চোখের সামনে থেকেও অচেনা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ও শেষ শহীদের সমাধিসৌধ



খন্দকার আসিফুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবিঃ বার্তা২৪.কম

ছবিঃ বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

যানবাহনের যানজট আর মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত মৌচাক মোড়ের ঠিক মধ্যভাগে চোখে পড়বে সাদা টাইলসের মোড়ানো একটি স্তম্ভ। এই মোড় দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। কিন্তু ৯০ ভাগ মানুষই জানেন না এই স্তম্ভটি আসলে কিসের এবং কেন! স্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ফারুক ইকবাল এবং শেষ শহীদ তসলিম উদ্দিনের সমাধিস্থল।

দুই শহীদের সমাধিস্থলের তিন পাশ দিয়ে চলাচল করা সাধারণ মানুষেরও বা কি দোষ। খুব কাছে গিয়ে না দেখলে সাধারণ চোখে স্থানটি দেখে বুঝারও উপায় নেই এখানেই শুয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং শেষ শহীদ। সমাধিসৌধের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা আবর্জনা আর মোটরসাইকেল পার্কিং দেখে মনে হবে যেন এটি একটি অবহেলিত সাধারণ নির্মাণ।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ, পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে ছাত্র-জনতার মিছিল নিয়ে ঢাকার রামপুরায় অবস্থান করছিলেন আবুজর গিফারী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাত্রলীগ নেতা ফারুক ইকবাল। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। শহীদ হন ফারুক ইকবাল। সেসময় মৌচাক মোড়ে সমাহিত করা হয় তাকে।

ফারুক ইকবালের পাশেই সমাহিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ শহীদ কিশোর তসলিম উদ্দিনকে। সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ১৭ই ডিসেম্বর ঘাতকদের হাতে নিহত হন।

মুক্তিযুদ্ধের ৩৭ বছর পর ২০০৮ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন শহিদদের সমাধিস্থলে নির্মাণ করেন সমাধিসৌধ। তবে সমাধিসৌধটি দেখভালের দায়িত্ব কাউকে না দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়।

এই দুই বীর শহিদের স্মৃতি এবং তাদের সমাধিসৌধের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় শহীদ ফারুক ইকবালের বড় ভাই এএনএম জুলফিকার হারুন ও শহীদ তসলিম উদ্দিনের ভাই জাহাঙ্গীর হাসান মানিকের সাথে।

শহীদ ফারুকের বড় ভাই জুলফিকার হারুন বার্তা২৪-এর সাথে আলাপকালে ভাইয়ের সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ফারুক যেদিন শহীদ হয় পল্টন ময়দানে সেদিন ছাত্রলীগের মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধুর আসার কথা ছিল। সেই মিটিং অরগানাইজ করার জন্যই সে নাস্তা না করেই সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আবুজর গিফারী কলেজের সামনে থেকে ফারুক যখন মিছিল নিয়ে রামপুরার দিকে রওনা হয় তখন আমি সেখানেই ছিলাম। আমি বাসায় চলে আসলাম। একটু পর একজন এসে বলল রামপুরায় একজনকে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করেছে। এই কথা আম্মা শুনে বলে উঠল ‘আল্লাহ জানেন কোন মায়ের বুক জানি খালি হল’। আমি বাসা থেকে বের হয়েই দেখি একটা ছেলে ফারুকের পায়ের জুতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দেখেই বুঝে ফেললাম ঘটনা কি! এটাই ছিল ফারুককে আমার শেষ দেখা। এভাবেই ভাই ফারুকের শহীদ হওয়ার ঘটনা বলছিলেন হারুন। এবং জানান সেদিন ফারুকের জানাজায় ছাত্রনেতা বীরবিক্রম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আ স ম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম না থাকা নিয়ে জুলফিকার হারুন বলেন, পরিবার থেকে আমরা কখনও আবেদন করিনি তালিকায় নাম তোলার জন্য। এরশাদ সরকারের আমলে একবার একটা ফরম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আব্বা আবেদন করতে দেননি। আব্বার একটাই কথা ‘আমার ছেলে শহীদ হইছে, এটাই সম্মানের। এর বিনিময়ে সরকার থেকে আমরা কোনো সুবিধা নেব না। এরপর আর আবেদন করা হয়নি। সরকার থেকেও আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। শুধুমাত্র ৩ মার্চ এলেই সমাধিসৌধে ফুল দিয়ে, একটু আলোচনা সভা করে সবাই আবার ভুলে যায়। তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদকে তুলে ধরার জন্য সরকার যদি কোনও ব্যবস্থা নিতো তাহলে সবাই তার ব্যপারে জানতে পারতো।

৩ মার্চ যখন শহীদ ফারুক ইকবালের মরদেহ বাড়িতে আনা হয় তখন কফিনের সামনে পেছনে হাজার হাজার মুক্তিকামি মানুষের মিছিল। কে জানতো বাড়ির উঠানে তখন অবস্থান করছিল দেশ প্রেমিক আরেক শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ তসলিম উদ্দিন- ঠিক এভাবেই নিজের ভাইয়ের গল্পটা শুরু করলেন জাহাঙ্গীর হাসান মানিক।

শহীদ তসলিম উদ্দিনের ভাই জাহাঙ্গীর হাসান মানিক বলেন, হাজার হাজার জনতা যখন স্লোগান দিতে দিতে ফারুক ভাইয়ের (শহীদ ফারুক ইকবাল) মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসলো এই দৃশ্য দেখেই আমার ১৩ বছরের ভাই মাকে বলে ‘দেখ মা, ফারুক ভাই কত ভাগ্যবান! হাজার হাজার জনতা তাঁর মরদেহ নিয়ে মিছিল করছে! তাঁর মৃত্যু নতুন ইতিহাসের সূচনা করছে!’ মা ধমক দেয়, "চুপ কর! কী সব অলুক্ষণে কথা কস!" মায়ের ধমকে ভাই তখন চুপসে যায়।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে শুরু হয় পাকবাহিনীর বর্বরতা, শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। সে রাতে ঢাকার যে আগুন তসলিম দেখেছে, সেই আগুনই তসলিমের মধ্যে জন্ম নেয় আগ্নেয়গি। মা-বাবা লক্ষ করলো কেমন জানি চুপচাপ হয়ে গেল সে। আগের মত তার মধ্যে চঞ্চলতা নেই, আবার কারো সঙ্গে ঠিক মত কথাও বলেনা। জানতে চাইলেও ভাই মা-বাবাকে কিছু বলেনি। এভাবে চলতে থাকার মধ্যে মার্চ কিংবা এপ্রিলে হঠাৎ একদিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তসলিমকে। বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এর কয়েকদিন পরই জানা যায়, তৎকালীন আমাদের এলাকারই আলাউদ্দিন সুইট- এর ম্যানেজার আজিম খোকন, বাচ্চ্‌ ও তসলিমকে যুদ্ধে পাঠাতে সহযোগিতা করে।

১৩ বছরের তসলিম যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করছে। সে বাসায় না থাকায় এদিকে শহরের রাজাকারদের সন্দেহ তসলিম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাই ক'দিন পরপরই বাসায় পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে এসে আব্বাকে খুব বিরক্ত করতো। ৮ বার আব্বাকে আর্মিরা তুলেও নিয়ে গেছিল। তসলিমের কোনও খোঁজ না পাওয়ায় আমাদের বাসা জ্বালিয়েও দিয়েছিল। আমাদের অন্যত্র গিয়ে থাকতে হয়েছে এই পাকিস্তানিদের অত্যাচারে।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ হয়। তসলিমরা জয়ী হয়। একটি নতুন সকাল ১৬ ডিসেম্বর। দেশ আজ স্বাধীন। জনতার বিজয়ের উল্লাসের সাথে পৃথিবীর সব খুশি যেন বাবার মধ্যে। বাবার অপেক্ষা শেষ হয় ১৭ ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধাদের বরণ করতে এলাকার মানুষ বিজয় স্লোগান দিচ্ছে। একে একে তসলিমদের দলের প্রধান মোশাররফসহ আরও অনেকেই ফিরে এসেছে। কিন্তু তসলিম আর ফিরল না।

যে ফারুক ভাইয়ের মরদেহ দেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তসলিম, মৌচাক মোড়ে সে ফারুক ভাইয়ের কবরের পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়- বলেই চোখের পানি মুছলেন শহীদ তসলিম উদ্দিনের ভাই জাহাঙ্গীর হাসান মানিক।

এভাবেই ঢাকার মৌচাক মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং শেষ শহিদের সমাধিস্থল পাশাপাশি।

তবে ফারুক-তসলিমের সমাধিসৌধের বর্তমান অবস্থা দেখে কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই দুই শহীদের দুই ভাই জানান, যদি সরকার থেকে সমাধিসৌধের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ না করা হয় তাহলে দুই পরিবার থেকেই যতটুকু সম্ভব করা হবে। অন্তত সমাধিসৌধের স্থানটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সেখানে বড় করে দুই শহীদের নামফলক লাগাবেন। যাতে মানুষ দূর থেকেই দেখতে পারে এবং ফারুক-তসলিম সম্পর্কে জানতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে ‘কুৎসিত কুকুর’ এটি!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কুকুরের তথ্য যেমন রয়েছে তেমনি এবার সবচেয়ে কুৎসিত আকৃতির কুকুরেরও তথ্য মিলেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

স্কাই নিউজ বলছে, চলতি বছরের ২১ জুন (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকু্রের প্রতিযোগিতা বসেছে। ওই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ওয়াইল্ড থাং নামে আট বছর বয়সী একটি কুকুর এ তকমা পেয়েছে।

তবে এবারই ওয়াইল্ড থাং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি। এর আগেও ৫ বার এমন প্রতিযোগিতায় প্রাণীটি অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

ওয়াইল্ড থাং এবং তার মালিক অ্যান লুইস। ছবি: সুমিকো মুটস / এনবিসি নিউজ

ওয়াইল্ড থাং এর মালিক অ্যান লুইস বলেন, ওয়াইল্ড থাং কুকুরছানা হিসাবে একটি ভয়ানক রোগ ক্যানাইন ডিস্টেম্পারে সংক্রমিত হয়েছিল। কোন ক্ষতি ছাড়াই অনেক চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার দাঁত বেশি বৃদ্ধি না পাওয়ায় জিহ্বা বাইরে থাকে এবং তার সামনের ডান পা ২৪/৭ প্যাডেল আকারে থাকে।

পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে ৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫১১ টাকা) দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকুর প্রতিযোগিতা প্রায় ৫০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটি আকর্ষণীয় করার জন্য কুকুরগুলোকে বিশেষ এবং অনন্য করে সাজিয়ে তোলা হয়।

;

ট্যাক্সি চালকের অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সংবাদটি পড়তে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে শুধু শিক্ষিতরাই সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন! কারণ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় এক ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীর সাথে অনর্গল ইংরজিতে কথা বলছেন।

ঘটনাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম এনডিতিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এনডিটিভি বলছে, ওই ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীদের সাথে ইংরেজি কথা বলার পাশাপাশি কিভাবে আরও দক্ষ হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ধারণ করা ভিডিওটি ভূষণ নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, "এমন ঘটনা দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরে তার সাথে কথা বলার সময় কিছুটা তোতলা হয়েছিলাম। তার ইংরেজিতে সাবলীলতা দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।"

পরে তার সাথে এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো।

ট্যাক্সি চালক বলেন, ইংরেজি শেখা থাকলে আপনি লন্ডন এবং প্যারিসের মতো উন্নত দেশে যেতে পারবেন। এটা বিশ্বব্যাপী ভাষা। এ কারণে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিডিওটিতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "তার কথা বলার ধরণ ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের মতো শোনাচ্ছেন"।

অপর একজন লিখেছেন, "১৬ বছরের শিক্ষার পর তার ইংরেজি আমার চেয়ে অনেক ভালো।"

;

‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার মেঘনা নদীর দেখা মেলে চুনা নদীতে



মৃত্যুঞ্জয় রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাতক্ষীরা
ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।

আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।

দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।


ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।

বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।

ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।

সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,

পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের প্রিয় স্বাধীনতা কবিতার লাইনের সঙ্গে মিল রেখে বলতে হয়-

শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে থাকা মানুষগুলোর কথা।
চুনা নদী পাড়ি দেবো, ডিঙ্গি নৌকা দিয়া।

আবার আমি যাবো আমার উপকূলের গাঁয়ে।
কাজের জন্য ছুটে বেড়াই, চুনা নদীর বাঁকে।

বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় লোনা পানির ক্ষত।
সেই চরের মানুষগুলো, এখনো লড়াই করে বাঁচে।

বর্ষাকালের দুপুর বেলা। আকাশে কালো মেঘ খেলা করছে! নদীতে পানি ঢেউ খেলছে! ভেসে আসছে, গেট থেকে জল আসার শব্দ। নদীর এপার ওপার হচ্ছেন ডিঙা নৌকা দিয়ে পাড়ে থাকা মানুষগুলো। ছুটে চলেছেন নারী-পুরুষ একে একে চুনা নদীর তীরে কাজের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। রাতের আঁধারে পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচেন এই চুনা নদীর পাড়ের মানুষগুলো।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে বসবাস নিত্যসংগ্রামী মানুষদের, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম


এখানকার মানুষজন লড়াই সংগ্রাম করে এখনো টিকে আছেন। টিকে থেকে তাদের রোজ কাজের সন্ধানে অবিরাম ছুটে চলতে হয়। বর্তমানে ভাঙাগড়ার জীবনে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে বসবাস করছেন তারা। শ্যামনগর উপজেলার কলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত চুনা নদীর চরটি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারানো ২০-২৫টি জেলে পরিবারের ঠাঁই হয়েছে এখানে। বছরের পর বছর এই চরকে আগলে বসবাস করলেও সব সময় লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

তাদের একজন ৩৫ বছর বয়েসি রমেশ চন্দ্র মণ্ডল। দুর্যোগে সহায়-সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নেন চরের এক কোণে। সেখানে মাটির ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ভর করে থাকতে হয়, স্ত্রীর ওপর। তার কষ্টের বিনিময়ে জোটে তাদের একমুঠো ভাত। স্ত্রী একাই লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে এই চরে।

বনে পশুপাখির, জলে কুমির আর স্থলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এভাবে তাদের জীবন প্রবহমান। তাদের জীবন চলার পথে নেই কোনো বিরাম। সংগ্রাম করে টিকে থাকেন সবাই। একে একে সব কিছু হারিয়েও এখানো টিকে থাকতে হয় তাদের।

রমেশের মতো একই অবস্থা ষাটোর্ধ্ব ফকির বিশ্বাসের। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয় তাকে। একবেলা কাজ করলে অপর বেলা কাটে অসুস্থতায়!

ফকির বিশ্বাস বার্তা২৪কমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আশ্রয়ের দুই যুগ লড়াই সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। বরং প্রতিবছর ছোটবড় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি। লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে বারংবার!

জীবন কাটে যুদ্ধ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় পেতে...চুনা নদীর তীরের মানুষের জীবন, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম

চুনা নদীর চরে মাছের পোনা গুনতে দেখা যায় নমিতা রাণী রায়কে। নমিতা রাণী রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সবসময় চিন্তার ভেতরে থাকতে হয় আমাকে। নদীতে কুমির আর বনে বাঘের আতঙ্ক! তারপর ডাঙায় লোনা পানির ক্ষত। লবণাক্ততায় ভরা জীবনকাল। তারপর চরটি নদীর ধারে হওয়াতে একটু জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। এই লড়াই-সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি সেই প্রথম থেকে। মাছের পোনা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। আমরা সবাই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে টিকে আছি।

নমিতা রাণী রায় বলেন, যখন বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সময় অনেক কষ্টে চর এলাকার সবার দিন কাটে। শিশু সন্তানদের সবসময় নজরে রাখতে হয়। অন্যথায় নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা!

নিত্যদিনের লড়াই-সংগ্রাম

লড়াই সংগ্রামের শেষ নেই উপকূলে থাকা মানুষজনের। সর্বশেষ, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে নদীর জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় তাদের বসতঘর। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বলে কথা না! যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানিতে তাদের বসতঘর তলিয়ে যায়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না তাদের। এমনও অনেক সময় গেছে যে, দিনের পর দিন উনুনে আগুন দিতে পারেননি তারা। ওই সময় শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এমনও দিন গেছে, যেদিন তাদের শুধুমাত্র পানি পান করে বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়েছে।

ঘরছোঁয়া জলের বানের দিকে তাকিয়ে থাকেন চুনা নদীর তীরের মানুষজন আর ভাবেন আর কত সংগ্রাম, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়,বার্তা২৪.কম

সত্যি, তাদের ভাষ্যের সঙ্গে বড়ই মিল কবি শামসুর রাহমানের ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার! ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটা একটা বড় প্রশ্নেরই বটে! জঙ্গল, বন্যা, নদীভাঙনের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আর অভাবে চরের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন। তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এসব দুর্যোগে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। আবারও লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরেও দাঁড়ান তারা।

;

ব্রহ্মপুত্রের বানভাসি নারীদের দুঃখগাথা!



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

'খ্যাতা-কাপড় সইগ ভিজি গেইছে, পাক-সাকও (রান্না-বান্না) করতে পারি না। আমাদের দেখার মতো মানুষ নাই। স্বামীর জ্বর আসছে, ওষুধ ও নাই। বাচ্চা গুল্যাক সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া নাগে। জ্বর নাগি আছে। যে ঘরত থাকি স্যাটে গরু ছাগলও থাকে। সারাদিন গরু ছাগলের ময়লা পরিষ্কার করতেই যায়। এই বানের পানিতও হামার বইসনা(অবসর) নাই’- কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া বেগম।

তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে। ১২ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদিপশু রাখার উঁচু টিলায়।

অপরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন রাবেয়া বেগমের মেয়ে শাহানাজ বেগম।

শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন শাহানাজ বেগম, ছবি- বার্তা২৪.কম

শাহানাজ বেগম বলছিলেন, 'হামার তো কষ্ট! সংসার হামরা বান হইলেও সামলাই, খরা হইলেও সামলাই। নিজে কম খাইলেও বাচ্চাদের জন্য রান্না করতে হয়। বাচ্চাদের দেখাশোনা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা করতে দিন কাটে। রাইতে পানি বাড়ে কি না দেখার জন্যে জাগি থাকা নাগে। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

শুধু এই দুই নারী-ই নন, কুড়িগ্রামের বানভাসি পরিবারগুলোর নারীদের চিত্র একই।

বন্যাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়েন পুরুষেরা। দিনের অধিকাংশ সময় কেউ বাজারে কেউ বা নৌকায় বসে শুয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে নারীদের ব্যস্ততা আরো বাড়ে এবং সংসারের কাজ করার প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর পার্বতীপুরে ৩০টির মতো পরিবারের বাস। সেখানের প্রায় সব বাড়িই পানির নিচে। সেখানে গেলে ওই চরের বাসিন্দা সামিনা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায় ঘরের ভেতর একটি মাচার ওপরে।

দুপুর ২টায় দিনের প্রথম রান্না করছেন তিনি। বাইরে নৌকায় বসে সন্তানেরা অপেক্ষা করছেন কখন রান্না শেষ হবে!

সামিনা বেগম বলছিলেন, রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই, ছবি- বার্তা২৪.কম

সামিনা বেগম বলছিলেন, ‘রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই। খালি ভাত আন্দি নুন দিয়া খামো। স্বামীর কাম বন্ধ। তরকারি কেনার ট্যাকাও নাই। হামাক কি কাঈও কিছু দিব্যার নয়’!

একই চরের রেজিয়া বেগম নৌকায় বসে স্বামীর বাজার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। খাবার পানিও বাজার করে আনলে তবেই রান্না হবে।

রেজিয়া বেগম বলেন, সকালে পন্তা খাইছি। স্বামী ২শ টাকা নিয়া হাটে গেইছে। কী যে আনে! নিয়া আইসলে রান্না হবে। বাচ্চার অসুখ, সারাক্ষণ পাহারা দিয়্যা রাখতে হয়। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন বলছে, রোববার (৭ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০১ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। সরকারি হিসাবেই প্লাবিত এলাকায় ৯৭ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একদিনের ব্যবধানে পানিবন্দি মানুষ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার।

এদিকে, পানিবন্দি মানুষের খাদ্যকষ্ট লাঘবে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার পর্যন্ত জেলার দুর্গত মানুষদের জন্য ৩৮৭ মেট্রিক টন চাল এবং ১৮ হাজার ৯৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ধরলা ও দুধকুমারের পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের দিকে আমরা নজর দিয়েছি। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে দুধকুমার ও ধরলা নদীও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রোববার (৭ জুলাই) দুপুরে দেওয়া বার্তায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

তবে আগামী ৭২ ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

;