেখে হয়তো এই ফুলের নাম ইংরেজিতে 'ফ্লেম ট্রি' রাখা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুল কবীর হিমেল বলেন, কৃষ্ণচূড়ার আদি নিবাস পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ভিনদেশী এই ফুল আমাদের দেশে নতুন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর উচ্চতা খুব বেশি হয় না। সর্বোচ্চ ১১-১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে এর শাখা-প্রশাখা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো থাকে। বছরের অন্য সময়ে এ ফুলের দেখা পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশে এপ্রিল-জুন মাসে দৃষ্টিনন্দন ফুলটির দেখা মেলে। সাধারণত বসন্তকালে এই ফুলটি ফুটলেও তা জুন-জুলাই পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

কৃষ্ণচূড়ার নজরকাড়া এসব ছবি ঘুরছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপেও।

কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিখ রেজিয়া। এটি ফাবাসিয়ি পরিবারের অন্তর্গত যা গুলমোহর নামেও পরিচিত। কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো সাধারণত বড় চারটি পাপড়ি যুক্ত হয়। পাপড়িগুলো প্রায় ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শীতকালে পাতা ও ফুল ঝড়ে যায়, বসন্তে নতুন পাতা ও কুশিতে নতুন সাজে সেজে ওঠে গাছ।

;

৬০০০ বছরেও অটুট কাঠের সেতু!



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
৬০০০ বছরেও অটুট কাঠের সেতু!

৬০০০ বছরেও অটুট কাঠের সেতু!

  • Font increase
  • Font Decrease

কতকিছু চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যায়। বিনষ্ট হয় স্থাপনা, ঐতিহ্য ও কীর্তি। অথচ আশ্চর্যজনক এক কাঠের সেতু ৬০০০ বছরেও রয়েছে অটুট!

একদিকে পাহাড়। আরেকদিকে ছোট্ট একটি দ্বীপ। মাঝে অগভীর জলাভূমি। আর সেই বিস্তীর্ণ জলাভূমির মাঝ বরাবর চলে গেছে একটি কাঠের সেতু।

অবশ্য এই সেতু আকারে-আকৃতিতে সাধারণভাবে পরিচিত ব্রিজের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাকে কাঠের পথ (Wooden Walkway) বলাই শ্রেয়। কারণ, তার প্রস্থ মাত্র এক ফুট। একের পর এক কাঠের পাটাতন পেতেই তৈরি হয়েছে এই পথ। নেই কোনো হাতলও।

ইংল্যান্ডের সমারসেটের (Somerset) শ্যাপউইক হিথ ন্যাশনাল নেচার রিজার্ভে গেলেই দেখা মিলবে এই কাঠের তৈরি সেতুটির। যার বয়স প্রায় ৬ হাজার বছর! ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম এই সেতু।

তবে বয়সের কারণেই ক্রমশ সংকটময় হয়ে উঠেছিল এই সেতুর অস্তিত্ব। সেতুটির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের ‘হেরিটেজ অ্যাট রিস্ক রেজিস্টার’-এর খাতায়। এবার সেখান থেকেই দুরন্ত প্রত্যাবর্তন করল এই প্রাগৈতিহাসিক পথ। দীর্ঘ কয়েক বছরের চেষ্টায় সেতুটির সংরক্ষণ কাজ সফলভাবে শেষ করলেন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

কার্বন ডেটিং অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০৬ অব্দে তৈরি হয়েছিল এই কাঠের সেতু। নিওলিথিক যুগে। অর্থাৎ, কিংবদন্তি স্টোনহেঞ্জের থেকেও বয়স বেশি কাঠের নির্মিত এই সেতুর। কোনও প্রকৌশলী নন, সেসময় ইংল্যান্ডের কৃষক সম্প্রদায়ের মানুষরা এই সেতু নির্মাণ করেন। সমারসেট জলাভূমির মধ্যে অবস্থিত দ্বীপের মাটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই উর্বর। সেই কারণেই পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে এই দ্বীপে কৃষিকাজ শুরু করেছিল তৎকালীন কৃষক সম্প্রদায়ের মানুষরা। যদিও তাঁদের বাসস্থান ছিল পার্বত্য উপত্যকা। দৈনন্দিন যাতায়াতের সুবিধার জন্যই তাই কাঠ পেতে তৈরি করা হয়েছিল ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ।

সাধারণত কাঠ পচনশীল হওয়ায়, কাঠের তৈরি যেকোনো স্থাপত্যই অত্যন্ত দ্রুত ক্ষয়ীভূত হয়। তবে সমারসেটের এই সেতুটির ক্ষেত্রে ঘটনাটা ঠিক বিপরীত। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে প্রথম আবিষ্কৃত হয় ‘সুইট ট্র্যাক’-খ্যাত এই সেতু। তবে তার অবস্থা দেখে তখনও পর্যন্ত আন্দাজ করা যায়নি যে সেটির বয়স ৬০০০ বছর। এর নেপথ্যে রয়েছে জলাভূমির জলে পিট মস এবং প্ল্যাংটনের উচ্চ উপস্থিতি। যার কারণে জলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় অনেকটাই। ফলে হ্রাস পায় ক্ষয়ীভবনের হারও।

সেতুটি সংরক্ষণের পর, সংশ্লিষ্ট জলাভূমিতে এই ধরনের মসের পরিমাণ বৃদ্ধির চেষ্টা করা হবে বলেই জানাচ্ছেন সংরক্ষণ কার্যের পরিচালক তথা ‘ন্যাচরাল ইংল্যান্ড’-এর সিনিয়র রিজার্ভ ম্যানেজার জুলি মেরেট৷ পরবর্তীতে এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকেও সারিয়ে তুলবে বলে অভিমত তাঁর।

;

সড়ক জুড়ে জারুলের হাতছানি



আছিয়া খাতুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নবীণ বৃক্ষরাজি পুষ্পভারে আচ্ছাদিত রাস্তার দুইধার। গাঢ় বেগুনি রঙের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপের মাঝেও চারদিকে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে মায়াবী কুহক। হালকা নিলুয়া বাতাসে সবুজ পাতার ফাঁক গলিয়ে মাথা তুলেছে বেগুনি পাপড়ি। যার দৃষ্টিনন্দন বর্ণচ্ছটা রঙে মায়াবী চোখে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুল স্ট্রিটের কথা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড থেকে পশ্চিমপাড়া যাওয়ার রাস্তাকে অনেকেই বলেন জারুল স্ট্রিট। এই রাস্তার দুইধারে রয়েছে সারি সারি জারুল গাছ। গ্রীষ্মের শুরুতেই এসব গাছে মোহময়তা নিয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে জারুল ফুল। যার বেগুনি রঙের আভা পথিকের চোখে এনে দিচ্ছে শিল্পর দ্যোতনা। বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজিয়ে তুলেছে নতুন সাজে।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম খালেদা জিয়া হলের দক্ষিণ দিকের রাস্তার ধারে সবুজ পাতার ক্যানভাসে বেগুনি জারুল ফুটিয়ে তুলেছে হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতি। রং আর রূপের বাহার ছড়ানো অপরূপ বর্ণিল সাজের এই ফুল সাজিয়েছে সৌন্দর্যের ডালি। কাজী নজরুল ইসলাম মিলতায়তনের সামনে, বিজ্ঞান ভবনের সামনে, টিএসসিসির পাশে, চারুকলা অনুষদের রেললাইনের পাশের রাস্তা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বাসস্ট্যান্ড, বিভিন্ন আবাসিক হলের সামনে, বধ্যভূমিসহ ক্যাম্পাস সজ্জিত হয়েছে জারুলের ঝুমকোতে। ফুলে ফুলে সৃষ্টি করেছে অপরূপ নান্দনিকতার। যোগ করেছে নতুন সৌন্দর্যের মাত্রা।

জারুলকে বলা হয় বাংলার চেরি। গ্রীষ্মে অপূর্ব হয়ে ফোটে এই ফুল। চোখ ভরে যায় তার রূপ দেখে। প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোর তার গানে বলেছেন ‘ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও, আমার শিউলি নাও, এসো দুজনে প্রেমে হই ঋণী।’ সেই গান শুনে হয়তো কোন এক কাল্পনিক বিদেশিনীকে শিউলি ফুল দেওয়ার জন্য কত খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। যেমনটি পায়নি চেরি ফুলের দেখাও। সে আকাঙক্ষা পূরণ করতে পারে বাংলার চেরি জারুল ফুল। জারুল নিয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘ভিজে হয়ে আসে মেঘ এক দুপুর চিল একা নদীটির পাশে। জারুল গাছের ডালে বসে চেয়ে থাকে উপরের দিকে।’

উদ্ভীদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জারুলের আদি নিবাস শ্রীলঙ্কায় হলেও এটি ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব বৃক্ষ। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে জারুলগাছের দেখা মেলে। জারুল ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম (Lagerstroemia speciosa) লেজারস্ট্রমিয়া স্পেসিওসা এবং ইংরেজি নাম (Giant Crape-myrtle) জায়ান্ত ক্রেপ মার্টেল। জারুলগাছ সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। গ্রীষ্মের শুরুতেই এর ফুল ফোটে এবং শরৎ পর্যন্ত দেখা যায়। ফুল শেষে গাছে বীজ হয়। বীজ দেখতে গোলাকার। জারুল বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশে সাধারণত নীলাভ ও গোলাপি এই দুই রঙের জারুল ফুল দেখা যায়। জারুলগাছের বীজ, ছাল ও পাতা ডায়াবেটিস রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ছাড়া জ্বর, অনিদ্রা, কাশি ও অজীর্ণতার চিকিৎসায়ও জারুল যথার্থ উপকারী।

জারুল ফুলের এমন মনকাড়া সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কেউ মুগ্ধ হয়ে স্থিরচিত্র ধারণ করে তা শেয়ার করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঝড়ো বাতাসে ক্ষণে ক্ষণেই ঝরে পড়ছে জারুল ফুল। আর সেগুলো রাস্তার উপর সৃষ্টি করেছে বেগুনি গালিচার। দেখলে মনে হয় কোনো অতিথিকে বরণের জন্য সাজানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে এখন কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙের সঙ্গে একক রাজত্ব করছে বেগুনি জারুল।

জারুলের বেগুনি রঙে বিমোহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হাচনাইন মোস্তফা। তিনি বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে সব ঋতুতেই কোনো না কোনো ফুল ফোটে। এসব ফুলের রঙ, গন্ধ আলাদা। তবে গ্রীষ্মের ফুলের মধ্যে জারুল অন্যতম। এর নজরকাড়া বেগুনি রঙ বিমোহিত করে।

;