“আমি কি পার্কে বসে রোদ পোহাতে পারব?”

অ্যালিসন হিলস, প্রফেসর, সেইন্ট জন কলেজ, অক্সফোর্ড
অ্যালিসন হিলস

অ্যালিসন হিলস

  • Font increase
  • Font Decrease

এমনিতে সাধারণ সময়ে, পার্কে বসে রোদ পোহানো একটা নির্মল প্রসন্নতার বিষয়। বর্তমান সময়ে এসে বিষয়টা এক অতিশয় সাহসিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে পুলিশ জড়িত হয়ে গেছে, এবং পার্কও হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে।

লকডাউন কখনোই আনন্দের ব্যাপার না। কিন্তু যখন, বাইরে পরিবেশ খুব সুন্দর, তখন বাইরে বের হবার তাড়না জাগা, কিংবা মুখে একটু রোদ লাগানো, বা একটু ঘাসের উপর শুয়ে থাকা, গাছের নিচে বসে থাকার ইচ্ছা জাগা—স্বাভাবিকভাবেই অনিবার্য। আপনি যদি চোখ বন্ধ করে একটু সময়ের জন্য ভাবেন, জীবনের সবকিছু এখনো ঠিকঠাকই আছে—তাহলে এইসবে অসুবিধা কোথায়?

চূড়ান্ত উদারবাদীরা মনে করেন, না এতে কোনো অসুবিধা নেই। তারা বলেন, স্বাধীনতাই পরম গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা বিনষ্ট হওয়া মৃত্যুর চেয়েও খারাপ (অন্য মানুষদের মৃত্যু, যে অঙ্কেই হোক)। আমরা বেশিরভাগ মানুষ এইধরনের চিন্তার সঙ্গে একমত না। আমরা সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি। কিন্তু এমনকি, লকডাউনের নিয়ম-কানুনও আমরা সবসময় এরকম থাকি, তা দরকার মনে করে না।

এখানে ব্যতিক্রমও আছে। কেন নয় শুধু আর একবার, শুধু আমার জন্য, আমার পরিবার, আমাদের সানটান ক্রিম এবং বনভোজনের ঝুড়ির জন্য? যদি আমার আঞ্চলিক পার্ক শূন্য হয়, আমার পরিবার এবং আমি উন্মুক্ত বাতাসের মধ্যে আমাদের বনভোজন উপভোগ করতে পারি। আমরা নিজেরাও এতে সতেজ হলাম, আর অন্য কারো ক্ষতি করলাম না—অন্যরা তো যে কোনো মূল্যেই হোক নিজগৃহে থাকার ব্যাপারে মনস্ত করেছে।

কিন্তু এই ধরনের চিন্তাভাবনায় সম্ভাব্য কী ধরনের ভুল থাকতে পারে?

মানুষের এই ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং অপরদিকে সমাজের সার্বিক মঙ্গল, একদিকে সাধারণ নিয়মনীতি, অন্যদিকে এর ব্যতিক্রম—এই বিষয়গুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দার্শনিকদের দীর্ঘ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, এবং সঠিক উত্তরের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন উপসংহারে পৌঁছাতে হয়েছে তাদের।

ক্রিড়াতত্ত্ববীদদের মতে (ক্রিড়াতত্ত্ব : কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি অধ্যয়ন) এটা খুবই যুক্তিসঙ্গত যে, সবাইকে ঠিক করার চাইতে কিছু মানুষকে [যেমন আমাকে বা আমার পরিবারকে] ঠিক করা উত্তম। কিছুসংখ্যক নৈতিক দার্শনিকেরা মনে করেন, নৈতিকভাবেও এই পন্থাটি সঠিক। উপযোগবাদীদের বয়ান অনুসারে, নিয়মনীতি বানানোই হয়েছে ভাঙবার জন্য, তবে তখন, যখন আপনি এই নিয়মনীতি ভাঙবার মধ্য দিয়ে মানুষকে সুখি করতে পারবেন। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, আমাদের মৌলিক এবং নৈতিক দায়িত্বটাই হলো বৃহত্তর সংখ্যক মানুষের জন্য বৃহত্তর সুখের বিধান করা। করোনাভাইরাসের সময়ে এই কথার অর্থ হবে, একে অন্যের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা।

হ্যাঁ, আপনার নিজের আনন্দের জন্য আপনি যদি তেমনটা করতে চান—সূর্যস্নান করে, বনভোজন করে, সবাই লকডাউনে আছে এই ভাবনা ভেবে—সেক্ষেত্রে আপনার এই কাণ্ড শুধু অনুমোদিতই না, বরং নৈতিকভাবেও আসলে আপনার এটি করবার অধিকার আছে। অবশ্যই আপনি ভাবতে পারেন, আমার পরিবারকে বাইরে বাইরে এভাবে শুয়ে-বসে থাকতে দেখে লোকেদের প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হলে হবে, এবং তাতে সামগ্রিক সুখ বিনষ্ট হলে হবে (যদিও প্রচণ্ড ক্ষোভ বিষয়টাও খুব উপভোগ্য)। কিন্তু আসলে এর মধ্য দিয়ে আমরা হয়তো অন্যদেরকেও নিয়ম ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করে তুলব। এবং সকলেই যদি এইভাবে ভাবেন, তাহলে একসময় পুরা পার্কটাই লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে। যেহেতু এটা খুবই বিপজ্জনক হবে, তাই আমাদের ঘরে থাকাই সবচেয়ে উত্তম রাস্তা। আসলে এই সব কথার অর্থ একটাই, কর্তব্যের সঙ্গে আমাদেরকে বিচক্ষণতা বজায় রাখতে হবে। তা যদি আমি রাখি, তবে কোনো ক্ষতি নেই, অসুবিধাও নেই।

আমরা যেভাবে ভাবলাম, সেটা কি আসলেই সঠিক?

ইমানুয়েল কান্ট নীতির এই মৌলিক প্রশ্নটিকে অন্যভাবে ভেবেছেন। বিষয়টা আদতে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কিভাবে প্রযোজ্য হবে? কান্টের চিন্তামতে, কেবলমাত্র ইউনিভার্সাল ল বা সার্বজনীন বিধানের অনুসারেই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তা সঠিক হবে। আমরা জানি, যদি আমরা প্রত্যেকে পার্কে গিয়ে বনভোজন আরম্ভ করি, তাহলে কেউই নিরাপদভাবে সেটা করতে পারব না। যখন আমি এটা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে করে ফেললাম, তখন কিন্তু আমি সবার কথা ভেবে করলাম না। আমি অন্যদের ওপর নির্ভর করলাম যে, তারাই সব নিয়মকানুন মানবেন, তারাই কষ্ট করবেন আমাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। আমি নিজেকে ব্যতিক্রম, অথবা একটা ‘স্পেশাল কেইস’ হিসেবে ধরে নিলাম। এটা আসলে অন্যদের প্রতি সম্মানসূচক আচরণ করা হলো না। এটা অনুচিত হলো।

আমরা যদি বুঝতে পারি নৈতিকতা শুধু লাভ-ক্ষতির বিষয় না, বরং সম্মান প্রদর্শন ও ঔচিত্যেরও বিষয়, তাহলে আমরা বুঝতে পারব এইসময়ে পার্কে গিয়ে আনন্দ করা কী ধরনের ভুল। আমরা একবার যদি এইভাবে ভাবতে শুরু করি, তাহলে আমাদের আরেকটু বড় ক্যানভাসেও তাকাবার প্রয়োজন আছে। রাজনৈতিক দার্শনিকদের অনেকে, যেমন কার্ল মার্ক্স, জোর দিয়ে বলেছেন যে, আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো তৈরি হয় মূলত সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে, যা আমরা নিজেরা ইচ্ছামাফিক গ্রহণ করিনি। লকডাউনের অভিজ্ঞতা বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্নরকম হতে পারে—প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব, তাদের পরিবারের পরিবেশ এবং জীবনযাপনের ধরন, এইসবের বিবেচনায়। নিশ্চিতভাবেই উঁচু দালানের উঠানবিহীন আবদ্ধ ফ্ল্যাটে থাকার তুলনায় বড়সড় কোনো মনোরম বাগানসমৃদ্ধ বাসায় থাকাটাই আরামের।

লকডাউন সমাজের অসমতাগুলোকে প্রকট করে তুলছে। যদিও এটা লকডাউনের নিয়মকানুন ভাঙবার আনুকুল্য পাবার ক্ষেত্রে বরং আরো কম মার্জনীয় ব্যাপার। কিন্তু আমাদের সবাইকে নিয়ম মেনে চলতে হবে, এর মানে এটা নয় যে, আমরা কাউকে অযথাই দোষ দেব। তার ঘরে থাকার অর্থ না জেনে, এবং তার বাইরে বের হওয়ার কারণ না বুঝেই তাকে বিরাট দোষী বানিয়ে ফেলব। অবশ্যই তাকে মেনে চলতে হবে, কিন্তু আপনাকেও সদয় থাকতে হবে। বেশিরভাগ মানুষই এখন তাদের সেরাটা করে যাচ্ছেন।

এটা এই দুর্যোগের একটা চিহ্ন যে, পার্কে বসে নিতান্ত রৌদ্রস্নানও কিন্তু এখন গভীর কিছু প্রশ্ন তুলে আনছে, আমাদের জীবনের সবচাইতে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে: আমাদের সবার সুখে থাকা এবং এমনকি যদি আমি অন্যের নিয়ম মানার ওপর নির্ভর করি, উপযোগবাদীরা যেভাবে বলেছেন। অথবা কিভাবে আমরা সম্মান করতে পারি অন্যকে, এবং কিভাবে উচিত কাজটি করতে পারি, ইমানুয়েল কান্ট যার উত্তর দিয়েছেন। এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব কী হবে, কার্ল মার্ক্স যার ওপরে জোর আরোপ করেছেন!

পরিশেষে, আমরা একটি আবশ্যিকতার আলাপ দিয়ে শেষ করতে পারি, যেটা কার্ল মার্ক্সের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, (রুশো এবং হেগেলের কাছেও)। সেটা হলো, পারস্পরিকতার আবশ্যিকতা, বা সংহতি। এখানে দায়িত্বভার দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা বড়ধরনের তফাৎ আছে, এখানে কিছুমাত্র মানুষ বৃহত্তর সংখ্যক মানুষকে সেবা দিচ্ছেন। ডাক্তার, নার্স এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়বার ভাবনা বাদ দিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলেছেন, এবং প্রয়োজনীয় সেবাদান জারি রেখেছেন। আমাদের বাকিদের জন্য, এখানে খুব অল্প কিছুই করবার আছে, যা দিয়ে আমরা এই বৈশ্বিক দুর্যোগে কিছুমাত্র পরিবর্তন এনে দিতে পারি। এমতাবস্থায় আমাদের অসহায় এবং বিহ্বল বোধ করা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে, আমরা ঘরের মধ্যে অবস্থান করে তাদের সাথে সংহতি জানাতে পারি, যারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি করছেন। আমরা আমাদেরটা নির্ধারিত অংশটা পালন করে যাচ্ছি, এবং সবার সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছি, যারাও একই রকম করছেন। এটাই সর্বোচ্চ, এবং অন্ততপক্ষে, যা আমরা করতে পারি।


দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রবন্ধের রূপান্তর
অনুবাদ : যাকওয়ান সাঈদ

আপনার মতামত লিখুন :