নিজের বাসা রেখে অন্য বাসা থেকে অফিস করছি

কামরুজ্জামান মিলু
নিজের বাসা রেখে অন্য বাসা থেকে অফিস করছি

নিজের বাসা রেখে অন্য বাসা থেকে অফিস করছি

  • Font increase
  • Font Decrease

কথায় আছে দুঃসময় বলে কয়ে আসে না। আমার মত কোটি মানুষের মনে এখন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হচ্ছে করোনাভাইরাস কবে যাবে দেশ থেকে? কবে নিজের বাসা থেকে নিরাপদে বের হয়ে কাজে যাব, বাজার করব, বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে বের হব কিংবা প্রিয় মানুষদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিবো আমরা। সময় যেন এক জায়গায় থেমে রেখেছে আমাদের। এই কঠিন সময়েও ঝুঁকি নিয়ে অফিস করতে হচ্ছে অনেককে। সেটাও অবশ্য প্রয়োজনে। আমি গত ১০ বছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছি।

তবে গত ২২ মার্চ দিনটি ছিল আমার জন্য ব্যতিক্রম এবং মনে রাখার মত দিন। গত মাস থেকেই কথা হচ্ছিল একটি নতুন চাকরির বিষয়ে। তবে সেটা সংবাদপত্রে না, ভিন্ন জায়গায়। গত ২২ মার্চ এসিআই লজিস্টিকসের (স্বপ্ন)-এর প্রধান কার্যালয়ে যাবার পর মিডিয়া অ্যান্ড পিআর ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগপত্রটি হাতে তুলে দিলেন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। প্রায় ৫ বছর কাজ করা প্রিয় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকা ছেড়ে নতুন চাকরিতে যোগ দিবার সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। এর আগে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরে ৪ বছর কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, তার আগে শিক্ষানবিশ হিসেবে দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায়। নতুন চাকরির সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আমার হাতে বেশি সময় ছিল না। তাই আমার অন্যতম প্রিয় ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে ও উক্ত প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম সম্পাদক শামীমুল হক, বার্তা সম্পাদক কাজল ঘোষ, বিনোদন বিভাগের প্রধান মোশাররফ রুমী ও প্রধান বার্তা সম্পাদক সাজেদুল হক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে নতুন প্রতিষ্ঠানে নতুন চাকরি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

শুরু হলো ‘স্বপ্ন’কে ঘিরে আমার জীবনের নতুন পথ চলা। চলতি মাসের ৫ তারিখে নতুন চাকরিতে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও করোনার কবলে পুরো দেশ খারাপ সময় পার করার জন্য তা পিছিয়ে ১১ এপ্রিলে যোগদান নিশ্চিত করলাম। দেশের অন্যতম বৃহত্তম সুপারশপ ‘স্বপ্ন’এর প্রধান কার্যালয়ে নতুন পদে কাজ করতে এসে ভালোই লাগছে। তবে অন্যদিক দিয়ে কষ্টও কম হচ্ছে না। কারণ আমার বাসা মোহাম্মদপুর নবোদয় হাউজিং সোসাইটিতে। ভাড়ায় থাকা এ বাসার কয়েকটা বাড়ির পর এক বাড়িতে করোনা রোগী পাওয়ার কারণে লকডাউন করা হয়েছে অনেক আগে। সেই বাসা থেকেও তেমন কেউ ভয়ে বের হয় না এখনো। তাই বাধ্য হয়ে ওই এলাকায় না থেকে আমার চাচা শ্বশুরের বাসায় থেকে নিয়মিত অফিস করছি। মোহাম্মদপুরের উনার সেই ফ্ল্যাটটি ফাঁকায় ছিল। কারণ আমার চাচা শ্বশুর বর্তমানে ঢাকার বাইরে আছেন। তাই সৌভাগ্যক্রমে আমি যোগাযোগ করার পর সেখানে থাকার সুযোগ করে দিলেন তিনি। এজন্য উনাকে অবশ্যই আমার অন্তরস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

কিন্তু পরিবারের দুই প্রিয় সদস্য আমার স্ত্রী ও সন্তান বরিশালে আছে এখন। লকডাউনের আগে তারা বরিশালে যায়। দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে বুঝিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকাতে না এসে আমি তাদেরকে ওখানেই থাকতে বলি। তারাও আমার কথাটি রাখে। এখনো তারা বরিশালে আছে। প্রতিদিন অফিস শেষে ভিডিও কলে কথা হয় আমার স্ত্রী মিতুর সঙ্গে। আমার তিন বছর চার মাস বয়সের একমাত্র মেয়ে মাহভিন জামান (আমায়া) আমাকে প্রায় ভিডিও কলে বলে বাবা তুমি কোথায়? বাসায় আসো না কেনো? আমি বলি, এই তো আর কয়েকটা দিন। তারপরই তোমার সঙ্গে দেখা হবে। তোমার জন্য চকলেট কিনে রেখেছি। ঢাকায় এসে নিও, এখন জমাচ্ছি। এই বলতে বলতে প্রায় এক মাস পার হতে চললো। লকডাউন শেষ হয়নি। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা এখনো কমেনি। এরইমধ্যে আমি নতুন অফিসেও কাজ শুরু করেছি। অফিস থেকে আসা যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা থাকাতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না।

এদিকে অফিসের সকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক ব্যবহার করছেন। তবে মার জন্য চিন্তা হয় আমার। বাবা মারা যাবার পর থেকে চার বছর হলো মা আমার দেশের বাড়ি দিনাজপুরেই একা থাকছেন। ঢাকায় আসতে ভয় পান তিনি। ঢাকা তার পছন্দ না হওয়ায় কিছুদিন আমার বাসায় থেকে চলে যান দিনাজপুর। আর এখন তো করোনার কারণে ঢাকায় আসতে আরও ভয় পাচ্ছেন। তিনি নিয়মিত খবর নিচ্ছেন আমার, আমিও সময় পেলেই কথা বলছি মার সঙ্গে। এরইমধ্যে নতুন অফিসে কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে। ভালো কিছুর প্রত্যাশায় দিন-রাত পরিশ্রম করছি। নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে তেমন পরিচয় এখনো হয়নি, তবে ধীরে ধীরে সকলের সঙ্গে বিভিন্ন কাজে গিয়ে কথা হচ্ছে। সকলে বেশ মিশুক ও আন্তরিক। আমার নতুন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির ভাই অফিসের সব স্টাফদের জন্য পিকআপ-ড্রপ গাড়ির (যাতায়াত, প্রয়োজনীয় স্যানিটাইজারের) ব্যবস্থা করেছেন। পুরো অফিসের সকলে করোনাকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনেই কাজ করছেন। এজন্য সাব্বির ভাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

করোনার এই কঠিন সময়ে আমি নিজের বাসা রেখে অন্য বাসা থেকে অফিস করছি। নিজের কাপড় অফিস থেকে যাবার পর নিজেই পরিষ্কার করছি। লন্ড্রি নিজে করছি। কষ্ট হচ্ছে এসব করতে। কারণ আমি অভ্যস্ত না। তবে সবকিছু নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে করছি, প্রয়োজনে করছি, সময় সবকিছু নতুন করে শেখাচ্ছে। রাতের রান্নাটা অবশ্য আমার স্ত্রীর ছোট বোন মুষান্না জাহান ইমির দায়িত্বে পড়েছে। ইমিকে আমরা বাসার সকলে ইমু বলেই ডাকি। সে আর্ন্তজাতিক একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। ঘরে বসেই অফিস করছে। রাতের খাবারটা কষ্ট করে রান্না করে দিয়ে যায় আমাকে। শত কাজের ফাঁকে তার এই সহযোগিতা আমার জন্য বিশেষ পুরস্কার। না হলে কষ্ট হয়ে যেত আমার। এজন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি ইমুকে। তবে জানি না কতদিন করোনা নামক আতংক থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলতে পারবো আমরা। তবে ডব্লিউএইচও’র দেওয়া তথ্যমতে ও বন্ধু-পরিবার মহলে থাকা ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী চলার চেষ্টা করছি। নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ছি, টিভিতে সংবাদ দেখছি। আর অনেকদিন লেখালিখির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে নিজের লেখা পত্রিকার পাতায় নামসহ দেখার বিষয়টি প্রতিনিয়ত মিস করছি। আরও বেশি মিস করছি আমার মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের। তারা দুরে থাকলেও ভালো থাকুক এটাই চাওয়া। ইনশাল্লাহ বেঁচে থাকলে, সুস্থ থাকলে আবারো দেখা হবে প্রিয়জনের সঙ্গে। মহান আল্লাহতায়ালা চাইলে আবারো ফেরা হবে পরিবারসহ নিজের বাসায়। আড্ডা হবে প্রিয়জনদের সঙ্গে। করোনা দ্রুত বিদায় হোক শহর থেকে, আমাদের দেশ থেকে।

লেখক:  কামরুজ্জামান মিলু, মিডিয়া অ্যান্ড পিআর ম্যানেজার, এসিআই লজিস্টিকস লি. (স্বপ্ন)