করোনাকালে সমাজ কাঠামো ও মানুষের সুরক্ষা

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
করোনাকালে সমাজ কাঠামো ও মানুষের সুরক্ষা

করোনাকালে সমাজ কাঠামো ও মানুষের সুরক্ষা

  • Font increase
  • Font Decrease

সমাজ একটি নদীর মতো। চলমান ও বহমান। দেখা যায়না, এমন একটি কাঠামো নিয়ে সমাজ পরিগঠিত। এজন্যই 'সোশ্যাল স্ট্রাকচার' বা 'সমাজ কাঠামো' নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। গবেষকরা কোনো দেশের আর্থ, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি কেনো বিষয়ের সমস্যা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জন্য 'সমাজ কাঠামো' নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালান।    

এই সমাজ, তার কাঠামো এবং এর মধ্যে বসবাসকারী মানুষ কখনো কখনো, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে বা ঘটনায় প্রবলভাবে নড়ে যায়। বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ঘটনার তোড়ে সমাজ কাঠামো ও মানুষ আক্রান্ত হয়। থমকে দাঁড়ায় সবকিছু। ভীত-বিহ্বল হয় সবাই। কিংবা হয়ে যায় উদভ্রান্ত।

যুদ্ধ, মারী, মন্বন্তর, বিপ্লব, বিদ্রোহের কালে এমনই হয়। অতীতে বার বার হয়েছে। তখন সমাজ তার স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারেনা। সমাজের মানুষগুলোও স্বাভাবিক আচরণ করেনা কিংবা করতে পারেনা।

কোনো কারণের অভিঘাতে সমাজ কাঠামো আক্রান্ত হলে কিছু পরিবর্তন ও নতুন বৈশিষ্ট্য সামনে চলে আসে। আঘাতে যদি সমাজ নড়ে যায় তো উদ্বেগ বাড়ে মানুষের মধ্যে। কিংবা সমাজ ভীত হলে উৎকণ্ঠিত হয় সমাজের মানুষ।   

তখন সেই আক্রান্ত সমাজের মানুষজন আনন্দ এবং উত্তেজনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিকতার মধ্যে ফারাক করতে পারেনা। ভালো ও মন্দ মিশিয়ে ফেলে। প্রতিষ্ঠিত সামাজিক নীতি, নৈতিকতা ও প্রথাকে গুলিয়ে ফেলে। চিন্তা-ভাবনার মধ্যেও চলে আসে কিছু বিভ্রান্তি ও বৈকল্য।

ফলে সমাজে বিদ্যমান সমস্যাটির মোকাবেলার পাশাপাশি সেই সমস্যা যাতে সমাজের কাঠামো এবং মানুষের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমকে আক্রান্ত করতে না পারে, সেজন্য প্রটেকশন বা প্রতিবিধান গ্রহণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সমস্যা দূর করার পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হয় তখন।   

করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতিতেও এমনই হয়েছে। সন্দেহ নেই, বৈশ্বিক মহামারি বিভিন্ন দেশের সমাজ ব্যবস্থাকে প্রবল ঝাঁকি দিয়েছে। যদিও তা সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, মন্দা, মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষের মতো দ্রুতলয় ও প্রত্যক্ষভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য  নয়, তথাপি সন্তর্পণে সমাজ ও মানুষকে অক্টোপাসের শীতল আলিঙ্গনের এক ভীতিকর গহ্বরে ফেলে দিয়েছে করোনা পরিস্থিতি।

এই ভীতির নানারকম প্রকাশও ঘটছে। প্রতিরোধে সম্মিলিত অংশগ্রহণের বদলে হতচকিত সমাজের বিহ্বল মানুষ নানা অসঙ্গত আচরণ করছে। কেউ কেউ সমস্যার শ্রেণিগত ও আঞ্চলিক চরিত্র সন্ধান করছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আর এই ভাইরাসে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে কতজন উচ্চবিত্ত, কতজন মধ্যবিত্ত, কতজন নিম্নবিত্ত আর কতজন বিত্তহীন শ্রেণী’র, তা অনুসন্ধান করছে কেউ কেউ।

আশ্চর্যজনকভাবে, কেউ কেউ করোনায় কতজন আস্তিক আর কতজন নাস্তিক আক্রান্ত ও মৃত, সেই তথ্য তালাশ করছে। যদিও এইসব তথ্য ভাইরাস প্রতিরোধে কোনো অর্থ বহন করেনা। কারণ, 'নগরে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায়না' এবং 'অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকেনা'।

এইসব অহেতুক চর্চার বদলে হওয়া দরকার বৈজ্ঞানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার চর্চা। কিন্তু সামাজিক ভীতি ও উৎকণ্ঠার কারণে মানুষ তা না করে করছে এমনই অসঙ্গত-অসংলগ্ন আচরণ। একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল ট্রমা। আরো কিছু শব্দ করোনার বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে সামনে চলে এসেছে। যেমন, ডিমেনশিয়া, ম্যালানকলি, ক্যাথারসিস।

একইভাবে অস্থির সমাজ ও ভীতিবিহ্বল মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নানা উপকথা, মিথ ও গুজব। দাবানলের মতো এগুলো ছড়িয়েও যাচ্ছে এবং সমাজকে আক্রান্ত ও মানুষকে আরো বিপর্যস্ত করছে। এই নেতিবাচক কাজটি হয়ত কেউ সজ্ঞানে করছে। কিন্তু অনেকেই করছে অজ্ঞাতে। মূলত, ভীতি ও অস্থিরতার পটভূমিতে এসব প্রসারিত হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধের পাশাপাশি এইসব নেতিবাচক বিষয়কে থামানো দরকার। নইলে রোগের মতোই এসব আতঙ্ক, ভীতি ও নেতিচিন্তা মানুষ ও সমাজকে ভোগাবে।        

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে  পশ্চিমা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজগুলো সঙ্গরোধ ও সামাজিক দূরত্বের বিধান মানতে গিয়ে নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। মানুষও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপন্ন হচ্ছে। আমাদের প্রাচ্য দেশের সমাজ ও মানুষের ঘাত সহনীয় শক্তি বেশি বলে এবং এখানে সামাজিক বিন্যাস অপেক্ষাকৃতভাবে সামষ্টিক বলে সমস্যাটি প্রবল হতে পারছেনা। তথাপি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, হতাশা, নিঃসঙ্গতা বোধের একধরনের সুপ্ত চাপ বিরাজ করছে, যা নানা অস্বাভাবিক আচরণ ও বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে।

ফলে সর্বত্র বিরাজমান এক গভীর অসুস্থতার ছাপ সমাজ ও মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে হলেও প্রকাশ পাচ্ছে। মুখ্য আর গৌনের পার্থক্য করতে পারছেনা অনেকে। প্রবৃত্তি, বিকার , বিকৃতি ইত্যাদিকে অবলীলায় আকন্ঠ সমর্থন দিয়ে চলেছে অনেকেই। এগুলো করোনার স্বাস্থ্য ঝুঁকির মতোই সামাজিক-মানবিক বিপদের কারণ এবং যারা রোগাক্রান্ত হয়নি তাদেরকেও আক্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট।

অথচ বাস্তবতা হলো এই যে, করোনা অনেক দিন থাকবে এবং একে মানিয়ে বা কাবু করে আমাদের জীবনধারণ করতে হবে, এটাই মূলকথা। এই বাস্তবতার নিকটবর্তী হওয়াই এই পরিস্থিতিতে জরুরি। অপ্রাসঙ্গিক বা অহেতুক কথা ও কর্মের মধ্যে আবর্তিত হওয়া অকাম্য কিংবা সমাজকে অস্থির ও মানুষকে উদ্বিগ্ন করে বিপদ মোকাবেলা করা অসম্ভব। এই সারসত্য উপলব্ধি করা সকলের জন্যই জরুরি।

মানুষ হয়ত বিপদগ্রস্ত হবে বা  ভুল করবে এটাই তার স্বভাব। আর ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করাটা ও প্রতিবিধান অনুসন্ধান করা  তার নিয়তি। একইভাবে, ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। নইলে ভুলের চক্রে আবর্তিত হয়ে বিপদ আরো ঘনীভূত হবে ও বাড়বে।

ফলে করোনাকালে আত্মসমালোচনা ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে ও সমাজকে বাঁচিয়ে রেখে জীবনসংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়াই মানুষের মহত্তম কর্তব্য। সমাজকে অস্থির ও মানুষকে ভীত-বিহ্বল করে মানবিক-সামাজিক বিপন্নতা বাড়িয়ে তা করা যাবেনা। বরং রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি করোনাকালে সমাজ কাঠামো ও মানুষের সুরক্ষার জন্যেও সচেষ্ট হতে হবে।  

আপনার মতামত লিখুন :

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস