শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন

শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

উৎসব-পার্বণ ছাড়াও প্রায় প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে বসে গানের আসর। তিনি গান করেন, গিটার আর স্যাক্সোফোন বাজিয়ে তাকে সংগত করেন দুই ছেলে। বড় ছেলে গিটারের সঙ্গে গানও করেন। সেজো জন স্যাক্সোফোনে তোলেন মোহনীয় সুর। চতুর্থ জন কবিতা আবৃত্তি করেন। পঞ্চম ছেলে কবিতাপ্রেমী এবং কবি। সাত ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে যৌথ বসবাস। এমন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর পারিবারিক বন্ধন যার, তিনি হলেন দেশের খ্যাতনামা শিল্প গ্রুপ পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

মাইজভান্ডারি গানের ভক্ত এই শিল্পপতির বাড়িটি যেন মরমি সংগীত লালন, মাইজভান্ডারি আর কাওয়ালি গানের কেন্দ্র। তার বাড়িতে নিয়মিতই ভক্তিমূলক গানের আসর বসে। পরিবারের সব সদস্যের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই উপস্থিত থাকেন সেই আসরে। ‘মন অহংকারে দিন কাটালি মানুষ হবি কেমন করে। তোর সাধন ভজন নষ্ট হইল, হিংসা নিন্দা অহংকারে’-কবিয়াল রমেশ শীলের এ গানটি সুযোগ পেলেই গেয়ে শোনান সুফি মিজান।

শিল্পপতি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে সুফি উপাধি দেওয়া হয় প্রায় ২৫ বছর আগে। আল্লামা রুমী সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদুল হক তাকে এই উপাধি দেন বলে জানা যায়।

দেশের সেরা শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিএইচপি। ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়া গ্রুপটির টার্নওভার বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সুফি মিজানুর রহমান। সাত ছেলেকে দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব।

এমন বর্ণাঢ্য জীবন যার, তার শুরুটা হয়েছিল ১০০ টাকা বেতনের চাকরি দিয়ে। কিন্তু মেধা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন পিএইচপি, যার মানে হলো শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি (পিস, হ্যাপিনেস, প্রসপারিটি)। এই তিন শব্দের অনুপ্রেরণা সঙ্গে নিয়ে বাবা ও ছেলেরা মিলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এমন বড় ও স্বনামখ্যাত শিল্প গ্রুপটিকে। একই সঙ্গে মাইজভাণ্ডারি ও মরমি সংগীতকে অমর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে চলেছেন সুফি মিজান ও তার সন্তানেরা।

আবদুল গফুর হালির মতো অসাধারণ গীতিকার ও সুরকার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সুফি মিজানের সান্নিধ্য পান। তার সব সৃষ্টিকে অমর করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেন সুফি মিজান। গফুর হালির গান সংরক্ষণ করা, শিল্পীদের দিয়ে নতুন করে গান গাইয়ে নেওয়ার মতো অতিপ্রয়োজনীয় কাজটি করা ছাড়াও সুফি পরিবার মরমি শিল্পী কবিয়াল রমেশ শীলের সৃষ্টিকেও অমরত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামের এই শিল্পীর গানগুলোও সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে পরিবারটি।

বাংলা লোকগানের অন্যতম ধারা চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার শিল্পী গফুর হালি তার ‘চাটগাঁইয়া নাটক সমগ্র’ গ্রন্থে ‘তুলনাহীন মানুষ শিরোনামে’ লেখা একটি কবিতায় এই শিল্পপতি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমি একজন মানুষকে চিনি/মনুষ্যত্বের সব গুণ যার কাছে বিদ্যমান/আমার সেই প্রিয় মানুষটির নাম/আলহাজ্জ শাহ সুফি মিজানুর রহমান।’

গফুর হালি ও আঞ্চলিক গানের গবেষক সাংবাদিক নাসির উদ্দিন হায়দার সুফি মিজানুর রহমান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘সুফি সাহেব সেই ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে য্ক্তু ছিলেন। একসময় রেডিও-টিভিতেও গিয়েছিলেন। তবে তিনি চট্টগ্রামে আসার পর মাইজভান্ডারির খলিফা আবদুস সালাম ইছাপুরীর মুরিদ হন। আর তখন থেকেই তিনি মাইজভান্ডারি গানের প্রতি দরদি হয়ে ওঠেন। মাইজভান্ডারি গান শোনা, এই গানের শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা, যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের সহায়তা করা এসবই করছেন তিনি। সুফি সাহেবের কাছ থেকে প্রায় অর্ধশত শিল্পী সম্মানী পেয়ে আসছেন।’

কারখানায় লোহা গলিয়ে স্টিল নির্মাণ কিংবা কাচ তৈরিতে দেশের কিংবদন্তি হওয়ার পথে থাকা এই শিল্প পরিবার শিল্প উৎপাদনে যেমন ব্যস্ত, তেমনিভাবে নিজেদের জীবনযাপনকে শিল্পিত করে তুলতে সমান মনোযোগী। গান-বাজনার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনের অনন্য উদাহরণও এ পরিবারটি। পাশাপাশি দুটি ভবনে সুফি মিজানুর রহমানসহ সাত ছেলে তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার খেতে রয়েছে ২০ চেয়ারের ডাইনিং টেবিল। যেখানে সুফি মিজানুর রহমান ও তাহমিনা রহমান দম্পতি সব ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তাদের সঙ্গে নিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন।

বড় শিল্পপতি হলেও কারও সঙ্গে দেখা হলেই দীর্ঘ সালাম দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সুফি মিজান। এ মানুষটি নিজে খাওয়ার চেয়ে খাওয়াতেই বেশি ভালোবাসেন। অতিথি আপ্যায়নে তার জুড়ি মেলা ভার। তার প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে করলা ভাজি, ইলিশ মাছ, কই মাছ ও ছোট মাছ। খাওয়ার আগে ও পরে দুই দফা মোনাজাত করে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, গান-বাজনা, হজ-জাকাত, খেলাধুলা, চিকিৎসাসেবা, এতিমখানাসহ সব ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ জন্য সুফি মিজান ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থাও গঠন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবায় কাজ করে আসা সুফি মিজানুর রহমানকে ২০২০ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়।

নিজে সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন যেমন তেলাওয়াত করতে পারেন, তেমনিভাবে মোয়াজ্জিন ও নামাজের জামাতে ইমামের দায়িত্বও পালন করতে পারেন এই শিল্পপতি। ধর্মীয় এসব আয়োজন সুন্দরভাবে করতে পারা ৮০ বছর বয়সী গুণী এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। স্থানীয় ভারত চন্দ্র বিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে এসএসসি, ১৯৬৩ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একই কলেজ থেকে পরে তিনি বিকম ও ব্যাংকিং বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন। ছাত্রাবস্থায় এইচএসসি পাসের পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জের জালাল জুট মিলে ১০০ টাকা বেতনে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক) চট্টগ্রামের লালদীঘি শাখায় জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে যোগ দেন। এই ব্যাংক ছেড়ে ১৯৬৭ সালে যোগ দেন তৎকালীন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) খাতুনগঞ্জ শাখায় ৮০০ টাকা বেতনে। বৈদেশিক বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি ওই ব্যাংকেই কাজ করেন। আর এ শাখায় কাজ করতে গিয়েই দেশের বিভিন্ন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুফি মিজান ব্যবসা শুরু করেন। গড়ে তোলেন শিল্পকারখানা। প্রথমে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড, পরে রি-রোলিং মিল, ঢেউটিন, কাচ তৈরি, মালয়েশিয়ান ব্র্যান্ডের প্রোটন গাড়ি কারখানা থেকে শুরু করে বর্তমানে ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার।

ব্যক্তি সুফি মিজানুর রহমান ও তাহমিনা রহমান দম্পতির সাত ছেলে ও এক মেয়ে। এই সাত ছেলের প্রথম তিনজন যথাক্রমে মোহাম্মদ মহসিন, মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন ও মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। পরের চারজন যথাক্রমে মোহাম্মদ আলী হোসেন সোহাগ, মোহাম্মদ আমীর হোসেন সোহেল, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রিংকু ও মোহাম্মদ আকতার পারভেজ হিরু পড়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। একমাত্র মেয়ে ফাতেমা তুজ জোহরা।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে যেখানে তরুণরা এখন বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যান, সেখানে সুফি মিজানুর রহমানের সব ছেলে দেশে ফিরে এসেছেন। বাবার সঙ্গে ব্যবসায় হাল ধরেছেন। বাবা ও সাত ছেলের সম্মিলিত মেধা ও পরিশ্রমে এগিয়ে গেছে পিএইচপি গ্রুপ। ব্যবসায় ক্রান্তিকাল এলেও তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে তা ঠিকই সব উতরে যায়।

ছেলেদের সম্পর্কে বাবা সুফি মিজানুর রহমানের মন্তব্য, ‘আমার সাত ছেলে সাতটি সোনার টুকরো।’

বাবাদের কাছে সন্তান সব সময় সোনার টুকরোই হয়ে থাকে। কিন্তু সুফি মিজানের সন্তানরা প্রকৃতপক্ষেই ব্যতিক্রম। বাবার বিনয়ী আচরণ সব সন্তানের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। তারা যেমন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন, তেমনি মানবিক গুণাবলী ও সমাজসেবায়ও বাবার মতো।

এসবের বাইরেও তাদের রয়েছে শৈল্পিক মন। বাড়িতে যখন গানের আসর বসে, তখন গিটারে সুর ছড়িয়ে গান করেন বড় ছেলে মোহাম্মদ মহসিন। বড় ছেলে যখন গিটার বাজান, তখন সেজো ছেলে আনোয়ারুল হক স্যাক্সোফোনে সুর তোলেন। পঞ্চম ছেলে আমির হোসেন কবিতাপ্রেমী। নিজেও কবিতা লেখেন। চতুর্থ ছেলে আলী হোসেন কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করেন দারুণ ছন্দে।

সৌজন্য: দেশ রূপান্তর

কলোনি তৈরি করে রাত্রিযাপন করে ‘শামুকখোল’



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
আকাশে ডানা মেলেছে শামুকখোল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

আকাশে ডানা মেলেছে শামুকখোল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

জলাভূমির পাখি শামুকখোল। আজ প্রায় দুই/তিন দশক আগেও বাংলাদেশে সহজে দেখা মিলতো না। উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রজনন সুবিধার কারণে এই পাখি এখন বাংলাদেশের আনাচে কানাচে দেখা মিলছে। সেই সঙ্গে বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে শামুকখোলের সংখ্যা।

প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক এ পাখি প্রসঙ্গে বলেন, শামুকখোল এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাল, বিল এবং নদীর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। এরা প্রজনন শেষে আর দেশের বাইরে যাচ্ছে না। বাংলাদেশেই তারা কলোনি তৈরি করে স্থায়ীভাবে থাকছে। ফলে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে সহজেই এই পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এক সময় শামুকখোল পাখি মূলত আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালীন ভিজিটে আসতো। এজন্য এদেরকে ‘পরিযায়ী পাখি’ বলা হয়। এরা বাংলাদেশে তখন খুব বেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করতো না। অল্প সংখ্যক দেখা যেতো। প্রজননের জন্য তারা অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশে আসতো। প্রজনন শেষে তারা আবারও দেশ ত্যাগ করতো। আমাদের দেশে যে শামুকখোলগুলো আসতো সেগুলোর বেশির ভাগ মূলত স্থায়ীভাবে বসবাস করতো পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন এলাকা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে। ভারতে বছর বছর প্রচণ্ড খরার কারণে ওই দেশে এদের প্রজনন এখন প্রায় বন্ধ হয়েছে।

ঠোঁটে শামুক ধরেছে শামুকখোল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

পাখিটির নামকরণ প্রসঙ্গে ইনাম আল হক বলেন, শামুকখোল পাখির ইংলিশ নাম Asian Openbill আর বৈজ্ঞানিক নাম Anastomus oscitans। আবাসিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এখন বাংলাদেশে বিপুল পরিমণ শামুকখোল দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের হাওড়-বাঁওড় এবং নদী এলাকাগুলোতে শামুকখোল কলোনি স্থাপন করেছে। এই পাখির ঠোঁটের সাথে অন্য কোন পাখির ঠোঁটের মিল নেই। শামুকখোল পাখির ঠোঁটের নিচের অংশের সাথে উপরের অংশে বড় ফাঁক। এরা এই বিশেষ ঠোঁটে শামুক তুলে চাপ দিয়ে শামুকের ঢাকনা খুলে ফেলে এবং ভিতরের নরম অংশ খেয়ে নেয়। মূলত শামুকের ঢাকনা খোলার শৈল্পিক কৌশলের কারণেই এই পাখির নামকরণ করা হয়েছে ‘শামুকখোল পাখি’।

ইনাম আল হক আরও বলেন, শামুকখোল পাখি খুবই নিরীহ পাখি। এদের বাহ্যিকভাবে পুরুষ-স্ত্রী বোঝা যায় না। গায়ের রঙ সাদা কালো। বয়স্ক পাখি হলে তার শরীরের সাদা রঙ অনেকটা কালচে বরণ ধারণ করে। এদের আবাসস্থল থাকে দুটি। একটি স্থায়ী বাসা থাকে তাদের। যেখানে তারা কেবলমাত্র প্রজননের সময় অবস্থান করে। অপরটি হচ্ছে প্রজনন পরবর্তী অস্থায়ী অবস্থান। এরা প্রজননের সময় কেবল নির্দিষ্ট বাসায় চলে আসে। অর্থাৎ এই পাখি যেখানে বাসা বাঁধে সেই বাসাতেই প্রতিবছর প্রজনন করে থাকে। এক থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগে তাদের বাসা তৈরি করতে। বাসা তৈরি হলে সেখানে তারা ডিম দেয়।

অন্য পাখিদের সাথে শামুকখোল। ছবি আবু বকর সিদ্দিক

এরা পানির ধারে, অল্প পানি অথবা পানির উপরে ভাসমান কিছুর উপর চুপ করে থাকে শিকার ধরতে। এছাড়াও অগভীর পানিতে হেঁটে হেঁটে কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খুঁজে। এদের খাদ্য তালিকার ৯০ ভাগ শামুক। এছাড়াও এরা ছোট মাছ, বড় আকাড়ের পোকা, কাঁকড়া, ব্যাঙ খেয়ে জীবন ধারণ করে বলে জানান ইনাম আল হক।

;

পক্ষিকূলের ভ্রমণবৃত্তান্ত



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
বাইক্কা বিলে ডানা মেলেছে পরিযায়ীর দল। ছবি: এবি সিদ্দিক

বাইক্কা বিলে ডানা মেলেছে পরিযায়ীর দল। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

আদিকাল থেকেই পাখিদের সাময়িক অন্তর্ধান ও পুনরায় আবির্ভাবের রেওয়াজ রয়েছে; যা আজও মানুষের কাছে রহস্যময়। ধারণা করা হয়, পাখিদের স্থানান্তর শুরু হয় প্রায় ৫ কোটি বছর আগে।

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যখন শীতকালে পাখিদের তাদের স্ববাসে দেখা যেত না; তখন মানুষ মনে করত, পাখিরা শীতকালটা পানির নিচে ডুব দিয়ে অথবা সরীসৃপের ন্যায় গর্তে কাটায়। পরে বিজ্ঞানীরা মানুষের ভুল ভাঙতে সক্ষম হন। পাখিরা পরিবেশগত চাপে, আরামদায়ক পরিবেশের আশায় ও জিনগত নিয়মের কারণে দেশান্তরী হয়।

কোনো কোনো তত্ত্বমতে, পাখিদের উৎপত্তি হয়েছিল উত্তর গোলার্ধ্বে এবং প্লায়োস্টোসিন সময়ের হিমবাহ তাদের বাধ্য করেছিল দক্ষিণে আসতে আর সে অভ্যাসগত কারণেই পাখিরা আজও দক্ষিণে আসে।

অন্য এক তত্ত্বমতে, পাখিদের আবির্ভাব দক্ষিণ গোলার্ধ্বেই; তবে খাদ্যের প্রাচুর্য ও অন্যান্য অনুকূল পরিবেশের কারণে তারা সেখানে চলে যায়। পূর্বপুরুষের ভিটায় তারা প্রতিবছর একবার আসে। তবে পাখিদের প্রথম আবির্ভাব যেখানেই হোক না কেন; বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, খাদ্য ও পরিবেশগত সুবিধার জন্য তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশান্তর হয়।

বস্তুত প্রচণ্ড শীতে স্ববাসে যখন বাঁচা-মরার প্রশ্ন দেখা যায়, দেখা দেয় খাদ্য ও আশ্রয়ের চরম সঙ্কট; তখন শীতপ্রধান দেশের পাখিরা অতিথি হয়ে আসে আমাদের দেশে। হিমালয়, সাইবেরিয়া, আসাম, ফিলিপাইন্স, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ পশ্চিম চীনের মালভূমি, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, তিব্বতের উপত্যকা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে প্রতিবছর শীতের প্রকোপে পাখিরা এখানে আসে।

পরিযায়ী পাখিদের একত্রিত উড্ডয়ন। ছবি: এবি সিদ্দিক

একটু উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও শ্যামলিমার আশায় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে পরিযায়ীরা। খুঁজে নেয় নির্জন স্থান, জলাশয় ও বনাঞ্চল।

দুর্ভাগ্যজনক হলো, এ সকল পরিযায়ী পাখিরা এদেশে অতিথি হয়ে থাকতে পারছে না; এক শ্রেণীর শিকারীর হাতে তারা শিকার হচ্ছে। পাখিরা মানুষের কাছে একসময় বিস্ময় হিসেবে থাকলেও আজ তা কারও কারও কাছে সৌখিন খাবারে পরিণত হয়েছে। অতিথি পাখি শিকার করা হলে ভবিষ্যতে হয়তো এদের আসা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাধিক প্রজাতির পাখি রয়েছে, এর মধ্যে দুই শতাধিক প্রজাতির রয়েছে দেশান্তরী বা পরিযায়ী পাখি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব পাখি ৩/৪ মাসের জন্য আশ্রয় নেয়। উড়ে বেড়ায় হাওর, বিল ও বিভিন্ন জলাশয়ে। রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য।

 

;

পরিযায়ীরা এসেছে অনেকটা পথ পেরিয়ে



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ডানায় আকাশ দখল করে রেখেছে লেঞ্জা হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

ডানায় আকাশ দখল করে রেখেছে লেঞ্জা হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

পাখিরা কেন ‘পরিযান’ করে -এর সঠিক কারণ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা কিছু তত্ত্ব উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক গবেষক বিভিন্ন ধরনের উপাত্ত আবিষ্কার করেছেন। যে কারণই থাকুক না কেন শীত আসলে পাখিরা আসবেই -এটাই নিয়ম। প্রধানত শীতের হাত থেকে বাঁচতেই পাখিরা পরিযান করে। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো অর্থাৎ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চলে শীত যখন জেঁকে বসে তখনই পাখিরা পরিযান করে উষ্ণ এলাকার দিকে চলে আসে।

আবার উষ্ণ এলাকায় গরম পড়ার আগেই তারা ফিরে যায় উত্তরের দিকে। শীত আসতে না আসতেই সুদূর তিব্বত, মালয়, সাইবেরিয়া, লাইবেরিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমাদের এই চির সবুজের দেশে এরা আসে।

এরা আসলে ‘পরিযায়ী পাখি’ (মাইগ্রেটরি বার্ড)। মানুষের বেঁধে দেয়া সীমানা ডিঙিয়ে পাখিরা ছড়িয়ে পড়ে। গোটা পৃথিবী যেন তাদের এক দেশ, এক ঘর এখানে কোন বন্ধন নেই। পাখিরা আসে মনের সুখে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে তাদের তো আর অনুমতি লাগে না।

প্রকৃতি তখন তাদের আগমনের প্রত্যাশায় প্রহর গুণতে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের দেখে কে না মুগ্ধ হয়। কত বাহারি রঙের পাখি! বাংলার নদ-নদী বিল-ঝিল হাওর-বাওর পাখিদের যে খুব চেনা-জানা, কতই না ভালবাসার অনুভূতি প্রকাশ করে কলকাকলিতে। হাওর-বাওর, বিল-ঝিল, জলাশয়ে যেন উৎসব লেগে যায়। চার ধারের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে মধুর কাকলিতে পাখিরা মুখর করে তুলে। পাখিরা ভেসে বেড়ায় পানির উপরে আর দোল খেতে থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কী অপরূপ দৃশ্য!

 আপন মনে উড়ছে টিকি হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

প্রতিবছর ঠিক একই সময়ে গৃহ থেকে যাত্রা শুরু করে আবার ভ্রমণ শেষে একই স্থানে একই দিনে ফিরে আসে। ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে যুগের পর যুগ। কীভাবে ঘটে প্রক্রিয়াটি। বছরের ঠিক কোন সময়ে দেশান্তরে যেতে হবে, আবার ঠিক কখন ফিরতে হবে। তা তারা বুঝে কীভাবে? আকাশের বুকে পাথটাই বা চিনে রাখে কেমন করে! বিস্ময়ের অন্ত নেই।

আকাশ পথে তাদের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ মাইল। তখন এই চর্বি খাদ্য হিসেবে কাজ করে। তারা এক নাগাড়ে ৯০ থেকে ১২০ ঘন্টা পর্যন্ত ওড়ে। বিজ্ঞানীরা রাডার যন্ত্রে দেখেছেন পাখিরা দেশান্তর হয় আকাশের ৫ হাজার ফুট থেকে ১০ হাজার এমনকি ১৫ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে।

শীতে আমাদের দেশে যে সমস্ত পরিযায়ী পাখিরা আসে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: লেঞ্জা হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, সিঁথি হাঁস, খুস্তে হাঁস, রাজ সরালি হাঁস, নাকটা, চখাচখি, বালি হাঁস, মেটে হাঁস, বাঙ্গি হাঁস, গিরিয়া হাঁস প্রভৃতিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। এরা উড়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকির হাওর, বাইক্কা বিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জলাশয়, ছোট-বড় নদীর মোহনায় ইত্যাদি স্থানে।

;

জানকিছড়ার উঁচু ডালে ‘জার্ডনের বাজ’



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ডালে বসে রয়েছে ডর্জানের বাজ। ছবি: সাঈদ জামাল

ডালে বসে রয়েছে ডর্জানের বাজ। ছবি: সাঈদ জামাল

  • Font increase
  • Font Decrease

জানকিছড়া বিটের উঁচু গাছের উপর এক অচেনা পাখি। এই বিট শ্রীমঙ্গল উপজেলার সংরক্ষিত একটি বন। পাখিটি ডালের উপর বসেই রইল। খুব ভালোভাবে না দেখতে পারলেও মাথার উপরের ঝুঁটিকে দেখে বুঝতে অসুবিধে হলো না যে এটি ‘জর্ডানের বাজ’। সে অবসর সময় পার করছে গাছের ডালে! অথবা শিকারী চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে চারদিক।

প্রথম ডর্জানের বাজ দেখার এ অনুভূতি সব রৌদ্রক্লান্ত ব্যথা ভুলিয়ে দিল। বিশেষ করে তার ঝুঁটিসৌন্দর্য মরে রাখার মতো। যা তাকে রাজার মর্যাদায় অভিসিক্ত করে রেখেছে। স্মৃতিতে নতুন পাখি দেখার সেই উজ্জ্বল সঞ্চয় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত পাখি গবেষক, লেখক এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, ‌‌‌‘জর্ডানের বাজের ইংরেজি নাম Jerdon’s Baza এবং বৈজ্ঞানিক নাম Aviceda jerdoni। এরা মিশ্র চিরহরিৎ সবুজ বনের পাখি। শুধুমাত্র সিলেট আর চট্টগ্রামের বন ছাড়া দেশের কোথাও এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের প্রাকৃতিক বনগুলোর বিরামহীন ধ্বংসের মাঝে যে কয়টা জর্ডানের বাজ এখানো টিকে আসে এগুলো আমাদের জন্য অমূল্য ধন। আমি নিজেও একটা জর্ডানের বাজ থেকে সীমাহীন উচ্ছ্বাসিত হয়ে পড়ি।’

প্রাপ্তি স্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমাকালেঙ্গা বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, দুধ পুকুরিয়া ধোপাছড়ি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য এসব ছোট ছোট বনেই ওরা এখনও একটা-দুটো কোনোক্রমে টিকে আছে। এর বেশি নেই কিন্তু। এগুলো সবই ছোট-ছোট বন, খন্ড বন; ধ্বংস হয়ে একেবারে কোনো রকম দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানেই এই পাখিটির বসবাস। জর্ডানের বাজ আমাদের দেশেরই পাখি। সারা বছর আমাদের দেশেই ওরা থাকে। বাসা তৈরি করে ছানা ফোটায়।’

পাতার আড়ালে পাখিটাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ছবি: সাঈদ জামাল

পাখিটির খাবার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওরা কীট-পতঙ্গ এবং পোকা ধরে ধরে খায়। এই সব বনগুলোর প্রকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার ফলে এবং ব্যাপকহারে পর্যটক পরিভ্রমণের ফলে ওর খাবারও অনেক কমে গেছে। আমাদের দেশে বাজ প্রজাতির মধ্যেই এই জর্ডানের বাজটিই আমরা এখনো পাহাড়ি বনে দেখতে পারি। যদিও তার সংখ্যা অত্যন্ত কম। তবে অন্যান্য বাজগুলোকে তো দেখতেই পাই না। সে হিসেবে বলা যেতে পারে জর্ডানের বাজটাই তুলনামূলকভাবে ভালো আছে।’

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায়, জার্ডনের বাজ আমাদের দেশের বিরল আবাসিক পাখি। এদের দৈর্ঘ্য ৪৮ সেমি এবং ডানার দৈর্ঘ্য ৩০.৫ সেমি। দেহ বাদামি। মাথার পেছনে খাড়া ঝুঁটির আগা সাদাটে। এরা উচু স্বরে বিড়ালের মতো : ‘পি-আউ’ কিংবা ‘কিকিয়্যা...কিকিয়্যা’ এভাবে ডাকে।

এরা চিল, শকুনের মতো মানুষের বর্জ্য খেলে বাঁচে না। শুধুমাত্র বনের পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ, ছোট ছোট সরীসৃপ খায়। এরা পুরোপুরিভাবে বনের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। ফলে বন যেহেতু প্রায় শেষ করে দিয়েছি আমরা তাই ধীরে ধীরে বনের উপর নির্ভরশীল পাখিগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে জানান এই পাখি বিজ্ঞানী।

;