সড়ক জুড়ে জারুলের হাতছানি



আছিয়া খাতুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নবীণ বৃক্ষরাজি পুষ্পভারে আচ্ছাদিত রাস্তার দুইধার। গাঢ় বেগুনি রঙের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপের মাঝেও চারদিকে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে মায়াবী কুহক। হালকা নিলুয়া বাতাসে সবুজ পাতার ফাঁক গলিয়ে মাথা তুলেছে বেগুনি পাপড়ি। যার দৃষ্টিনন্দন বর্ণচ্ছটা রঙে মায়াবী চোখে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুল স্ট্রিটের কথা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড থেকে পশ্চিমপাড়া যাওয়ার রাস্তাকে অনেকেই বলেন জারুল স্ট্রিট। এই রাস্তার দুইধারে রয়েছে সারি সারি জারুল গাছ। গ্রীষ্মের শুরুতেই এসব গাছে মোহময়তা নিয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে জারুল ফুল। যার বেগুনি রঙের আভা পথিকের চোখে এনে দিচ্ছে শিল্পর দ্যোতনা। বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজিয়ে তুলেছে নতুন সাজে।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম খালেদা জিয়া হলের দক্ষিণ দিকের রাস্তার ধারে সবুজ পাতার ক্যানভাসে বেগুনি জারুল ফুটিয়ে তুলেছে হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতি। রং আর রূপের বাহার ছড়ানো অপরূপ বর্ণিল সাজের এই ফুল সাজিয়েছে সৌন্দর্যের ডালি। কাজী নজরুল ইসলাম মিলতায়তনের সামনে, বিজ্ঞান ভবনের সামনে, টিএসসিসির পাশে, চারুকলা অনুষদের রেললাইনের পাশের রাস্তা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বাসস্ট্যান্ড, বিভিন্ন আবাসিক হলের সামনে, বধ্যভূমিসহ ক্যাম্পাস সজ্জিত হয়েছে জারুলের ঝুমকোতে। ফুলে ফুলে সৃষ্টি করেছে অপরূপ নান্দনিকতার। যোগ করেছে নতুন সৌন্দর্যের মাত্রা।

জারুলকে বলা হয় বাংলার চেরি। গ্রীষ্মে অপূর্ব হয়ে ফোটে এই ফুল। চোখ ভরে যায় তার রূপ দেখে। প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোর তার গানে বলেছেন ‘ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও, আমার শিউলি নাও, এসো দুজনে প্রেমে হই ঋণী।’ সেই গান শুনে হয়তো কোন এক কাল্পনিক বিদেশিনীকে শিউলি ফুল দেওয়ার জন্য কত খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। যেমনটি পায়নি চেরি ফুলের দেখাও। সে আকাঙক্ষা পূরণ করতে পারে বাংলার চেরি জারুল ফুল। জারুল নিয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘ভিজে হয়ে আসে মেঘ এক দুপুর চিল একা নদীটির পাশে। জারুল গাছের ডালে বসে চেয়ে থাকে উপরের দিকে।’

উদ্ভীদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জারুলের আদি নিবাস শ্রীলঙ্কায় হলেও এটি ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব বৃক্ষ। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে জারুলগাছের দেখা মেলে। জারুল ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম (Lagerstroemia speciosa) লেজারস্ট্রমিয়া স্পেসিওসা এবং ইংরেজি নাম (Giant Crape-myrtle) জায়ান্ত ক্রেপ মার্টেল। জারুলগাছ সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। গ্রীষ্মের শুরুতেই এর ফুল ফোটে এবং শরৎ পর্যন্ত দেখা যায়। ফুল শেষে গাছে বীজ হয়। বীজ দেখতে গোলাকার। জারুল বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশে সাধারণত নীলাভ ও গোলাপি এই দুই রঙের জারুল ফুল দেখা যায়। জারুলগাছের বীজ, ছাল ও পাতা ডায়াবেটিস রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ছাড়া জ্বর, অনিদ্রা, কাশি ও অজীর্ণতার চিকিৎসায়ও জারুল যথার্থ উপকারী।

জারুল ফুলের এমন মনকাড়া সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কেউ মুগ্ধ হয়ে স্থিরচিত্র ধারণ করে তা শেয়ার করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঝড়ো বাতাসে ক্ষণে ক্ষণেই ঝরে পড়ছে জারুল ফুল। আর সেগুলো রাস্তার উপর সৃষ্টি করেছে বেগুনি গালিচার। দেখলে মনে হয় কোনো অতিথিকে বরণের জন্য সাজানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে এখন কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙের সঙ্গে একক রাজত্ব করছে বেগুনি জারুল।

জারুলের বেগুনি রঙে বিমোহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী হাচনাইন মোস্তফা। তিনি বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে সব ঋতুতেই কোনো না কোনো ফুল ফোটে। এসব ফুলের রঙ, গন্ধ আলাদা। তবে গ্রীষ্মের ফুলের মধ্যে জারুল অন্যতম। এর নজরকাড়া বেগুনি রঙ বিমোহিত করে।

উড়ন্তভাবেও খাবার খেতে পারে ভুবন-চিল



বিভোর স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
তীক্ষ্ম নখে শিকার ধরে ভুবন-চিলের উড়ে যাবার মুহূর্ত। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

তীক্ষ্ম নখে শিকার ধরে ভুবন-চিলের উড়ে যাবার মুহূর্ত। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

দুপুর-রোদের তীব্রতা। চারদিক পুড়ছে। যেদিকে চোখ মেলে তাকানো যায় কেবল ফ্যাকাসে আভা। সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে রৌদ্রতাপে। বিখ্যাত জলাভূমি বাইক্কা বিলে দগ্ধতার জ্বালা। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় ‘ভুবন চিল’।

‘পাখি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার’টা আজ বেদনার স্মৃতি! কেননা ওখানে একজন পাখিপ্রেমী মানুষ ছিলেন। যার নাম মিরাশ মিয়া। তিনি কত্তশত পাখি চিনিয়েছিন মানুষদের! গত কয়েক বছর ধরেই মিরাশশূন্য পাখিরা।

বাইক্কা বিলে পাখিদের কথা বললেই অনায়াসে এসে যান তিনি। ভালোবাসা থেকেই হয়তো। এখনো স্পষ্টতই কানের গহ্বরে মৃদুমধূরতায় বাজে- ‘দেখুন দেখুন, এই যে ভুবন চিল’! হঠাৎ ওড়ে যাওয়া ভুবন চিলের দিকে পাখীপ্রেমী মিরাশ মিয়ার দৃষ্টিদান পর্ব। মাথার উপর দিয়ে ধীরে গম্ভীরভাবে তখন উড়ে যায় শিকারি ভুবন চিল।

ভুবন চিলের ইংরেজি নাম Black Kite এবং বৈজ্ঞানিক নাম Milvus migrans। এরা আমাদের দেশের তুলনামূলক বড় আকারের পাখি। এরা উড়ন্তভাবেও খাবার খেতে পারে। আগে থেকে শিকার ধরে যখন অনন্ত আকাশে ডানা মেলে, তখন উড়তে উড়তে তীক্ষ্ম নখে ধরে থাকা শিকার বা খাবারগুলো তার শক্তিশালী ঠোঁটের সাহায্যে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি গবেষক ইনাম আল হক বলেন, ভুবন চিল Milvus গণের মাঝারি আকারের শিকারি পাখি। এদের ডানা দীর্ঘ ও সুচালো; তা লেজের আগা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ পালক সবচেয়ে লম্বা। পা খাটো। পৃথিবীতে ২ প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে ১ প্রজাতি পাওয়া যায়।

মাঝে মাঝে শিকারের প্রয়োজনে মাটি থেকে উড্ডয়নভঙ্গি। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইনাম আল হক বলেন, এ পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬ সেন্টিমিটার। কালচে-বাদামি দেহ এবং ডানায় কালো ছোপ রয়েছে। পাখিটির লেজ লম্বা এবং মাছের লেজের মতো চেরা দেখতে পাওয়া যায়। লালচে আভা রয়েছে পেট ও লেজতলে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় ডানার নিচের দিকের সাদা সাদা পট্টি চোখে পড়ে। হালকা হলুদ রঙের লম্বা পা এবং চোখ বাদামি।

এর প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, এরা আমাদের দেশের সুলভ আবাসিক পাখি হলেও শীত মৌসুমে বিপুল সংখ্যায় এদের পাওয়া যায়। এরা পর্বত, নদীর পাড়, বেলাভূমি নগর, শহর ও গ্রামে বিচরণ করে। সচরাচর ছোট দলে লোকালয়ে থাকে। এছাড়াও ভারত, ভূটান, নেপাল, শ্রীলংকাসহ ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

এদের খাদ্য-তালিকা সম্পর্কে এ পাখি বিশেষজ্ঞ বলেন, এরা বর্জ্যভুক পাখি। বর্জ্যস্তুপ, মাছের বাজারের উচ্ছিষ্ট ও ফেলে দেওয়া বর্জ্য অংশই খায়। প্রায়ই শকুনের সাথে মিলে উচ্ছিষ্ট কিংবা পশুর মৃতদেহ খেয়ে থাকে।

মার্চ-মে ভুবন চিলদের প্রজনন মৌসুম। তখন ছেলেপাখি আকাশের মাঝে চক্রাকারে উড়তে থাকে এবং হঠাৎই ঝাপ দিয়ে প্রেমময় অভিসারে ডালে বসে থাকা মেয়েপাখির পিঠে এসে নামে বলে জানান প্রখ্যাত পাখিবিদ ইনাম আল হক।

;

পদ্মাসেতু: ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা সবাই উন্নয়নের পন্থী’

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার



ড. মাহফুজ পারভেজ
পদ্মাসেতু, ছবি: বার্তা২৪.কম

পদ্মাসেতু, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাঙনে, স্রোতে, গতিতে ও সংহারে 'সর্বনাশা পদ্মা' নামের পরিচিতিতে গানে, কবিতায় ও বাঙালি জনজীবনে চিত্রিত প্রমত্তা নদীতে এখন ঐতিহাসিক সেতু। ইতিহাস নির্মাণের এমন 'টার্নিং পয়েন্ট'-এ পদ্মা সেতুর তীরে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের বহুল চর্চিত কবিতাকে একটু বদলে নিজেদের মতো করে লেখার সাধ জাগতেই পারে বাংলাদেশের স্বপ্ন-সফল মানুষের। সম্মিলিত কণ্ঠের আবাহনে সবাই বলতেই পারে: "পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/'আমরা সবাই উন্নয়নের' পন্থী।"

আদিতে রোমান্টিক আবহে রচিত 'শেষের কবিতা'য় চরণগুলো রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শেষ বয়সে আধুনিক মনন আর অগ্রসর প্রেমের শৈলীতে রচিত 'শেষের কবিতা'কে রবীন্দ্রনাথের রচনা সমগ্রের মধ্যে 'বিশেষ' ও 'আলাদা' বৈশিষ্ট দিয়েছে। কেটি মিত্তির, অমিত রয়ের বিন্যাসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

"পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।/রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল/পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,/ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে/দিগঙ্গনার নৃত্য;/হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে/ঝলমল করে চিত্ত।"

পদ্মা সেতু শুধু পথই বেঁধে দেয় নি, হঠাৎ আলোর ঝলকানি লাগিয়ে সারা জাতির চিত্ত ঝলমল করে দিয়েছে। এক অসম্ভব রকমের ব্যয়বহুল ও অকল্পনীয় নির্মাণের মধ্য দিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের সভ্যতার ইতিহাস-মুকুটে স্বর্ণ পালকের মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে পদ্মা সেতু।

নদী-বিঘ্নিত বাংলাদেশকে সহস্র বর্ষের পরিক্রমায় এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় আলিঙ্গনাবদ্ধ করেছে পদ্মা সেতু। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ বাংলাদেশের সংযোগ ও যোগাযোগের স্বপ্নময় সরণি উন্মোচিত হয়েছে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে। দুর্লঙ্ঘ পদ্মার বুক পেরিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালি এক ও একাকার হতে পেরেছে মৈত্রী, মিলন, আন্তঃসংযোগের মসৃণ আবহে।

যে কর্মযজ্ঞ আর চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবের মোহনায় পৌঁছেছে, তা এক মহাসমর তুল্য আখ্যান। নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, সাহস ও কমিটমেন্টের দ্বারা ভেতরের ও বাইরের শাঠ্য-ষড়যন্ত্র-বিঘ্ন গুড়িয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জয় হয়েছে বাঙালি জাতির অকুতোভয় ও অদম্য স্পৃহার। পৃথিবীর আশ্চর্য ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ও নির্মাণশৈলীর তালিকায় স্থান লাভকারী পদ্মা সেতু বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সৃষ্টি ও বিকাশ চেতনার অনুকরণীয় 'আইকন' আজ।

পৃথিবীর বুকে সভ্যতার ইতিহাস হলো বিঘ্ন, বিপদ ও দুর্গমতাকে জয় করার ইতিবৃত্ত। সেতু সেই ইতিহাসকে সহজ করেছে অজানা ও অচেনাকে কাছে এনে এবং সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মোচিত করে। সেতু, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্রিজ, তা হলো, যেকোনো প্রকারের প্রতিবন্ধক অতিক্রম করার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিমভাবে গঠিত সংযোগ। একটি সেতুর নকশা ও নির্মাণশৈলী নির্ভর করে তার প্রয়োজনীয়তা, নির্মাণস্থলের প্রাকৃতিক অবস্থান, ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রী এবং বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণের উপর।

যাবতীয় সকল আয়োজন সম্পন্নকরণ ও বাস্তবায়ন সমাপ্তের পর নির্মিত সেতুর প্রভাবে বদলে যায় ইতিহাসের গতি ও সভ্যতার চাকা। কৃষি, পর্যটন, বিপণন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নবনির্মিতির উল্লাস বয়ে আনে সেতুর প্রসারিত দুই প্রান্ত। সেতু শুধু ভৌত কাঠামোর উন্নয়নপ্রবাহের মধ্যেই সীমিত থাকে না, আরও প্রসারিত হয়ে জাতির ঐক্য, সংহতি, শক্তির প্রতীকেও পরিণত হয়। চৈতন্য জাগ্রতকারী এক বাতিঘরের মতো বহুমাত্রিক আলোকমালার বিচ্ছুরিত বর্ণালীতে ঋদ্ধ করে জাতিসত্তার সমগ্র কেন্দ্র ও প্রান্তকে এবং প্রতিটি সদস্যকে।

ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরব ও অর্জনের মহত্তম সঞ্চয়কে আরও পরিপুষ্ট করার প্রত্যয়ে দীপ্ত। জীবন ও যাপনের, সমাজ ও অর্থনীতির, সংস্কৃতি ও লোকাচারের, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতিটি ক্ষেত্রে পরম পরশে পদ্মা সেতুর স্পর্শ সমুদ্র-সমান সম্ভাবনার নতুন ইতিহাস রচনার তীব্র প্রতীতিতে দোলায়িত।

বৃহত্তর ঢাকা ও বৃহত্তর ফরিদপুরের জল ও স্থলরেখার বিভেদ ঘুচিয়ে পদ্মা সেতু যখন বাংলাদেশের মধ্য ও দক্ষিণাংশকে মিলিয়ে দেওয়ার স্মরণীয় ইতিহাসকে চুম্বন করছে, তখন সমগ্র বাংলাদেশ অন্তরের আলোয় দেখছে অনাগত সুন্দর ও সম্ভাবনার পথরেখা; প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে সমবেত আনন্দধ্বনিতে গাইছে: "পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, 'আমরা সবাই উন্নয়নের' পন্থী"।

. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

;

মহান মুক্তিযুদ্ধ, একজন বাটুল ও রণাঙ্গন থেকে দাবানল



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

  • Font increase
  • Font Decrease

 

মহান মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রকাশের জন্য প্রকাশিত সাপ্তাহিক রণাঙ্গনের পথধরে আজকের দৈনিক দাবানল। যে কারণে রংপুরের মুক্তিযুদ্ধ, দাবানল ও খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলকে এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা হয়।

আর দশটি পত্রিকা সঙ্গে মেলানো যায় না রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক দাবানলকে। দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে গোপন স্থান থেকে হতো ছাপানো আর বন্দুকের নল এড়াতে সংগোপনে হতো বিতরণ।  সম্ভবত আর কোনো পত্রিকার জন্ম এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হয় নি।

১৯৬৫/৬৬ সালে রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের জিএস তখন। ছাত্র অবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক আন্দোলনে। প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর-দিনাজপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। বিএ পাশের পর উচ্চ শিক্ষায় ব্রতী না হয়ে শ্রমিক সংগঠন সম্প্রসারণে উদ্যোগি হন ক্ষণজন্মা বাটুল। সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন, যার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পুর্বেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। যুগপথ শ্রমিক মুভমেন্টের কারনে ১৯৭০ সালে মার্শাল ‘ল’ এর সময় ৬ মাসের জেল দেওয়া হয় তাকে। সে সময় রংপুর জেলা সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ রংপুরে অবাঙালিদের গুলিতে কিশোর শংকু সমঝদার ও জেলা জজ আদালতের কর্মচারী ওমর আলী শহীদ হন। বাটুল ছিলেন সেই মিছিলের অন্যতম সিপাহসালার।

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের ভাষায় ‘রংপুরে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে আলমনগর এলাকায় অরাঙালি নেতা আলম এর বাসভবনে অরাঙালিদের একটি মহাসমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে পাকিস্তান ও রংপুর, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, পার্বতীপুর, ঈশ্বরদি, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অরাঙালি নেতারা জড়ো হয়। সিদ্ধান্ত নেয় রংপুর-দিনাজপুরসহ আরো কিছু সংখ্যক এলাকা নিয়ে বিহারীস্থান প্রতিষ্ঠা করবে। এরপরই শুরু হয় রংপুর অঞ্চলে রাঙালি-অরাঙালিদের মধ্যে বিরোধ। এরই ধারাবাহিকতায় ৩রা মার্চ আওয়ামী লীগের ডাকে যখন সারাদেশে সাধারণ হরতাল পালিত হচ্ছিল। সে সময় আওয়ামীলীগের মিছিল থেকে আলমনগরের সরফরাজ খানের বাড়ীর বৈঠকখানায় ঢুকে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের ছবি ভাংচুর করার সময় সরফরাজ খানের গুলিতে কিশোর শংকু সমঝদার গুলিবিদ্ধ হয়।

স্মৃতিচারণে প্রয়াত খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল বলেছিলেন, ওই ঘটনায় সারা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ছাত্র জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আমি কিছু সংখ্যক বিক্ষুদ্ধ ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকি।      

শুরুতেই মিছিলে অংশ গ্রহণকারীদের সংখ্যা কম হলেও কিছুক্ষনের মধ্যে মিছিলটি বিশাল আকার ধারণ করে। কিছুদুর অগ্রসর হবার পর মালদহ মিষ্টিমূখ অতিক্রম করে একটু সামনে এগুলেই মিছিলটি সহিংস রূপ নেয়। মিছিলের আশপাশের অরাঙালিদের দোকানপাটে হামলা শুরু হয়। প্রথমেই বিদেশী হোটেল খ্যাত হোটেলটি ভাংচুর করা হয়। এরপর আক্রমণ হয় পায়রা চত্বরের সামনে একটি কাবুলীওয়ালার পুরাতন কম্বল আর কাপড়ের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে পাশের ছাপাখানায় আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সবকিছু। এরপর জাহাজ কোম্পানীর মালিকের মালিকানাধীন কে-টু সিগারেট এর ফ্যাক্টরিতে আগুন দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে মিছিলটি সামনের দিকে এগুতে থাকে। শেষে জাহাজ কোম্পানী মোড়ে এসে মিছিলটি থমকে দাড়ায়।

দেওয়ান বাড়ি রোডে জেলা জজ আদালতের কর্মচারী ওমর আলী গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। এ খবরে সারা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে রংপুর ক্যান্টমেন্ট থেকে সেনাবাহীনির একটি দল বের হয়। শহরে কারফিউ জারি করে এবং জনগনকে শহর ছেড়ে যেতে বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর জনশূন্য হয়ে যায়। ’

পরের দিন ৪ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাঙালি বিহারীদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ৩ মার্চ এর ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করা হয়। বৈঠক শেষে রাঙালি বিহারীদের একটি যৌথ মিছিল বের করে। ‘রাঙালি-বিহারী ভাই ভাই, একসাথে বাস করতে চাই’ শ্লোগান দিয়ে মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করে।

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ মজদুর ফেডারেশনের ব্যানারে এবং ডা. সোবহানের সভাপতিত্বে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী ময়দানে শ্রমিক জনসভায় আনুষ্ঠনিকভাবে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে সেখানে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন বাটুল।

এরই মধ্যে সারাদেশে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন মূখর হয়ে উঠে মানুষ। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকায় খাদ্যশস্য মজুদের পরিকল্পনা নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে ঢাকায় মজুদ করতে থাকে। এই অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিহত করার ডাক দেন তৎকালীন রংপুর দিনজাপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। ২৩ মার্চ স্থানীয় তেঁতুলতলায় (বর্তমানে শাপলা চত্বর) এক শ্রমিক সভায় শ্রমিকদের খাদ্যশস্য পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বাটুল। ফলে পরদিন থেকে খাদ্যশস্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে শাসকগোষ্ঠী বাটুলের ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন।

এ অবস্থায় নিরাপত্তাহীনতার কথা চিন্তা করে ২৬ মার্চ রাতে গঙ্গাচড়ার মহিপুর হয়ে তিস্তা পাড়ি দিয়ে লালমনিরহাটের কালিগঞ্জে যান। পরে সেখান থেকে ২৭ মার্চ ভারতের কুচবিহারের দিনহাটার সিতাই বন্দরে চলে যান ।

 ওই এলাকার ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহ বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদের শিক্ষা জীবনে সহপাঠি ছিলেন। বাটুল কমল গুহের সাথে সাক্ষাৎ করে সহযোগিতা কামনা করেন। বাটুলের ভাষায় ‘কমল গুহ তাকে জানালেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে; তাই মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করতে হবে। তার কথা মত শিতাই বন্দরে ফিরে এসে উৎসাহী যুবক টিপু, জোসনা, পিন্টুসহ ১০ থেকে ১২ জন যুবক যুবতীকে কমল গুহের নিকট প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান। তিনি বেসরকারীভাবে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকভাবে লোকজন ভারতে যেতে থাকে। তাদের মধ্য থেকে আরো কিছু লোককে সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান।

১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠনের পর তারা ভারতে চলে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই তারা মুক্তিযুদ্ধের সকল দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে তারা বেকার হয়ে পড়েন। এসময় কমল গুহ মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য বাটুলকে পত্রিকা প্রকাশের পরামর্শ দেন।

তার পরামর্শ ও সাহসে মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাটুল ‘মুস্তফা করিম’ ছদ্মনামে সাপ্তাহিক ‘রণাঙ্গন’ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। হয়ে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, প্রকাশক ও সম্পাদক । বাটুল ও তার ১০/১২ জন সহযোগী উদ্যোগি ভারত সরকার থেকে পাওয়া রিলিফের অর্ধেক বিক্রি করা অর্থ দিয়ে পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

সেই সময় সাপ্তাহিক রণাঙ্গন এ ‘ডিসেম্বরে বাংলা মুক্ত’ শীর্ষক খবর প্রকাশ করে হলুস্থল তুলে দেন পুরো উপমহাদেশে। ওই খবর নিয়ে শুরু হয় হৈহৈ রৈরৈ। শুরু হয় নানান আলোচনা, সমালোচনা। সরকার এবং নানা ব্যক্তির নানা প্রশ্নের সম্মুখিন হয় হন বাটুল ও সাপ্তাহিক রণাঙ্গন। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ‘বাটুল ও রণাঙ্গন’ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গণ’ এর ওই সংখ্যাটি এখনও জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

যুদ্ধের দিনগুলোতে গোপনে পত্রিকা বিতরণ করতেন জীবনের ঝঁকি নিয়ে। নানা চড়াই উৎরাই এর মধ্যদিয়ে এ পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রাখতে সক্ষম হন। এভাবে কয়েক মাস চলার পর আমরা ৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে ঐতিহাসিক এক দূলর্ভ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন গোলাম মোস্তফা বাটুল। অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ রণাঙ্গনের দুঃখ দূদর্শার কথা শুনে নগদ দুই হাজার টাকা প্রদান করে। ওই সাক্ষাতকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, ‘আমরা কতদিন পর বাংলাদেশে ফিরে যাব ? তার জবাব ছিল, ‘যুদ্ধ হচ্ছে; কতদিনে দেশ স্বাধীন হবে বলা মুশকিল। ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় দীর্ঘদিন থেকে যুদ্ধ চলছে এখনো তারা স্বাধীনতা পায়নি। আমাদের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৬ মাস অতিবাহিত হচ্ছে। আমাদেরও স্বাধীনতা পেতে সময় লাগবে। সম্পুরক প্রশ্ন ছিল, ‘আমাদের নিকট তথ্য আছে আপনাদের সাথে পাকিস্তান সরকারের একটি আপোষ আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগিরই সমাধান হতে পারে। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন- ‘আই হ্যাভ নো কমেন্ট’। বাটুল তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন এরপর আমরা ফিরে এসে নিশ্চিত হই খুব শিগগিরই আমরা দেশে ফিরে যেতে পারব। যার ফলশ্রুতিতে আমরা ‘ডিসেম্বরে বাঙলা মুক্ত’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করি। ফলে আমাদেরকে নানাভাবে বিভিন্ন মহল থেকে নিগৃহীত হতে হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে, আমরা বীরোচিত সংবর্ধনা পাই।

দেশ স্বাধীনের পর তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরেন। শুরু হয় রণাঙ্গনের সাহসী পথচলা। পরে রণাঙ্গন বাজেয়াপ্ত করে সরকার। পরবর্তীতে বিভাগীয় কমিশনার অফিসে আপিল করে ছাপাখানাটি ফেরত পেলেও রণাঙ্গণের ডিক্লারেশন ফেরত পাননি । এরপর প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত থাকে ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ এর। এরপর ১৯৮১ সালের ২৭শে মে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাংবাদিকতার ঐতিহ্যের মনুমেন্ট ‘দৈনিক দাবানল’। বাটুল প্রতিষ্ঠিত এই তিনটি পত্রিকার কাজ করেছেন দেশে বিদেশের প্রথিতষশা সব সাংবাদিক। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন, আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র সাংবাদিক আব্দুল মালেক, দৈনিক প্রথম আলোর সহ-সম্পাদক আনিসুল হক, দৈনিক জনকণ্ঠের খ্যাতিমান সাংবাদিক আমান উদ দৌলা, অপরাধ জগতের সফিক রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের আনিস রহমান, তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) এর সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বকসী সবুজ, দৈনিক বিজলীর সম্পাদক মোজাফফর হোসেন, দৈনিক মায়াবাজার সম্পাদক মোনাব্বর হোসেন মনাসহ অনেকেই।

এছাড়াও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিদম্যান পত্রিকাগুলোও তারই হাতে গড়া সাংবদিকদের হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। গত পাঁচ দশক থেকে রংপুর স্টেশন রোডের দাবানল অফিস এখনো প্রাণবন্ত। নানা শ্রেণী পেশার মানুষে টইটম্বুর থাকে দৈনিক দাবানল অফিস।

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল একজন ভিন্নধারার মানুষ ছিলেন। মিঠাপুকুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তার হাতে গড়া সংগঠন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন এখন উত্তরাঞ্চলে সব থেকে প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সংগঠন। প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী সংগঠন রংপুর খেলাঘর, শিখা সংসদসহ অসংখ্য সংগঠন। সাংবাদিকতায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য রংপুর পৌরসভার সিটিজেন এ্যাওয়ার্ড, রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের ‘মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতা স্মৃতিপদক’সহ অসংখ্য পদক পেয়েছেন। তার বড় পুত্র খন্দকার মোস্তফা মোর্শেদ ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক দাবানল এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। ছোট ছেলে খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনু ভারতের মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেছেন। একমাত্র কণ্যা প্রয়াত সোনিয়া মোস্তফা ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন।

জীবন চলার পথের নানা টানাপোড়েন, রাজনীতি আর দৈনিক দাবানল পরিচালনা করতে গিয়ে দমদমায় তেলের পাম্প, ঠিকাদার পাড়ায় হোটেল সম্রাট বিক্রি করে দেন। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যদিয়েও পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রেখে গত ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান! পরবর্তিতে তার সুযোগ্য সহধর্মীনি সাঈদা পারভীন ও  তার হাতে গড়া ছোট সন্তান খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনুর সম্পাদনায় পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রয়েছে। দৈনিক দাবানল ২০২২ সালের ২৭ মে ৫১ বছর অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠার একান্ন বর্ষপূতি উপলক্ষে ২০ জুন বের হয়েছে বিশেষ সংখ্যা। সঙ্গে থাকছে গুণীজন সংবর্ধনাসহ নানা আয়োজন।

তার প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে আসছেন তাদের অনেকেই হয়তো কাংখিত বেতন ভাতা পাননি। তবুও তারা একজন বাটুল এবং সাংবাদিকতার প্রতিবিম্বকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন, এখনো অনেকে আছেন পরম ভালবাসায়। তিনি নেই কিন্তু এখনও তার দাবানল আলো ছড়াচ্ছে স্ব-মহিমায়। এর সব কৃতিত্বই খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া এই গুনি সাংবাদিক ও সংগঠক মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও ১২ ঘন্টা কাটান তার প্রতিষ্ঠিত দাবানলে। কারণে অকারণে ডাকেন সহকর্মীদের। মনের দিক থেকে তিনি ছিলেন চির তরুণ। দাঁতবিহীন মুখে পান চিবাতে চিবাতে পরামর্শ দিতেন, পরামর্শ নিতেন। হাসতেন ফোকলা দাঁতে। সফেদ সাদা পাঞ্জাবীর আবরণে চলতেন পথ। মনে হয়, ছুটছেন কোন অনুসন্ধাণী রিপোর্টের সন্ধানে। তার উদ্যেম সবাইকে অনুপ্রাণিত করতো। সামনে এগুবার পথ দেখাতো। সাংবাদিকতার মাধ্যমে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। একটি পত্রিকাকে ৫০ বছর ধরে প্রকাশনায় রাখা যে কতটা সাধনা, ত্যাগ আর কর্মের ফসল। সেটির বাস্তব উদাহরণ দৈনিক দাবানল। আর সেটি যিনি করেন তিনি যে কতটা সাধক, ত্যাগী আর কর্মঠ সেটিও প্রমানিত। তিনি হলেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তিনি একজন সাধক সাংবাদিক, সংবাদপত্রের সাধক প্রতিষ্ঠাতা। তিনি হলেন সাংবাদিকদের প্রতিবিম্ব। তার প্রয়াণ পরবর্তী শুন্যতায় দাবানল আজ বায়ান্ন বছরে পদার্পণ অনুষ্ঠান উদযাপন করছে। তিনি শরীরে উপস্থিত না থাকলে আছেন হদয়ে, আছেন শত শত অনুজদের চোখে।

;

বাবা নাই, কষ্ট এটাই!



কবির য়াহমদ
বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এবারের বাবা দিবসের এক সপ্তাহ আগে ছিল আমার বাবার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিক। বাবা নামের যে আকাশ সমান ছায়া তার অনুপস্থিতি টের পাচ্ছি গত তিন বছর ধরে। ২০১৯ সালের জুন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে দিনটা ছিল শুক্রবার, ১৪ তারিখ। বিকালে আমার বাবা যাকে আমরা ‘আব্বা’ বলে ডাকতাম তিনি শেষ ঘুমে মগ্ন হয়েছিলেন। শেষ ঘুমের আগে প্রকৃতির নিয়মে জাগতিক অনেক ঘুমে যেতেন তিনি। আমরা কেউ জানতাম না সেদিনের সেই ঘুম ছিল তাঁর শেষ ঘুম। আগের দিন থেকেই তীব্র জ্বর ছিল তাঁর। খানিক বিরতি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, জেগেও ওঠছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের দুপুরের পর থেকে যে ঘুমে মেতেছিলেন তার পর থেকে আর জাগেননি। এই ঘুমের সময়েই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন। বারবার তাঁর শরীরের তাপমাত্রা মাপতে এসে একটা সময়ে টের পেলাম সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তাঁর। জাগাতে চেয়েও পারিনি। শেষমেশ যখন তীব্র ঠান্ডা জমেছিল তাঁর শরীরে তখন পায়ের তলার মাটিগুলো সরে গিয়েছিল আমার, আমাদের।

বাবাহীন হতে পারি আমরাও—এমন ভাবনা তাঁর অসুস্থ হওয়ার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়লেও বিপদ ভেবে সেটা দূরে সরিয়ে রাখছিলাম। কেন আমরা বাবা-হারা হবো; আমাদের কী বাবার আশ্রয়ের দরকার নেই—এমন ভাবনায় তাঁর কাছাকাছি থেকেছিলাম শেষ কবছর। এর মধ্যিখানে কোথাও জরুরি প্রয়োজনে গেলেও তিনি ফোন দিয়ে ‘কখন ঘরে ফিরছি’ এমনটা জানতে চাইতেন বারবার। সন্ধ্যা হলেই এমন হতো নিয়মিত। ফিরে এসে খোঁজ করার কারণ জানতে চাইলে প্রতিবারই বলতেন—‘ঘরে থাকলে ভরসা পাই, মনে শক্তি পাই’। প্রথম প্রথম একথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে না পারলেও একটা সময়ে বুঝতে পারি কতটা ভরসা আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রশ্ন, কাছে রাখার এমন আকুতি ঝরত তাঁর। স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছি এবং ছেলেবেলার যতটুকু মনে পড়ে আব্বা আমাকে ‘অন্ধের যষ্টি’ বলে ডাকতেন। এ কারণেই বুঝি সেই ছোটকালের যে স্বপ্ন বড়কালেও এসে সেটার ছাপ রয়ে গিয়েছিল পুরোটাই, যদিও জানি অন্ধের যষ্টি হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি আমি।

আব্বার একাধিকবার স্ট্রোক করেছিলেন, হাই ব্লাড প্রেসার ছিল, কোলেস্টেরল সমস্যা ছিল, হার্টে রিঙ পরানো ছিল তাঁর। শেষ সময়ে এসে মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কিডনিজনিত রোগ ছিল। ওটাই ভুগিয়েছে তাঁকে। ঢাকায়-সিলেটে একাধিকবার তাঁর কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয়েছিল। শেষবার যখন হাসপাতালে ছিলেন তখন ১০ দিনের বেশি সময় ছিলেন আইসিইউতে। আইসিইউতে থাকাকালে ওই ইউনিটে সবসময় ঢোকা যেত না, বাইরে পায়চারি করতাম। রাতের পর রাত ঘুমহীন থেকে থেকে তাঁর সামান্য চোখ মেলার অপেক্ষা করতাম। সামান্য নড়লে-চড়লে মনে হতো প্রাণ ফিরেছে আমারও দেহে। আইসিইউ থেকে কেবিনে নেওয়ার পর সামনাসামনি থাকার সুযোগ হয়েছিল। অসুস্থ তবু মনে শান্তি ফিরত, সামনে ত আছেনই। এরপর বাড়িতে নিয়ে আসার সময়ে মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধজয় করে ফিরছি। তাঁর চিকিৎসাকালে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের করার কিছু ছিল না, কিন্তু ফিরিয়ে নিয়ে আসার সময়ে সত্যি সত্যি যুদ্ধজয়ের সেনাপতি ভাবছিলাম। এভাবে কয়েকবার, বেশ কয়েকবার। প্রতিবারই একই অনুভূতি হতো।

আব্বাকে প্রতিদিন একগাদা ওষুধ খেতে হতো। ডা. ফয়সল আহমদ, ডা. নাজমুস সাকিব, ডা. আবদুল লতিফ রেণুসহ অনেক চিকিৎসক আব্বাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর যখনই দরকার পড়েছে চিকিৎসকবন্ধু ডা. এনামুল হক এনাম, ডা. আলিম আল রাজি, ডা. সুমন দে, ডা. জোবায়ের আহমেদদের কাছে নানা পরামর্শ পেয়েছি। তাদের কারণে মনে হতো আমার আব্বা পুরোটা সময়ই আছেন চিকিৎসকের পরামর্শাধীন। তাদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই।

আমার আব্বার সঙ্গে আমার ছেলে রাইআনের দুরন্ত সম্পর্ক ছিল। কিডনি রোগ তাই টক জাতীয় কিছু খেতে ডাক্তারের বারণ ছিল। তবু মাঝে মাঝে দেখতাম আব্বা আর রাইআন দুজনে মিলে আমের আচার, বরইয়ের আচারসহ বিবিধ আচার খাচ্ছেন। দাদা-নাতির এই আচার খাওয়ার সময়টাতে অনেকবার বাধা দিয়েছি মূলত চিকিৎসকের পরামর্শের কারণে। আব্বা রাইআনকে ‘দাদা’ সম্বোধনে ডাকতেন। রাইআন যখন খুব ছোট ছিল তখন তার সামান্য কান্নাতে আব্বা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। রাইআনের খাবারদাবারের সমস্যা হচ্ছে কি-না এনিয়ে সতর্ক দৃষ্টি ছিল তাঁর। রাইআনের দুধসহ খাবারদাবারের টাকাগুলো আব্বাই দিতেন। সময়ে সময়ে জিজ্ঞেস করতেন তার কিছুর দরকার কি না, আবার সামান্য অথচ বাচ্চাদের স্বাভাবিক কান্নাকাটিতেও ভাবতেন তার বুঝি খাবারদাবারের সঙ্কট! স্কুলে ভর্তির টাকা তিনিই দিয়েছিলেন। রাইআন-আয়ানের মাসে-মাসে স্কুলের বেতনের টাকা তিনিই দিতেন। এত বেশি কেয়ারিং ছিলেন তাদের প্রতি।

আব্বা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন, ছিলেন সাবেক জনপ্রতিনিধি। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। ছিলেন সালিশ ব্যক্তিত্ব। নিজেদের উপজেলাসহ আশপাশের এলাকার মাঝেও পরিচিত ছিলেন তিনি। যেকোনো প্রয়োজনে এলাকায় কিংবা দূরে কোথাও গেলেও মুরুব্বিদের কারও সঙ্গে দেখা হলে এলাকার নাম বললে স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল—‘আজিজ উদ্দিন চৌধুরী ভাইস চেয়ারম্যান সাহেবের কিছু হই কি-না?’ পরিচয় দেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকার মানুষদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা ভুলার মত নয়। এগুলো আদতে অর্জন। আব্বা নেই আজ তিন বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, অথচ সেই একই পরিচিতি, একই ভালোবাসা আমরা পেয়ে যাচ্ছি। এগুলো দেখে মনে হয় আব্বা দৈহিকভাবে হয়ত নেই কিন্তু তাঁর পরিচিতি এখনও রয়ে গেছে। এগুলো দেখে একদিকে গর্ব হয়, আবার অন্যদিকে নিজেকে পিতৃহীন ভেবে বুকটা হাহাকার করে ওঠে! এই হাহাকারের যন্ত্রণা যে কতটা ভারী সেটা ঠিক ঠিক টের পাই; আমি নিশ্চিত জগতের অধিকাংশ পিতৃহীনেরাই টের পায়।

আব্বা খেলাধুলা-ভক্ত ছিলেন। দেশে যখন ক্রিকেট এত বেশি জনপ্রিয় ছিল না, তখন টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখালে সেগুলো দেখতেন। আমরাও তাঁর সঙ্গী হতাম। ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। রাত জেগে বিশ্বকাপের খেলাও দেখতেন। টেলিভিশনে খেলার আওয়াজ শুনলে যোগ দিতেন আমাদের সঙ্গে। পত্র-পত্রিকা পড়তেন, বইপত্র পড়তেন। সে কারণে ছোটবেলা থেকে বইয়ের প্রতি আমাদের অনুরাগও জন্মেছিল। আব্বা মারা যাওয়ার পর এবার প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল আসছে। এবার খেলাগুলো দেখা হবে না তাঁর। ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপ জেতে সে সংবাদও জানা হবে না তাঁর!

সিলেট ভাসছে বানের জলে। আব্বার জীবদ্দশায় একাধিকবার আমরা বন্যা আক্রান্ত হয়েছিলাম। ১৯৯১ সালের বন্যায় আমাদের ঘরে পানিও উঠেছিল। তিন-রুমের পুরনো সেই ঘর এখন নেই। সে ঘরের কেবল একটি রুম ছাড়া বাকি দুই রুমে পানি উঠে পড়েছিল। সেই বন্যায় গাদাগাদি করে আমরা থেকেছিলাম সবাই একটা মাত্র ঘরে। চারদিকে পানি, উঠানে পানি; আব্বা খাবারদাবার নিয়ে আসতেন নৌকায় করে। সেই স্মৃতি এখনও ভাসে। ভাসে পরম মমতার এক পিতৃছবি যেখানে সন্তান এবং সন্তানের হাসিই মুখ্য। দেশের নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আব্বা এলাকার মানুষদের সহায়তা দিতে আমাদের ভাইবোনদের উদ্বুব্ধ করতেন। দেশের বাইরে থাকা তাঁর সন্তানদের বলতেন কিছু করতে। তারা কখনই তাঁকে হতাশ করেনি। টাকা হাতে এলে ডেকে এনে দিতেন, অথবা আমাদের কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখনও মানুষ সে স্মৃতি রোমন্থন করে। আব্বার মৃত্যুর পর আমাদের ভাইবোন ও বোনদের স্বামীরা মিলে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা রাখে। বেশ কিছু টাকা একত্র হলে সেগুলো দেশে পাঠায় মানুষের জন্যে। মানুষকে ভালোবাসার-সহায়তা করার আব্বার যে চেষ্টা সেটাই ধরে রাখা উদ্দেশ্য আমাদের।

আমরা বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ বলে ঝড়বৃষ্টি নিয়মিত ঘটনাই। টিনের চালে ঝড়ের ধাক্কা লাগত নিয়মিত। ঝড় শুরু হলেই আব্বা আমাদের সাত ভাইবোনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। আমরা সবাই তাঁর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। ঝড়ে তাঁর ছিল প্রচণ্ড ভয়, তাই ওই সময়টা সবাইকে একত্র করতেন; ঘুম থেকে তোলে হলেও! এখনও ঝড় হয়, কিন্তু আগের মতো সেভাবে টের পাই না, আগের মতো কেউ আর ঝড়ে অভয় দিতে ডেকে তোলে না!

আজ বাবা দিবস। দেশে দেশে আছে এর দিবসী আয়োজনও। দিবসী এসব আয়োজন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যত মত-প্রতিমতই থাকুক না কেন ‘বাবা’ শব্দটাই স্বতন্ত্র আবেগের, নির্ভরতা আর আশ্রয়ের। ২০১৯ সালের ১৪ জুন আমার বাবা, আমার আব্বাকে হারিয়ে আমি এবং আমরা যে নির্ভরতা আর আশ্রয় হারিয়েছি সেটা অব্যাখ্যেয়। বাবাকে হারানোর সোয়া দুইবছরের মাথায় আম্মাকেও হারিয়েছি ২০২১ সালের ২ নভেম্বর; অনেক কিছু থাকা আমাদের ঘরে মা নেই, বাবা নেই—এরচেয়ে কষ্টের আর কিছু থাকতে পারে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক, ইমেইল: [email protected]

;