করোনা ক্লান্তি ও আশা জাগানিয়া ঝা রোদ

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস

মাহমুদ মেনন, সাংবাদিক
করোনা ক্লান্তি ও আশা জাগানিয়া ঝা রোদ

করোনা ক্লান্তি ও আশা জাগানিয়া ঝা রোদ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা ক্লান্তি... হ্যাঁ, ভাবতে গিয়ে ঠিক এই কথাটিই মাথায় এলো। করোনা কী আমাদের জন্য ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে? যে ঘরটাতে গত কয়েকদিন স্বেচ্ছাবন্দি আছি তার দুই দিকের বারান্দা থেকে রাজধানীর দুটি ব্যস্ততম সড়ক দেখা যায়। একদিকে কারওয়ানবাজার থেকে বাংলামটর অবধি চোখে পড়ে। অন্যদিকে মগবাজার থেকে তেজগাঁর পথে নিচের মূল সড়ক, উপরের ফ্লাইওভার। আরও একটু দৃষ্টি প্রসারিত করলে হাতিরঝিলের দুই দিকের রাস্তাও দেখা যায়। এই সড়কগুলোর ব্যস্ততা নিয়ে হয়তো কাউকে ধারণা দিতে হবে না। এই লেখাটি যখন শুরু হয় তখন বেলা ১১টা ০৫। সপ্তাহের প্রথম দিন। এমন একটি সময়ে এই দুটি সড়ক সাধারণ দিনে পুরোপুরি জমাট বেঁধে থাকে। অনেকদিন দেখেছি, ফ্লাইওভারও হয়ে থাকে স্থবির গাড়িগুলো যেন চলতেই পারে না। কিন্ত আজ? আজও স্থবির। বলতে গেলে গাড়িই চলছে না এসব সড়কে। প্রতি মিনিটে গোটা দশেকও হবে না, গাড়ি পার হচ্ছে এই সড়কপথে। মনে হচ্ছে, গাড়িহীন হয়ে স্থবির পড়ে আছে ফ্লাইওভারটি। কারণ করোনা।

আমার মতো রাজধানীবাসী অনেকেই এখন সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে। বোধ হয়, প্রায় সকলেরই অলস সময় কাটছে। এই অলসতা আমাদের প্রত্যেকের জন্য বিলাসিতা তাতে সন্দেহমাত্র নেই। কারণ এই শহরের অধিকাংশ মানুষই দিন এনে দিন খায়। কিছু সংখ্যক মানুষ মাস এনে মাস চলে। আর অতি সামান্য কিছু মানুষ হয়তো রয়েছে যাদের জীবিকার জন্য খুব একটা চিন্তা করতে হয় না। এই কোয়ারেন্টাইন তাদেরই মানায়! কিন্তু কাজপাগল যারা তাদের জন্য এই স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইন স্রেফ ক্লান্তিকর। আর কাজ করেই যাদের জীবিকা অর্জন তাদের জন্য এ এক অসম্ভব বিষয়। তারপরেও এ আমাদের বাধ্য বিলাসিতা।

লিখতে বসলে টানা লিখে ফেলা আমার অভ্যাস। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটানে শেষ হয়ে যায়। কিন্ত করোনা ক্লান্তিই হয়তো দায়ী! লেখা এগুচ্ছে না। মাঝে ঘণ্টা দেড়েক সময় পার করে আবার কম্পিউটারে বসেছি।

লেখাটি যখন শুরু করি তখন বেলা ১১টা। এখন ঝা দুপুর। ঢাকা এখন ভীষণ রৌদ্রোজ্জ্বল। পরিচিত শব্দগুলো উধাও। গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছেনা বললেই চলে। কাছেধারে কোনও বাড়িতে একটা কুকুর টানা ঘেউ ঘেউ ডাকছে। কিছুক্ষণ আগে একটা অ্যাম্বুলেন্সের প্যাঁ-পোঁ শব্দ কানে এসেছিলো... বাকিটা স্রেফ এক ক্লান্ত দুপুরের চিত্র। নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি ট্রেন গেলো। শহরের স্বাভাবিক ধীর গতির চেয়ে একটু দ্রুত গেলো কি? আবার নিস্তব্ধতা নামতে সময় লাগলো না।   

মাথার উপর থেকে সূর্য কড়া উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মোবাইল ফোনের ওয়েদার অ্যাপ জানাচ্ছে বাইরে তাপ ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাঙালির জন্য সহনীয়। তবে এই উত্তাপ যতই বাড়বে, ততই ভালো এমন একটা কথা অনেকের মুখে অনেকবার শুনেছি। একটু গুগল করে তার তথ্য প্রমাণ নিতে গিয়ে যা পেলাম বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিতে দ্বিমত করেননি। বলেছেন, সূর্যালোক ও তাপ উভয়ই ভাইরাসের আয়ুষ্কাল কমায়। তবে তারা এও বলেছেন, করোনাভাইরাসে সঠিকভাবে পরিচ্ছন্ন থাকা ও নিজেকে নিরাপদ রাখাই সবচেয়ে সেরা ও কার্যকর উপায়।

রাজধানীর চিত্র/ছবি: বার্তা২৪.কম

তবে চৈত্রের কড়া রোদ, আর আসন্ন গ্রীষ্ম নিয়ে আমাদের কিছুটা স্বস্তিতে থাকার সুযোগ রয়েছে বলেই বোধ করছি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা যত বাড়বে, ধীরে ধীরে করোনার প্রাদুর্ভাব কমে আসবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন হেরাল্ডকে জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমোলজি বিশেষজ্ঞ ড. স্টেফান বরাল বলেছেন, এটা হবে প্রাকৃতিক হ্রাস। আমরা যতই গরম আবহাওয়ার দিকে যাব, ততই করোনার বিস্তার দুর্বলতর হবে। 

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জন নিকোলাস আবহাওয়ার পূর্বাভাসদায়ী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাকুওয়েদারকে বলেছেন- তিনটি বিষয় করোনাভাইরাস সহ্য করতে পারেনা- এক. সূর্যালোক দুই. তাপ আর তিন. আর্দ্রতা। ঢাকার আবহাওয়ায় এখন এই তিনেরই অবস্থান রয়েছে।

বিশেষ করে সূর্যালোক। নিকোলাস আরো বলছিলেন, অন্ধকারে করোনাভাইরাস ১৩ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকে। কিন্তু সূর্যালোকে তা সর্বোচ্চ আড়াই মিনিট টিকে থাকতে পারে।

ঢাকায় এখন তাপমাত্রা ক্রমশঃ বাড়ছে। দুপুর একটায় যা ছিল ২৬ ডিগ্রি, তা একঘণ্টা পরে ২৯ ডিগ্রি দেখাচ্ছে। এতে গরমের কষ্ট বাড়বে, কিন্তু করোনাওতো মরবে। এ সপ্তাহে প্রতিদিনই তাপমাত্রা কিছুটা করে বাড়বে। সোমবার ৩২, মঙ্গলবার ৩৪, বুধবার ৩৬, বৃহস্পতিবার ৩৮, শুক্রবার ৩৯ ডিগ্রি হয়ে শনিবার ৪১ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এটা আশা জাগানিয়া।

তবে এখনি পুরোপুরি স্বস্তির জোনে পৌঁছে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়নি। দিনের তাপমাত্রা ক্রমশঃ বাড়লেও রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। রোববার দিনগত রাতে ১৮ ডিগ্রিতে নামবে বলে দেখাচ্ছে অ্যাকুওয়েদার। আগামী সপ্তাহেও রাতের গড় ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায়ও টিকে থাকতে পারে করোনাভাইরাস। পরের সপ্তাহে অবশ্য রাতের তাপমাত্রার গড়ও ২৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। 

সে কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে করোনা নিয়ে পুরোপুরি স্বস্তিতে পৌঁছাতে আরো দিন দশেক অপেক্ষা করতে হবে। এই সময় পর্যন্ত করোনা সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শটাই বেশি গুরুত্বের সাথে দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ফলে এই ঘরে বসে থাকা যতই ক্লান্তিকর হোক, এই সময়টুকু সেটাই মানবে শহরবাসী, তেমনই প্রত্যাশা।

লেখক: মাহমুদ মেনন, সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন :

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস