ভীষণ সাহসী আর লড়াকু পাখি ‘কালো ফিঙে’



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভূবন চিলকে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছি কালো ফিঙে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

ভূবন চিলকে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছি কালো ফিঙে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় – আমাদের প্রতিবেশী এবং আমাদের চিরচেনা পাখি কোনোটি? তবে খুব সহজেই ‘কালো ফিঙে’ পাখির নাম চলে আসবে। কারণ, সে আমাদের চারপাশেই থাকে। এদিক-সেদিক চোখ মেললেই এই পাখিটির দেখা মেলে। প্রতিনিয়তই সে ঘুরে বেড়ায় আমাদের বাসা-বাড়ির সামনে, বৈদ্যুতিক তারে, বিস্তৃর্ণ ধানক্ষেতে, ছোটখাটো ঝোপঝাড় থেকে শুরু করে বনপাহাড়ে। কোথায় নেই সে!

২৮ সেন্টিমিটারের চকচকে কালো দেহের ফিঙের ইংরেজি নাম Black Drongo এবং বৈজ্ঞানিক নাম Dicrurus macrocercus। কালো ফিঙে তুখোর লড়াকু পাখি। গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা এই পাখিটিকে ‘পাখির রাজা’ বলে থাকেন। কালো ফিঙে ছাড়াও এই পাখিটিকে কালা ফিঙে, ফেউচ্চা, হেচ্চোয়া প্রভৃতি অনেকে বলে থাকেন।

বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী আবু বকর সিদ্দিক এর তোলো বিশেষ এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি কালো ফিঙে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছি তার থেকে কয়েকগুণ বড় ভূবন চিল (Black Kite) পাখিকে। এর থেকেই বুঝা যায় কালো ফিঙে দৈহিক গঠনে ছোট হলেও সে প্রচন্ড সাহসী।

দুর্বল পাখিদের রক্ষক এবং খুব সাহসী পাথি কালো ফিঙে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

বাংলাদেশের প্রখ্যাত পাখি গবেষক, লেখক এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, অনেক সাহসী পাখি কালা ফিঙে। কারণ, হলো সে অনেক বড় পাখিকে তাড়া করে থাকে। ও যে এলাকায় থাকে ওর থেকে দশগুণ বড় এবং ওজনে বিশগুণ বড় পাখিকে সে সবসময় তাড়া করে সরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ও যদি বাসা করে তখন সব পাখিকেই সে তাড়া করে। শুধু তাড়া করলেই হয় না; তাড়া করে সে জিতেও যায়।  তাতে কি হয় – ওর আসেপাশে অন্য দুর্বল পাখিরা যেমন-বুলবুল, ঘুঘু ওরা বাসা করে। কারণ ওরা জানে এখানে কোনো শত্রু আসবে না। কালাফিঙে এত্ত ভয়ংকরভাবে তাড়া করবে যে, বিড়াল-কুকুর পর্যন্ত ওর তাড়া খেয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য।

শিকার হিসেবে টিকিটিকি কে ধরেছে সে। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

ফিঙে এবং শিকারী পাখিদের বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘এটার বড় কারণ হলো- কালা ফিঙের নখরগুলো খুব তীক্ষ্ম। সাধারণত আপনি দেখবেন- শিকারি পাখিগুলোর নখ খুব তীক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়। কালাফিঙে কিন্তু শিকারী পাখি নয়। ও তো মুখ দিয়ে শিকার ধরে। শিকারী পাখি হলো যারা পা দিয়ে শিকার ধরে খায়। আমাদের দেশের শিকারী পাখিরা হলো- ঈগল, বাজ, চিল, পেঁচা প্রভৃতি। এদের পায়ের নখর অত্যন্ত শক্ত। আপনি এদের হাত দিয়ে ধরলে এদের কামড়ে আপনার ক্ষতি হবে না, কিন্তু সে যদি নখর দিয়ে আপনাকে ধরে তাহলে আপনার হাতের চামড়া ছিড়ে যাবে। ফিঙে শিকারী পাখি নয়, কিন্তু ওর নখর অত্যন্ত শক্তিশালী। ওইজন্যে ওর একটা বড় সুবিধে আছে- ও যদি তাড়া করে পায়ের নখ দিয়ে ধরে তাহলে বড় পাখিদের বড় ক্ষতি করে ফেলবে। তাই তারা ফিঙের তাড়া খেয়ে পালায়।’

কালো ফিঙের উড়ন্ত সৌন্দর্য। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

ইনাম আল হক আরো বলেন, ‘ফিঙের ঠোঁটেও শক্তি আছে; আর নখে তো আছেই। আমরা যেহেতু পাখিগবেষণার কাজে ওদেরকে ধরি তাই আমরা এ সম্পর্কে ভালো জানি। ফিঙে ধরলেই হাত রক্তাক্ত হয়ে যাবে। কিংবা একটা বুলবুল ধরলে বা ঘুঘু ধরলে কিছুই হবে না। কারণ তাদের পায়ে নখরের শক্তি নেই। ফিঙে ধরলেই খুব সাবধান থাকবেন- একদম ছিঁড়ে ফেলবে আপনার হাত। আপনার হাতের মাংসের মধ্যে তার নখ ঢুকে গেলে বের কথা কঠিন হবে এবং সে একমুহুর্তেই ওর তীক্ষ্ম নখর আপনার হাতের ঢুকিয়ে ফেলবে।’

`তীক্ষ্ম, শক্তিশালী এবং সরু নখরের অধিকারী বলেই ফিঙে বহু বড় বড় পাখিকে তাড়া করে পশুকেও ক্ষতবিক্ষত করতে পারে। তাই সবাই ভয় পায় ওকে। ফলে ফিঙে যেখানে বাসা করে ওর আসেপাশে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পাখিরাও লুকিয়ে বাসা করে। কিন্তু ফিঙে প্রকাশ্যে মাচায় বাসা করে। ফিঙের বাসা দেখবেন খোলা জায়গায় হয়ে থাকে। কারণ ও কাউকেই ভয় পায় না। রাত্রিবেলা নিশাচর প্রাণী যেমন- গন্ধগোকুল, সাপসহ অন্যপ্রাণীরাও ওর বাসায় দিকে আসলে তাদেরও সে তাড়া ভীষণভাবে করতে ভয় পায় না।'

গ্রামাঞ্চলের মানুষ কিন্তু ফিঙে পাখিকেই ‘পাখির রাজা’ বলে থাকেন। কারণ মানুষ দেখেছে যে- ফিঙে তার থেকে অনেক বড় পাখিদের তাড়া করে নিয়ে যেতে সক্ষম। তাই তার সাহস থেকে এমন নামটি দেয়া। আবার অন্য পাখিরাও এটা ভালই জানে যে, ফিঙে আসেপাশে থাকলে নিরাপদে থাকা যাবে বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিজ্ঞানী ইনাম আল হক।

পদ্ম বিলে সৌন্দর্যের হাতছানি



ছাইদুর রহমান নাঈম, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্ম। মৃদু হাওয়াতে দুলছে ফুলগুলো। ভোরে যেন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে রয়েছে বিলে ৷ নৌকা দিয়ে ঘুরে এমন দৃশ্য দেখার আনন্দটাই অন্য রকম। হাতের কাছে, চোখের সামনে ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। কাছ থেকে তাকিয়ে দেখলে স্বপ্নের দেশে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও বিলে সাদা বক, পাতি হাঁসের সাঁতার কাটা, বিভিন্ন পাখির শব্দ মনকে উদ্বেলিত করে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের নওভাগা, খামা বিলসহ কয়েকটি স্থানে রয়েছে পদ্ম ফুল। এসব বিলে প্রায় আট থেকে ১০ মাস থাকে পানি। বিলে সৌন্দর্যের আভা ছড়াচ্ছে ফুটে থাকা রাশি রাশি গোলাপি পদ্মফুল। প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন কাছে-দূরের দর্শনার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক যুগ আগে থেকে বর্ষাকালে এ বিলের অধিকাংশ জমিতেই প্রাকৃতিকভাবে জন্মে পদ্ম ফুল। আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত এই বিলে পদ্ম থাকে। এসময় পুরো বিল গোলাপি রঙের পদ্মে ভরে ওঠে, যা দেখলে যে কারও মন জুড়িয়ে যায়।

শীত মৌসুমে বিলটি প্রায় শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। তখন সেখানে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। আর বাকি সময় থইথই পানিতে ভরা থাকে বিলটি। সেইসঙ্গে দেশি মাছের ছড়াছড়ি এ বিলে। ফলে বছরজুড়ে এ বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে গোলাপি রঙের পদ্মফুল ফুটে আছে। বিলের পানিতে শাপলা-শালুক আর পদ্মফুলের ছড়াছড়ি। বিশাল এ বিল জুড়ে এখন শুধুই গোলাপি-লাল-সাদার সংমিশ্রণে ফোটা রাশি রাশি পদ্ম ফুল। ফুলগুলো যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। শরতের ফুল হলেও বিলে বর্ষাতেই তার সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক নিয়ে হাজির হয় ‘পদ্ম’। প্রকৃতিতে নিজের রূপ বিলিয়ে দিচ্ছে ফুটে থাকা এ জলজ ফুলের রাণী।

জেলা-উপজেলা ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা বিলটিতে আসছেন। ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। পাশাপাশি তুলছেন ছবি-সেলফি, করছে ভিডিও।

সারা বছর পানি থাকে এমন জায়গায় পদ্ম ভালো জন্মে। তবে খাল-বিল, হাওর-বাওড়ে এ উদ্ভিদ জন্মে। এর বংশবিস্তার ঘটে কন্দের মাধ্যমে। পাতা পানির ওপরে ভাসলেও এর কন্দ পানির নিচে মাটিতে থাকে। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে গাছ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাতা বেশ বড়, পুরু, গোলাকার ও রং সবুজ। পাতার বোঁটা বেশ লম্বা, ভেতর অংশ অনেকটাই ফাঁপা। ফুলের ডাঁটার ভেতর অংশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ছিদ্র থাকে। ফুল আকারে বড় এবং অসংখ্য নরম কোমল পাপড়ির সমন্বয়ে সৃষ্টি পদ্মফুলের। ফুল ঊর্ধ্বমুখী, মাঝে পরাগ অবস্থিত। ফুটন্ত তাজা ফুলে মিষ্টি সুগন্ধ থাকে। ফুল ফোটে রাত্রিবেলা এবং সকাল থেকে রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির পূর্ব পর্যন্ত প্রস্ফুটিত থাকে। রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুল সংকুচিত হয়ে যায় ও পরবর্তী সময়ে প্রস্ফুটিত হয়। ফুটন্ত ফুল এভাবে অনেক দিন ধরে সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়।

এর পাতা বড় এবং গোলাকৃতি। কোনো কোনো পাতা পানিতে লেপ্টে থাকে, কোনোটা উঁচানো। বর্ষাকালে ফুল ফোটে। হাওর-ঝিল-বিল বা পুকুরে বিভিন্ন ফুলের মতো শুভ্রতার প্রতীক সাদা পদ্মফুল ফোটে। ফুল বৃহৎ এবং বহু পাপড়িযুক্ত। সাধারণত বোঁটার ওপর খাড়া, ৮-১৫ সেমি চওড়া। ফুলের রং লাল, গোলাপি, সাদা ও সুগন্ধিযুক্ত। হিন্দুদের দুর্গাপূজার প্রিয় এ ফুল। ফুল ও ফলের ভেষজ গুণ আছে। পদ্মের মূল, কাণ্ড, ফুলের বৃন্ত ও বীজ খাওয়া যায়। পুরোনো গাছের কন্দ এবং বীজের সাহায্যে এদের বংশবিস্তার হয়। তিন ধরনের পদ্মফুল রয়েছে যেমন- শ্বেতপদ্ম, লালপদ্ম, নীলপদ্ম।

আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের জন্য খুবই উপকারী। ঔষধি গুণ ছাড়াও পদ্মচাক, বীজ ও বোঁটা সুস্বাদু খাবার। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পুকুর-জলাশয়, লেক ও হাওর-বিলে গোলাপি পদ্ম বেশি চোখে পড়ে। সে তুলনায় সাদা পদ্ম বা পদ্মকমল অনেকটাই অপ্রতুল। আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে সাদা পদ্ম বিলুপ্তির পথে। সাদা পদ্মের উৎসস্থল জাপান ও নর্থ অস্ট্রেলিয়া।

এর ফলের বীজ হূৎপিণ্ড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং ডায়রিয়া রোগ সারাতে এর বোঁটা কাঁচা খেলে উপকারে আসে। পদ্মফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি লোটাস চা গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া ও হার্টের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। হাইব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণ করে। পদ্মের শুকনো মূল গুঁড়া করে খেলে ফুসফস, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে।

;

নিউইয়র্কের দিনলিপি-২



আমান-উদ-দৌলা
নিউইয়র্কের দিনলিপি-২

নিউইয়র্কের দিনলিপি-২

  • Font increase
  • Font Decrease

১. এ সপ্তাহে অনেকগুলি সুখবর আছে নিউইয়র্কবাসীর জন্য।

ব্রডব্যান্ড ইনটারনেট ব্যবহারের জন্য স্বল্প আয়ের লোকেদের মাসে ৩০ ডলার করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে যারা সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছেন। ইন্টারনেট পেতে চান। তারা এপ্লাই করেন। 917-589-3923 নাম্বারে ফোন করেন অথবা [email protected] এ ইমেইল করেন।

২. স্টুডেন্ট লোন মওকুফের সবকিছু রেডি হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই মওকুফ করা হবে। প্রায় ৫০ হাজার ডলার করে ঋণী অনেক ছাত্র-ছাত্রী। মওকুফ হলে ওরা খুব খুশি হবে। ২৫ আগস্টের আগে লোন নিয়েছে যারা তাদের অর্থ দিচ্ছে ফেড়ারেল সরকার। তা লোন নেয়া বিভিন্ন সংস্থা বা রাজ্য সরকারকেই দেয়া হবে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লোন যারা নিয়েছেন, তাদের কথাও ভাবা হচ্ছে।

৩. সাবওয়ের টানেলেও সবাই পেতে যাচ্ছে সেলফোন নেটওয়ার্ক। এতো দিন সাবওয়েতে মাটির নীচে স্টেশনগুলিতে চালু ছিল। নদীর নীচের টানেলে ছিল না। শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে। টানেলে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতো কয়েক মিনিট।

৪. ইলেকট্রিক ডাবল ডেকার বাস নেমেছে বেশ কিছু সিটির বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে প্লেনের মতো চার্জার কানেকশন পয়েন্ট আছে। ধীরে ধীরে অত্যাধুনিক হয়ে উঠছে এ শহর।

৫. নিউইয়র্কের কাগজপত্র বিহীন ইমিগ্রান্টদের কার্ড আগে থেকেই চালু আছে । এবার ফেডারেল ইমিগ্রান্ট এন্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট সব রাজ্যের কাগজবিহীন ইমিগ্রান্টরা উপকৃত হবেন। তারাও আইডি কার্ড নিয়ে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারবেন। তবে নিউইয়র্ক রাজ্য এগিয়ে আছে। তারা লোকাল ইলেকশনে ভোটও দিতে পারবেন। সেই আইন গত বছর থেকে চালু আছে।

৬. আকস্মিক খবর, প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজেই ইংগিত দিয়েছেন। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ২য় বার দাঁড়াবেন না। তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। সামনের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি ডেমোক্র‍্যাটরা খারাপ করেন। তাহলে আর তিনি দাঁড়াবেন না। নিউ নেশন পরিচালিত সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২২ ভাগ আমেরিকান ভোটার ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট বাইডেন আবার দাঁড়াক। কমলা হ্যারিসেরও অবস্থা খুব ভাল না। মাত্র ১৬ ভাগ আমেরিকান তাকে ভোট দেবেন।

৭. হঠাৎ আমেরিকার সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিশেল সেসন ঢাকা যাচ্ছেন। আগামী ৬ আগস্ট তার যাবার কথা। বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার টানাপোড়েন চলছে। আগামী ৮ আগস্ট চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। চীনের সংগে আমেরিকার তুমুল কাণ্ড চলছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে আমেরিকা ও চীনের 'ব্যাটল গ্রাউন্ড' হয়ে আছে।

৮. বৃহত অংকের অর্থে জলবায়ু পরিবর্তনের বিল কংগ্রেস পাশ করতে যাচ্ছে। দুই দলের সিনেটরবৃন্দ মিলে পাশ করাবেন প্রধান মিডিয়ায় আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে ৪০ ভাগ ঘন কার্বন থেকে রক্ষা পাবে পৃথিবী।

*বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ থেকে নেয়া।

* আমান-উদ-দৌলা, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক-বাংলা বিভাগ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ( ২০১৪-১৬)। সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার-দৈনিক জনকন্ঠ ( ১৯৯৪-২০০০) One of the founders and First GS of DCAB in 1998. ( Dilpomatic Correspondent Association, Bangladesh)

;

চা- শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা



সেলিম মাসুদ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এর একটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো 'কেউ পিছনে পড়ে থাকবে না '। সকলকে নিয়েই সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন। চা বাগানের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা এখনো সমাজের মূল ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে, এখানে দারিদ্র্যের হারও অনেক বেশি। চা শ্রমিকরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীর সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তাসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। এ খাতে কর্মরত শ্রমিক কম-বেশি পনে তিন লাখ। এ সব শ্রমিকের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। এসব নারী চা শ্রমিকরা বংশ পরম্পরায় এ খাতে কাজ করে থাকে।

চা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে নবম, প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন এবং ভারত। বাংলাদেশে নিবন্ধিত চা বাগান ও টি স্টেট রয়েছে ১৬৭টি, এর মধ্যে সিলেট বিভাগে রয়েছে ১২৯টি। চা বাগান করতে গেলে ন্যূনতম ২৫ একর জমি লাগে। সে হিসেবে ৪ হাজার একরেরও বেশি নিবন্ধিত জমিতে চা চাষ হচ্ছে। তবে অনিবন্ধিত ক্ষুদ্র পরিসরের বাগানের দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২১ সালে দেশে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজি। চা এর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চা এর চাহিদা প্রায় ১০ কোটি কেজি। আমাদের দেশিও উৎপাদন থেকে চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হয় না, কিছুটা ঘাটতি থাকে, তা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দুই দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে কম বেশি এক কোটি ৩০ লাখ কেজি চা রফতানি হতো। আর এখন সেখানে খুবই সীমিত আকারে ৬ লাখ থেকে ২০ লাখ কেজি রফতানি করা হয়। কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি রয়েছে। তাই ২০২৫ সাল নাগাদ সরকার চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৪ কোটি কেজি। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার ইতিমধ্যে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের চা চাষিদের ' ক্যমেলিয়া খোলা আবাশ স্কুলের ' মাধ্যমে চা আবাদ বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিতকরণ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে সমতলে চা বাগান ও ক্ষুদ্র চা চাষিদের চা উৎপাদন ২০২০ এর থেকে ২০২১ সালে ৪১ শতাংশ বেশি হয়েছে, যা এ খাতের জন্য আশাব্যাঞ্জক। সত্তর দশকে প্রতি হেক্টর জমিতে ৭৫০ কেজির মতো চা উৎপাদন হতো। আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে চা উৎপাদনের ফলে এখন জমি ভেদে প্রতি একরে কম বেশি ১ হাজার ৫ শত থেকে ৩ হাজার ৫ শত কেজি চা উৎপাদন হচ্ছে। চা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো প্রচুর বৃষ্টিপাত ও উঁচু জমি। যেন প্রচুর বৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয়ে যায়।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ ছয় মাস হলো শুষ্ক মৌসুম, এসময় চা এর ফলন ঠিক রাখতে খরা সহিষ্ণু চা এর দুইটি জাত উদ্ভাবন করছে আমাদের চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিরা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটি হলো চা। চা পান সর্বপ্রথম শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০০ চীনে। পৃথিবীতে যত ধরনের চা উৎপাদন হয় তার সবই তৈরি হয় ক্যামেলিয়া সিনেসিস থেকে। এই চির হরিৎ গুল্ম বা ছোট গাছ থেকে পাতা এবং এর কুঁড়ি সংগ্রহ করে তা চা উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের চা এর মধ্যে উদ্ভিদের ধরনের এবং উৎপাদনের প্রক্রিয়াতে ভিন্নতা রয়েছে।

আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষের আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রথম চা চাষ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ সালে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেখানে চা চাষ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা কুন্ডদের বাগান নামে পরিচিত। তারপর ১৮৫৪ সালে মতান্তরে ১৮৪৭ সালে বর্তমান সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোড়ের কাছে মালিনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠা হয়। মূলত মালিনীছড়া চা-বাগানই বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান। দেশ স্বাধীনের পূর্বে বাংলাদেশে মূলত দুইটি জেলায় চা বাগান ছিলো। এর একটি সিলেট জেলায়, যা সুরমা ভ্যালি এবং অপরটি চট্টগ্রাম জেলায় যা হালদা ভ্যালি নামে পরিচিত ছিল।

বাংলাদেশ বিশ্বের একটা বড়ো চা উৎপাদনকারী দেশ। চা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের বড়ো দশটি চা বাগান আছে আমাদের দেশে। চা শিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং হচ্ছেন। পাশাপাশি একশ্রেণির দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু চা বাগানের দরিদ্র শ্রমিকদের বছরের পর বছর তাদের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। নারী প্রধান চা শ্রমিক পরিবারের দারিদ্র্যের হার খুব বেশি। চা শ্রমিকদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার খুব বেশি। যদিও সরকারি, বেসরকারি এবং এনজিও চা শ্রমিকদের বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করতে নানা রকম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্যবিবাহের হার কিছুটা কমেছে। তবে তা কোনোভাবেই যথেষ্ট না।

চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। একজন চা শ্রমিক দৈনিক ১২০ টাকা হারে মজুরি পান, এর সাথে রেশন পান। বাগানে সাধারণত একটি পরিবারের দুই তিনজন আয় করে। কিছু সীমিত চিকিৎসা সুবিধা, শিশুদের জন্য লেখাপড়াসহ আরও কিছু সুযোগ সুবিধা আছে। তবে বাগান ভেদে এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক চা বাগানের মালিকরা স্থায়ী চা শ্রমিকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করেছে। ৬০ বছর বয়সে অবসরে যাওয়ার সময় তারা একটা এককালীন আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং ১৫০-২০০ টাকা মতো সাপ্তাহিক ভাতা পেয়ে থাকেন। যিনি অবসরে যান তার শূন্য পদে পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়। চা শ্রমিকদের কম বেশি ৬০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের প্রায় শতভাগ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হয়। চা বাগানগুলোতে ১৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এছাড়াও আছে এনজিওদের নানা রকম শিক্ষা কর্মসূচি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক শিক্ষাভাতা চালু আছে, কিন্তু এনজিও স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য কোন ভাতার ব্যবস্থা নেই। তবে চা বাগানের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ইতিমধ্যে শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করতে নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটি একটি চলমান কার্যক্রম।

চা বাগানে ১৯৩৯ সাল থেকে মাতৃত্ব আইন চালু আছে। একজন গর্ভবতী নারী ৮ থেকে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন সুবিধা পান। তাদের জন্য প্রশিক্ষিত মিডওয়াইভস, নার্স ও চিকিৎসক রয়েছে। তবে এ সুবিধা শুধু মাত্র নিবন্ধিত শ্রমিকদের জন্য। চা বাগানের অবস্থান প্রান্তিক অঞ্চলে হওয়ায় এ বাগানগুলোর আশেপাশের তেমন কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে নি। চা বাগানে বিশ্রামের জন্য কোন বিশ্রামাগার নেই, পানির ব্যবস্হা নেই। দূষণের কারণে সাধারণত কোন ফসলের পাশে শৌচাগার থাকে না। এজন্য চা বাগানের থেকে শৌচাগার দূরে রাখা হয়। এতে চা বাগানের নারী শ্রমিকদের জন্য সমস্যা হয়ে থাকে। চা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সরকার ২০১৬ সালে চা শিল্পের জন্য একটি রোড়ম্যাপ করে যা ২০১৭ সালে অনুমোদন পায়। এখানে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ৫০ হাজার চা শ্রমিককে সরকার প্রতিবছর এককালীন পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করে থাকে। এছাড়াও সারা দেশের ন্যায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী, শিক্ষা উপবৃত্তি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়ন ভাতাসহ সকল সরকারি সুবিধা চা বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলো পেয়ে থাকে।

বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ এর মধ্যে এসডিজি এবং ২০৪১ এ উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ। এরই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে চা শিল্পের উন্নয়ন এবং এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন অংশীজনের কল্যাণে চাহিদার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীদের সেবাসহ চা বাগানের দরিদ্র শ্রমিকদের জাতীয় গড় উন্নয়নের মূল ধারায় সংযুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। এসকল কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দারিদ্র্যমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বসবাস করবে,এটাই প্রত্যাশা।

;

সামালবং: এক পাহাড়ি গ্রামে



সম্প্রীতি চক্রবর্তী
সামালবং: এক পাহাড়ি গ্রামে। বার্তা২৪.কম

সামালবং: এক পাহাড়ি গ্রামে। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাঙালির পাহাড় ভ্রমণের শখ মেটেনা আর আমরা কলকাতার মানুষ পাহাড় বলতে বুঝি রাতটা কোনমতে ট্রেনে কাটিয়ে দিয়ে ভোরের দিকে দার্জিলিং-কালিম্পং। সেবার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'দার্জিলিং' বইটা হাতে পেয়েছিলাম। এবারও ওটি খোঁজার ইচ্ছা ছিল, তবে কিভাবে জানি না হাতে এসে গেলো পরিমল ভট্টাচার্য্য এর লেখা 'দার্জিলিং'।

বইটি কিছুটা গোগ্রাসে গিলে বোঝা গেলো, এই লেখা পড়ে আর যাই হোক টুরিস্ট হিসেবে পাহাড়ে যাওয়া যায় না। বইটির আদ্যপান্ত জুড়ে পাহাড়ি মানুষ, তাদের জীবনশৈলী নিয়ে কথা; একবার একটি পাহাড়ি ছেলে লেখককে নিয়ে গেছিলেন তার নিজের গ্রামে, সেখানে আধুনিক সভ্যতা বলতে নাকি কেবল প্লাস্টিকের দ্রব্য পৌঁছেছে, মানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, জলের জোগান বা পরিমিত বিদ্যুৎ, এ সবের আগে যেটা তারা হাতে পেলো, তা রং বেরং-এর প্লাস্টিকের পাত্র, বাটি, গেলাস।

ছেলেটির সঙ্গে লেখকের সেভাবে আর পরে যোগাযোগ হয়নি, তবে উনি জানতে পারেন পুনেতে একটি ওষুধের কোম্পানিতে ছেলেটি কর্মরত, পাহাড় থেকে অনেক দূরে, কাজের চাহিদায় সে সমতলের মানুষ হয়ে উঠেছে, অন্তত হওয়ার চেষ্টা করেছে হয়তো।

বই-এর কিছুটা পড়ে আর সময় দেওয়া গেলো না, কারণ এবার রওনা দিতে হবে। মনে মনে ছবি আঁকছি পাহাড়ের আর সাথে ভাবছি এই আমাদের মতো হামলে পরা টুরিস্টদের কথা। মাঝরাতে জলপাইগুড়ি পৌঁছলাম, চারটে বাজতে না বাজতেই পাহাড়ের রাস্তা ধরা হলো। বিভীষিকা কাকে বলে! অন্ধকার পথ, বিশাল চাঁদ আর গাড়িটা সটাং উঠে যাচ্ছে ঢালে আবার কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই হুস করে নামছে। আলো থাকলে তাও সামনেটুকু দেখা যেত। তবে এই ভীষণ ওঠা-পরার মধ্যেও যেটা একমাত্র পাওনা, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পূর্ণিমার চাঁদ, যা পাহাড়ের বাকে বাকে হঠাৎ দেখা দিয়ে অদৃশ্য হচ্ছে আর কি ভীষণ নীল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে। রাতের পাহাড় একদিকে যেমন বীভৎস আবার খুব আত্মবিশ্বাসী। প্রচুর উঁচুনিচুর মধ্যেও কেমন যেন জেদ চেপে যায়, রাস্তা শেষ হবেই, গন্তব্য আসবে, সে যতই চড়াই-উৎরাই থাকুক না কেনো।

দার্জিলিং কয়েকদিন কাটিয়ে আমরা গেলাম ছোট পাহাড়ি গ্রাম সামালবং-এ। কালিম্পং পৌঁছে ঘণ্টা দুই আরও লাগে গাড়িতে। যেহেতু একটু রিমোট এরিয়া তাই গাড়িতে আমরা বাদে আর সকলেই গ্রামের বাসিন্দা। পাহাড়ের সরু রাস্তা বেয়ে গাড়ি গিয়ে থামলো একেবারে নির্জন স্থানে। হোটেল বলতে একটাই, আর আশেপাশে দুটো দোকান, ব্যস।

দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে আমরা বেরোলাম একটু হাঁটতে। ক্রমশ সন্ধ্যে হয়ে আসছে, টর্চের আলোয় খুব বেশি দূর দেখা যায় না। নির্জন সন্ধ্যাবেলা, পাহাড়ি চুড়ো, শনশনে হাওয়ায় আমরা দু কাপ চা নিয়ে বসলাম। সময়ের অস্তিত্ব বোঝা কঠিন এখানে, আকাশের একফালি চাঁদ আর অনেক নিচে একটা নদী বয়ে যাওয়ার হালকা শব্দ ছাড়া আর কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। দোকানি একটা চেয়ার বাড়িয়ে দিলেন, সেটা নিয়ে পাহাড়ের ধারে বসার রীতি আছে। বিশেষ কিছু দৃশ্য উপভোগ করছি তা নয়, তবে রাতের পাহাড়, তার সমস্ত রহস্য নিয়ে জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি।

দোকানি গল্প জুড়লেন, গ্রামের প্রচুর জমির মালিক উনি নিজেই। আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, এখন voluntary retirement নিয়ে গ্রামেই থাকেন। স্ত্রীর সঙ্গে দোকান দেখাশোনা ও চাষবাস করেন। বাংলা, হিন্দি দুটোতেই সড়গড়, বললেন আরও অনেক ভাষা জানেন, ভাষা শেখা ওনার অন্যতম শখ। এই গ্রামেই জন্ম, বড় হওয়া, এখান থেকে মূল শহর প্রায় দুঘণ্টার পথ। আশেপাশের জমিতে ধানচাষ হয়, বর্ষাকালে ভাতের জোগানে অসুবিধা হয় না, তবে বাকি রসদে টান পড়ে। ভীষণ বৃষ্টিতে মূল শহর থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিছুদিনের জন্য, এটাই সমস্যা।

এরপর এক এক করে ছেলেবেলার গল্প, গ্রামের ইতিহাস, মানুষজন আসতে লাগলো কথাবার্তায়। তিরিশ, চল্লিশ বছর আগেকার সামালবং, পাহাড় ডিঙিয়ে যাতায়াত করতেন ওনারা জোয়ান বয়সে, পায়ে হেঁটে, নদী পেরিয়ে। এখনকার ছেলেমেয়েরা যদিও স্কুটি বা সাইকেল ব্যবহার করে।

পাহাড়ের ধারে বসে গল্প করছি, ইতিমধ্যে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। অদূরে সোনালী রঙের আলো, পাহাড়ের গায়ে, ভাঁজে ভাঁজে। আলোর দিকে তাক করে বললেন ওগুলো দাবানল। সারা রাত হয়তো জ্বলবে, গ্রামের লোকালয় গুলোতে গাছপালা কেটে দেওয়া হয় যাতে নিশুতি রাতে আগুন হানা না দিতে পারে। ধিকিধিকি আগুনের পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে আমরা যেখানে বসে আছি।

এর মধ্যেই বৃষ্টি নামলো। তাড়াতাড়ি ছুটলাম হোটেলের দিকে। ঘরের বিছানায় বসে বৃষ্টি দেখছি নীল পাহাড়ে, চা আর মোমো আছে সাথে। বিদ্যুৎ না থাকায় বেয়ারা এসে মোমবাতি দিয়ে গেলো। কেমন যেন নীল আভা চারিদিকে, বুঝলাম পাহাড়ে বৃষ্টির আওয়াজ অন্যরকম। কেমন সময়ের চাকা থেমে যায়। চা, বৃষ্টি, পাহাড়, প্রথম দিনটা একবারে মন মতো কাটলো। ইতিমধ্যে হোটেলের দুই পোষ্য আমাদের ঘরের সামনে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রাত প্রায় হয়ে এলো, আগুন নিভলো কিনা ভাবছি।

পরেরদিন সকালবেলা উঠে জায়গাটা ঘুরে দেখাই একমাত্র কাজ। কালিম্পং জেলার এই গ্রামটি এতটাই প্রত্যন্ত যে খুবই স্বল্প মানুষ বসবাস করেন এখানে। আমরা হেঁটে পাহাড়ের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম, একেবারে ধারে যেতে ভয় করে, যেন পৃথিবীর শেষ সীমানা, ভয়ঙ্কর সুন্দর, কাছে যেতে মন চায় আবার পরক্ষণেই পা হরকানোর ভয় চেপে ধরে।

সামালবং এর এই view point এ দাঁড়িয়ে কালিম্পং শহরটাকে পুরো দেখা যায়। পাশেই চায়ের দোকান, আমাদের বয়সী এক দম্পতি ও তার ছোট মেয়ে রয়েছে টিনের ছাউনি দেওয়া দোকানে, পাশেই তাদের বাড়ি ও খামার। লাল চা নেওয়া হলো, অসম্ভব ভালো খেতে, অজানা কোনো মশলা দিয়েছে নিশ্চয়ই, কি ভীষণ সুবাস তার। তিন কাপ পরপর চললো, সাথে অমলেট। ছেলেটির সঙ্গে কথাবার্তায় জানা গেলো তাদের দোকানটি গ্রামের সদাই হিসেবে পরিচালিত হয়। টুরিস্ট-এর রমরমা নেই বলে গ্রামের লোকেরাই বিকেল করে আসেন দোকানে, চা খায়, আড্ডা দেয়। দূর থেকে দেখেছি সেই পাহাড়ি আড্ডা। শাল গায়ে দিয়ে প্রাপ্তবয়স্কের দল টিমটিমে আলোয় বসে আছে। হাসি ঠাট্টা মস্করা চলছে তাদের নিজস্ব ভাষায়।

পরের দিন আবার গেলাম সেই ভিউ পয়েন্টে। দোকানি দম্পতি জানালেন তারা মশলা, রান্নার সামগ্রী বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করেন। ওটাই তাদের আয়ের মূল উৎস। তাদের ছোট মেয়েটিকে আগের দিন দেখেছিলাম। সে সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, মা তাকে রোজ সকালে পৌঁছে দেন পাহাড়ি পথ হেঁটে। আর বাবা সকাল থেকে মুরগি, সবজি কেটে, বাসন ধুইয়ে দোকান খোলায় ব্যস্ত থাকেন। আমরা চা খাচ্ছি, মহিলা ইতিমধ্যে চলে এসেছেন মেয়েকে স্কুলে দিয়ে। গল্প করতে করতেই দেখলাম ভদ্রলোক বাসন ধুতে প্রায় পাহাড়ের খাদ বরাবর নামছে। কেন বুঝলাম না, মনে হলো আরে, একটু ওপরেও তো কাজটি করা যায়!
জিজ্ঞেস করলাম ভয় লাগে না আপনাদের এইভাবে নেমে যেতে? তার স্ত্রী বললেন, অনেকবার পড়ে গেছে, একেবারে নিচে গড়ানোর অবকাশ নেই, আবার পাহাড় বেয়ে উঠে আসতে পারবে, অসুবিধা নেই। মানে আমাদের কার্নিশ থেকে বল তোলবার মতো ব্যাপার, ভারী অদ্ভুত বিষয়।

কথা হচ্ছিলো গ্রামে জল সরবরাহ নিয়ে, আগে অনেক দূর থেকে জল বয়ে আনতে হতো, এখন দূরের ড্রাম থেকে পাইপ দিয়ে এক একটা স্থানে জল পৌঁছে যায়, কিন্তু প্রত্যেক বাড়ির আলাদা সময় বাঁধাধরা আছে। দোকানি দম্পতির রাতের বেলা স্লট, তাই অনেক ভোরে উঠতে হলেও রাতে জলের জন্য কিছুটা সময় দিতেই হয়।

পারিবারিক বিষয়ও কথা হচ্ছিল। ছেলেটির বাড়ি সিকিমে, আগে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করতেন, আপাতত সামালবং, তার শ্বশুরবাড়ি, সেই দোকানেই কাজ করেন স্ত্রী কন্যার সাথে। কথায় কথায় আমাদের ফোন নম্বর নিলেন, কখনো কলকাতায় আসলে যোগাযোগ করতে বললাম। বাচ্চা মেয়েটি খুব হাসিখুশি, কোনো জড়তা নেই, আমাদের দেখে লজ্জা না পেয়ে নিজের মনে খেলা করে।

সামালবং খুব ভালো লাগলো, নির্জন গ্রাম, সকলে মন খুলে কথা বলে, পাহাড়ে বেঁচে থাকার গল্প, জল, খাবার জোগান, নিজেদের খামারে মুরগি, ছাগল পুষে কিভাবে জীবন চলে তাদের। আমরা বিকেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম এক পরিত্যক্ত বাড়িতে, মনে হলো কোনোদিন হয়তো স্কুল ছিলো, এখন কোনো কারণে বন্ধ, পাহাড়ের চূড়ায় বেঞ্চি পাতা, তাতে বসে গল্প করছি, সারা শহরটা দেখা যাচ্ছে নিচে। সামনের রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর গ্রামের লোক হেঁটে যাচ্ছে, দু একটা গাড়িও চলছে। এক মহিলা তার ছোট মেয়েকে কাঁধে নিয়ে আসছেন, পাহাড়ি বাঁকে কোনো জড়তা নেই তাদের। মহিলা তার মেয়েকে ইংলিশ অ্যালফাবেট শেখাচ্ছেন, একটা করে পা ফেলা আর B for বলে থেমে গেলে মেয়ে উত্তর দেয় Bat.

সন্ধ্যে হয়ে আসছে, এবার হোটেলের পথে ফিরবো, ভাবছি কাল এই সময় শহরে ঢুকে গেছি। এমন শান্তির বিকেল কতদিন কাটাইনি, হালকা ঠান্ডা, শনশনে হাওয়া, আর পাহাড়ের স্তব্ধতায় একঘেয়ে লাগলে গ্রামবাসীদের সাথে দু-চার কথা বলে নেওয়ার মুগ্ধতা, আজীবনের মহার্ঘ্য সঞ্চয়।

সম্প্রীতি চক্রবর্তী, ইতিহাস বিষয়ক গবেষক, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।

;