করোনায় বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর হার কমছে

তানিম কায়সার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
সাম্প্রতিক গবেষণা দিচ্ছে পরিসংখ্যানগত স্বস্তি

সাম্প্রতিক গবেষণা দিচ্ছে পরিসংখ্যানগত স্বস্তি

  • Font increase
  • Font Decrease

নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কত লোক মারা যাচ্ছে প্রতিদিন? সোমবারের প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী আগের যে সংখ্যা ছিল তারচেয়ে অনেক কম। কিন্তু অনেক কম হলেও সেটা অন্যান্য ফ্লুয়ে মৃত্যুর হারের চেয়ে অনেক বেশি। The Lancet Infectious Diseases নামে একটি মেডিকেল প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। নতুন এই গবেষণাটি বলছে আক্রান্তদের মধ্য থেকে মাত্র ০.৬৬ শতাংশ লোক মারা যাবে এই ভাইরাসে।

নতুন এই প্রতিবেদনে উঠে আসা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকদের মৃত্যুর হার কমে আসছে ধীরে ধীরে। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকেরা স্বাভাবিক ফ্লু থেকে যেভাবে রিকোভার হয় সেভাবেই সুস্থ হচ্ছেন। তবে এরপরেও অন্যান্য সময়ের স্বাভাবিক ফ্লুয়ের মৃত্যুর চাইতে এই ফ্লুয়ে মৃত্যুর হার অন্তত পক্ষে দশমিক এক শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

শুরুতে সকল কেইস শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে বিভিন্ন দেশ নিজেদের সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্তকরণ উপায় বের করছে এবং শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। সুতরাং কেইসের সংখ্যা বাড়ছে। সকল কেইস শনাক্ত করার পূর্বে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১.৩৩ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় এই হার অনেক কমে আসছে বলেই দেখা যাচ্ছে।

ড. এন্থনি ফুচি, যিনি the US National Institute of Allergy and Infectious Diseases-এর পরিচালক, তিনি বলেন, আপনি যদি এটাকে গাণিতিকভাবে হিসাব করেন তাহলে প্রায় ২% হয়। তিনি কিছুদিন আগেই জোর দিয়ে বলেছিলেন, এই সংখ্যাটা কমে যাবে দ্রুত। কেননা যখন সন্দেহজনক কেইসগুলোকে পরীক্ষার মাধ্যমে আলাদা করা যাবে তখন আমাদের সামনে আসল তথ্য আসতে শুরু করবে।

এই মৃত্যুহার বেশি হওয়ার আরেকটা কারণ আছে। এই যে মৃত্যু তালিকা, এখানে কেবল সিরিয়াস কেইসগুলোই আসে। যে সকল রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন থাকে তারাই কেবল হসপিটালাইজড হচ্ছেন এবং তাদের মধ্যে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের হিসেবটাই আমরা জানতে পারছি। কিন্তু এর বাইরে প্রায় আশি শতাংশ লোক আছেন যাদেরকে হসপিটালাইজডও হতে হচ্ছে না। সুতরাং যখন এই লোকদের আমরা তালিকায় নিয়ে আসব তখন দেখা যাবে যে সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।

ড. এন্থনি ফুচি

সুতরাং এই রিপোর্টে শুধুমাত্র তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি যাদের টেস্ট করা হয়েছে এবং যারা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে কিংবা নিজ গৃহে আইসোলেশনে আছেন। বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর্মী, প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য উৎস থেকে আক্রান্তের সর্বমোট সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।

এটি অনুসন্ধান করার জন্য, গবেষকরা চীনের উহান থেকে ফ্লাইটে স্বদেশে ফিরে আসা লোকদের মধ্যে কিভাবে বিস্তৃত সংক্রমণ ছিল তা লক্ষ্য করেছিলেন। সমীক্ষা অনুসারে, গবেষণাদল এই উহান ফেরত লোকদের পিসিআর পরীক্ষা করেছিল। বলে রাখা ভালো, পিসিআর পরীক্ষা হলো এমন এক ধরনের পরীক্ষা যা এই সংখ্যক ভ্রমণকারীদের মধ্যে কতজন ভাইরাস বহন করছে তা সনাক্ত করতে সক্ষম হবে, এমনকি তাদের শরীরে লক্ষণগুলি প্রদর্শন না করলেও।

গবেষকরা ‘সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব’ সম্পর্কিত তথ্যটি রিপোর্ট করা ঘটনা ও আক্রান্ত হয়ে মৃত জনসাধারণের তথ্যের সাথে একত্রিত করে, সামগ্রিক মৃত্যুর হার ১%-এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বলে অনুমান করেন। এই সংখ্যাটি যদিও বয়স্কদের মধ্যে বেড়েছে। অর্থাৎ সংক্রমণের পরে যারা মারা গেছেন তাদের বয়স আনুমানিক ৮০ বা তার বেশি ছিল এবং এই বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৪.৮% লোকই মৃত্যুবরণ করেন। যেই হার নয় বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্র ০.০০১৬১% বা তার ও কম।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ বছরের কম বয়সী বয়সের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার কখনোই ০.১৬% এর বেশি ছিল না। সংক্রামিত ১,০০০ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১ বা ২ জন মারা যেতে পারে। অর্থাৎ গবেষণা বলছে সবচেয়ে কম বয়সী লোকেরা সবচেয়ে কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক এবং গবেষণার লেখক আজরা গনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা বিশ্লেষণ করে খুব স্পষ্টভাবে দেখেছি যে ৫০ বছরের কম বয়সীদের তুলনায়, যাদের বয়স ৫০ বছরের বেশি তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এদের মধ্যে একটা বড় অংশ মৃত্যুবরণ করেন বলে আমাদের কাছে মৃত্যুহার কোথাও কোথাও এত বেশি বলে মনে হয়।

বিশ্লেষকরা শুধু একটি অঞ্চলের দিকে না তাকিয়ে বৃহৎ পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন যেন সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো ফলাফল আসে। যার কারণে গবেষকরা মূল ভূখণ্ডের চীন এবং এর বাইরে কয়েক হাজার মামলা, সেই সাথে ডায়মন্ড প্রিন্সেস নামে একটি করোনভাইরাস-জর্জরিত ক্রুজ জাহাজের আরোহী ৩,৭১১ জন লোককেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাস থেকে লোকেরা সুস্থ হয়ে উঠতে কয়েক সপ্তাহ সময় নিতে পারে, যা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যসেবার সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। লোকেরা আরো ভালো হতে যত বেশি সময় নেয়, তত বেশি তাদের হাসপাতালের মূল্যবান স্থান এবং সংস্থান প্রয়োজন হতে পারে।

শিগুই রুয়ান

হাসপাতালে আক্রান্তরা লক্ষণগুলো শুরু হওয়া থেকে গড় সময় প্রায় ২৫ দিন যাবত অসুস্থ ছিল বলে দেখা যায়। গবেষকরা জানিয়েছেন, রোগীরা তাদের অসুস্থতার প্রথম দিনগুলোতে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারতেন না। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন—তাদের মধ্যে যারা মারা গেছেন সেই সব লোকেরা লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করার গড়ে প্রায় ১৮ দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন।

মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক শিগুই রুয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, এই মহারমারির সময়ে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর প্রকৃত হার নির্ণয় করা খুব চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়। তদুপরি যেখানে বিভিন্ন দেশের তাদের তথ্য ঠিকভাবে প্রকাশ না করার একটা অভিযোগ আছে। তবে ভাইরাস থেকে কত লোক মারা যায় তা বুঝতে পেরে তিনি বলেছিলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা যা সরকার এবং জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে তাদের কাজ করতে সহায়তা করতে পারে।

রুয়ান গবেষণার সাথে জড়িত কেউ ছিলেন না। বরং তিনি এই গবেষণার ওপর একটি নিবন্ধ লিখেন এবং সেখানে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি এটাও যুক্ত করেন যে, এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাসে মৃত্যুহার আগের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু অতি উৎসাহী হয়ে এটাকে অনেকেই আবার সাধারণ ফ্লুয়ের সাথে তুলনা করেন। তিনি বলেন, মৃত্যুহার কমলেও এটা এখনো সাধারণ ফ্লুয়ের চেয়ে মারাত্মক এবং মরণঘাতী হিসেবেই আছে। তাই নিজেকে সচতেন রেখে যর দ্রুত সম্ভব এর বৃদ্ধিকে টেনে ধরতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :