মামলার নৌকা!

রুহুল সরকার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম)
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুড়িগ্রামগামী এই নৌকা দুটির বেশির ভাগ যাত্রী মামলা মোকদ্দমা সংক্রান্ত কাজে যাতায়াত করে। তাই নৌকা দুটিকে স্থানীয়রা বলে মামলার নৌকা।

জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে নদীবিচ্ছিন্ন রৌমারী উপজেলা। প্রতিদিন এই উপজেলা শহর থেকে মামলা মোকদ্দমা, অফিসিয়াল ও চিকিৎসাজনিত কাজে জেলা শহর কুড়িগ্রামে যাতায়াত করতে হয়। জেলা শহরে যাতায়াতে দীর্ঘ নৌ পথ পাড়ি দিতে হয় তাই দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় নৌকায়।

শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ধীরগতির নৌকায় নদী পার হয়ে একদিনে কাজ শেষ করে বাড়িতে ফেরাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। রাত্রি যাপন করলে হোটেলে থাকা খাওয়াসহ খরচ হয় অতিরিক্ত টাকা। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তসহ সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য যা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্বল্প সময়ে নৌপথ পাড়ি দিয়ে কিভাবে দ্রুত কুড়িগ্রাম পৌঁছানো যায় এবং কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরা যায় ভাবতে থাকেন বন্দবের গ্রামের আবু বক্কর। তিনি স্থানীয়দের সাথে পরামর্শ করে বন্দরের ইউনিয়নের বলদমারা ঘাট থেকে উলিপুর উপজেলার ফকিরের হাট ঘাট পর্যন্ত একটি নৌকা চালানোর সিন্ধান্ত নেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ ২০১৮ সাল থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টায় বলদমারা ঘাট থেকে একটি নৌকা যাত্রী পারাপার শুরু করে। নৌপথ পাড়ি দিয়ে ফকিরের হাট ঘাট থেকে অটোরিকশা বা অটোভ্যানে কুড়িগ্রাম পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ওই দিনই বাড়ি ফিরতে পারে যাত্রীরা।

বলদমারা ঘাট থেকে নতুন নৌ রুট চালু হওয়ার পর রৌমারী নৌ ঘাট কর্তৃপক্ষ সকাল সাড়ে ৬টায় আরেকটি নৌকা চিলমারী ঘাট পর্যন্ত চালু করে। সকালবেলা চলাচলকারী এই দুটি নৌকার বেশিরভাগ যাত্রী মামলা সংক্রান্ত কাজেই কুড়িগ্রাম যাতায়াত করে। বদলমারা ঘাট থেকে ফকিরের হাট যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। যাত্রী প্রতি ভাড়া ৫০ টাকা। রৌমারী ঘাট থেকে প্রতিদিন চিলমারী বন্দরের উদ্দেশ্যে সকাল সাড়ে ৬টায় একটি নৌকা ছেড়ে যায় এই পথে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। প্রতি যাত্রীর ভাড়া ৭০ টাকা। নৌ চালক ও যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এই তথ্য। রৌমারী উপজেলা শহর থেকে এই ঘাট দুটির দূরত্ব ৩ থেকে ৪ কিলোমিটারের মধ্যে।

রবিবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বদলমারা ঘাটে কথা হয় নৌ যাত্রী আব্দুল হালিমের সাথে। কুড়িগ্রাম কেন যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমি নিয়ে ভাইদের সাথে বিরোধ কোর্টে মামলা আছে। আবু শামা নামের একজনের সাথে কথা হলে তিনিও জানান মেয়ের যৌতুক মামলার তারিখ পড়েছে তাই মেয়েকে নিয়ে কুড়িগ্রাম যাচ্ছি। সোমবার রৌমারী নৌঘাটে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা গেছে তিনি মাদক মামলার আসামি, কোর্টে হাজিরা আছে তাই কুড়িগ্রাম যাচ্ছেন। অফিসিয়াল কাজে রৌমারী থেকে কুড়িগ্রাম যাচ্ছেন তরিকুল ইসলাম নামের এক এনজিও কর্মী। তিনি বলেন ১১টায় মিটিং আছে জেলা অফিসে তাই সকালের এই নৌকায় যাচ্ছি মিটিং শেষে আজকেই আবার বিকেলে রৌমারী ফিরে আসব।

বলদমারা ঘাটের ইজারাদার আবু বক্করের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এই নৌরুটে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত যাত্রী চলাচল করে। রৌমারী ঘাট ইজারাদার নাছির উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে তিন শতাধিক যাত্রী পারাপার হয় এই নৌরুটে। সকাল সাড়ে ৬টার নৌকায় সাধারণত যাত্রী কিছুটা কম হয়। যাদের খুব ইমারজেন্সি দরকার হয় তারাই এই নৌকায় চলাচল করে। বদলমারা ঘাটের নৌকার মাঝি জয়নাল এবং শমসেরের সাথে কথা বলে জানা গেছে এই নৌরুটে প্রায় ৫৬টি নৌকা আছে একবার সিরিয়াল পেতে ১ মাস পর্যন্ত সময় লাগে প্রতিটি টিপে খবচ বাদ দিয়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

রৌমারী উপজেলার তরুণ ব্যাবসায়ী এবং ক্রীড়া সংগঠক আবু সাইদ কাকনের সাথে মামলার নৌকা নামকরণ নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, স্থানীয়রা মজা করে এই নৌকাকে মামলার নৌকা বলে। তিনি আরা জানান, সকালে দুটি নৌকা যাতায়াত করায় সাধারণ মানুষ খুব উপকৃত হচ্ছে। এক দিনেই নৌপথে কুড়িগ্রাম গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বাড়িতে ফেরা যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :