করোনাবিরোধী যুদ্ধে মানবজাতি নেতৃত্বহীন

ইউভাল নোয়াহ হারারি
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস মহামারির জন্য বিশ্বায়নকে দোষারোপ করছে অনেকেই, এবং বলছে পৃথিবীকে বিশ্বায়ন মুক্ত করাই এই ধরনের প্রাদুর্ভাবসমূহ প্রতিরোধের একমাত্র পথ। পাঁচিল তোলো, ভ্রমণ সীমিত করো, বাণিজ্য কমাও। যাইহোক, মহামারি থামানোর জন্য স্বল্পকালীন কোয়ারেন্টাইন প্রয়োজনীয় হলেও, দীর্ঘসময়ের জন্য রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাকরণ নীতি সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে সত্যিকার সুরক্ষা তো দেবেই না; উল্টো টেনে নেবে অর্থনৈতিক ধসের পথে। ঠিক এর বিপরীত। মহামারির সত্যিকার প্রতিষেধক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সহযোগিতা।

বিশ্বায়নের বহু আগেও মহামারিতে মারা গেছে কোটি মানুষ। চৌদ্দ শতকে না ছিল উড়োজাহাজ, না কোনো প্রমোদ তরী। অথচ ব্ল্যাক ডেথ এক দশকের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপের পশ্চিম অব্দি। মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে বিশ কোটির মধ্যে। অর্থাৎ ইউরেশিয়ার মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশেরও বেশি। ইংল্যান্ডে প্রতি দশজনের চারজন মানুষ মারা গেছে সেই সময়। এক লক্ষ অধিবাসীদের মধ্যে পঞ্চাশ হাজারই হারিয়ে ফেলেছে ফ্লোরেন্স।

তারপর ১৫২০ সালের মার্চ মাস। শরীরে স্মলপক্স নিয়ে ফ্রান্সিসকো ডি এগুইয়া নামলেন মেক্সিকোতে। মধ্য আমেরিকায় তখন না আছে ট্রেন; না বাস। এমনকি গাধাও ছিল না। অথচ ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা মধ্যআমেরিকা তছনছ করে দিল স্মলপক্সের মহামারি। প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায় বলে অনুমিত।

১৯১৮ সালের ঘটনা। ভয়াবহ স্পেনিশ ফ্লু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর দূরবর্তী কোন অব্দি। প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়—যা ওই সময় গোটা মানবজাতির এক চতুর্থাংশেরও বেশি। ধরা হয়, ভারতের জনসংখ্যার ৫% মারা গেছে সে সময়। তাহিতি দ্বীপে মারা যায় ১৪% এবং সামোয়াতে ২০%। সব মিলিয়ে এক বছরেরও কম সময়ে এই প্যানডেমিকে মৃত্যুর সংখ্যাটা কোটির অধিক; সম্ভবত দশ কোটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের চার বছরেও এত মানুষ মারা যায়নি।

১৯১৮ সালের পর পেরিয়ে গেছে এক শতাব্দী। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারের কারণে মানুষ এখন আরো বেশি মহামারির ঝুঁকিতে রয়েছে। টোকিও কিংবা মেক্সিকো সিটির মতো আধুনিক নগরগুলো প্যাথোজেন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার জন্য মধ্যযুগের ফ্লোরেন্সের চেয়েও উর্বর। তার ওপরে বর্তমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ১৯১৮ সালের তুলনায় ঢের দ্রুত। একটা ভাইরাসের প্যারিস থেকে টোকিও কিংবা মেক্সিকো অব্দি পৌঁছাতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগবে না। তাই আমরা কোনো সংক্রামক রোগের জাহান্নামে আছি বলেই মেনে নিতে হবে। যেখানে একের পর এক ধেয়ে আসছে প্লেগের মতো মহামারি।

‘সেপিয়েন্স’ প্রকাশিত হবার পর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিন্তক হারারি

যাইহোক, হাল আমলে মহামারির প্রকোপ এবং প্রভাব দুই-ই কমে এসেছে নাটকীয়ভাবে। একুশ শতকে এইডস কিংবা ইবোলার মতো মহামারিও তেমন সুবিধা করে উঠতে পারছে না। সেই প্রস্তর যুগের পর থেকে যে কোনো সময়ের চেয়ে কমে এসেছে মৃত্যুহার। তার কারণ প্যাথোজেনগুলোর বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে কার্যকর যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে সেটি বিচ্ছিন্নতা নয়—তথ্য। মানবজাতি এই সব মহামারির বিরুদ্ধে জিতে চলেছে। তার কারণ ডাক্তার আর ভাইরাসের মধ্যে অস্ত্রের যুদ্ধে, ভাইরাসেরা নির্ভর করে অন্ধ রূপান্তরের ওপর, যেখানে ডাক্তাররা নির্ভর করেন তথ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর।

ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়
যখন চতুর্দশ শতকে ব্ল্যাক ডেথ আঘাত হানলো, মানুষের কোনো ধারণা ছিল না—এর কারণ কী কিংবা এর বিরুদ্ধে কী করা যেতে পারে। আধুনিক জমানার আগ পর্যন্ত মানুষ এই মহামারিগুলো সংঘঠিত করার দায় চাপাত ক্রুদ্ধ দেবতা, বিদ্বেষপরায়ণ অতিপ্রাকৃত সত্তা অথবা বাজে বাতাসের ওপর। কিন্তু এর পেছনে যে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকতে পারে, সেটি নিয়ে এমনকি সন্দেহপোষণও করেনি। মানুষ বিশ্বাস করত দেবদূত এবং উপকথায়, কিন্তু তারা কল্পনাও করতে পারেনি, ভয়াল দানবপূর্ণ একটি পুরো রণতরীর বহরকে বহন করতে পারে শুধুমাত্র একফোঁটা পানি। সুতরাং যখন ব্ল্যাক ডেথ কিংবা স্মলপক্স দর্শন দিতে এলো, তখন কর্তৃপক্ষ সর্বোত্তম যে কাজটি করার কথা চিন্তা করল সেটি ছিল বিবিধ দেবতা এবং সন্তদের উদ্দেশ্যে গণ প্রার্থণার আয়োজন সংঘটিত করা। এটি কোনো প্রকার সাহায্য করেনি। প্রকৃতপক্ষে যখন মানুষ প্রার্থনার জন্য একত্রিত হতো; তখনই বেশি ত্বরান্বিত হতো সংক্রমণ।

মধ্যযুগে মহামারির দায় চাপানো হতো ক্রুদ্ধ দেবতা কিংবা খারাপ বাতাসের ওপর

গত শতাব্দীতে পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানী, ডাক্তার এবং নার্সরা তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং একসাথে বোঝার চেষ্টা করেছেন মহামারির গতিপথ ও একইসাথে সেগুলোকে মোকাবিলা করার উপায়। বিবর্তনবাদ ব্যাখ্যা করে কেন এবং কিভাবে নতুন রোগগুলোর আবির্ভাব ঘটে এবং পুরাতনগুলো আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে। বংশগতিবিদ্যা বিজ্ঞানীদের সক্ষম করে তোলে ভাইরাসের কর্মপ্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি চালাতে। মধ্যযুগের মানুষ ব্ল্যাক ডেথের কারণই বের করতে পারেনি। কিন্তু আজকের বিজ্ঞানীরা মাত্র দুই সপ্তাহে সনাক্ত করেছেন নোভেল করোনা ভাইরাস। সেইসাথে বের করেছেন এর গঠনপ্রণালী এবং বিকশিত করেছেন আক্রান্ত মানুষ শনাক্ত করার একটা নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিও।

একবার যদি বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন মহামারি কেন ঘটে; তাহলে তাদের জন্য যুদ্ধ করাটা সহজ হয়ে দাঁড়ায়। টীকাদান কর্মসূচি, এন্টিবায়োটিকস, স্বাস্থ্যবিধির উন্নতি এবং আরো বেশি উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো মানুষকে অদৃশ্য দানবদের থেকে রক্ষা করছে। ১৯৬৭ সালেও স্মলপক্সে আক্রান্ত হয় দেড় কোটি মানুষ। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে বিশ লাখ। ঠিক পরের দশকেই স্মলপক্স টীকাদানের জন্য চলে বৈশ্বিক কর্মসূচি। উদ্যোগ এতটাই সফল ছিল যে, ১৯৭৯ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে মানব জাতির জয় হয়েছে। নির্মূল হয়েছে স্মলপক্স। ২০১৯ সালে একজন ব্যক্তিও আক্রান্ত বা মৃত্যুবরণ করেনি এর কারণে।

সীমান্ত সুরক্ষা
বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারিতে ইতিহাস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
প্রথমত, এটা বোঝায় যে স্থায়ীভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। মনে রাখা দরকার, বিশ্বায়নের বহু আগে সেই মধ্যযুগে মহামারি ছড়িয়েছে দ্রুত। তাই যদি আপনি ১৩৪৮ সালের ইংল্যান্ডের মতো হঠাৎ করে তাবৎ বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন— সেটা যথেষ্ট হবে না। বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে নিজেকে রক্ষা করতে হলে, মধ্যযুগে যাওয়াটা কার্যকরী হবে না। এ জন্য আপনাকে যেতে হবে পূর্ণতার শিখরে পৌঁছানো প্রস্তর যুগে। সেটা কি আপনি করতে পারবেন?

দ্বিতীয়ত, ইতিহাস নির্দেশিত করে যে, সত্যিকার সুরক্ষা আসে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিনিময় এবং বৈশ্বিক ঐক্যের ভেতর দিয়ে। যখন একটা দেশ মহামারির কবলে পড়ে, তখন অর্থনৈতিক ধসের ভয় না করে তাদের উচিত সবাইকে সত্যটা জানানো। তখন অন্য দেশগুলোর উচিত তাকে একঘরে না করা। বরং তার তথ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া । আজকে, চীন সারা বিশ্বের দেশগুলোকে করোনাভাইরাস নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখাতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চমাত্রার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশ্বাস।

কার্যকর কোয়ারেন্টাইন বিধানের জন্যেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন। কোয়ারেন্টাইন এবং লকডাউন মহামারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস থাকে কিংবা তারা যার-যার তার-তার নীতিতে চলে—তখন শাসকবর্গ এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় ভোগে। যদি আপনি আবিষ্কার করেন আপনার দেশে ১০০ করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে; তখন আপনি সবগুলো শহর এবং গোটা অঞ্চল লকডাউন করে দেবেন? বড় পরিসরে যদি দেখা যায়, তাহলে সিদ্ধান্তটা নির্ভর করে অন্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে আপনি কী প্রত্যাশা করেন তার ওপর। আপনার শহরগুলোকে লকডাউন করে রাখলে সেটি সেগুলোকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। যদি আপনি মনে করেন যে অন্য দেশগুলো আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবে—সম্ভবত তখনই আপনি এই জোরালো পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন অন্য দেশগুলো আপনাকে ত্যাগ করবে, আপনি সম্ভবত সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করবেন আর ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

নতুন দেহে সংক্রমণের মধ্যে দিয়ে মিউটেশন ঘটে ভাইরাসের

সম্ভবত এই ধরনের মহামারি সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মানুষের বোঝা উচিত, এটা এই যে একটা দেশে মহামারির বিস্তারলাভ মানে সমগ্র মানবজাতিকেই বিপদগ্রস্ত করা। কারণ ভাইরাসেরা বিবর্তিত হয়। করোনার মতো ভাইরাসগুলোর জন্ম বাঁদুড় জাতীয় প্রাণী থেকে। যখন তারা মানুষের শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, প্রথম দিকে মানব গ্রহীতার অভ্যন্তরে তাদের খাপ খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হয়। অল্পসময়ের মধ্যেই তারা তাদের প্রতিলিপি তৈরি করতে শুরু করে দেয়, এবং কখনো কখনো নিজেদের রূপান্তরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। বেশিরভাগ রূপান্তরই ক্ষতিকারক নয়। তবে প্রতিবারের রূপান্তর ভাইরাসকে আরো বেশি সংক্রামক এবং মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রতিরোধী করে তোলে—আর এই রূপান্তর থেকে আসা ভাইরাসের উপনমুনাটি দ্রুত গতিতে মনুষ্য বসতিতে ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে একজন মানুষ সম্ভবত ট্রিলিয়ন ভাইরাস কণার গ্রহীতা হতে পারে যেগুলো অবিরাম তাদের প্রতিলিপি তৈরির ভেতর দিয়ে যায়। প্রত্যেক সংক্রমিত ব্যক্তি মানবদেহে অভিযোজিত হবার জন্য ভাইরাসকে ট্রিলিয়নবার নতুন সুযোগ দেয়। প্রত্যেক মানব পরিবাহকই যেন একটি জুয়ার যন্ত্র যেটি ভাইরাসকে দেয় ট্রিলিয়ন লটারির টিকেট—এবং ভাইরাসের ওঠানো দরকার শুধু একটিমাত্র বিজয়ী টিকেট নিজেকে সম্মৃদ্ধশালী করার জন্য।

এ কিন্তু নেহায়েত অনুমান নয়। রিচার্ড প্রেসটন তার ‘ক্রাইসিস ইন দ্য রেড জোন’ বইতে ২০১৪ সালের ইবোলা বিস্তার নিয়ে এমনটাই বর্ণনা করেছেন। ইবোলার শুরুটা হয় কতিপয় ভাইরাসের বাঁদুড় থেকে মানব দেহে সংক্রমণের ভেতর দিয়ে। এই ভাইরাসগুলো মানুষকে প্রচণ্ড অসুস্থ করে ফেলত, কিন্তু তখনও পর্যন্ত তারা মানব শরীরের চেয়ে বাঁদুড়ের শরীরে বাস করতে বেশি অভ্যস্ত ছিল। ইবোলাকে অপ্রতুল অসুখ থেকে ভয়াবহ মহামারিতে পরিণত করেছে কেবল জিনের অভ্যন্তরে ভাইরাসের একটা রূপান্তর। রূপান্তরটি ঘটেছিল পশ্চিম আফ্রিকায় ম্যাকোনার কোনো এক জায়গাতে। এই রূপান্তরে পাওয়া ইবোলা উপনমুনার নাম দেওয়া হয় ম্যাকোনা স্ট্রেইন, যেটি মানব কোষের কোলেস্টেরল পরিবাহকের সাথে যুক্ত হতে সক্ষম। কোলেস্টেরলের বদলে পরিবাহক নিজেই ইবোলাকে কোষে নিতে লাগল। নতুন এই ম্যাকোনা স্ট্রেইন মানুষের শরীরে স্বাভাবিক ইবোলার চেয়ে চারগুণ বেশি সংক্রামক।

আপনি যখন এই লেখাটা পড়ছেন, সম্ভবত করোনাভাইরাসের মধ্যে একটিমাত্র জিনে একইরকম রূপান্তর সংঘটিত হচ্ছে যেটি তেহরান, মিলান কিংবা উহানের কিছু মানুষকে সংক্রমিত করেছে। প্রকৃতপক্ষে যদি এটাই ঘটে চলেছে, তবে এটা শুধু ইরানীয়, ইতালীয় কিংবা চৈনিকদের জন্য সরাসরি হুমকি নয়; হুমকি আপনার জীবনের জন্যেও। সারা বিশ্বের মানুষ নিজেদের জীবন এবং মরণে একীভূত আগ্রহে যু্ক্ত যেন করোনাভাইরাস তাদের কাছ থেকে এই ধরনের কোনো সুযোগ না পায়। এবং এটা এই বোঝায় যে আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষকে রক্ষা করা।

১৯৭০-এর দশকে মানুষ স্মলপক্সকে হারাতে পেরেছে প্রতিটা দেশে টীকাদান কর্মসূচির জন্য। যদি একটা দেশও তার জনগণকে টীকা দিতে ব্যর্থ হতো; তা বিপদে ফেলতে পারত গোটা মানব জাতিকেই। যতক্ষণ স্মলপক্সের অস্তিত্ব এবং অভিযোজন চলত; সেটি ছড়িয়ে পড়তে পারত যে কোনো জায়গায়। তাই করোনাভাইরাস-বিরোধী যুদ্ধে মানুষের উচিত সীমান্ত পাহারা দেওয়া। দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমান্ত নয়। বরং, পাহারা দেওয়া প্রয়োজন মানবপৃথিবী এবং ভাইরাস-গোলকের মধ্যকার যে সীমান্ত রয়েছে সেটি। এই পৃথিবী ভরে উঠছে অজস্র ভাইরাসে। রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়ে আসছে আরো অনেক। মানুষ আর ভাইরাসকে আলাদা করার সীমান্তটা রয়েছে প্রতিটি মানুষের অভ্যন্তরে। যদি পৃথিবীর কোনো এক জায়গায় একটি বিপদজনক ভাইরাস এই সীমানা অতিক্রম করে ফেলে; সেটি গোটা মানবজাতিকেই তখন বিপদে ফেলবে।

গত শতাব্দী জুড়ে এই সীমান্ত শক্তিশালী করেছে মানুষ। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সেই সীমান্তে দেয়ালের ভূমিকা পালন করছে। ডাক্তার, নার্স এবং বিজ্ঞানীরা যেন সীমান্তরক্ষী; অনবরত তদারকি করছেন সেখানে বাইরের কেউ ঢুকে পড়ে কিনা। যদিও সীমান্তের একটা বড় অংশ এখনো অরক্ষিত। সারা বিশ্বের কয়েকশো মিলিয়ন মানুষ রয়েছে যারা এমনকি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত। এটি আমাদের সবার জন্যেই সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতি তৈরি করছে। স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা জাতীয়ভাবে ভেবে অভ্যস্ত, কিন্তু ইরানীয় কিংবা একজন চৈনিককে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলে তা একজন ইসরায়েলি এবং আমেরিকানকেও রক্ষা করবে মহামারী থেকে। এই সহজ সত্যটা সকলের বোঝা উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই তা মাথায় রাখেন না।

নেতাহীন এক বিশ্ব
আজ কেবল করোনাভাইরাসের জন্যই মানবজাতি সংকটে পড়েনি। পড়েছে মানুষে মানুষে বিদ্যমান অবিশ্বাসের কারণেও। মহামারিকে পরাজিত করার জন্য মানুষকে বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে জনপ্রশাসনের ওপর আর দেশগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে পরস্পরকে। গত কয়েক বছর ধরে কাণ্ডজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদেরা ক্রমাগত খাটো করে এসেছেন বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস, জনপ্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে। এর ফলে, বিশ্বনেতাবিহীন অবস্থায় আজ আমরা এই সংকটের মুখোমুখি যারা আমাদের উৎসাহ দিতে পারতেন, সংগঠিত করতে পারতেন এবং সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়োজনে অর্থায়ন করতে পারতেন ।

২০১৪ সালের ইবোলা মহামারিতে আমেরিকা অনেকটা এইরকম নেতার ভূমিকা পালন করেছে। একই ভূমিকা পালন করেছে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা চলার সময়ে। তখন সেই পুনরুদ্ধার প্রকল্পে যথেষ্ট সংখ্যক দেশ তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল অর্থনীতির বিপর্যয় রোধ করতে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বিশ্বসংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে সহায়তা করা বন্ধ করে দিয়েছে, এবং বিশ্বের কাছে এটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকার কোনো প্রকৃত বন্ধু নেই—তার আছে কেবল স্বার্থ। যখন করোনাভাইরাস এলো, তখনো আমেরিকা একপাশে সরে থাকল এবং এখন পর্যন্ত নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে যাওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে। যদি সে নেতৃত্ব নিতে চেষ্টাও করে, আমেরিকার প্রশাসনের ওপর বিশ্বাস এমন পর্যায়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে যে, খুব কম দেশই তাকে অনুসরণ করবে। আপনি সেই নেতাকে অনুসরণ করবেন, যার নীতি ‘আগে আমি’?

আমেরিকা যে শূন্যতা রেখে গেছে, তা কেউ পূরণ করেনি। বরং হয়েছে ঠিক এর বিপরীত। বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিদেশিদের সম্পর্কে অহেতুক ভয় এবং অবিশ্বাসই বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে। বিশ্বাস এবং বৈশ্বিক সংহতি ছাড়া আমরা করোনাভাইরাস মহামারি থামাতে পারব না, এবং সম্ভবত ভবিষ্যতে এরকম আরো বহু মহামারি দেখব আমরা। কিন্তু প্রত্যেকটা সংকটই একটা সুযোগও বটে। আশা করা যায়, বর্তমান মহামারি বৈশ্বিক অনৈক্য দ্বারা সৃষ্ট বিপদ মানবজাতিকে অনুধাবন করাবে ।

একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এখানে দেওয়া যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে সমর্থন হারিয়েছে; তা উদ্ধারের জন্য এই মহামারি হতে পারে সুবর্ণ সুযোগ। যদি বেশি ভাগ্যবান সদস্যরা এই দুঃসময়ে তাদের সবচেয়ে চরম-আঘাতগ্রস্ত সহযোগীদের দ্রুতগতিতে এবং নিস্বার্থভাবে অর্থ, যন্ত্রপাতি এবং চিকিৎসা সেবা দিয়ে সহায়তা করে; তাহলে বোঝা যাবে ইউরোপীয় আদর্শ ফাঁপা বুলির চেয়ে বেশি কিছু। যদি, অন্যদিকে, প্রতিটি দেশকে নিজেই নিজের আত্মরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ফেলে যাওয়া হয়; তবে এই মহামারিই হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কফিনে শেষ পেরেক।

এই সংকটের মুহূর্তে, গুরুতর লড়াইটি মানবজাতির অভ্যন্তরেই জায়গা করে নিয়েছে। যদি এই মহামরির ফলে মানুষের মধ্যে অনৈক্য এবং অবিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়; তবে তা হবে ভাইরাসের বৃহত্তর বিজয়। যখন মানুষেরা তুচ্ছ বিষয়ে তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত—ভাইরাসেরা তখন দ্বিগুণ হয়। বিপরীত দিকে, যদি মহামারির ফলে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরো দৃঢ়বদ্ধ হয়, তবে বিজয়টা কেবল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে হবে না, হবে ভবিষ্যতের সকল ভাইরাসের বিরুদ্ধেও।


টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ইংরেজি প্রবন্ধের রূপান্তর
অনুবাদ : আহমেদ দীন রুমি

আপনার মতামত লিখুন :