ওয়াহেদুল করিম বাবুল: জীবন-উদযাপন করা আমার বাবা



সেমন্তী ওয়াহেদ
ইনসেটে লেখকের বাবা ওয়াহেদুল করিম বাবুল

ইনসেটে লেখকের বাবা ওয়াহেদুল করিম বাবুল

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি, আমার একজন সহপাঠী ওর বাবার হাতে প্রতিনিয়ত নিজের ও ওর মায়ের নির্যাতনের ঘটনার কথা উল্লেখ করে ভীষণ কেঁদেছিলো। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই দিনের পর, আমি, ঈশ্বর/আল্লাহ/ভগবান/প্রকৃতি, আমরা যে যেই শক্তিতেই বিশ্বাস করিনা কেন- আমি সেই পরম শক্তির কাছে কখনও নিজের জন্য কিছু চাইনি। সেই মুহূর্তে এগারো আর বারোর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আমি দিব্যি উপলব্ধি করেছিলাম যে মানবিক গুণসম্পন্ন বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা সকলের জীবনে নাও হয়ে উঠতে পারে, সে নিশ্চয়তা হয়তো অনেকের জীবনকে এঁড়িয়েই চলে যায়; জীবনের বাঁক আঁধারে নিমজ্জিত করে। আমার মত যে সব সন্তানের প্রয়াত বাবার স্মৃতিচিহ্ন মিশে আছে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, প্রতি নিঃশ্বাসে, থমকে না যাওয়ার প্রতি বিশ্বাসে; সেই বাবার কথা লিখতে গিয়ে অক্ষর মিশে যায়-ভেসে যায়, অশ্রুভেলায়।

ছোটবেলায় বাবাই প্রথম বলেছিলো," শোন, তোকে যদি কেউ বলে তুই নিনি আর বাবুলের একমাত্র মেয়ে, সুন্দর করে বলবি, না, আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান"। আট বছরের আমি তোতা পাখির মত প্রায়ই অগ্রজদের এই ভুল শুধরে দিতাম। বাবা মুচকি মুচকি হাসতো। আর বেড়ে উঠতে উঠতে সেই আমি অনুধাবন করেছি কত সহজেই পুত্র কিংবা কন্যা সন্তানের সামাজিক কাঠামোতে আবদ্ধ না করে বাবা আমাকে শুধুই মানুষ, এক মুক্ত-স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ছিল সহায়ক শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ত্রে কিংবা বোভোয়ার একাধিকবার পাঠ করে যে দর্শনের নির্যাস আন্দোলিত করেছে মন, সেই মানসপট বহু আগেই নির্মাণ করেছিল বাবা।

বাবা-মায়ের সঙ্গে সেমন্তী ওয়াহেদ

আমাদের বাসায় বাবার কিছু পরিচিতজন এসেছিলেন একদিন। তাঁদের কথপোকথনের এক পর্যায়ে বাবা বেশ সহজ ভাষায় তবে কঠিন কণ্ঠে বলেছিল, "কি বললে? নিনিকে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি? নিনিতো পরাধীন নয় তাই ওকে স্বাধীনতা দেবার প্ৰশ্নই ওঠে না। আমি যেমন, ঠিক নিনিও তেমন, দুজনেই সমান ও স্বাধীন"। নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার বাবার উচ্চারণের মতন স্পষ্ট করে যেন ধারণ, লালন ও পালন করে বিশ্ব। 

কৈশোরপ্রাপ্তি থেকে কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সী মেয়েদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসা আমাদের উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে অভিবাসী বাঙালি সমাজের জন্যও সমান প্রযোজ্য। মানুষ সামাজিক জীব এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সামাজিকতার সেই অংশ যা নিজের ইচ্ছায় চাইলে বেছে নিতে পারি, কোন পারিবারিক বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া, এই পরিচ্ছন্ন দৃ‌ষ্টিভঙ্গি যতটা মায়ের তার চাইতেও বেশি, বোধহয়, বাবাই প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছে, "বিয়ে করতেই হবে কেন?" কেউ যদি জানতে চাইতো, "বাবুল ভাই, সেমন্তীর বিয়ে দেবেন না?" অথবা " মেয়ের বিয়ে হয়নি?" সেই সময়ে প্রতিবার বাবাকে বলতে শুনেছি, "আমাদের পরিবারে মেয়েদের বিয়ে দেই না, হয়ও না, আমাদের পরিবারে মেয়েরা বিয়ে করে, তাও চাইলে"। কন্যার বিয়ে দেওয়া, হওয়া ও করা নিয়ে বাবার যেই উক্তি শুনে বেড়ে উঠেছি তা আমি আজও বলি। আজ তা বোধ করি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। 

শিক্ষা ও জ্ঞান নিয়ে যেই কথাটি আমি হরহামেশা আমার "ছাও-পাও" অর্থাৎ আমারই প্রজন্মের তবে আমার চাইতে বয়সে ছোট এই মাটিতে জন্ম কিংবা বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে বলে থাকি, তা বাবার বোঝানো আরও একটি কথা। "আপনার এত মেধাবী মেয়ে কেন বিজ্ঞান, আইন বা অর্থনীতি, এই ধরণের কোন বিষয় নিয়ে পড়লো না? ওতো অনায়াসে কোন আইভি লীগে পড়তে পারতো?" এই সব প্রশ্নের উত্তরে বাবার বরাবর ঠোঁটের ভাজে হাসি মাখানো অভিব্যক্তি জ্বলজ্বল করে ভাসে। আমার পড়াশোনা প্রসঙ্গে বাবা-মা কখনও জোর করেনি; না বিষয় নিয়ে, না বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। শুধু একটি অনুরোধ করেছিল বাবা, আমার শিক্ষা যেন জ্ঞানে পরিণত হয়, তাতে যেন মানুষের কল্যাণ হয়, শুধু চারকোণে একটি তকমা-সম্পন্ন কাগজে সীমাবদ্ধ না রয়ে যায়। 

বাবা জীবনযাপনে নয়, জীবন-উদযাপনে ছিল দৃঢ় বিশ্বাসী আর তাই বাবা জীবন উদযাপন করেছে দুটি অধ্যায়ে। প্রথম অধ্যায় যেমন জ্ঞান ও অর্থে প্রাচুর্যপূর্ণ দ্বিতীয় অধ্যায় তেমনি বিকশিত বোধ ও রুচিশীলতায় পরিপূর্ণ। সাতচল্লিশে বাবারা সপরিবারে নদিয়া শান্তিপুর থেকে বসতি গড়ে ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত বাবার জীবন যেন এক বাস্তব রূপকথা। বাবা ভীষণ মেধাবী ছিল, ওর ছিল তুখোড় স্মরণশক্তি। ক্রিকেটের মাঠে তখন বাবার অল রাউন্ডার হিসেবে ছিল খ্যাতি। মন চাইলেই বাবা উড়োজাহাজে চড়ে শারজার মাঠে ক্রিকেট খেলা উপভোগ করতে যেত। বাবার সাদা ড্যাটসান সাজিয়ে সেই সময়ে গেন্ডারিয়ায় বিয়ে হয়নি বোধহয় এমন কেউ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার ৪৯ দিনোনাথ সেন রোডের সুবিশাল বাড়ি ছিল আশ্রয় স্থল। আমার মায়ের সাথে এক দশক প্রণয়ের সময়ে কলকাতার মঞ্চে উৎপল দত্ত, সম্ভু ও তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় দুজনে দেখতে গেছে বহুবার; লরেন্স অলিভিয়ার ও গ্রেগরী পেক থেকে দিলীপ কুমার ও মধুবালা কিংবা উত্তম-সুচিত্রার প্রতিটি সিনেমা বাবার বারবার দেখা। বাবা নিমগ্ন হয়ে সব ধরনের গান শুনতো। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও পুরনো দিনের বাংলা ও হিন্দি সিনামার গান শুনতে বাবা বেশি ভালোবাসতো। মোহাম্মদ রফির কণ্ঠ বাবার কাছে ছিল বিশেষ প্রিয়।

সেই সময়ের উচ্চশিক্ষিত, ধনাঢ্য বনেদি-জমিদার পরিবারের সুদর্শন এক পুত্রের অকল্পনীয় জীবন বাস্তবে অতিবাহিত করা আমার বাবা সেই বর্ণাঢ্য জীবন সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে নব্বই সালে হঠাৎই পারি জমিয়েছিল নিউইয়র্ক নগরীতে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ৩৬ এভিনিউর যেই ওয়াশিংটন টাওয়ারে বাবা প্রথম এসে উঠেছিল, সেই বিল্ডিং-এই বাবা থেকেছে আমৃত্যু। নিজের সাদা ড্যাটসান নয়, টি এল সির হলুদ গাড়ি গর্বভরে চালিয়েছে বাবা; কাজ করেছে রেস্তোরাঁয়। গাড়ি চালানো, বিল্ডিং সিকিউরিটি অথবা দোকান বা রেস্তোরাঁয়ে কাজ করাকে অনেকেই আখ্যায়িত করে "odd job" হিসেবে আর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আইনজীবীদের কর্মকে বলা হয়ে থাকে "career"। কোনো প্রকার সৎ উপার্জন "odd" অর্থাৎ উদ্ভট বা অস্বাভাবিক নয়, শুধুই চাকরি, কাজ বা "job" এবং এই ধরণের শ্রেণী বৈষম্য দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজের শিক্ষিত মানুষেরাই করে থাকে এবং এর ফলে শুধু শ্রেণী বৈষম্যই বৃদ্ধি পায় না, ব্যক্তি মনে বাসা বাঁধে হীনমন্যতা- মনস্তাত্ত্বিক এমন অনেক বিশ্লেষণ শুনেছি বাবার মুখে। 

আমাদের সামাজিকতায় আমরা সাধারণত বয়সে ছোটদেরকে বেয়াদব বা বেত্তমিজ বলে থাকি। আমার ছোটবেলায়, বাবা, একজনের আচরণের প্রেক্ষিতে বুঝিয়েছিল, "মা, অনেক সময় বয়সে বড়রাও এই শব্দ দুটির আভিধানিক অর্থের মত আচরণ করে থাকে, অনেক সময় বয়সের সঙ্গে রুচির মিল তুই নাও খুঁজে পেতে পারিস, তবে নিরাশ হবি না"। জীবনে কথার মূল্য আছে, বিশেষ করে এক একটি শব্দের অর্থের- তা যেমন মা শিখিয়েছে, সেই শব্দের মূল্যায়ন ও প্রাত্যহিক ব্যবহার প্রতি মুহূর্তে শিখিয়েছে বাবা। 

বাবা সাহিত্যিক, গবেষক, বা বুদ্ধিজীবী ছিল না। মানসম্পন্ন লেখক, সুবক্তা, গুণী বিশ্লেষক বা পন্ডিত চিন্তাবিদ হবার জন্য যে চর্চা ও অধ্যবসায় প্রয়োজন বাবা কখনোই তা করেনি। নামের আগে একাধিক বিশেষণের ভার বহন করে বাবার ওজন কখনো বাড়েনি। কোন আসন কিংবা সম্ভাষণে মুখ্য বা প্রধান হিসেবে বাবাকে দেখা বা নাম শোনা যায়নি। বাবা সবসময়ই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল। অতি সহজ-সরল, সাদা-মাটা, সাধারণ আমার বাবা ওর মতো করে জীবন পরখ করেছে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবা ওর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন উদযাপন করেছে। আমার ৩৫ বছরের জীবনে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার চাইতে পৈতৃক সম্পদ হিসেবে পাওয়া বাবার দৈনন্দিন জীবন উদযাপনের জ্ঞান আমার কাছে অমূল্য, অসামান্য- আমার বাকি জীবন অতিবাহিত করবার পাথেয়।

বিশ্বের সবচেয়ে ‘কুৎসিত কুকুর’ এটি!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কুকুরের তথ্য যেমন রয়েছে তেমনি এবার সবচেয়ে কুৎসিত আকৃতির কুকুরেরও তথ্য মিলেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

স্কাই নিউজ বলছে, চলতি বছরের ২১ জুন (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকু্রের প্রতিযোগিতা বসেছে। ওই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ওয়াইল্ড থাং নামে আট বছর বয়সী একটি কুকুর এ তকমা পেয়েছে।

তবে এবারই ওয়াইল্ড থাং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি। এর আগেও ৫ বার এমন প্রতিযোগিতায় প্রাণীটি অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

ওয়াইল্ড থাং এবং তার মালিক অ্যান লুইস। ছবি: সুমিকো মুটস / এনবিসি নিউজ

ওয়াইল্ড থাং এর মালিক অ্যান লুইস বলেন, ওয়াইল্ড থাং কুকুরছানা হিসাবে একটি ভয়ানক রোগ ক্যানাইন ডিস্টেম্পারে সংক্রমিত হয়েছিল। কোন ক্ষতি ছাড়াই অনেক চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার দাঁত বেশি বৃদ্ধি না পাওয়ায় জিহ্বা বাইরে থাকে এবং তার সামনের ডান পা ২৪/৭ প্যাডেল আকারে থাকে।

পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে ৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫১১ টাকা) দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকুর প্রতিযোগিতা প্রায় ৫০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটি আকর্ষণীয় করার জন্য কুকুরগুলোকে বিশেষ এবং অনন্য করে সাজিয়ে তোলা হয়।

;

ট্যাক্সি চালকের অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সংবাদটি পড়তে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে শুধু শিক্ষিতরাই সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন! কারণ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় এক ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীর সাথে অনর্গল ইংরজিতে কথা বলছেন।

ঘটনাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম এনডিতিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এনডিটিভি বলছে, ওই ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীদের সাথে ইংরেজি কথা বলার পাশাপাশি কিভাবে আরও দক্ষ হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ধারণ করা ভিডিওটি ভূষণ নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, "এমন ঘটনা দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরে তার সাথে কথা বলার সময় কিছুটা তোতলা হয়েছিলাম। তার ইংরেজিতে সাবলীলতা দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।"

পরে তার সাথে এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো।

ট্যাক্সি চালক বলেন, ইংরেজি শেখা থাকলে আপনি লন্ডন এবং প্যারিসের মতো উন্নত দেশে যেতে পারবেন। এটা বিশ্বব্যাপী ভাষা। এ কারণে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিডিওটিতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "তার কথা বলার ধরণ ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের মতো শোনাচ্ছেন"।

অপর একজন লিখেছেন, "১৬ বছরের শিক্ষার পর তার ইংরেজি আমার চেয়ে অনেক ভালো।"

;

‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার মেঘনা নদীর দেখা মেলে চুনা নদীতে



মৃত্যুঞ্জয় রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাতক্ষীরা
ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।

আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।

দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।


ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।

বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।

ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।

সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,

পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের প্রিয় স্বাধীনতা কবিতার লাইনের সঙ্গে মিল রেখে বলতে হয়-

শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে থাকা মানুষগুলোর কথা।
চুনা নদী পাড়ি দেবো, ডিঙ্গি নৌকা দিয়া।

আবার আমি যাবো আমার উপকূলের গাঁয়ে।
কাজের জন্য ছুটে বেড়াই, চুনা নদীর বাঁকে।

বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় লোনা পানির ক্ষত।
সেই চরের মানুষগুলো, এখনো লড়াই করে বাঁচে।

বর্ষাকালের দুপুর বেলা। আকাশে কালো মেঘ খেলা করছে! নদীতে পানি ঢেউ খেলছে! ভেসে আসছে, গেট থেকে জল আসার শব্দ। নদীর এপার ওপার হচ্ছেন ডিঙা নৌকা দিয়ে পাড়ে থাকা মানুষগুলো। ছুটে চলেছেন নারী-পুরুষ একে একে চুনা নদীর তীরে কাজের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। রাতের আঁধারে পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচেন এই চুনা নদীর পাড়ের মানুষগুলো।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে বসবাস নিত্যসংগ্রামী মানুষদের, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম


এখানকার মানুষজন লড়াই সংগ্রাম করে এখনো টিকে আছেন। টিকে থেকে তাদের রোজ কাজের সন্ধানে অবিরাম ছুটে চলতে হয়। বর্তমানে ভাঙাগড়ার জীবনে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে বসবাস করছেন তারা। শ্যামনগর উপজেলার কলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত চুনা নদীর চরটি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারানো ২০-২৫টি জেলে পরিবারের ঠাঁই হয়েছে এখানে। বছরের পর বছর এই চরকে আগলে বসবাস করলেও সব সময় লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

তাদের একজন ৩৫ বছর বয়েসি রমেশ চন্দ্র মণ্ডল। দুর্যোগে সহায়-সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নেন চরের এক কোণে। সেখানে মাটির ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ভর করে থাকতে হয়, স্ত্রীর ওপর। তার কষ্টের বিনিময়ে জোটে তাদের একমুঠো ভাত। স্ত্রী একাই লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে এই চরে।

বনে পশুপাখির, জলে কুমির আর স্থলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এভাবে তাদের জীবন প্রবহমান। তাদের জীবন চলার পথে নেই কোনো বিরাম। সংগ্রাম করে টিকে থাকেন সবাই। একে একে সব কিছু হারিয়েও এখানো টিকে থাকতে হয় তাদের।

রমেশের মতো একই অবস্থা ষাটোর্ধ্ব ফকির বিশ্বাসের। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয় তাকে। একবেলা কাজ করলে অপর বেলা কাটে অসুস্থতায়!

ফকির বিশ্বাস বার্তা২৪কমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আশ্রয়ের দুই যুগ লড়াই সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। বরং প্রতিবছর ছোটবড় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি। লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে বারংবার!

জীবন কাটে যুদ্ধ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় পেতে...চুনা নদীর তীরের মানুষের জীবন, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম

চুনা নদীর চরে মাছের পোনা গুনতে দেখা যায় নমিতা রাণী রায়কে। নমিতা রাণী রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সবসময় চিন্তার ভেতরে থাকতে হয় আমাকে। নদীতে কুমির আর বনে বাঘের আতঙ্ক! তারপর ডাঙায় লোনা পানির ক্ষত। লবণাক্ততায় ভরা জীবনকাল। তারপর চরটি নদীর ধারে হওয়াতে একটু জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। এই লড়াই-সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি সেই প্রথম থেকে। মাছের পোনা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। আমরা সবাই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে টিকে আছি।

নমিতা রাণী রায় বলেন, যখন বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সময় অনেক কষ্টে চর এলাকার সবার দিন কাটে। শিশু সন্তানদের সবসময় নজরে রাখতে হয়। অন্যথায় নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা!

নিত্যদিনের লড়াই-সংগ্রাম

লড়াই সংগ্রামের শেষ নেই উপকূলে থাকা মানুষজনের। সর্বশেষ, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে নদীর জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় তাদের বসতঘর। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বলে কথা না! যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানিতে তাদের বসতঘর তলিয়ে যায়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না তাদের। এমনও অনেক সময় গেছে যে, দিনের পর দিন উনুনে আগুন দিতে পারেননি তারা। ওই সময় শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এমনও দিন গেছে, যেদিন তাদের শুধুমাত্র পানি পান করে বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়েছে।

ঘরছোঁয়া জলের বানের দিকে তাকিয়ে থাকেন চুনা নদীর তীরের মানুষজন আর ভাবেন আর কত সংগ্রাম, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়,বার্তা২৪.কম

সত্যি, তাদের ভাষ্যের সঙ্গে বড়ই মিল কবি শামসুর রাহমানের ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার! ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটা একটা বড় প্রশ্নেরই বটে! জঙ্গল, বন্যা, নদীভাঙনের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আর অভাবে চরের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন। তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এসব দুর্যোগে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। আবারও লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরেও দাঁড়ান তারা।

;

ব্রহ্মপুত্রের বানভাসি নারীদের দুঃখগাথা!



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

'খ্যাতা-কাপড় সইগ ভিজি গেইছে, পাক-সাকও (রান্না-বান্না) করতে পারি না। আমাদের দেখার মতো মানুষ নাই। স্বামীর জ্বর আসছে, ওষুধ ও নাই। বাচ্চা গুল্যাক সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া নাগে। জ্বর নাগি আছে। যে ঘরত থাকি স্যাটে গরু ছাগলও থাকে। সারাদিন গরু ছাগলের ময়লা পরিষ্কার করতেই যায়। এই বানের পানিতও হামার বইসনা(অবসর) নাই’- কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া বেগম।

তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে। ১২ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদিপশু রাখার উঁচু টিলায়।

অপরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন রাবেয়া বেগমের মেয়ে শাহানাজ বেগম।

শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন শাহানাজ বেগম, ছবি- বার্তা২৪.কম

শাহানাজ বেগম বলছিলেন, 'হামার তো কষ্ট! সংসার হামরা বান হইলেও সামলাই, খরা হইলেও সামলাই। নিজে কম খাইলেও বাচ্চাদের জন্য রান্না করতে হয়। বাচ্চাদের দেখাশোনা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা করতে দিন কাটে। রাইতে পানি বাড়ে কি না দেখার জন্যে জাগি থাকা নাগে। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

শুধু এই দুই নারী-ই নন, কুড়িগ্রামের বানভাসি পরিবারগুলোর নারীদের চিত্র একই।

বন্যাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়েন পুরুষেরা। দিনের অধিকাংশ সময় কেউ বাজারে কেউ বা নৌকায় বসে শুয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে নারীদের ব্যস্ততা আরো বাড়ে এবং সংসারের কাজ করার প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর পার্বতীপুরে ৩০টির মতো পরিবারের বাস। সেখানের প্রায় সব বাড়িই পানির নিচে। সেখানে গেলে ওই চরের বাসিন্দা সামিনা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায় ঘরের ভেতর একটি মাচার ওপরে।

দুপুর ২টায় দিনের প্রথম রান্না করছেন তিনি। বাইরে নৌকায় বসে সন্তানেরা অপেক্ষা করছেন কখন রান্না শেষ হবে!

সামিনা বেগম বলছিলেন, রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই, ছবি- বার্তা২৪.কম

সামিনা বেগম বলছিলেন, ‘রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই। খালি ভাত আন্দি নুন দিয়া খামো। স্বামীর কাম বন্ধ। তরকারি কেনার ট্যাকাও নাই। হামাক কি কাঈও কিছু দিব্যার নয়’!

একই চরের রেজিয়া বেগম নৌকায় বসে স্বামীর বাজার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। খাবার পানিও বাজার করে আনলে তবেই রান্না হবে।

রেজিয়া বেগম বলেন, সকালে পন্তা খাইছি। স্বামী ২শ টাকা নিয়া হাটে গেইছে। কী যে আনে! নিয়া আইসলে রান্না হবে। বাচ্চার অসুখ, সারাক্ষণ পাহারা দিয়্যা রাখতে হয়। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন বলছে, রোববার (৭ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০১ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। সরকারি হিসাবেই প্লাবিত এলাকায় ৯৭ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একদিনের ব্যবধানে পানিবন্দি মানুষ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার।

এদিকে, পানিবন্দি মানুষের খাদ্যকষ্ট লাঘবে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার পর্যন্ত জেলার দুর্গত মানুষদের জন্য ৩৮৭ মেট্রিক টন চাল এবং ১৮ হাজার ৯৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ধরলা ও দুধকুমারের পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের দিকে আমরা নজর দিয়েছি। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে দুধকুমার ও ধরলা নদীও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রোববার (৭ জুলাই) দুপুরে দেওয়া বার্তায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

তবে আগামী ৭২ ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

;