সাবধান ঝুঁকি বাড়ছে

সাইফুল হাসান
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

২৫ মে, ১৭২০। পূর্ব ভূমধ্যসাগর (লেবানন) থেকে ‘গ্রান্ড সেইন্ট আন্তোইন’ নামক একটি জাহাজ ফ্রান্সের মার্সাই বন্দরে নোঙর করে। জাহাজটিতে প্লেগের প্রকোপ ছিল। এ তথ্য জানার পরও, নগর কর্তৃপক্ষ তাদের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র বন্দরটি বন্ধ করতে আগ্রহী ছিল না। কারণ নগরের খাদ্য মজুত ফুরিয়ে আসা নিয়ে তারা দুঃশ্চিন্তায় ছিল। আবার ব্যবসায়ীরাও পণ্য সরবরাহ পেতে উদগ্রীব ছিল। এবং তাদের কারণেই জাহাজটি নোঙরের অনুমতি দেওয়া হয়।

প্লেগ ঠেকাতে নগর কর্তৃপক্ষের ভাবনা ছিল, বন্দরে ভেড়া মাত্রই জাহাজটির নাবিকদের জারস নামক একটি দ্বীপে আইসোলেশনে পাঠানো হবে। কিন্তু জাহাজটি বন্দরে আসার আগেই স্থানীয়রা (কুলি ও কর্মী) নাবিকদের সংস্পর্শে আসে। এবং সংক্রমিত হয়। তাদের মাধ্যমে প্লেগ পুরোমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী দুই বছরে মার্সাইয়ের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মারা যায় প্লেগে। যা ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অব মার্সেই’ নামে পরিচিত।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র শিথিলতায় কী ঘটতে পারে, মার্সাই তার বড় উদাহরণ। গত শতকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া নগর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় স্প্যানিশ ফ্লুতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু বাড়তি সতর্কতায় নিউইয়র্কে বহু প্রাণ রক্ষা পায়। মহামারিতে সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তা শারীরিক বা আর্থিক অথবা দুটোই হতে পারে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ নেই। ফলে ন্যূনতম ক্ষতির বিনিময়ে মহামারি এড়ানোর পথ খোঁজা উচিত।

ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্যখাত ও অর্থনীতির ভেতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সরকারি নীতিতে জনস্বাস্থ্য কতটা উপেক্ষিত তাও প্রকাশিত। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দুনিয়ার প্রায় সব দেশেরই চিত্র এক। তবে, উন্নত দেশগুলোর সুবিধা হচ্ছে, তাদের হাতে প্রচুর সম্পদ, শক্তি ও প্রযুক্তি আছে। যে কোনো ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ। কিন্তু উদীয়মান দেশগুলোর পক্ষে মহামারিজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।

অর্থনীতির ক্ষতি তবু পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত হলে জীবন ও জীবিকা দুটোই যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে করোনায় এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আক্রান্ত ৪০ লাখের বেশি। ইউরোপ-অ্যামেরিকায় সংক্রমণের গতি কমলেও, রাশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হিসেবে, দেশে আক্রান্ত পনের হাজার পেরিয়েছে। মৃত্যু আড়াইশো পার। এবং সংক্রমণের গতি উর্ধ্বমুখী।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বিবিসিকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি খুব খারাপ হলে দিনে ৬৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। প্রয়োজনে আবার কঠোর লকডাউন করতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, করোনার ঝুঁকি এখন প্রতিদিন বাড়ছে। চলতি মাসেই সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছাবে। এবং প্রতিদিনকার রোগীর সংখ্যা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ফলে পুরো মাস ‘কারফিউ’র মতো ছুটি পালন করা গেলে ভালো হতো।

এ পর্যায়ে লকডাউন প্রত্যাশিত হলেও, সরকারের কাছে অর্থনীতি প্রাধান্য পাওয়ায় গার্মেন্টসসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখীখাত, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে। প্রধান শপিংমলগুলো না খুললেও, দোকান খুলতে শুরু করেছে। গণপরিবহন বন্ধ, তবে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বাড়ছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে অর্থনীতি জেগে উঠছে। অবশ্য, অর্থনীতিতে ফেরা ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্পও খুব নেই।

কেননা, সাধারণ ছুটির প্রায় দেড়মাস পেরিয়েছে। এ অবস্থায় সবকিছু বন্ধ বা আটকে রাখা কঠিন। তাই ছুটির শর্ত শিথিল করার পাশাপাশি সরকার খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো হচ্ছে করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র ও হাসপাতালের সংখ্যা। বসুন্ধরা কনভেনশন হলকে দুই হাজার শয্যার আইসোলেশন হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়েছে। চীনা বিশেষজ্ঞরা আসছেন বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে। জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দুই হাজার চিকিৎসক এবং পাঁচ হাজার নার্স। দেশব্যাপী সিসিইউ-ভেন্টিলেটর স্থাপন, আইসোলেশন সেন্টার গড়ে তোলার জন্য ১৪শ’ কোটি টাকার জরুরি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

লকডাউন যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই অনেক বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত। এজন্য অনেক পরিকল্পনা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং দৃঢ় অঙ্গিকার লাগে। অর্থাৎ ব্যাপক পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ এর সাথে পুরো জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। তাই নির্দিষ্ট ওই সময়কে জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধাবাস্থার মতো করে পরিচালনা করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। কিন্তু ঢিলেঢালা ছুটি পেয়ে লাগামহীন বাঙালি তা উদযাপনে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সাথে ভাইরাসও।

দুঃখজনক হচ্ছে, করোনা মোকাবেলায় অনেক সময় পাওয়া গেলেও, বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। মূল দায় অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। ৮ মার্চ করোনা রোগী পাওয়ার পরপরই লকডাউনে যাওয়া উচিত ছিল। তাহলে সহজেই ভাইরাসটিকে থামানো যেত। পাশাপাশি ওইসময়ে বিদেশ থেকে আসা প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইন করানো গেলে ভাইরাসটি ছড়ানোর সুযোগ পেত না। কিন্তু সাধারণ ছুটি শুরু দিতে দিতেই ২৬ মার্চ। সে সময়ও তিন সপ্তাহের কারফিউ দেওয়া গেলে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন হতো বলে দাবি অনেকের।

প্রশাসনের চেষ্টা সত্ত্বেও মানুষকে পুরোপুরি ঘরে রাখা যায়নি। ছুটির মধ্যেই গার্মেন্টস মালিকরা লাখ লাখ শ্রমিক ঢাকায় এনেছে। সারাদেশের বাজারগুলোতে ভিড় করেছে হাজারো মানুষ। শত শত মানুষ লাইন দিয়েছে টিসিবির ট্রাকের সামনে। খাবারের সন্ধানে অনেক মানুষ রোজ রাস্তায় বেরিয়েছে।

শুরুর দিকে দেখা গেল, চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হয়নি হাসপাতালগুলো। ডাক্তার-নার্সদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব। পরীক্ষাগার ও কিটের অভাব। তথ্যের অভাব ও গড়মিল। সমন্বয়হীনতা। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবিকতার অভাবও। সব মিলিয়ে জোড়াতালি ব্যবস্থা এবং অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত। বর্তমানে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হলেও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। স্বস্তির হলো, ভাইরাসটিতে মৃত্যুর হার কমে এসেছে। কিন্তু মানুষের অসচেতনতা ও উদাসীনতায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

করোনা মোকাবেলায়, এখন পর্যন্ত সরকারের বেশিরভাগ প্রস্তুতি রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে। কিন্তু ভাইরাস ৬৪টি জেলায়ই ছড়িয়েছে। এবং বেশিরভাগ জেলায় পরীক্ষা সুবিধা নেই। হাসপাতাল, আইসোলেশন এবং অক্সিজেন সাপোর্টও সীমিত। ঢাকায় অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও, হাসপাতাল ও চিকিৎসা নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। সম্প্রতি একজন অতিরিক্ত সচিব অনেক ভোগান্তির পরও আইসিইউ সেবা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এমন ঘটনাতেই বোঝা যায়, হাসপাতালগুলো বাড়তি চাপ নিতে পারছে না। সামর্থ্যের চেয়ে বেশি রোগী তারা সামলাচ্ছে।

এরওপর ছুটির শর্ত শিথিল করায় সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়ে হাজার হাজার রোগী হলে অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। এমনকি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের যে সীমিত সম্পদ তা দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে হবে। দেশের সব মানুষের জন্য যেহেতু হাসপাতাল বানানো সম্ভব নয়, তাই ঢাকার চাপ কমাতে করোনা চিকিৎসা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি, বেসরকারিখাতকে পুরোপুরি সক্রিয় করতে হবে। তাহলে ভোগান্তি হয়তো কিছুটা কমবে।

বর্তমান বাস্তবতায়, জনসচেতনতা ছাড়া সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিকল্প নেই। সরকারের উচিত এ বিষয়ে আগ্রাসী প্রচারণা চালানো। জনগণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানছে তা মনিটরিং করা। করোনা পরীক্ষার সুযোগ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। অসুস্থ কেউ যেন হাসপাতাল থেকে ফেরত না যায় তা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতির অবনতি হলে, পুনরায় লকডাউনে ফেরার প্রস্তুতি রাখা। এবং রুটি রুজি হারানো মানুষদের সহায়তা অব্যাহত রাখা।

অন্যদিকে নাগরিক কর্তব্য হচ্ছে ঘরে থাকা। স্মরণ রাখা উচিত লড়াইটা অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে। যার কোনো প্রতিষেধক নেই এবং চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। তাই জরুরি প্রয়োজন না হলে কোনোমতেই বাইরে বেরুনো উচিত নয়। এরপরও বহু মানুষকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে বেরুতেই হবে। এদের মধ্যে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের বেশিরভাগ মানুষ অসচেতন। তাদের কাছে ক্ষুধার ভয় করোনার চেয়ে বড়।

ভয়টা মূলত এদের নিয়েই। ইতোমধ্যেই কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক আক্রান্ত হবার কথা শোনা গেছে। বিশেষত বস্তিবাসী, নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যাপকহারে সংক্রমিত হলে বিপদ। নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কারখানায় হয়তো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে, কিন্তু শ্রমিক যেখানে বাস করে সেখানে কোনো দূরত্বই বজায় রাখা সম্ভব নয়। এমনকি বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়াও সম্ভব নয়। কারণ এত পানি আর সাবানের জোগান তাদের নেই।

জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে এরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে। অথচ এদের ঘামেই প্রবৃদ্ধির ঘোড়া তেজী হয়। রাষ্ট্রের চাকচিক্য বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফেপে ওঠে। মাথাপিছু আয় বাড়ে। ধনী আরো ধনী হয়। সরকারের সাফল্যগাঁথা তৈরি হয়। ফলে কৃষক-শ্রমিক এবং প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা সবার নিশ্চিত করা দরকার। এবং তা অর্থনীতির স্বার্থেই।

সীমিত পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর কথা বলা হলেও, এখন আর তা সীমিত নেই। এই উদ্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ, সকলেই মানছেন। কিন্তু এছাড়া উপায়ই বা কী? কোটি কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন কোনো সরকারের পক্ষেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ এর সাথে ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রনোদনা, করোনা প্রতিরোধ, চিকিৎসার এবং রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব জড়িত। তাই ঝুঁকি জেনেও সরকার কিছু কিছু ছাড় দিচ্ছে। প্রয়োজনে আবার সব বন্ধ করে দেবে।

প্রতিদিন সংক্রমণের যে চিত্র তাতে পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত সাধারণ ছুটিও ঈদ পর্যন্ত বহাল থাকবে। সেটা না হলে, যান ও মানুষের চলাচল যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে হলেও। জনগণ সচেতন না হলে, সরকারের একার পক্ষে করোনা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। ফলে নাগরিকদেরই দায়িত্বশীলতা দেখাতে হবে।

চীন, কোরিয়াসহ অনেক দেশেই করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। ফলে ভাইরাসটিকে হালকা করে দেখা উচিত নয়। সবার মনে রাখা উচিত, মাত্র চারমাসে প্রায় তিনলাখ মানুষের জীবন নিয়েছে করোনা। আরো কত নেবে সময়ই বলবে।

বেঁচে থাকলে শপিং, আড্ডা, ঘোরাফেরার সুযোগ আসবেই, আর মরে গেলে? শুধুমাত্র আপনিই যাবেন এবং আপনার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মৃত আপনি রাষ্ট্রের কাছে শুধুই একটি সংখ্যা মাত্র। তাই সাবধানে থাকুন। সরকার ছাড়লে ছাড়ুক। করোনা কিন্তু ছাড়বে না।

যার মূল্য হতে পারে আমাদের জীবন।

আপনার মতামত লিখুন :