হুমায়ূন-সাহিত্যের স্বাদ নিতে পড়ুন এ বইগুলো

তানিম কায়সার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
হুমায়ূন আহমেদের কয়টি বইয়ের প্রচ্ছদ

হুমায়ূন আহমেদের কয়টি বইয়ের প্রচ্ছদ

  • Font increase
  • Font Decrease

অনেকে বলেন হুমায়ূন আহমেদের বই আয়নার মতো। পাঠক যেন তাতে নিজেকেই দেখতে পান। তাই সময় বদলায়, মানুষের জীবনে আসে কতশত পরিবর্তন। তবুও হুমায়ূন সাহিত্যের মুগ্ধতা পাঠকের কাটেই না। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক তাঁর ব্যাপারে বলেছেন, ‘পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে যে চিরায়ত রসায়নটা আছে তিনি সবসময় ওইটা ব্যবহার করেছেন। যেখানে তিনি গভীর জটিলতা এড়িয়ে গেছেন বলে মনে হয় সেখানে তিনি মানবিকতার চিরন্তন মূল্যবোধগুলোকে পুঁজি করেছেন। যেটা তাকে অনেক দিন টিকিয়ে রাখবে।’

টিকে আছেন হুমায়ূন আহমেদ। আছেন মানে একেবারে গেঁথে আছেন তিনি। বৃষ্টিধারা যেমনি ভূমিতলের অন্তরে প্রবেশ করে বহু প্রাণের সঞ্চার করে, হুমায়ূন সাহিত্য তেমনি, পাঠককে সঞ্চারিত করে অন্য সাহিত্যের দিকেও। এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বিরাট অংশের পাঠক হয়ে ওঠা এই হুমায়ুন আহমেদের হাত ধরেই। তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় তিনশোরও অধিক। সেখান থেকে কয়েকটি বইয়ের সারসংক্ষেপ, হুমায়ূন-সাহিত্যের স্বাদ নিতে চাইলে যা এখনই পড়ে ফেলতে পারেন।

নন্দিত নরকে

কথায় আছে “মর্নিং শোজ দ্য ডে।” হুমায়ুন আহমেদ যেন তার প্রথম বইয়েই দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আসলে সাহিত্য জগতে অতিথি হয়ে নয়, বরং এসছেন এখানে স্থায়ী বসবাস গড়তে। এখানে লেখক নিজেকে বেছে নেন উপন্যাসের কাহিনী কথক হিসেবে। নামও থাকে হুমায়ূন । বইটিতে কোনো চরিত্রকেই প্রধান চরিত্র বলা যায় না, এখানে যেন প্রধান হয়ে উঠেছে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনসংগ্রাম , দুঃখ , কষ্ট , হাসি , কান্না, যৌনতা। গল্পে হুমায়ূনের সাথে থাকে তার অপ্রকৃতস্থ এক বছরের বড়বোন রাবেয়া, ছোট বোন রুনু, বাবা আর মা। আরো থাকে বাবার বন্ধু তাদের বাসায় আশ্রিত মাস্টার কাকা এবং বাবার প্রথম ঘরের সন্তান মন্টু। একদিন রাবেয়া হারিয়ে যায়, ওকে খুঁজে বের করে আনেন মাস্টার কাকা। কিছুদিন পরেই সন্তানসম্ভবা হয় রাবেয়া। পাগল মেয়ের সাথে কে কখন কী করেছে, রাবেয়া বলতে পারে না। এই সংকটের মধ্যে দিয়ে একটি পরিবার এগিয়ে যেতে থাকে। শেষে কারা যেন মন্টু মাস্টার কাকাকে খুন করে, কেন খুন করল জানতে হলে অসাধারণ এই বইটি আপনাকে পড়তে হবে।

দেবী

হুমায়ূন আহমেদের তৈরি চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলী অন্যতম প্রধান চরিত্র। এই দেবী উপন্যাসের মাধ্যমেই মিসির আলীর আবির্ভাব ঘটে। সম্প্রতি এই বইয়ের আলোকে তৈরি হয়েছে সিনেমা। জয়া আহসান চঞ্চল চৌধুরি অভিনীত সিনেমাটি ব্যাপক আলোচিতও হয়েছে। রানু নামের এক নববিবাহিতার কিছু অলৌকিক ঘটনা ও মানসিক সমস্যা এবং মিসির আলীর সেসব সমস্যা নির্ণয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে খুবই সাবলীলভাবে। বইটি না পড়া থাকলে আজই পড়ে ফেলতে পারেন।

ময়ূরাক্ষী

হুমায়ূন আহমেদের তৈরি সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হলো হিমু। হলুদ পাঞ্জাবী, মুখে দাড়ি, এলো চুলের হিমুর কাজ কারবার ছিল খুবই অদ্ভুত। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাই হিমু খুবই জনপ্রিয় একটি চরিত্র। এই গল্পে দেখা যায় হিমুর বাবা ছিলেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ তিনি বিশ্বাস করতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। এই মহাপুরুষ তৈরির জন্যই সে তার স্ত্রী, হিমুর মাকে হত্যা করে। একসময় হিমু বড় হয়। মেট্রিক পাসের পর তার ফুফুর বাড়িতে আসে। সেখানেও এক সমস্যা হয়। তার ফুফাত ভাই বাদল তার সংস্পর্শে এসে তার ভক্ত হয় এবং তিনবার ইন্টারমিডিয়েটে ফেল করে। বাদল হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। হিমুর প্রতি রয়েছে তাঁর অগাধ বিশ্বাস।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার দুই বছর পর প্রথম কথা হয় রুপার সাথে। একসময় সে ভালোবেসে ফেলে হিমুকে কিন্তু হিমু তাকে ধরা দেয় না, ঠিক তেমনিই চলেও যায় না। সে তো মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করছে, সে কেমন করে স্বাভাবিক হয়ে রুপার কাছে যাবে। এসব টানা পোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে গল্প।

দীঘির জলে কার ছায়া গো

“দীঘির জলে কার ছায়া গো
তোমার না আমার
তোমার কী আর মন চায় না এই কথাটা জানার?”
গল্পের নায়ক মুহিব। মুহিব নামটা কি একটু চেনা চেনা লাগছে? আচ্ছা মুহিবের মুহি অক্ষর দুটি উল্টালে দেখুন তো কি হয়। হুমমমম হিমু হয়। নামের কারণেই হোক আর অন্য কোনো কারণেই হোক মুহিবও হিমু পাগল। অনেক সময় তার ইচ্ছে করে হিমুর মতো হয়ে যেতে, তার মতো কার্যকলাপ করতে। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক হলেও যে জিনিসটা মুহিব ছাড়তে পারে না সেটা হলো মিথ্যাদিবস। মুহিবের একটা মিথ্যা দিবস আছে। এইদিন মিথ্যা ছাড়া সত্যি বলে না মুহিব। এ তো গেল গল্পের নায়ক, নায়িকাও একজন আছে নাম লীলা। লীলা হলো মুহিবের কাছে রুপা। দুজনের বন্ধুত্ব অসাধারণ। এরকম আনন্দে ঝলমলে দিনগুলো যখন কাটছিল তখনই নেমে আসলো কঠিন এক ঝড়ো হাওয়া। মুহিবের বাবাকে ধর্ষণের অভিযোগে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো। বাকি ঘটনা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে আপনাকে।

জোছনা ও জননীর গল্প

মুক্তিযুদ্ধের ওপর যত উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে অনেকেরই সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। এর কাহিনী শুরু হয়েছে যুদ্ধ দিয়ে নয়। বরং অন্যান্য উপন্যাসের মতোই। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ থেকে বেশ কজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার মাধ্যমে যুদ্ধের নয় মাসের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন নিপুণভাবে। সবজায়গাতেই লেখক তথ্যসূত্র ব্যবহার করেছেন ফুটনোটে, এটি বইটির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। বইয়ে এরপর রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা। উঠে এসেছে কালজয়ী কিছু ব্যক্তিত্বের কথাও। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখের তৎকালীন জীবনবর্ণনা উঠে এসেছে খুবই ভিন্নভাবে।

কৃষ্ণপক্ষ

‘কৃষ্ণপক্ষ’ হুমায়ূন আহমেদের নিজেরই অত্যন্ত প্রিয় একটি উপন্যাস। সে কথা তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় তাঁর লেখায়, কথাবার্তায় জানিয়ে গেছেন। হুমায়ূনের পাঠকেরা লক্ষ সেরা লেখার মধ্য থেকেও এই লেখাটাকে আলাদা করে রাখতে পারবে। শুধু এই নয় যে উপন্যাসটা স্বয়ং লেখকের পছন্দের উপন্যাস।

কোথাও কেউ নেই

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রদর্শিত এই টিভি ধারাবাহিক এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে, ধারাবাহিকটির প্রতিটি পর্ব, দর্শকরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করতেন। ধারাবাহিকের অগ্রগতির সাথে সাথে দর্শকরা বাকের ভাইকে পছন্দ করে ফেলেন এবং বাকেরের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে যখন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠে, উকিল হুমায়ূন ফরিদি শত চেষ্টাসত্ত্বেয় খেই হারিয়ে ফেলছেন এই কেসে, তখন দর্শকরা প্রতিবাদমুখর হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে; চলতে থাকে মিছিল, দেয়াললিখন, সমাবেশ। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে লোকজন মিছিল করে স্লোগান দিতে থাকে: ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, কুত্তাওয়ালী জবাব চাই’ কিংবা, ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। বইটি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলবার আছে কি?

এইসব দিন রাত্রি

হুমায়ূন আহমেদের এই গল্পটি নিয়েও নাটক হয়েছে বিটিভিতে। সেখানে টুনি নামের একটা বাচ্চা মেয়ে ছিল। গল্পে যার মৃত্যু হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার যেন মৃত্যু না হয় এজন্যে হাজার হাজার মানুষ চিঠি পাঠাতে থাকেন।

মেঘ বলেছে যাব যাব

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মা বাবা বোন ভাই ভাবী সবার সাথে যৌথ পরিবারে থাকে। বর্তমানে বেকার। উপন্যাসে হাসানের কাহিনী প্রধানত তার বেকার জীবন ও প্রেমে ব্যর্থতটাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন হুমায়ূন আহমেদ। হাসান ভালোবাসে তিতলিকে। সেও এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। পরিবারের সবাই প্রথমে হাসানের সাথে তিতলির মেলামেশাকে প্রাধান্য দিলেও পরবর্তীতে যখন বিয়ের জন্যে বিত্তশালী ছেলে পায় তখন তারা সেই ছেলের কাছেই তিতলির অমত থাকা সত্ত্বেও বিয়ে দেয়।

আপনার মতামত লিখুন :