“নয়া উদারনীতিবাদের সর্বশেষ মহাবিপর্যয়”

আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

নোয়াম চমস্কির জন্য করোনাভাইরাস মহামারির অগ্রাহ্য করে যাওয়া শিক্ষাটা হলো, “এই সংকট পুঁজিবাদেরই সংস্করণ নয়া উদারনীতিবাদের জন্য আরেক মহাবিপর্যয়।” যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে ওয়াশিংটনে বসে সরকার পরিচালনা করা সোশিওপ্যাথ ভাঁড়গুলোর মাধ্যমে।

ম্যাসাচুসেটস্ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজিতে ভাষাবিজ্ঞানে অধ্যপনার পর বিশ্বের সবচেয়ে সমাদৃত এই পণ্ডিত ২০১৭-তে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনাতে। নিজ বাসা তুসন থেকে তিনি কথা বলেছেন ইউর‌্যাক্টিভের পার্টনার ইএফই-এর সাথে। কোভিড-১৯ এর শিক্ষা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে চমস্কি আঙুল তোলেন বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যর্থতার দিকে।

“একটা শিক্ষা হলো, পুঁজিবাদেরই সংস্করণ নয়া উদারনীতিবাদের জন্য আরেকটা বিপর্যয়। মহাবিপর্যয়। সেই শিক্ষাটা যদি আমরা না নেই; তবে পরের দফায় আরো খারাপ হয়ে ফিরে আসবে। যা ঘটেছে তা অবশ্যম্ভাবি ছিল। ২০০৩ সালের সার্স মহামারির পর বিজ্ঞানীরা ভালোভাবেই জানত যে সম্ভাব্য করোনাভাইরাসের ধরন হিসাবেই আরো মহামারি সামনে আসছে। তখনই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল। সচরাচর যেভাবে ফ্লুয়ের সাথে নেওয়া হয়। সামান্য তারতম্যের কারণে প্রতি বছরই আনতে হয় নতুন ফ্লু ভ্যাকসিন। আগেই প্রস্তুত থাকলে উৎপন্ন করা যায় দ্রুত। কিন্তু তা হয়নি। কাউকে তো বলটা নিতে হবে এবং এগিয়ে যেতে হবে।”

দুইটি সম্ভাবনা আছে এরজন্য। প্রথমত ঔষধ কোম্পানিগুলো। পর্যাপ্ত রিসোর্স আছে তাদের। সমৃদ্ধ আমাদের উদার উপহারে। অথচ তারা এটা করে না। বরং লক্ষ্য রাখে বাজারের সংকেতের দিকে। বাজার সংকেত আপনাকে বলে দেয় বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নিলে আদতে মুনাফা নেই। অন্যদিকে আছে নয়া উদারনীতিবাদের হাতুড়ি অর্থাৎ সরকারের, কিছু করার অনুমতি নেই। যেন সমাধান না; সরকার নিজেই এখানে সমস্যা।

যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে ওয়াশিংটন গ্যাং-এর কারণে। তারা জানে কিভাবে নিজেদের ব্যতীত পৃথিবীর বাকি সবাইকে দোষারোপ করা যায়। এই বিপর্যয়ের দায় তাদের। যুক্তরাষ্ট্র এখন সংকটের কেন্দ্র। আর একমাত্র দেশ হিসাবে এতটাই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে মৃত্যু এবং সংক্রমণের সঠিক তথ্যটা অব্দি দিতে পারছে না।

সংকটের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণকে চমস্কি বর্ণনা করেন পরাবাস্তব হিসাবে। সুতরাং ফেব্রুয়ারিতেই মহামারি লাগামহীন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের সবাই এটি দেখতে পেল ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতেই। ট্রাম্প বেরিয়ে এলেন পরবর্তী বছরের নতুন বাজেট হাতে ধরে। বিষয়টা গভীরভাবে দৃষ্টির দাবি রাখে। রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানে বাজেট মহামারির মধ্যে আরেক দফা কাটা হলো। বৃদ্ধি পেল জীবাশ্ম জ্বালানিশিল্পের জন্য বরাদ্দ। আরো ভর্তুকি দেওয়া হলো বিপর্যস্ত করে তুলতে মানবজীবন। আরো বরাদ্দ পেল সামরিক খাত; দিনকে দিন যা স্ফীতি হচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এবং আরো বরাদ্দ দেওয়া হলো ট্রাম্পের বিখ্যাত প্রাচীরের জন্য। এটিই আপনাকে সরকার পরিচালনা করা সোশিওপ্যাথিক ভাঁড়গুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে বলে দেয়। আর দেশটাও তাদের জন্যই ভুগছে।

“এখন তারা হন্যে হয়ে কারো ঘাড়ে দোষ চাপানোর জন্য খুঁজছে; চীন কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। তারা যারা করছে তা রীতিমতো অপরাধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় বরাদ্দ নামিয়ে আনার মানে কী? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কাজ করে সারা পৃথিবীব্যাপী। বিশেষ করে গরীব দেশগুলোতে মায়েদের স্বাস্থ্য এবং ডায়েরিয়ায় মৃত্যুর মতো বিষয়াদি নিয়ে। সুতরাং আপনি বলবেন, ওকে, চলো দক্ষিণের প্রচুর মানুষ হত্যা করি; কারণ তাতে সম্ভবত আমি আমার নির্বাচনের ছকে উন্নতি আনতে পারব।”

করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমানোর প্রচেষ্টার পর ট্রাম্প নীতি গ্রহণ করলেন সংকট কমানোর। যদিও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কৃত ভুলগুলোকে স্বীকার করেননি। ট্রাম্পকে আপনার ক্রেডিট দিতেই হবে। খুব সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী মানুষ। পি টি বারনামকে তিনি বানিয়েছেন অপেশাদার। তিনি তো এটা করতেও সক্ষম যে এক হাতের ব্যানারে লেখা, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমিই তোমার রক্ষক। আমার উপর আস্থা রাখো; দিনরাত আমি তোমার জন্যই কাজ করছি।” আর অন্য হাতে পেছনে ছুরি বসানো। নির্বাচকমণ্ডলিদের যারা তার বন্দনা করে; তাদের সাথেও এমনটাই করে। কী করেছে; যায় আসে না। তাকে সাহায্য করে কতিপয় গণমাধ্যম। আর রিপাবলিকানরা কেবল তাকিয়ে থাকে ফক্স নিউজ, রাশ লিম্বাহ, ব্রেইটবার্টের সেগম্যান্টগুলোর দিকে।

ট্রাম্প যা বলে; তারই প্রতিধ্বনি করে তারা। যদি সে বলে, “এটি কেবল একটি ফ্লু; বাদ দাও।” তারা বলবে, হ্যাঁ, এটি কেবল একটা ফ্লু; বাদ দাও। পরের দিন সে বলবে, “এটি একটি ভয়ানক মহামারি। আমিই প্রথমে লক্ষ্য করেছি।” তখন আবার সকলে জিগির তোলবে, “তিনি ইতিহাসের মহানতম পুরুষ এবং তার আবিষ্কার স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার।” দিনের পর দিন এভাবেই চলে। সকালে সে নিজে ফক্স নিউজের দিকে তাকায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় আজ কী বলা উচিত। ব্যাপারটা বিস্ময়কর, রুপার্ট মারডক, রাশ লাম্বাহ এবং হোয়াইট হাউসের সোশিওপ্যাথগুলো দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কে বদল আসবে কিনা, চমস্কির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এর জবাব তরুণদের মধ্য থেকে আসবে।

ভবিষ্যদ্বাণী করার জোঁ নেই। এটা নির্ভর করে চলতি ঘটনাগুলো পৃথিবীর মানুষ কিভাবে নিচ্ছে। এটি আরো স্বৈরাচারীর দিকে নিতে পারে। দমনমূলক দেশগুলো, যারা ঘটনার চেয়ে বেশি প্রচার করে বেড়াতো নয়া উদারনীতিবাদ নিয়ে। বস্তুত তারা সে সব নিয়ে কাজ করছে এখন। মনে রাখবেন, পুঁজিবাদী শ্রেণিটা কখনো ঢিল দেয়নি। বরং সব সময় সংগ্রামে আছে। এতকিছুর মধ্যেই তারা আহ্বান করছে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বাজেট বরাদ্দের জন্য। নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থা ট্রাম্পের অধীনে উল্টে গিয়ে সংযোজিত হলো কয়লা উৎপাদক হিসাবে। আর তা কয়লা স্থাপনার চারপাশের মাটিতে মার্কারি এবং অন্যান্য দূষণে নিষেধাজ্ঞা আইনকে নাকচ করে। তার মানে হলো, “চলুন আরো আমেরিকান শিশুদের হত্যা করি এবং চলুন ধ্বংস করি পরিবেশ।” কারণ কয়লা কোম্পানির জন্য এই পথেই মুনাফা আসে। আর অবশ্যই তা পরিবেশ ধ্বংস করার মাধ্যমে। এটাই তারা করে চলছে ক্রমাগত। প্রতিদিন বিরতিহীন। যদি কোনো বিরোধিতা না আসে; তাহলে দিনশেষে পৃথিবীর কপালেই শনি।

কোভিড-১৯ এর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চমস্কি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সংহতিহীনতার সমালোচনা করলেন। আন্তর্জাতিকভাবে যা ঘটে চলছে; তা সত্যিকার অর্থেই দুঃখজনক। সংকট মোকাবিলায় জার্মানি বেশ ভালো করছে। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়েছে; বাড়িয়েছে সেবাদানের ক্ষমতা। নয়া উদারনীতিবাদকে খুব কড়ায় গণ্ডায় মানা হয়নি। ইতালিতে মহামারির অবস্থা তীব্র। তারা কি জার্মানি থেকে সাহায্য পাচ্ছে? বরং সৌভাগ্যক্রমে সাহায্য পাচ্ছে আটলান্টিকের অপর পাড়ের ‘সুপারপাওয়ার’ কিউবার কাছে থেকে। কিউবা ডাক্তার পাঠাচ্ছে; চীন পাঠাচ্ছে যন্ত্রপাতি। অন্তত কিছুটা সাহায্য তারা পাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধনী দেশগুলো থেকে না। এটা আপনাকে জানান দেয় কিছু একটা চিন্তার বিষয়।

আসলে একমাত্র দেশ হিসাবে যথার্থভাবে আন্তর্জাতিকতা দেখাচ্ছে কিউবা। তাও এবারই প্রথম না। তা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। কিউবা ৬০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিধ্বংসী আক্রমণের কেন্দ্র ছিল। অর্থনৈতিক অবরোধের দীর্ঘ সন্ত্রাস এবং তারপরেও অলৌকিকভাবেই তারা টিকে গেছে। পৃথিবীকে দেখিয়ে চলছে তাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ।

কিন্তু আপনি যুক্তরাষ্ট্রে এসব নিয়ে কথা বলতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রে আপনাকে কেবল কিউবাকে দোষারূপ করতে হবে; কারণ সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। সে যা করে; তা ওই গোলার্ধের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। দক্ষিণ কিউবার গুয়ান্তানামো নামের একটা স্থানে। যুক্তরাষ্ট্র যা কিউবার কাছে থেকে নিয়েছে কিন্তু ফিরিয়ে দেয়নি। অথচ তা আপনি বলতে পারবেন না। অপেক্ষাকৃত নম্র এবং অনুগতরা আরেকটু ভিন্ন কিছু বলবে। “চীনকে দোষারূপ করা উচিত। জোর দেওয়া উচিত ইয়েলো পেরিল তত্ত্বের ওপর। আমেরিকার ইতিহাসের আরো গভীরে ঢুকবে তারা। চীন আসছে আমাদের ধ্বংস করার জন্য। উনিশ শতকে ফিরে গিয়ে আপনি তাকে যে কোনো সময়ে আবির্ভুত দেখতে পাবেন।”

প্রগতিশীল আন্তর্জাতিকতাবাদীদের জন্য আহবান আছে। আহবানটি যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্স এবং ইউরোপে ইয়ানিস ভারোফাকিসের মাধ্যমে ইস্যু হয়েছে। ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রগতিশীল উপাদানগুলো একত্রিত করার জন্য। হোয়াইট হাউসের কৃত্রিম প্রতিক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিকতাবাদকে ঠেকাতে এর পরিকল্পনা হয়েছিল। ট্রাম্পের প্রশাসন একত্রিত করতে চাচ্ছে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বর্বর দেশগুলো। উপসাগরের তেলপ্রধান রাজ্যগুলো, সিসির মিশর, মোদির ভারত, ডানপন্থী পরিচালিত ইসরায়েল, ভিকটর ওরবান চালিত হাঙ্গেরি এবং অন্যান্য দেশ।

একমাত্র যথার্থ আশা আমি দেখি বার্নির নির্ভরতায় প্রগতিশীল আন্তর্জাতিকতার অগ্রগতিতে। সাধারণভাবে বলা হয় স্যান্ডার্সের ক্যাম্পেইন ব্যর্থ ছিল। পুরোপুরি ভুল। বস্তুত এটা ছিল দারুণ সফলতা; অবিশ্বাস্য সফলতা। স্যান্ডার্স আলোচনার মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছেন। যথেষ্ট রকম বদলে দিয়েছেন নীতি। দুই বছর আগে যা উল্লেখ করার মতো ছিল না; বর্তমানে তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে; যেমন ‘গ্রিন নিউ ডিল’ এর কথা। টিকে থাকার জন্য বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন :