হেমন্তের অল্প শীতে ঘুরে আসুন শ্রীমঙ্গল

তানিম কায়সার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
পর্যটনের শহর চা বাগানের শহর শ্রীমঙ্গল

পর্যটনের শহর চা বাগানের শহর শ্রীমঙ্গল

  • Font increase
  • Font Decrease

সিলেট এলেন, আর শ্রীমঙ্গল দেখে গেলেন না, সেক্ষেত্রে আপনার সিলেট আসা অপূর্ণই থেকে গেল। মৌলভীবাজার জেলাধীন শ্রীমঙ্গল উপজেলা পুরো সিলেট বিভাগের মধ্যেই সবচেয়ে আলাদা আর বৈচিত্রপূর্ণ একটি জায়গা। এখানে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। ছোট শহর হওয়া সত্ত্বেও রয়েছে বড় শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা। পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য হওয়ায় শ্রীমঙ্গলে আছে যথেষ্ট পরিমাণ আবাসিক হোটেল। দেশি বিদেশি পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এখানে গড়ে উঠেছে গ্রান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা সমমানের রিসোর্টও। রসনা বিলাসে সিলেটের বিখ্যাত ‘পাঁচ ভাই’ এবং ‘পানসী’র শাখা রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। শ্রেণিমতো থাকা খাওয়াসহ বেড়ানোর সকল সুযোগ সুবিধাই রয়েছে পর্যটনের শহরখ্যাত এই উপজেলায়।

ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে খুব সহজেই শ্রীমঙ্গল চলে আসা যায়। রাস্তাঘাটও ভালো। বাসে আসতে সময় লাগবে চার থেকে সাড়ে চারঘণ্টা। ট্রেনেও কাছাকাছি সময়। এনা, হানিফ ও শ্যামলীসহ প্রায় আন্তঃজেলা সব বাসই এখানে আসে রোজ। ননএসি বাস ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪০০-র মধ্যে। ননএসি ট্রেন ভাড়া ২৫০ থেকে ৩২০-এর মধ্যে। ট্রেনে আসাটাই ভালো সিদ্ধান্ত হবে কেননা তাতে দুপাশের পাহাড় ও চা বাগানের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আসতে পারবেন।


শ্রীমঙ্গলের প্রবেশ পথেই মিলবে বিখ্যাত এই ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য


শ্রীমঙ্গলে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র চা গবেষণা কেন্দ্র (BTRI)। রয়েছে ফিনলে, ইস্পাহানীসহ বেশ কিছু কোম্পানির নিজস্ব চা বাগান। শহরের কাছাকাছি হওয়ায় যাতায়াতও একেবারে সহজ। বাস বা ট্রেন থেকে নেমে পায়ে হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে চা বাগান। সারিবাঁধা চা গাছ এবং চারপাশের মনোরম পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করে ছাড়বে।

ঘুরে যেতে পারেন হামহাম ঝর্না। হামহাম নামটা যেমন সুন্দর, ঝর্নাটাও তাই। হামহামে যেতে গাড়ি রিজার্ভ করা ভালো হবে। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় ফেরার পথে স্থানীয়ভাবে গাড়ি পাওয়া দুষ্কর। আর এক্ষেত্রে পাহাড়ে চলাচলের উপযোগী জিপ গাড়ি নেওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় জিপ ভাড়া করতে পারবেন শহরের কালিঘাট রোড পয়েন্ট থেকে। জিপে সোজা কলাবন পাড়া পর্যন্ত চলে যেতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মতো। চাইলে ৫০০ টাকার মধ্যে নিয়ে নিতে পারেন স্থানীয় গাইড। পাহাড়ি রাস্তা যেহেতু আঁকাবাঁকা, রয়েছে কিছুটা বিপদের শঙ্কাও। তবে ঘাবড়াবার মতো কিছু নয়। যে কোনো জায়গা থেকে পরেও গাইড ঠিক করতে পারবেন।


হামহাম জলপ্রপাত


হামহামে যাওয়া একটু কষ্ট। ছোট বড় প্রায় অর্ধশত টিলা এবং পাহাড় ওঠানামা করতে হয়। তারপর ছড়ার ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। উঁচু নিচু পাহাড়, পাথর, জল ভেঙে হামহাম পৌঁছাতে ঝরে যাবে গায়ের ঘাম। কিন্তু বেশ খানিকটা দূর থেকে যখন ঝর্নার শব্দ পাবেন তখনি ভেতরে একটা ভালো লাগা সক্রিয় হবে। আর সেই ভালো লাগার ষোলকলা পূর্ণ হবে তখন, যখন নিজ চোখে ঝর্না দেখবেন। উবে যাবে সকল ক্লান্তি। ইচ্ছামতো জলকেলি করে ফেরার পথে কলাবন থেকে সেরে নিতে পারেন আহারপর্ব। এক্ষেত্রে যাওয়ার পথেই অর্ডার করে যেতে হবে।

হামহাম থেকে ফেরার পথে দেখা মিলবে মাধবপুর লেকের। বিশ টাকা এন্ট্রি দিয়ে চলে যেতে পারেন সেখানে। চা বাগান ও টিলা বেষ্টিত এই লেকে রয়েছে প্রচুর নীলপদ্ম। আপনার চোখের এবং মনের শান্তির জন্য এর অপরূপ দৃশ্য হতে পারে অত্যন্ত উপকারী।


মনোরম মাধবপুর লেক


মাধবপুর লেক দেখা শেষ হলে ফেরার পথে নেমে যেতে পারেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় কয়েক হাজার প্রজাতির গাছ রয়েছে। রয়েছে খাসিয়া পুঞ্জি। উদ্যানের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইন এর সৌন্দর্যে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। আলাদাভাবে শহর থেকে লাউয়াছড়া যেতে চাইলে ভানুগাছ বাসস্ট্যান্ড থেকে জনপ্রতি ৩০ টাকায় সিএনজি পাওয়া যায়। বাসে দশ টাকা লাগতে পারে। জানা-অজানা এসব গাছ-গাছালির সাথে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং বাহারি পাখি। বানর, হনুমানসহ প্রায় কয়েক হাজার প্রাজাতির বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম এই জাতীয় উদ্যান।


বনের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেন


ইচ্ছে হলে ঘুরে আসতে পারেন নিরালা পুঞ্জি। নিরালা পুঞ্জি হলো আরেকটি আদিবাসী এলাকা। এখানে যেতেও জিপ লাগবে। জিপ ছাড়া যাওয়া সম্ভব নয়। দেড় থেকে দু হাজার টাকা খরচায় জিপ পাওয়া যায়। সেখানে আদিবাসী এবং তাদের নিজস্ব পল্লী, ঘরবাড়ি বানানোর নমুনা, সবকিছুই আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর যাওয়া আসার পথে রাস্তার দুপাশের চা বাগান তো থাকছেই।


পুঞ্জির ঘরবাড়ি


ফেরার পথে হরিণছড়া গল্ফ মাঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। এমন বিস্তীর্ণ সবুজ আপনার শহুরে জীবনকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেবে।

এ পথেই রয়েছে শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত সাত কালার চায়ের দোকান। আদি নীলকণ্ঠ নামের এই চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসতে পারেন। এই সাত কালার চায়ের উদ্ভাবক রমেশ রাম গৌড়, যার আদিনিবাস ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা। শ্রীমঙ্গলে এলে এই চা একবার হলেও দেখে যাবেন। টেস্ট যেমন তেমন, কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর। তবে সত্যিকার চাখোররা কাছে এই চা খেয়ে হতাশ হবেন। বরং এখানকার অন্য যে কোনো সাধারণ চা খেতে পারেন। বহুদিন মুখে লেগে থাকবে এখানকার চায়ের স্বাদ।


বিখ্যাত সাতরঙা চা


শহরের পাশেই রয়েছে বদ্ধভূমি ৭১। স্থানীয় বিজিবির তত্ত্বাবধানে জায়গাটিকে করে তোলা হয়েছে আকর্ষণীয়। সময় পেলে এক নজর দেখে নিতে পারেন। এছাড়াও যেতে পারেন লাল পাহাড়, লিচুবাগানসহ আশেপাশের আরো বিভিন্ন জায়গায়।

শীত মানেই অতিথি পাখি। আর এক্ষত্রেও পিছিয়ে নেই শ্রীমঙ্গল। শহর থেকে অল্প দূরে রয়েছে বাইক্কা বিল, হাইর হাওরসহ বেশি কিছু অতিথি পাখির জন্য বিখ্যাত জায়গা। সময় করে চলে যেতে পারেন সেখানেও।

শ্রীমঙ্গল শহরে এলেই পায়ে হাঁটা দূরত্বে পাবেন বেশ কিছু ভালো আবাসিক হোটেল। টি হেভেন, টাউন হিল, টি টাউন গেস্ট হাউসসহ বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে। খরচ পড়বে রুম প্রতি এক হাজার টাকার মতো। পাহাড় বা চা বাগানের পাশে থাকতে চাইলে লেমন গার্ডেন, নভেম রিসোর্ট কিংবা হোটেল গ্রান্ড সেলিমে থাকতে পারেন। রুম প্রতি খরচ ১,৫০০ থেকে শুরু এসব রিসোর্টে।


গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গল্ফ


খেতে পারেন শহরের ভানুগাছ রোডস্থ ‘পাঁচ ভাই’ কিংবা ‘পানসী’তে। কম মূল্যে খুবই ভালো খাবার পাবেন এ দুটি হোটেলে। এছাড়াও চায়নিজ বা ইন্ডিয়ান খাবার খেতে চাইলে যেতে পারেন স্টেশন রোড কুটুম বাড়ি রেস্টুরেন্ট কিংবা গুহ রোডের আগ্রা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে। চাইলে একবার ঘুরে আসতে পারেন গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গল্ফ। যেটা লাউয়াছড়া যাওয়ার পথেই রাস্তার বাঁপাশে দৃশ্যমান হবে।

আপনার মতামত লিখুন :