শুভ জন্মদিন, ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা

সাফাত জামিল, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
১৯৬০ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন ম্যারাডোনা

১৯৬০ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন ম্যারাডোনা

  • Font increase
  • Font Decrease

“মানুষ শুধুমাত্র তখনই সফল হয়, যখন সে কঠোর পরিশ্রম করে। সাফল্যের সাথে ভাগ্যের কোনো সম্পর্ক নেই।”

১৯৬০ সালের আজকের দিনে বুয়েন্স আইরেসের লানুসে জন্ম নেওয়া আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার বাণীটি যেন তাঁর নিজ খেলোয়াড়ি জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বল পায়ে দক্ষ নিয়ন্ত্রণ, চিতার বেগে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়াসহ আরো অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্ত আর গোল বিশ্বসেরা ফুটবলারের বিতর্কে তাঁকে রেখেছে বেশ উঁচু স্থানে। কারো মতে, শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় জ্বলজ্বলে তারাটি একমাত্র ম্যারাডোনাই। আবার কেউ কেউ পেলে, লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে সে জায়গার যোগ্য দাবিদার মনে করেন। তবে ভালো-মন্দ যেভাবেই হোক, ফুটবল বিশ্বকে সবসময় বিমোহিত করেছেন একসময়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ম্যারাডোনা।

মাত্র দুই দশকের পেশাদার ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা খেলেছেন ছয়টি ক্লাবে। ষোল বছর বয়সে পা দেবার ঠিক দশদিন আগে নিজ শহরের ক্লাব আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে অভিষেক ঘটে তাঁর, বর্তমানে যাদের হোম গ্রাউন্ডের নামকরণ হয়েছে ম্যারাডোনারই নামে। সেদিন আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশনের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ডটি নিজের করে নেন ১৬ নম্বর জার্সির ছোট্ট ডিয়েগো। হুয়ান ডমিঙ্গোর দু পায়ের মাঝ দিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া ম্যারাডোনার সেই দুর্দান্ত ‘নাটমেগ’ হয়ে গিয়েছিল ইতিহাসেরই অংশ।

◤ ম্যারাডোনার সেই দুর্দান্ত নাটমেগ ◢


আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে পাঁচ মৌসুমে ১৬৭ ম্যাচে ১১৫ গোল করেন ম্যারাডোনা। পরবর্তীতে ৪ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার ফি-তে স্বপ্নের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেওয়া ডিয়েগোর সামনে প্রস্তাব ছিল রিভার প্লেটের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হবার। তবে সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেওয়া ম্যারাডোনা বোকার হয়ে অভিষেকেই পান জোড়া গোল। দারুণ এক গোল পান সে মৌসুমের প্রথম সুপার ক্লাসিকোতেও, যে ম্যাচে রিভারপ্লেটকে ৩-০ ব্যবধানে হারায় তাঁর ক্লাব। সফলতার ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে বোকার হয়ে প্রথম মৌসুমেই ম্যারাডোনা জিতে নেন আর্জেন্টাইন ঘরোয়া লিগে নিজের একমাত্র শিরোপা।

১৯৮২ বিশ্বকাপের পর শুরু হয় তাঁর বার্সেলোনা অধ্যায়। তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড ৭.৬ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার ফি-তে কাতালান ক্লাবটিতে যোগ দিয়ে কোচ সিজার লুইস মেনোত্তির অধীনে কোপা ডেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৩ সালে বার্নাব্যুর এল ক্লাসিকোয় বার্সাকে জিতিয়ে প্রতিপক্ষ দর্শকদের তুমুল অভিবাদন পান ম্যারাডোনা। হেপাটাইটিস আর গোড়ালির চোটে একসময় তাঁর বার্সা ক্যারিয়ারই পড়েছিল ঝুঁকির মুখে। তবে কার্যকরী পরিচর্যা আর পরিশ্রমে দ্রুতই মাঠে ফেরেন এই তারকা মিডফিল্ডার।

◤ বার্সেলোনার জার্সিতে ম্যারাডোনা ◢


১৯৮৩-৮৪ মৌসুমের শেষের দিকে বিলবাওয়ের বিরুদ্ধে কোপা ডেল রে-এর ফাইনালে ভয়ানক এক সংঘর্ষে জড়ান ‘এল ডিয়েগো’। চিরশত্রু মাদ্রিদের মাঠে ১-০ ব্যবধানে হারের দিকে এগোতে থাকা ম্যারাডোনা দর্শকদের বর্ণবাদী স্লোগান আর বিলবাও মিডফিল্ডার মিগুয়েল সোলার তির্যক মন্তব্যে ক্ষেপে যান। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সোলাকে গুঁতো মেরেই থামেননি, কনুই আর হাঁটু দিয়ে আঘাত করেন প্রতিপক্ষের আরো দুজনকে। বিলবাওয়ের বাকি খেলোয়াড়েরা ম্যারাডোনাকে ঘিরে ধরলে এগিয়ে আসে বার্সা দলও—যা পরে রুপ নেয় আরো বড় মারামারিতে।

পুরো ঘটনার চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে মাঠে এক লাখ দর্শকের পাশাপাশি আরো ছিলেন স্প্যানিশ রাজা হুয়ান কার্লোস। আর গোটা স্পেনের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ টিভিতে দেখেছে এই কাণ্ড। পরবর্তীতে মাঠে উপস্থিত দর্শকরা খেলোয়াড়, কোচ আর আলোকচিত্রীদের উদ্দেশ্য করে নানা রকম ধাতব বস্তু ছুড়ে মারে, যাতে আহত হয় প্রায় ৬০ জন। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় তাঁর দুই মৌসুমের বার্সেলোনা ক্যারিয়ার। ৫৮ ম্যাচে ৩৮ গোল করা ম্যারাডোনা আবারও গড়েন ট্রান্সফার ফি’র বিশ্ব রেকর্ড—এবার ১০.৪৮ মিলিয়ন ডলারে যোগ দেন সিরি আ ক্লাব নাপোলিতে।

নেপলসে দ্য গ্রেট ম্যারাডোনাকে বরণ করে নিতে হাজির হয় প্রায় ৭৫ হাজার দর্শক। তাঁদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতেও খুব বেশি সময় নেননি তিনি। শীঘ্রই নাপোলির অধিনায়কত্ব গ্রহণ করে ক্লাবটিকে নিয়ে যান ইতিহাসের সফলতম পর্যায়ে। মিলান, ইন্টার, জুভেন্টাস, রোমার আধিপত্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে নাপোলিকে এনে দেন কাঙ্ক্ষিত সিরি আ শিরোপা। বিদ্যুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা। দেয়ালে দেয়াল অঙ্কিত ছবি থেকে শুরু করে নবজাতকদের ‘ম্যারাডোনা’ নামকরণ—বাদ যায়নি কিছুই!

◤ নাপোলিতে যেন প্রাণসঞ্চার করেন ম্যারাডোনা ◢


১৯৮৯-৯০ মৌসুমে আরো একটি লিগ শিরোপা জেতা ম্যারাডোনা পরবর্তীতে দুবার লিগে রানার্সআপ হন। নেপলসের ক্লাবটির হয়ে ঝুলিতে আরো পুরেছেন কোপা ইতালিয়া, উয়েফা সুপার কাপ আর ইতালিয়ান সুপার কাপ। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা ডিয়েগো ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে ১৫ গোল নিয়ে হয়েছিলেন লিগসেরা গোলদাতা। ১১৫ গোল নিয়ে নাপোলির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন ম্যারাডোনা, যদিও ২০১৭ সালে রেকর্ডটি নিজের করে নেন মারেক হামসিক।

তবে মাঠের বাইরের বিতর্ক আর বিশৃঙ্খলা পিছু ছাড়ছিল না তাঁর। কোকেনের নেশায় আসক্ত ডিয়েগোকে ৭০ হাজার ডলারের জরিমানা গুনতে হয় ম্যাচে আর অনুশীলনে অনুপস্থিতির জন্য। নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কামোরা-র সাথে সখ্যসহ নানা বিতর্কে জর্জরিত ছিলেন সবসময়। অতঃপর কোকেন সেবনের দায়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১৯৯২ সালে নাপোলি ছাড়েন ম্যারাডোনা। তাঁর সম্মানে ১০ নম্বর জার্সিটি আজীবনের জন্য তুলে রাখে নাপোলি কর্তৃপক্ষ। লা লিগায় ফিরে সেভিয়ায় এক মৌসুম কাটান ডিয়েগো, তবে ক্লাব ক্যারিয়ারের শেষটা অবশ্য হয়েছিল স্বপ্নের বোকা জুনিয়র্সে ফিরেই।

◤ সেভিয়ার হয়ে আবারো লা লিগায় প্রত্যাবর্তন ◢


নিজেকে সেরাদের সেরা হিসেবে প্রমাণ করেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ১৬ বছর বয়সে ক্লাবের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলেও অভিষেক ঘটে তাঁর, যদিও বিশ্বকাপ পর্যন্ত যেতে অপেক্ষা করেন আরো পাঁচ বছর। তার আগেই নিজের আবির্ভাব জানান দেন অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে। ম্যারাডোনা আর মেসি ছাড়া আর কারোই নেই অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ আর মূল বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল।

নিজের প্রথম বিশ্বকাপে বেশ নিস্প্রভ ছিলেন ম্যারাডোনা। তবে অধিনায়ক হিসেবে ৮৬-এর মেক্সিকো বিশ্বকাপে পা রেখেই জ্বলে ওঠেন এই মহাতারকা। প্রতিটি ম্যাচের প্রতিটি মিনিট খেলা ম্যারাডোনার নামের পাশে ছিল ৫ করে অ্যাসিস্ট ও গোলের রেকর্ড। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা গোল দুটি নিয়ে আলোচনা এখনো ঝড় তোলে চায়ের কাপে। বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি দিয়ে শুরু করা ম্যারাডোনা পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকেন দ্বিতীয় গোলটি, যা পরবর্তীতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত হয়। সেমিফাইনালে আরো দুই গোল করা ম্যারাডোনার পাস থেকেই পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে আসে জয়সূচক গোলটি। অলরাউন্ড পারফরমেন্সে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ শিরোপার সাথে টুর্নামেন্ট সেরার গোল্ডেন বলও নিজের করে নেন অধিনায়ক ডিয়েগো।

◤ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে করা ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরির’ পথে ◢


১৯৯০ সালের আসরে আবারও আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক দলকে নিয়ে যান ফাইনালে। তবে চার বছর আগের ফাইনালের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সেবার আর সুবিধা করতে পারেনি আর্জেন্টিনা, ১-০ ব্যবধানে হেরে শেষ হয় শিরোপা মিশন। আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়ির প্লেন ধরেন ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ হওয়া ম্যারাডোনা। সেই সাথে ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল নিয়ে সমাপ্তি ঘটে তাঁর ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের।

◤ স্বপ্নের বিশ্বকাপ হাতে ম্যারাডোনা ◢


‘ক্লাসিক নম্বর টেন’ ডিয়েগো ম্যারাডোনা সুপরিচিত ছিলেন ড্রিবলিং দক্ষতা, দূরদর্শিতা, বল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, পাসিং আর সৃজনশীলতার জন্য। গড়পড়তা শারীরিক উচ্চতা আর গঠন নিয়েও যে শক্তিমত্তা আর দক্ষতার ভেলকি দেখানো সম্ভব, তা দেখিয়ে গেছেন ম্যারাডোনা, আর এখন দেখাচ্ছেন স্বদেশি লিওনেল মেসি। ২০০৮ সালে মেসিদের কোচ হয়ে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আর্জেন্টিনা নিশ্চিত করে ২০১০ বিশ্বকাপের টিকিট। মিডিয়ার সাথে তুমুল রেষারেষিতে একসময় ফিফা থেকে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞাও পান। বিশ্বকাপে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষদের হারিয়ে ম্যারাডোনার দল কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হজম করে ৪ গোল। এর পরপরই বোর্ডের সাথে আরেক দফা রেষারেষিতে ইস্তফা দেন কোচের পদ থেকে।

◤ ২০১০ বিশ্বকাপে কোচ ডিয়েগো ◢


ক্লাবের কোচিংয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি ডিয়েগো। ২০১১ সালে দুবাইয়ের আল ওয়াসি ক্লাবে যোগ দিয়ে টিকতে পেরেছিলেন মোটে এক মৌসুম। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিতীয় বিভাগের দল ফুজাইরাহ-এ এক মৌসুম কাটিয়ে পাড়ি দেন মেক্সিকোয়। সর্বশেষ এ বছরের সেপ্টেম্বরে হেড কোচ হিসেবে যোগ দিয়েছেন নিজ শহরের ক্লাব জিমনাসিয়া ডে লা প্লাতায়।

রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা ক্যারিয়ারে মোট গোল করেছেন ৩৪৬টি। সমসাময়িক খেলোয়াড়েরা তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন সবসময়। “জিদান বল পায়ে যা করত, তা সামান্য কমলালেবু পায়ে নিয়েই করতে পারতেন ম্যারাডোনা”, মজা করে বলেছিলেন ফরাসি গ্রেট মিশেল প্লাতিনি। পাওলো মালদিনির চোখে প্লাতিনি, রুমেনিগেদের চেয়ে বহু ধাপ উপরে ম্যারাডোনার স্থান। কোকেনের ভয়াল থাবা থেকে দূরে থাকতে পারলে হয়তো সর্বকালের সেরার বিতর্কটাই মাটিচাপা দিতে পারতেন চিরতরে। তবে যেটুকু করেছেন, তাতে ফুটবল বিশ্বে আজীবন কিংবদন্তির মর্যাদাই পাবেন ৫৯-এ পা রাখতে যাওয়া ডিয়েগো।

আপনার মতামত লিখুন :