বোহেমিয়া চেক প্রজাতন্ত্রের স্বর্গীয় শহর প্রাগ



মায়াবতী মৃন্ময়ী, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বোহেমিয়া চেক প্রজাতন্ত্রের স্বর্গীয় শহর প্রাগ

বোহেমিয়া চেক প্রজাতন্ত্রের স্বর্গীয় শহর প্রাগ

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন বোহেমিয়া রাজ্য বা আজকের চেক প্রজাতন্ত্রে ভ্রমণ ট্রিপে ইউরোপের পশ্চিম থেকে পূর্বে  ভিয়েনা, ব্রুনো হয়ে স্বর্গীয় শহর প্রাগে প্রবেশের রোমাঞ্চকর অনুভূতির তুলনা হয় না। তারপর "নাইট ওয়াক ইন দ্যা সিটি অফ প্রাগ" মানেই লাইফটাইম মেমোরি। তবে, প্রাগে নামেই রাত, বাস্তবে খুঁজতে হবে "কোথায় রাত ?" রাতের যেন পড়ন্ত বিকেল।  আকাশে তখনো কটকটে রোদ। বাতাসে বসন্তের রেশ।

পশ্চিম ইউরোপ যেমন জার্মানিক, পূর্ব ইউরোপের প্রাগ শহরে তেমনই প্রধানত স্লাভিক ট্রাইবদের বাস। চেক ভাষায় প্রাগের নাম প্রাহা। যার অর্থ হল ‘ford’ বা ‘rapid’। আক্ষরিক অর্থে ভ্লাতাভা নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে পেরোতে হয় এই অঞ্চল যেখানে নদীর গভীরতা অত্যন্ত কম। মানুষ আর ঘোড়াও সেই তিরতির করে বয়ে চলা অগভীর নদীর মধ্যে দিয়ে অনায়াসে এককালে পেরিয়ে চলত। এখন সেখানে ছোট্ট ব্রিজ হয়েছে। এই হলো প্রাহা নামটির উৎসমূল।

দেশ হিসেবে চেক প্রজাতন্ত্র কিংবদন্তির ভাণ্ডার। বুদ্ধিমতী ও জ্ঞানী স্লেভিক রাজকন্যা লিবিউসে অসাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী করতেন । পাহাড়ের মাথায় তিনি আর তার স্বামী রাজপুত্র প্রেমিস্ল শান্তিপূর্ণভাবে রাজ্য শাসন করতেন। একদিন পাহাড়ের মাথায় উঠে, ভ্লাতাভা নদীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে তিনি বললেন, অদূর ভবিষ্যতে এই শহর হয়ে উঠবে পূর্ব ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শহর। খ্যাতির শিখরে পৌঁছবে তার শিল্প-কলা-কৃষ্টির উৎকর্ষতায়। শাসন বানালেন একটি বিশাল দুর্গ বানিয়ে চলেছিল। রাণীও বললেন, ওইখানেই  সেই চরম শহরায়ণের সব লক্ষণ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ভাবীকালে ফলেও গেল তাদের কথা।  পূর্ব ইউরোপের হৃৎপিণ্ড স্বরূপ গোড়াপত্তন হলো চেক রিপাব্লিকের।  রাজধানী হলো প্রাহা, বিশ্ববাসী যাকে ডাকে প্রাগ।


চেক দেশের সুরম্য রাজধানী প্রাগ দর্শন করতে হয় বাসে চড়ে। প্রথমে নামতে হয় পাহাড়ের মাথায়  স্ট্রাহভ মনাষ্ট্রি দেখতে। মনাষ্ট্রিতে রয়েছে বিয়ার ব্রুয়ারি।  সেখান থেকে দুর্গ শহর প্রাগের  অতি সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়। এই ভিউপয়েন্টে গিয়ে চেকের বিশিষ্ট সন্ত সেন্ট নরবার্টিনের বৃত্তান্ত সচিত্র জানা  যায়।

স্ট্রাহভ মনাস্ট্রিতে সেন্ট নর্বার্টিনের রেলিক্স রাখা রয়েছে। আছে প্রকান্ড লাইব্রেরি, বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার, ব্যাসিলিকায়  ফ্রেসকো  ভার্জিন  মেরীর মোটিফ। ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সবকিছুই সযত্নে সংরক্ষিত। পাশেই রাখা রয়েছে প্রকাণ্ড এক অর্গ্যান, যা বাজিয়ে বিশ্বসেরা সুরসম্রাট মোৎজার্ট বলেছিলেন, এমন বড় ও সুন্দর অর্গ্যান তিনি আর কোনোদিনো বাজাননি। 

বাসের পাশাপাশি প্রাগ দেখতে হয় পায়ে হেঁটে। প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারে ঘোরার মজাই আলাদা। প্রাগ কিন্তু শিল্প, সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত ছুঁয়ে আগন্তুক পর্যটকদের নিয়ে যায় ফিজিক্স ব‌ইয়ের পাতায়। কারণ, জোহান কেপলার ও টাইকো ব্রাহের জ্যোতির্বিদ্যার অনেক কিছু আবিষ্কার ঘটেছিল এই প্রাগ শহরে। পথের ধারে দুই বিজ্ঞানির স্ট্যচু প্রমাণস্বরূপ আজো দৃশ্যমান।

কথিত আছে, দুই দিকপাল জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে আর জোহানেস কেপলার ভাগ্যের টানে আসেন প্রাগে। টাইকো ব্রাহে ছিলেন উৎকৃষ্ট পর্যবেক্ষক আর কেপলার ছিলেন গণিতজ্ঞ। এই প্রাগেই টাইকো ব্রাহে কেপলারকে তার সহকর্মী করলেন। আকাশে হঠাৎ টাইকো দেখতে পেলেন অদ্ভুত সুপারনোভা। কেপলার তা থেকে অঙ্ক কষে সূত্র তৈরি করলেন। বিজ্ঞানের সাধনায় একে অপরের পরিপূরক ছিলেন তারা।


প্রাগের হটস্পট সেন্ট নিকোলাস চার্চ।  কোবলস্টোনের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নির্বিঘ্নে পৌঁছা  যায়। কেননা, প্রাগের সবকিছু সংরক্ষণই অতি সুন্দর। অথচ এরা দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরেও নিজেদের অনেক ভেঙেচুরে আবারো অনেক সুন্দর করে গড়ে তুলেছে। সবকিছু রেখেছে  চমৎকার, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি।

ট্রাম প্রাগের মনোরম বাহন। রাস্তা আর  ট্রামলাইনের চলেছে পাশাপাশি। কি অপূর্ব এই স্ট্রীটকারের মায়াবী নেটওয়ার্ক।  সারা শহরের অলিগলি রাজপথ থেকে ক্রিসক্রস ভাবে রঙীন সুন্দর সুন্দর ট্রাম চলে যাচ্ছে অনবরত। আর এরা কত সুন্দরভাবে এই যানটিকে ব্যাবহার করে সেটাই দেখবার বিষয়।  প্রাগের ট্রামের নেটওয়ার্ক চেক রিপাবলিকের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে বৃহৎ।

প্রাগের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা যায় নিরাপদে ও অবলীলায়। জেব্রাক্রসিংয়ে পা দিয়ে ট্র্যাফিক লাইট মেনেই চলাচল করে সবাই। যান বা মানুষ, কারোই তাড়া নেই। নিয়ম ভাঙার কথা তো অকল্পনীয়। নিজস্ব ছন্দময় গতিতে সবাই চলছে নিজস্ব পথে। পশ্চিম ইউরোপের মতো রুদ্ধশ্বাস দৌঁড়ে চলার ছিটেফোঁটাও নেই পূর্ব ইউরোপের প্রাগে।

প্রাগে চোখে পড়বে অসাধারণ রেনেসাঁ স্থাপত্য। সমগ্র ইউরোপই নবজাগরণের মূলভূমি। চারিদিক স্থাপত্যকলা, ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি। প্রাগের লেসার টাউন হলো নান্দনিকতার চূড়ান্ত প্রকাশস্থল। লেসার টাউন স্কোয়ারের  ল্যান্ডমার্ক হল রাজকীয় সেন্ট নিকোলাস চার্চ। ওল্ড টাউন স্কোয়ারের কেন্দ্রবিন্দুতে এই চার্চ।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চেক আর্মির ঘাঁটি ছিল এই নিকোলাস চার্চ। চার্চটির সংরক্ষণে সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রম আর নামীদামী স্থপতিদের পরিশ্রমে শিল্পকলায় ভরে উঠে চার্চের অন্দর ও বাইরের মহল।  সেন্ট নিকোলাস চার্চটি একাধারে গীর্জা অন্যধারে ক্লাসিকাল কনসার্টের অন্যতম প্রেক্ষাগৃহ বা মঞ্চ। 


চার্চের বাইরে  থিকথিক করছে রেস্তোঁরা, পাব, দোকানপাট, ব্যুটিক আর প্রাগের বিখ্যাত মানুষ, ধনী লোকজনের ব্যারক স্টাইলের ঘরবাড়ি। ইন্টারন্যাশানাল এমব্যাসিগুলোও এখানে। এই  ব্যারক স্টাইল হল অত্যন্ত সুন্দর স্থাপত্যে নির্মিত বাড়ি। জানলার নীচে খোদাই করা মানুষের মুখ, বাড়ির ছাদের প্যারাপেটে পরী কিম্বা প্রবেশ পথে জীবজন্তুর অসামান্য আর্কিটেকচার।  পুরণো শহরের অনুপাতে অনেকটাই ছোট বলে এর নাম লেসার টাউন।  

চলতে চলতে প্রাগে পাওয়া যাবে অনেকগুলো ট্যানেল। মনে হবে একফালি অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে আবারো বড় রাস্তায় আসা হয়েছে। ডাকলেই পাওয়া যাবে  প্রাইভেট ট্রামের একটি কামরাকে। ম্যাজিকের মত ট্রাম এসে দাঁড়াবে সামনে। উঠে পড়তে হবে টুক করে। তারপর সুন্দর অনুভূতিতে স্বপ্নের মত সন্ধ্যেয় প্রাগের  ট্রামে চড়া আর একটা গলির মুখে অবতরণ করে পাথরের রাস্তা দিয়ে এক বিয়ার ব্রুয়ারীর মধ্যে প্রবেশ করা। বোহেমিয়ান বিয়ার বিশ্ববিখ্যাত। কোনও এক 'বিয়ার পাবে' সান্ধ্য আড্ডার অভিজ্ঞান শিহরণ জাগানিয়া। বিশাল সুদৃশ্য কাটগ্লাসের মাগে বিয়ার হাজির হবে। এককোণায় প্রৌঢ় বাজিয়ে চলেবেন একর্ডিয়ানে চেনাঅচেনা গানের সুর। আলো আঁধারিতে মায়াময় পরিবেশ তৈরি হবে। 

রহস্যে মোড়ানো ঘন্টাখানেক পর পাব থেকে বেরিয়ে এলে আলোকমালায় সজ্জিত রোমান্টিক প্রাগের রাজপথে উঁকি দেবে সামনে। দূরে দেখা যাবে বিখ্যাত ইউনিভাসিটি অফ প্রাগ, যেখানে এলবার্ট আইনস্টাইন থিওরিটিকাল ফিজিক্সে অধ্যাপনা করেছিলেন।  পাশেই রয়েছে চারজন মিউজিশিয়ানের অনবদ্য স্ট্যাচু, যা প্রাগের বিখ্যাত স্থাপত্যগুলোর একটি। চারজনের হাতে চারটি বাদ্যযন্ত্র। স্থপতির কল্পনায় বিশ্বের বৃহত্তম চারটি নদী আমাজন, মিসিসিপি, গঙ্গা এবং দানিয়ুব-এর এক অনবদ্য কলতান এই চার বাদ্যশিল্পী চোখ বন্ধ করে বাজিয়ে চলেছে । চার নৃত্যরত শিল্পীর চোখ বাঁধা। তাদের হাতে ম্যান্ডোলিন, ভায়োলিন, বাঁশী ও ট্রামপেট।  

ভ্লাতাভা নদীর ওপরে প্রাগের ঐতিহাসিক চার্লস ব্রিজ। ব্রিজে বিশাল চওড়া হাঁটার পথ। ব্রিজের ডাইনে বাঁয়ে সব পিলারের মাথায় দন্ডায়মান  সারেসারে  স্থাপত্য। রাজ পুরোহিত সেন্ট জন নেপোমুকের স্ট্যচুটি সর্বপ্রধান, যে স্ট্যাচুর মাথার চারিপাশ দিয়ে একটি ধাতব রিংয়ে পাঁচটি সোনালী স্টার খচিত।  ভ্লাতাভা নদীর ব্রিজের ঠিক ওই স্থানটি থেকে তাঁকে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন রাজা। কারণ পুরোহিতের কাছে রাজা তাঁর  রাণীর স্বীকারোক্তির কথা জানতে চেয়েছিলেন  এবং পুরোহিত তা জানাতে চান নি।  অতি জাগ্রত এই স্ট্যাচুটি ছুঁলে নাকি মনোস্কামনা পূর্ণ হয়। স্থানীয় মানুষ ব্রিজের গায়ে ছোট ছোট তালা লাগিয়ে দেয়, অনেকটা মাজারে গিয়ে লাল সূতো বাঁধার মত। নদীর ওপরে পুরণো ব্রিজ, নতুন ব্রিজ রাতের রূপসী প্রাগ শহরকে উন্মোচিত করে বহুবর্ণা আলোকমালায়।


যদি সেই রাতে আকাশে কৃষ্ণা চতুর্থীর চাঁদ থাকে, কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকারে পায়ে হেঁটে রূপসী প্রাগের পথ চলার শেষে পাওয়া যাবে প্রাগৈতিহাসিক ভৌতিক অনুভূতি। ছমছম করে ওঠবে গা। চোখের পলক পড়বে না একবারও। কানে ভাসবে প্রাগের পৌরাণিক উপাখ্যান।  মাথাকাটা এক সাধুর গল্প, যার অতৃপ্ত আত্মা এখনো ঘুরে বেড়ায় মনাষ্ট্রির সিঁড়িতে। সেই সাধু অভাবের তাড়নায় নিজের মাথা কেটে দেন।  হেডলেস মঙ্কের গল্প শুনে মনে হবে সামনে নিজের বাড়ি বা হোটেল নয়, অশরীরী আত্মায় ভরা তেপান্তরের দিগন্তব্যাপী মাঠ।

প্রাগের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য সেন্ট অ্যাগনেস মনাষ্ট্রি, যার সামনে রয়েছে 'পাউডার গেট'। প্রাগের গথিক শৈলীতে নির্মিত টাওয়ার সহ প্রবেশদ্বার যেন মুঘল সম্রাটের 'বুলন্দ দরওয়াজ' অথবা 'গেট ওয়ে অফ ইন্ডিয়া' বা 'ইন্ডিয়া গেট'। এই প্রবেশদ্বার প্রাগের ওল্ডটাউনকে নিউটাউন থেকে পৃথক করেছে।  সেখানেও রয়েছে নানা  গল্প। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, সেন্ট এগনেস নামে এক রাজকন্যা আট বছর বয়সে বাগদত্তা হন আরেক দশ বছরের রাজপুত্রের। কিন্তু বিয়ের পর সংসারে বীতরাগ জন্মানো আর কৃচ্ছ্রসাধনে ব্রতী হয়ে ভক্তিমার্গে বিচরণের যান তারা।  ওল্ড টাউন অঙ্গনের ওয়েসনেসডে স্কোয়ার'-এ এ গল্প মশহুর, বোহেমিয়ার প্যাট্রন সেন্ট-এর নামে এই স্কোয়ারের নাম। 

এই ঐতিহাসিক স্থানটি হল প্রাগের হেরিটেজ সাইট।  মধ্যযুগে এখানে ঘোড়ার বাজার ছিল। তারওর বোহেমিয়ান রাজা চতুর্থ চার্লসের নিউ টাউন স্কোয়ার বানানোয় তা পুরনো শহরে পরিণত হয়। এখন আলোয় ঝলমলে প্রাগের নিউটাউন।  রাতের আলোয় ন্যাশানাল মিউজিয়াম, Wenceslas মনুমেন্ট  এক অদ্ভূত রোমান্টিক স্থান। আর ওল্ড টাউন গা ছমছম রূপকথা জগতের মতো ধূসর ও রহস্যঘেরা।

"নাইটস অফ দ্যা ক্রস স্কোয়ার" হলো প্রাগের বিখ্যাত রাজপথ,  টুরিস্টদের অন্যতম গন্তব্য। ডিজিটাল ক্লিকে, সেলফি স্টিকে রাজকীয় রাতপরী প্রাগের ছবি ক্যামেরায় ধরে সবাই এখানেই। এই পথ ও স্কোয়ার অন্যদিকে চার্লস ব্রিজকেও ছুঁয়েছে। স্কোয়ারের মধ্যখানে রাজা চতুর্থ চার্লসের বিশাল সেমি-গথিক স্ট্যাচু ।


শহরের আলোয় ঝলমলে অতিপ্রাচীন প্রাগ যেন যৌবনউদ্ভিন্না। চালর্স ইউনিভার্সিটির ৫০০ বছর পূর্তিতে রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে স্মারক নির্মিত হয়েছে। স্কোয়ারের আশপাশের গথিক স্টাইল অট্টালিকার প্যারাপেটে দাঁড়িয়ে সারে সারে ভাস্কর্য। অপূর্ব নন্দন দৃশ্য প্রাগের সর্বত্র উদ্ভাসিত করে রেখেছে। 

পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের শহর প্রাগের নিজস্বতা অক্ষুণ্ণ হলেও সেখানে পশ্চিম ও দূরপূর্ব ইউরোপের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। প্রাগ যেন নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিলন ও সঙ্গমস্থল। বিশেষত পাশের বলকানের প্রভাব প্রাগে অলঙ্ঘনীয় রূপে পরিব্যাপ্ত। বলকান অঞ্চল বলতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়। এর পূর্বে কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিমে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। দানিউব, সাভা ও কুপা নদীগুলো অঞ্চলটির উত্তর সীমানা নির্ধারণ করেছে। বুলগেরিয়া থেকে পূর্ব সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বলকান পর্বতমালার নামে অঞ্চলটির নাম এসেছে।

বলকান অঞ্চলের সন্নিহিত চেক প্রজাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে বোহেমিয়া নামেও পরিচিত মধ্য ইউরোপের একটি ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র। দেশটির দক্ষিণে অস্ট্রিয়া, পশ্চিমে জার্মানি, উত্তর-পূর্বে পোল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্বে স্লোভাকিয়া অবস্থিত। চেক প্রজাতন্ত্র দেশটিতে রয়েছে পাহাড়ি ভূমি যা প্রায় ৭৮,৮৭১ বর্গকিলোমিটার (৩০,৪৫২ বর্গমাইল) অঞ্চলে বিস্তৃত এবং এর অধিকাংশেই নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় জলবায়ু বিদ্যমান। দেশের মধ্যভাগে অবস্থিত বৃহত্তম শহর ও রাজধানী প্রাগ। অন্যান্য শহরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বার্নো ও অস্ত্রাভা।

নবম শতাব্দীর শেষের দিকে মোরাভিয়ার অধীনে বোহেমিয়ার ডাচি প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বে ১০০২ সালে রোমান সাম্রাজ্যের একটি ইম্পেরিয়াল রাজ্য হিসাবে এটি স্বীকৃত হয়েছিলো এবং ১১৯৮ সালে এটি একটি রাজ্যে পরিণত হয়। ১৫২৬ সালে মোহাচের যুদ্ধের পর, বোহেমিয়ার পুরো সাম্রাজ্যটি ধীরে ধীরে হাবসবার্গ রাজতন্ত্রের সাথে একীভূত হয়। এসময় প্রোটেস্ট্যান্ট বোহেমিয়ান বিদ্রোহ ত্রিশ বছরব্যাপী হোয়াইট মাউন্টেনের যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। যুদ্ধের পর হাবসবার্গরা তাদের শাসনকে সুসংহত করে। ১৮০৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সাথে সাথে এসব ভূমি অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে, চেক ভূমি আরও শিল্পোন্নত হয়ে ওঠে এবং ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পতনের পরে এর বেশিরভাগ অংশ প্রথম চেকোস্লোভাক প্রজাতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। চেকোস্লোভাকিয়া মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের একমাত্র দেশ ছিল, যা আন্তঃযুদ্ধকালীন সময়কালে সংসদীয় গণতন্ত্র বজায় রেখেছিল। ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তির পর নাৎসি জার্মানি পদ্ধতিগতভাবে চেক ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৯৪৫ সালে চেকোস্লোভাকিয়া পুনরুদ্ধার করা হয় এবং ১৯৪৮ সালে একটি অভ্যুত্থানের পরে এটি পূর্ব ব্লকের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সরকার ও অর্থনীতির উদারীকরণের প্রচেষ্টা ১৯৬৮ সালের প্রাগ বসন্তের সময় সোভিয়েত-নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের মাধ্যমে দমন করা হয়। ১৯৮৯ সালের নভেম্বরের 'মখমল বিপ্লব' দেশে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটায়। ১ জানুয়ারি ১৯৯৩ তারিখে চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে যায় এবং এর সাংবিধানিক রাজ্যগুলো চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়ার স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

প্রাগ বা প্রাহা চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৩তম বৃহত্তম শহর। এছাড়াও বোহেমিয়ার ঐতিহাসিক রাজধানী। ভুলটাভা নদীর তীরে অবস্থিত এ শহরে ১.৩ মিলিয়ন মানুষের বাস, যখন তার নগর জোনগুলোতে প্রায় ২.৭ মিলিয়ন জনসংখ্যার বাস বলে অনুমান করা হয়। শহরে নাতিশীতোষ্ণ মহাসাগরীয় জলবায়ু বিদ্যমান। এখানে গ্রীষ্মকাল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং শীতকাল অপেক্ষাকৃত শীতল।

প্রাগ পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র, এক সমৃদ্ধ ইতিহাস যাকে পূর্ণতা দিয়েছে। রোমানেস্ক স্থাপত্য যুগে প্রাগ শহর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গথিক, রেনেসাঁ, বলকান ও বারোক স্থাপত্য যুগে এর বিকাশ ঘটে। প্রাগ বোহেমিয়া রাজ্যের রাজধানী এবং কয়েকজন পবিত্র রোমান সম্রাটের বাসস্থান ছিল। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাজা চতুর্থ চার্লস (শা. ১৩৪৬-১৩৭৮ খ্রি)। এটি হ্যাব্সবার্গ রাজ্যের এবং অস্ট্রো-হাংগেরীয় সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর কমিউনিস্ট আমলের মধ্যবর্তীকালে চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী হিসাবে বোহেমীয় ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার, ত্রিশবর্ষীয় যুদ্ধ এবং বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে এটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

প্রাগ কিছুসংখ্যক বিখ্যাত সাংস্কৃতিক আকর্ষণের কেন্দ্র, যাদের অনেকগুলো বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের সহিংসতা ও ধ্বংসের পরেও টিকে রয়েছিল। এর প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে 'প্রাগ ক্যাসল' (প্রাগ দুর্গ), চার্লস ব্রিজ, (প্রাগ জ্যোতির্বিদ্যা ঘড়িযুক্ত) ওল্ড টাউন স্কয়ার, ইহুদি কোয়ার্টার, পেট্রিন পাহাড় ও দুর্গ।

১৯৯২ সাল থেকে প্রাগের বিস্তীর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্র ইউনেস্কোর 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট' তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শহরটিতে দশটির অধিক বড় বড় জাদুঘর, অসংখ্য নাট্যশালা, গ্যালারি, সিনেমা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। একটি সম্প্রসারিত আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা শহরটিকে সংযুক্ত করেছে। এখানে বহু সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয় আছে। প্রাগের 'চার্লস ইউনিভার্সিটি' মধ্য ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। গ্লোবাল এন্ড ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিসার্চ নেটওয়ার্ক-এর গবেষণা অনুযায়ী প্রাগ 'আলফা-গ্লোবাল সিটি' হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ। ২০১৯ সালে মারসার কর্তৃক শহরটি পৃথিবীর ৬৯তম সর্বাধিক বাসযোগ্য শহরের মর্যাদা লাভ করে। একই বছর পিকসা ইন্ডেক্স প্রাগকে পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য ১৩তম শহরের স্থান দেয়। শহরটির সমৃদ্ধ ইতিহাস তাকে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী শহরটিতে প্রতি বছর ৮.৫ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক দর্শনার্থী ভ্রমণে আসে। ২০১৭ সালে প্রাগ লন্ডন, প্যারিস, রোম, ইস্তানবুলের পর সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী গ্রহণকারী ৫ম ইউরোপীয় শহর হিসাবে তালিকাবদ্ধ হয়।

প্রাগ ভ্রমণের উৎকৃষ্ট সময় মে থেকে আগস্ট মাস। চেক রিপাবলিকের ক্যাপিটাল প্রাগে যেতে যেকোনো ইউরোপিয়ান শহর থেকেই ফ্লাইট নেওয়া যায়। অথবা টুরগ্রুপের সাথে গেলে তারা বাস বা ট্রেন প্রোভাইড করে। হট টুরিস্টপ্লেস প্রাগে সবধরণের হোটেলের রমরমা। প্রত্যেক হোটেলেই বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট ইন্ক্লুডেড।

প্রাগ এমন এক ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, রোমান্টিক শহর, যাতে রয়েছে স্বর্গীয় ছোঁয়া, প্রাকৃতিক পরশ ও ঐতিহ্যের দ্যোতনা। প্রাগ শহরকে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের শেষে বিদায় জানিয়েও রেহাই পাওয়া যায় না। জীবনের বাঁকে বাঁকে স্বপ্নে এসে ধরা দেয় প্রাগসুন্দরী। মনে হয়, যে শহরে হাঁটতে আরও আরও পথ বাকী। অনায়াসে, অবলীলায়, জীবনভর যে শহরকে নিজের একান্ত শহরের মতো বুকে লুকিয়ে রাখা যায় এবং কখনোই বিদায় জানানো যায় না।

ইউরোপের আধুনিক কবি  Mitchell Duran যা বিবৃত করেছেন কাব্যিক ব্যাঞ্জনায়:

"Goodbye Prague, to a city

I never thought I'd know.

Goodbye Prague, to a heaven

that is lined with shattered beer bottles and stamped out cigarettes

the junkies and the hobo's here still manage to get a  few puffs out of."

উড়ন্তভাবেও খাবার খেতে পারে ভুবন-চিল



বিভোর স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
তীক্ষ্ম নখে শিকার ধরে ভুবন-চিলের উড়ে যাবার মুহূর্ত। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

তীক্ষ্ম নখে শিকার ধরে ভুবন-চিলের উড়ে যাবার মুহূর্ত। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

দুপুর-রোদের তীব্রতা। চারদিক পুড়ছে। যেদিকে চোখ মেলে তাকানো যায় কেবল ফ্যাকাসে আভা। সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে রৌদ্রতাপে। বিখ্যাত জলাভূমি বাইক্কা বিলে দগ্ধতার জ্বালা। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় ‘ভুবন চিল’।

‘পাখি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার’টা আজ বেদনার স্মৃতি! কেননা ওখানে একজন পাখিপ্রেমী মানুষ ছিলেন। যার নাম মিরাশ মিয়া। তিনি কত্তশত পাখি চিনিয়েছিন মানুষদের! গত কয়েক বছর ধরেই মিরাশশূন্য পাখিরা।

বাইক্কা বিলে পাখিদের কথা বললেই অনায়াসে এসে যান তিনি। ভালোবাসা থেকেই হয়তো। এখনো স্পষ্টতই কানের গহ্বরে মৃদুমধূরতায় বাজে- ‘দেখুন দেখুন, এই যে ভুবন চিল’! হঠাৎ ওড়ে যাওয়া ভুবন চিলের দিকে পাখীপ্রেমী মিরাশ মিয়ার দৃষ্টিদান পর্ব। মাথার উপর দিয়ে ধীরে গম্ভীরভাবে তখন উড়ে যায় শিকারি ভুবন চিল।

ভুবন চিলের ইংরেজি নাম Black Kite এবং বৈজ্ঞানিক নাম Milvus migrans। এরা আমাদের দেশের তুলনামূলক বড় আকারের পাখি। এরা উড়ন্তভাবেও খাবার খেতে পারে। আগে থেকে শিকার ধরে যখন অনন্ত আকাশে ডানা মেলে, তখন উড়তে উড়তে তীক্ষ্ম নখে ধরে থাকা শিকার বা খাবারগুলো তার শক্তিশালী ঠোঁটের সাহায্যে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি গবেষক ইনাম আল হক বলেন, ভুবন চিল Milvus গণের মাঝারি আকারের শিকারি পাখি। এদের ডানা দীর্ঘ ও সুচালো; তা লেজের আগা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ পালক সবচেয়ে লম্বা। পা খাটো। পৃথিবীতে ২ প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে ১ প্রজাতি পাওয়া যায়।

মাঝে মাঝে শিকারের প্রয়োজনে মাটি থেকে উড্ডয়নভঙ্গি। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইনাম আল হক বলেন, এ পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬ সেন্টিমিটার। কালচে-বাদামি দেহ এবং ডানায় কালো ছোপ রয়েছে। পাখিটির লেজ লম্বা এবং মাছের লেজের মতো চেরা দেখতে পাওয়া যায়। লালচে আভা রয়েছে পেট ও লেজতলে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় ডানার নিচের দিকের সাদা সাদা পট্টি চোখে পড়ে। হালকা হলুদ রঙের লম্বা পা এবং চোখ বাদামি।

এর প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, এরা আমাদের দেশের সুলভ আবাসিক পাখি হলেও শীত মৌসুমে বিপুল সংখ্যায় এদের পাওয়া যায়। এরা পর্বত, নদীর পাড়, বেলাভূমি নগর, শহর ও গ্রামে বিচরণ করে। সচরাচর ছোট দলে লোকালয়ে থাকে। এছাড়াও ভারত, ভূটান, নেপাল, শ্রীলংকাসহ ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

এদের খাদ্য-তালিকা সম্পর্কে এ পাখি বিশেষজ্ঞ বলেন, এরা বর্জ্যভুক পাখি। বর্জ্যস্তুপ, মাছের বাজারের উচ্ছিষ্ট ও ফেলে দেওয়া বর্জ্য অংশই খায়। প্রায়ই শকুনের সাথে মিলে উচ্ছিষ্ট কিংবা পশুর মৃতদেহ খেয়ে থাকে।

মার্চ-মে ভুবন চিলদের প্রজনন মৌসুম। তখন ছেলেপাখি আকাশের মাঝে চক্রাকারে উড়তে থাকে এবং হঠাৎই ঝাপ দিয়ে প্রেমময় অভিসারে ডালে বসে থাকা মেয়েপাখির পিঠে এসে নামে বলে জানান প্রখ্যাত পাখিবিদ ইনাম আল হক।

;

পদ্মাসেতু: ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা সবাই উন্নয়নের পন্থী’

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার



ড. মাহফুজ পারভেজ
পদ্মাসেতু, ছবি: বার্তা২৪.কম

পদ্মাসেতু, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাঙনে, স্রোতে, গতিতে ও সংহারে 'সর্বনাশা পদ্মা' নামের পরিচিতিতে গানে, কবিতায় ও বাঙালি জনজীবনে চিত্রিত প্রমত্তা নদীতে এখন ঐতিহাসিক সেতু। ইতিহাস নির্মাণের এমন 'টার্নিং পয়েন্ট'-এ পদ্মা সেতুর তীরে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের বহুল চর্চিত কবিতাকে একটু বদলে নিজেদের মতো করে লেখার সাধ জাগতেই পারে বাংলাদেশের স্বপ্ন-সফল মানুষের। সম্মিলিত কণ্ঠের আবাহনে সবাই বলতেই পারে: "পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/'আমরা সবাই উন্নয়নের' পন্থী।"

আদিতে রোমান্টিক আবহে রচিত 'শেষের কবিতা'য় চরণগুলো রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শেষ বয়সে আধুনিক মনন আর অগ্রসর প্রেমের শৈলীতে রচিত 'শেষের কবিতা'কে রবীন্দ্রনাথের রচনা সমগ্রের মধ্যে 'বিশেষ' ও 'আলাদা' বৈশিষ্ট দিয়েছে। কেটি মিত্তির, অমিত রয়ের বিন্যাসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

"পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।/রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল/পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,/ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে/দিগঙ্গনার নৃত্য;/হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে/ঝলমল করে চিত্ত।"

পদ্মা সেতু শুধু পথই বেঁধে দেয় নি, হঠাৎ আলোর ঝলকানি লাগিয়ে সারা জাতির চিত্ত ঝলমল করে দিয়েছে। এক অসম্ভব রকমের ব্যয়বহুল ও অকল্পনীয় নির্মাণের মধ্য দিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের সভ্যতার ইতিহাস-মুকুটে স্বর্ণ পালকের মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে পদ্মা সেতু।

নদী-বিঘ্নিত বাংলাদেশকে সহস্র বর্ষের পরিক্রমায় এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় আলিঙ্গনাবদ্ধ করেছে পদ্মা সেতু। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ বাংলাদেশের সংযোগ ও যোগাযোগের স্বপ্নময় সরণি উন্মোচিত হয়েছে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে। দুর্লঙ্ঘ পদ্মার বুক পেরিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালি এক ও একাকার হতে পেরেছে মৈত্রী, মিলন, আন্তঃসংযোগের মসৃণ আবহে।

যে কর্মযজ্ঞ আর চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবের মোহনায় পৌঁছেছে, তা এক মহাসমর তুল্য আখ্যান। নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, সাহস ও কমিটমেন্টের দ্বারা ভেতরের ও বাইরের শাঠ্য-ষড়যন্ত্র-বিঘ্ন গুড়িয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জয় হয়েছে বাঙালি জাতির অকুতোভয় ও অদম্য স্পৃহার। পৃথিবীর আশ্চর্য ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ও নির্মাণশৈলীর তালিকায় স্থান লাভকারী পদ্মা সেতু বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সৃষ্টি ও বিকাশ চেতনার অনুকরণীয় 'আইকন' আজ।

পৃথিবীর বুকে সভ্যতার ইতিহাস হলো বিঘ্ন, বিপদ ও দুর্গমতাকে জয় করার ইতিবৃত্ত। সেতু সেই ইতিহাসকে সহজ করেছে অজানা ও অচেনাকে কাছে এনে এবং সম্ভাবনার দ্বারকে উন্মোচিত করে। সেতু, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্রিজ, তা হলো, যেকোনো প্রকারের প্রতিবন্ধক অতিক্রম করার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিমভাবে গঠিত সংযোগ। একটি সেতুর নকশা ও নির্মাণশৈলী নির্ভর করে তার প্রয়োজনীয়তা, নির্মাণস্থলের প্রাকৃতিক অবস্থান, ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রী এবং বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণের উপর।

যাবতীয় সকল আয়োজন সম্পন্নকরণ ও বাস্তবায়ন সমাপ্তের পর নির্মিত সেতুর প্রভাবে বদলে যায় ইতিহাসের গতি ও সভ্যতার চাকা। কৃষি, পর্যটন, বিপণন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নবনির্মিতির উল্লাস বয়ে আনে সেতুর প্রসারিত দুই প্রান্ত। সেতু শুধু ভৌত কাঠামোর উন্নয়নপ্রবাহের মধ্যেই সীমিত থাকে না, আরও প্রসারিত হয়ে জাতির ঐক্য, সংহতি, শক্তির প্রতীকেও পরিণত হয়। চৈতন্য জাগ্রতকারী এক বাতিঘরের মতো বহুমাত্রিক আলোকমালার বিচ্ছুরিত বর্ণালীতে ঋদ্ধ করে জাতিসত্তার সমগ্র কেন্দ্র ও প্রান্তকে এবং প্রতিটি সদস্যকে।

ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরব ও অর্জনের মহত্তম সঞ্চয়কে আরও পরিপুষ্ট করার প্রত্যয়ে দীপ্ত। জীবন ও যাপনের, সমাজ ও অর্থনীতির, সংস্কৃতি ও লোকাচারের, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতিটি ক্ষেত্রে পরম পরশে পদ্মা সেতুর স্পর্শ সমুদ্র-সমান সম্ভাবনার নতুন ইতিহাস রচনার তীব্র প্রতীতিতে দোলায়িত।

বৃহত্তর ঢাকা ও বৃহত্তর ফরিদপুরের জল ও স্থলরেখার বিভেদ ঘুচিয়ে পদ্মা সেতু যখন বাংলাদেশের মধ্য ও দক্ষিণাংশকে মিলিয়ে দেওয়ার স্মরণীয় ইতিহাসকে চুম্বন করছে, তখন সমগ্র বাংলাদেশ অন্তরের আলোয় দেখছে অনাগত সুন্দর ও সম্ভাবনার পথরেখা; প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে সমবেত আনন্দধ্বনিতে গাইছে: "পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, 'আমরা সবাই উন্নয়নের' পন্থী"।

. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

;

মহান মুক্তিযুদ্ধ, একজন বাটুল ও রণাঙ্গন থেকে দাবানল



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল

  • Font increase
  • Font Decrease

 

মহান মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রকাশের জন্য প্রকাশিত সাপ্তাহিক রণাঙ্গনের পথধরে আজকের দৈনিক দাবানল। যে কারণে রংপুরের মুক্তিযুদ্ধ, দাবানল ও খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলকে এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা হয়।

আর দশটি পত্রিকা সঙ্গে মেলানো যায় না রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক দাবানলকে। দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে গোপন স্থান থেকে হতো ছাপানো আর বন্দুকের নল এড়াতে সংগোপনে হতো বিতরণ।  সম্ভবত আর কোনো পত্রিকার জন্ম এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হয় নি।

১৯৬৫/৬৬ সালে রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের জিএস তখন। ছাত্র অবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক আন্দোলনে। প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর-দিনাজপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। বিএ পাশের পর উচ্চ শিক্ষায় ব্রতী না হয়ে শ্রমিক সংগঠন সম্প্রসারণে উদ্যোগি হন ক্ষণজন্মা বাটুল। সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন, যার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পুর্বেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। যুগপথ শ্রমিক মুভমেন্টের কারনে ১৯৭০ সালে মার্শাল ‘ল’ এর সময় ৬ মাসের জেল দেওয়া হয় তাকে। সে সময় রংপুর জেলা সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ রংপুরে অবাঙালিদের গুলিতে কিশোর শংকু সমঝদার ও জেলা জজ আদালতের কর্মচারী ওমর আলী শহীদ হন। বাটুল ছিলেন সেই মিছিলের অন্যতম সিপাহসালার।

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের ভাষায় ‘রংপুরে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে আলমনগর এলাকায় অরাঙালি নেতা আলম এর বাসভবনে অরাঙালিদের একটি মহাসমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে পাকিস্তান ও রংপুর, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, পার্বতীপুর, ঈশ্বরদি, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অরাঙালি নেতারা জড়ো হয়। সিদ্ধান্ত নেয় রংপুর-দিনাজপুরসহ আরো কিছু সংখ্যক এলাকা নিয়ে বিহারীস্থান প্রতিষ্ঠা করবে। এরপরই শুরু হয় রংপুর অঞ্চলে রাঙালি-অরাঙালিদের মধ্যে বিরোধ। এরই ধারাবাহিকতায় ৩রা মার্চ আওয়ামী লীগের ডাকে যখন সারাদেশে সাধারণ হরতাল পালিত হচ্ছিল। সে সময় আওয়ামীলীগের মিছিল থেকে আলমনগরের সরফরাজ খানের বাড়ীর বৈঠকখানায় ঢুকে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের ছবি ভাংচুর করার সময় সরফরাজ খানের গুলিতে কিশোর শংকু সমঝদার গুলিবিদ্ধ হয়।

স্মৃতিচারণে প্রয়াত খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল বলেছিলেন, ওই ঘটনায় সারা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ছাত্র জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আমি কিছু সংখ্যক বিক্ষুদ্ধ ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকি।      

শুরুতেই মিছিলে অংশ গ্রহণকারীদের সংখ্যা কম হলেও কিছুক্ষনের মধ্যে মিছিলটি বিশাল আকার ধারণ করে। কিছুদুর অগ্রসর হবার পর মালদহ মিষ্টিমূখ অতিক্রম করে একটু সামনে এগুলেই মিছিলটি সহিংস রূপ নেয়। মিছিলের আশপাশের অরাঙালিদের দোকানপাটে হামলা শুরু হয়। প্রথমেই বিদেশী হোটেল খ্যাত হোটেলটি ভাংচুর করা হয়। এরপর আক্রমণ হয় পায়রা চত্বরের সামনে একটি কাবুলীওয়ালার পুরাতন কম্বল আর কাপড়ের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে পাশের ছাপাখানায় আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সবকিছু। এরপর জাহাজ কোম্পানীর মালিকের মালিকানাধীন কে-টু সিগারেট এর ফ্যাক্টরিতে আগুন দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে মিছিলটি সামনের দিকে এগুতে থাকে। শেষে জাহাজ কোম্পানী মোড়ে এসে মিছিলটি থমকে দাড়ায়।

দেওয়ান বাড়ি রোডে জেলা জজ আদালতের কর্মচারী ওমর আলী গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। এ খবরে সারা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে রংপুর ক্যান্টমেন্ট থেকে সেনাবাহীনির একটি দল বের হয়। শহরে কারফিউ জারি করে এবং জনগনকে শহর ছেড়ে যেতে বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর জনশূন্য হয়ে যায়। ’

পরের দিন ৪ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাঙালি বিহারীদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ৩ মার্চ এর ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করা হয়। বৈঠক শেষে রাঙালি বিহারীদের একটি যৌথ মিছিল বের করে। ‘রাঙালি-বিহারী ভাই ভাই, একসাথে বাস করতে চাই’ শ্লোগান দিয়ে মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করে।

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ মজদুর ফেডারেশনের ব্যানারে এবং ডা. সোবহানের সভাপতিত্বে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী ময়দানে শ্রমিক জনসভায় আনুষ্ঠনিকভাবে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে সেখানে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন বাটুল।

এরই মধ্যে সারাদেশে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন মূখর হয়ে উঠে মানুষ। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকায় খাদ্যশস্য মজুদের পরিকল্পনা নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে ঢাকায় মজুদ করতে থাকে। এই অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিহত করার ডাক দেন তৎকালীন রংপুর দিনজাপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। ২৩ মার্চ স্থানীয় তেঁতুলতলায় (বর্তমানে শাপলা চত্বর) এক শ্রমিক সভায় শ্রমিকদের খাদ্যশস্য পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বাটুল। ফলে পরদিন থেকে খাদ্যশস্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে শাসকগোষ্ঠী বাটুলের ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন।

এ অবস্থায় নিরাপত্তাহীনতার কথা চিন্তা করে ২৬ মার্চ রাতে গঙ্গাচড়ার মহিপুর হয়ে তিস্তা পাড়ি দিয়ে লালমনিরহাটের কালিগঞ্জে যান। পরে সেখান থেকে ২৭ মার্চ ভারতের কুচবিহারের দিনহাটার সিতাই বন্দরে চলে যান ।

 ওই এলাকার ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহ বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদের শিক্ষা জীবনে সহপাঠি ছিলেন। বাটুল কমল গুহের সাথে সাক্ষাৎ করে সহযোগিতা কামনা করেন। বাটুলের ভাষায় ‘কমল গুহ তাকে জানালেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে; তাই মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করতে হবে। তার কথা মত শিতাই বন্দরে ফিরে এসে উৎসাহী যুবক টিপু, জোসনা, পিন্টুসহ ১০ থেকে ১২ জন যুবক যুবতীকে কমল গুহের নিকট প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান। তিনি বেসরকারীভাবে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকভাবে লোকজন ভারতে যেতে থাকে। তাদের মধ্য থেকে আরো কিছু লোককে সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠান।

১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠনের পর তারা ভারতে চলে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই তারা মুক্তিযুদ্ধের সকল দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে তারা বেকার হয়ে পড়েন। এসময় কমল গুহ মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য বাটুলকে পত্রিকা প্রকাশের পরামর্শ দেন।

তার পরামর্শ ও সাহসে মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাটুল ‘মুস্তফা করিম’ ছদ্মনামে সাপ্তাহিক ‘রণাঙ্গন’ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। হয়ে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, প্রকাশক ও সম্পাদক । বাটুল ও তার ১০/১২ জন সহযোগী উদ্যোগি ভারত সরকার থেকে পাওয়া রিলিফের অর্ধেক বিক্রি করা অর্থ দিয়ে পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

সেই সময় সাপ্তাহিক রণাঙ্গন এ ‘ডিসেম্বরে বাংলা মুক্ত’ শীর্ষক খবর প্রকাশ করে হলুস্থল তুলে দেন পুরো উপমহাদেশে। ওই খবর নিয়ে শুরু হয় হৈহৈ রৈরৈ। শুরু হয় নানান আলোচনা, সমালোচনা। সরকার এবং নানা ব্যক্তির নানা প্রশ্নের সম্মুখিন হয় হন বাটুল ও সাপ্তাহিক রণাঙ্গন। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ‘বাটুল ও রণাঙ্গন’ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গণ’ এর ওই সংখ্যাটি এখনও জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

যুদ্ধের দিনগুলোতে গোপনে পত্রিকা বিতরণ করতেন জীবনের ঝঁকি নিয়ে। নানা চড়াই উৎরাই এর মধ্যদিয়ে এ পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রাখতে সক্ষম হন। এভাবে কয়েক মাস চলার পর আমরা ৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করে ঐতিহাসিক এক দূলর্ভ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন গোলাম মোস্তফা বাটুল। অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ রণাঙ্গনের দুঃখ দূদর্শার কথা শুনে নগদ দুই হাজার টাকা প্রদান করে। ওই সাক্ষাতকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, ‘আমরা কতদিন পর বাংলাদেশে ফিরে যাব ? তার জবাব ছিল, ‘যুদ্ধ হচ্ছে; কতদিনে দেশ স্বাধীন হবে বলা মুশকিল। ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় দীর্ঘদিন থেকে যুদ্ধ চলছে এখনো তারা স্বাধীনতা পায়নি। আমাদের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৬ মাস অতিবাহিত হচ্ছে। আমাদেরও স্বাধীনতা পেতে সময় লাগবে। সম্পুরক প্রশ্ন ছিল, ‘আমাদের নিকট তথ্য আছে আপনাদের সাথে পাকিস্তান সরকারের একটি আপোষ আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগিরই সমাধান হতে পারে। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন- ‘আই হ্যাভ নো কমেন্ট’। বাটুল তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন এরপর আমরা ফিরে এসে নিশ্চিত হই খুব শিগগিরই আমরা দেশে ফিরে যেতে পারব। যার ফলশ্রুতিতে আমরা ‘ডিসেম্বরে বাঙলা মুক্ত’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করি। ফলে আমাদেরকে নানাভাবে বিভিন্ন মহল থেকে নিগৃহীত হতে হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে, আমরা বীরোচিত সংবর্ধনা পাই।

দেশ স্বাধীনের পর তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরেন। শুরু হয় রণাঙ্গনের সাহসী পথচলা। পরে রণাঙ্গন বাজেয়াপ্ত করে সরকার। পরবর্তীতে বিভাগীয় কমিশনার অফিসে আপিল করে ছাপাখানাটি ফেরত পেলেও রণাঙ্গণের ডিক্লারেশন ফেরত পাননি । এরপর প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত থাকে ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ এর। এরপর ১৯৮১ সালের ২৭শে মে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাংবাদিকতার ঐতিহ্যের মনুমেন্ট ‘দৈনিক দাবানল’। বাটুল প্রতিষ্ঠিত এই তিনটি পত্রিকার কাজ করেছেন দেশে বিদেশের প্রথিতষশা সব সাংবাদিক। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন, আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র সাংবাদিক আব্দুল মালেক, দৈনিক প্রথম আলোর সহ-সম্পাদক আনিসুল হক, দৈনিক জনকণ্ঠের খ্যাতিমান সাংবাদিক আমান উদ দৌলা, অপরাধ জগতের সফিক রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের আনিস রহমান, তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) এর সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বকসী সবুজ, দৈনিক বিজলীর সম্পাদক মোজাফফর হোসেন, দৈনিক মায়াবাজার সম্পাদক মোনাব্বর হোসেন মনাসহ অনেকেই।

এছাড়াও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিদম্যান পত্রিকাগুলোও তারই হাতে গড়া সাংবদিকদের হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। গত পাঁচ দশক থেকে রংপুর স্টেশন রোডের দাবানল অফিস এখনো প্রাণবন্ত। নানা শ্রেণী পেশার মানুষে টইটম্বুর থাকে দৈনিক দাবানল অফিস।

খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল একজন ভিন্নধারার মানুষ ছিলেন। মিঠাপুকুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তার হাতে গড়া সংগঠন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন এখন উত্তরাঞ্চলে সব থেকে প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সংগঠন। প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী সংগঠন রংপুর খেলাঘর, শিখা সংসদসহ অসংখ্য সংগঠন। সাংবাদিকতায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য রংপুর পৌরসভার সিটিজেন এ্যাওয়ার্ড, রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের ‘মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতা স্মৃতিপদক’সহ অসংখ্য পদক পেয়েছেন। তার বড় পুত্র খন্দকার মোস্তফা মোর্শেদ ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক দাবানল এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। ছোট ছেলে খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনু ভারতের মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেছেন। একমাত্র কণ্যা প্রয়াত সোনিয়া মোস্তফা ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন।

জীবন চলার পথের নানা টানাপোড়েন, রাজনীতি আর দৈনিক দাবানল পরিচালনা করতে গিয়ে দমদমায় তেলের পাম্প, ঠিকাদার পাড়ায় হোটেল সম্রাট বিক্রি করে দেন। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যদিয়েও পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রেখে গত ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান! পরবর্তিতে তার সুযোগ্য সহধর্মীনি সাঈদা পারভীন ও  তার হাতে গড়া ছোট সন্তান খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনুর সম্পাদনায় পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রয়েছে। দৈনিক দাবানল ২০২২ সালের ২৭ মে ৫১ বছর অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠার একান্ন বর্ষপূতি উপলক্ষে ২০ জুন বের হয়েছে বিশেষ সংখ্যা। সঙ্গে থাকছে গুণীজন সংবর্ধনাসহ নানা আয়োজন।

তার প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে আসছেন তাদের অনেকেই হয়তো কাংখিত বেতন ভাতা পাননি। তবুও তারা একজন বাটুল এবং সাংবাদিকতার প্রতিবিম্বকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন, এখনো অনেকে আছেন পরম ভালবাসায়। তিনি নেই কিন্তু এখনও তার দাবানল আলো ছড়াচ্ছে স্ব-মহিমায়। এর সব কৃতিত্বই খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া এই গুনি সাংবাদিক ও সংগঠক মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও ১২ ঘন্টা কাটান তার প্রতিষ্ঠিত দাবানলে। কারণে অকারণে ডাকেন সহকর্মীদের। মনের দিক থেকে তিনি ছিলেন চির তরুণ। দাঁতবিহীন মুখে পান চিবাতে চিবাতে পরামর্শ দিতেন, পরামর্শ নিতেন। হাসতেন ফোকলা দাঁতে। সফেদ সাদা পাঞ্জাবীর আবরণে চলতেন পথ। মনে হয়, ছুটছেন কোন অনুসন্ধাণী রিপোর্টের সন্ধানে। তার উদ্যেম সবাইকে অনুপ্রাণিত করতো। সামনে এগুবার পথ দেখাতো। সাংবাদিকতার মাধ্যমে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। একটি পত্রিকাকে ৫০ বছর ধরে প্রকাশনায় রাখা যে কতটা সাধনা, ত্যাগ আর কর্মের ফসল। সেটির বাস্তব উদাহরণ দৈনিক দাবানল। আর সেটি যিনি করেন তিনি যে কতটা সাধক, ত্যাগী আর কর্মঠ সেটিও প্রমানিত। তিনি হলেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তিনি একজন সাধক সাংবাদিক, সংবাদপত্রের সাধক প্রতিষ্ঠাতা। তিনি হলেন সাংবাদিকদের প্রতিবিম্ব। তার প্রয়াণ পরবর্তী শুন্যতায় দাবানল আজ বায়ান্ন বছরে পদার্পণ অনুষ্ঠান উদযাপন করছে। তিনি শরীরে উপস্থিত না থাকলে আছেন হদয়ে, আছেন শত শত অনুজদের চোখে।

;

বাবা নাই, কষ্ট এটাই!



কবির য়াহমদ
বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এবারের বাবা দিবসের এক সপ্তাহ আগে ছিল আমার বাবার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিক। বাবা নামের যে আকাশ সমান ছায়া তার অনুপস্থিতি টের পাচ্ছি গত তিন বছর ধরে। ২০১৯ সালের জুন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে দিনটা ছিল শুক্রবার, ১৪ তারিখ। বিকালে আমার বাবা যাকে আমরা ‘আব্বা’ বলে ডাকতাম তিনি শেষ ঘুমে মগ্ন হয়েছিলেন। শেষ ঘুমের আগে প্রকৃতির নিয়মে জাগতিক অনেক ঘুমে যেতেন তিনি। আমরা কেউ জানতাম না সেদিনের সেই ঘুম ছিল তাঁর শেষ ঘুম। আগের দিন থেকেই তীব্র জ্বর ছিল তাঁর। খানিক বিরতি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, জেগেও ওঠছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের দুপুরের পর থেকে যে ঘুমে মেতেছিলেন তার পর থেকে আর জাগেননি। এই ঘুমের সময়েই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন। বারবার তাঁর শরীরের তাপমাত্রা মাপতে এসে একটা সময়ে টের পেলাম সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তাঁর। জাগাতে চেয়েও পারিনি। শেষমেশ যখন তীব্র ঠান্ডা জমেছিল তাঁর শরীরে তখন পায়ের তলার মাটিগুলো সরে গিয়েছিল আমার, আমাদের।

বাবাহীন হতে পারি আমরাও—এমন ভাবনা তাঁর অসুস্থ হওয়ার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়লেও বিপদ ভেবে সেটা দূরে সরিয়ে রাখছিলাম। কেন আমরা বাবা-হারা হবো; আমাদের কী বাবার আশ্রয়ের দরকার নেই—এমন ভাবনায় তাঁর কাছাকাছি থেকেছিলাম শেষ কবছর। এর মধ্যিখানে কোথাও জরুরি প্রয়োজনে গেলেও তিনি ফোন দিয়ে ‘কখন ঘরে ফিরছি’ এমনটা জানতে চাইতেন বারবার। সন্ধ্যা হলেই এমন হতো নিয়মিত। ফিরে এসে খোঁজ করার কারণ জানতে চাইলে প্রতিবারই বলতেন—‘ঘরে থাকলে ভরসা পাই, মনে শক্তি পাই’। প্রথম প্রথম একথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে না পারলেও একটা সময়ে বুঝতে পারি কতটা ভরসা আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রশ্ন, কাছে রাখার এমন আকুতি ঝরত তাঁর। স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছি এবং ছেলেবেলার যতটুকু মনে পড়ে আব্বা আমাকে ‘অন্ধের যষ্টি’ বলে ডাকতেন। এ কারণেই বুঝি সেই ছোটকালের যে স্বপ্ন বড়কালেও এসে সেটার ছাপ রয়ে গিয়েছিল পুরোটাই, যদিও জানি অন্ধের যষ্টি হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি আমি।

আব্বার একাধিকবার স্ট্রোক করেছিলেন, হাই ব্লাড প্রেসার ছিল, কোলেস্টেরল সমস্যা ছিল, হার্টে রিঙ পরানো ছিল তাঁর। শেষ সময়ে এসে মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কিডনিজনিত রোগ ছিল। ওটাই ভুগিয়েছে তাঁকে। ঢাকায়-সিলেটে একাধিকবার তাঁর কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয়েছিল। শেষবার যখন হাসপাতালে ছিলেন তখন ১০ দিনের বেশি সময় ছিলেন আইসিইউতে। আইসিইউতে থাকাকালে ওই ইউনিটে সবসময় ঢোকা যেত না, বাইরে পায়চারি করতাম। রাতের পর রাত ঘুমহীন থেকে থেকে তাঁর সামান্য চোখ মেলার অপেক্ষা করতাম। সামান্য নড়লে-চড়লে মনে হতো প্রাণ ফিরেছে আমারও দেহে। আইসিইউ থেকে কেবিনে নেওয়ার পর সামনাসামনি থাকার সুযোগ হয়েছিল। অসুস্থ তবু মনে শান্তি ফিরত, সামনে ত আছেনই। এরপর বাড়িতে নিয়ে আসার সময়ে মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধজয় করে ফিরছি। তাঁর চিকিৎসাকালে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের করার কিছু ছিল না, কিন্তু ফিরিয়ে নিয়ে আসার সময়ে সত্যি সত্যি যুদ্ধজয়ের সেনাপতি ভাবছিলাম। এভাবে কয়েকবার, বেশ কয়েকবার। প্রতিবারই একই অনুভূতি হতো।

আব্বাকে প্রতিদিন একগাদা ওষুধ খেতে হতো। ডা. ফয়সল আহমদ, ডা. নাজমুস সাকিব, ডা. আবদুল লতিফ রেণুসহ অনেক চিকিৎসক আব্বাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর যখনই দরকার পড়েছে চিকিৎসকবন্ধু ডা. এনামুল হক এনাম, ডা. আলিম আল রাজি, ডা. সুমন দে, ডা. জোবায়ের আহমেদদের কাছে নানা পরামর্শ পেয়েছি। তাদের কারণে মনে হতো আমার আব্বা পুরোটা সময়ই আছেন চিকিৎসকের পরামর্শাধীন। তাদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই।

আমার আব্বার সঙ্গে আমার ছেলে রাইআনের দুরন্ত সম্পর্ক ছিল। কিডনি রোগ তাই টক জাতীয় কিছু খেতে ডাক্তারের বারণ ছিল। তবু মাঝে মাঝে দেখতাম আব্বা আর রাইআন দুজনে মিলে আমের আচার, বরইয়ের আচারসহ বিবিধ আচার খাচ্ছেন। দাদা-নাতির এই আচার খাওয়ার সময়টাতে অনেকবার বাধা দিয়েছি মূলত চিকিৎসকের পরামর্শের কারণে। আব্বা রাইআনকে ‘দাদা’ সম্বোধনে ডাকতেন। রাইআন যখন খুব ছোট ছিল তখন তার সামান্য কান্নাতে আব্বা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। রাইআনের খাবারদাবারের সমস্যা হচ্ছে কি-না এনিয়ে সতর্ক দৃষ্টি ছিল তাঁর। রাইআনের দুধসহ খাবারদাবারের টাকাগুলো আব্বাই দিতেন। সময়ে সময়ে জিজ্ঞেস করতেন তার কিছুর দরকার কি না, আবার সামান্য অথচ বাচ্চাদের স্বাভাবিক কান্নাকাটিতেও ভাবতেন তার বুঝি খাবারদাবারের সঙ্কট! স্কুলে ভর্তির টাকা তিনিই দিয়েছিলেন। রাইআন-আয়ানের মাসে-মাসে স্কুলের বেতনের টাকা তিনিই দিতেন। এত বেশি কেয়ারিং ছিলেন তাদের প্রতি।

আব্বা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন, ছিলেন সাবেক জনপ্রতিনিধি। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। ছিলেন সালিশ ব্যক্তিত্ব। নিজেদের উপজেলাসহ আশপাশের এলাকার মাঝেও পরিচিত ছিলেন তিনি। যেকোনো প্রয়োজনে এলাকায় কিংবা দূরে কোথাও গেলেও মুরুব্বিদের কারও সঙ্গে দেখা হলে এলাকার নাম বললে স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল—‘আজিজ উদ্দিন চৌধুরী ভাইস চেয়ারম্যান সাহেবের কিছু হই কি-না?’ পরিচয় দেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকার মানুষদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা ভুলার মত নয়। এগুলো আদতে অর্জন। আব্বা নেই আজ তিন বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, অথচ সেই একই পরিচিতি, একই ভালোবাসা আমরা পেয়ে যাচ্ছি। এগুলো দেখে মনে হয় আব্বা দৈহিকভাবে হয়ত নেই কিন্তু তাঁর পরিচিতি এখনও রয়ে গেছে। এগুলো দেখে একদিকে গর্ব হয়, আবার অন্যদিকে নিজেকে পিতৃহীন ভেবে বুকটা হাহাকার করে ওঠে! এই হাহাকারের যন্ত্রণা যে কতটা ভারী সেটা ঠিক ঠিক টের পাই; আমি নিশ্চিত জগতের অধিকাংশ পিতৃহীনেরাই টের পায়।

আব্বা খেলাধুলা-ভক্ত ছিলেন। দেশে যখন ক্রিকেট এত বেশি জনপ্রিয় ছিল না, তখন টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখালে সেগুলো দেখতেন। আমরাও তাঁর সঙ্গী হতাম। ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। রাত জেগে বিশ্বকাপের খেলাও দেখতেন। টেলিভিশনে খেলার আওয়াজ শুনলে যোগ দিতেন আমাদের সঙ্গে। পত্র-পত্রিকা পড়তেন, বইপত্র পড়তেন। সে কারণে ছোটবেলা থেকে বইয়ের প্রতি আমাদের অনুরাগও জন্মেছিল। আব্বা মারা যাওয়ার পর এবার প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল আসছে। এবার খেলাগুলো দেখা হবে না তাঁর। ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপ জেতে সে সংবাদও জানা হবে না তাঁর!

সিলেট ভাসছে বানের জলে। আব্বার জীবদ্দশায় একাধিকবার আমরা বন্যা আক্রান্ত হয়েছিলাম। ১৯৯১ সালের বন্যায় আমাদের ঘরে পানিও উঠেছিল। তিন-রুমের পুরনো সেই ঘর এখন নেই। সে ঘরের কেবল একটি রুম ছাড়া বাকি দুই রুমে পানি উঠে পড়েছিল। সেই বন্যায় গাদাগাদি করে আমরা থেকেছিলাম সবাই একটা মাত্র ঘরে। চারদিকে পানি, উঠানে পানি; আব্বা খাবারদাবার নিয়ে আসতেন নৌকায় করে। সেই স্মৃতি এখনও ভাসে। ভাসে পরম মমতার এক পিতৃছবি যেখানে সন্তান এবং সন্তানের হাসিই মুখ্য। দেশের নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আব্বা এলাকার মানুষদের সহায়তা দিতে আমাদের ভাইবোনদের উদ্বুব্ধ করতেন। দেশের বাইরে থাকা তাঁর সন্তানদের বলতেন কিছু করতে। তারা কখনই তাঁকে হতাশ করেনি। টাকা হাতে এলে ডেকে এনে দিতেন, অথবা আমাদের কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখনও মানুষ সে স্মৃতি রোমন্থন করে। আব্বার মৃত্যুর পর আমাদের ভাইবোন ও বোনদের স্বামীরা মিলে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা রাখে। বেশ কিছু টাকা একত্র হলে সেগুলো দেশে পাঠায় মানুষের জন্যে। মানুষকে ভালোবাসার-সহায়তা করার আব্বার যে চেষ্টা সেটাই ধরে রাখা উদ্দেশ্য আমাদের।

আমরা বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ বলে ঝড়বৃষ্টি নিয়মিত ঘটনাই। টিনের চালে ঝড়ের ধাক্কা লাগত নিয়মিত। ঝড় শুরু হলেই আব্বা আমাদের সাত ভাইবোনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। আমরা সবাই তাঁর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। ঝড়ে তাঁর ছিল প্রচণ্ড ভয়, তাই ওই সময়টা সবাইকে একত্র করতেন; ঘুম থেকে তোলে হলেও! এখনও ঝড় হয়, কিন্তু আগের মতো সেভাবে টের পাই না, আগের মতো কেউ আর ঝড়ে অভয় দিতে ডেকে তোলে না!

আজ বাবা দিবস। দেশে দেশে আছে এর দিবসী আয়োজনও। দিবসী এসব আয়োজন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যত মত-প্রতিমতই থাকুক না কেন ‘বাবা’ শব্দটাই স্বতন্ত্র আবেগের, নির্ভরতা আর আশ্রয়ের। ২০১৯ সালের ১৪ জুন আমার বাবা, আমার আব্বাকে হারিয়ে আমি এবং আমরা যে নির্ভরতা আর আশ্রয় হারিয়েছি সেটা অব্যাখ্যেয়। বাবাকে হারানোর সোয়া দুইবছরের মাথায় আম্মাকেও হারিয়েছি ২০২১ সালের ২ নভেম্বর; অনেক কিছু থাকা আমাদের ঘরে মা নেই, বাবা নেই—এরচেয়ে কষ্টের আর কিছু থাকতে পারে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক, ইমেইল: [email protected]

;