রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত স্মৃতিতে নেপাল

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত স্মৃতিতে নেপাল

রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত স্মৃতিতে নেপাল

  • Font increase
  • Font Decrease

১ জুন বিশ্বের ইতিহাসে নানা ঘটনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় দিনটি রক্তস্মৃতিতে মিশ্রিত। ২০০১ সালের এমনই ১ জুন হিমালয়কন্যা নেপালের রাজপ্রাসাদে ঘটেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। নিহত হয়েছিল পুরো রাজপরিবার।

১৯ বছর আগের দিনটি এখনো নাড়া দেয় সবাইকে এবং ঘটনাচক্রে আমি রাজহত্যাকাণ্ডের পর পরই নেপাল গিয়েছিলাম, যে স্মৃতি রয়েছে দিব্যপ্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত আমার 'রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে' গ্রন্থে। সেসব কথা এখনো নাড়া দেয় আমাকে।

ঘটনার দিন রাতে নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে অবস্থিত রাজপ্রাসাদে চলছিল রাজপরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনী পার্টি। পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, রানী ঐশ্বরিয়াসহ রাজ পরিবারের বিশ জনের মতো সদস্য। প্রায় প্রতি মাসেই রাজপরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনী পার্টি হয়। রাজা, রানী সহ রাজপুত্র, রাজকন্যা, রাজার ভাই, তাদের ছেলেমেয়েসহ অনেকেই উপস্থিত থাকেন সেসব পার্টিতে। কিন্তু ২০০১ সালের ১ জুনের পার্টি রক্তের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল।

রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ড নেপালসহ পুরো বিশ্বকেই অবাক করে দেয়। সপরিবারে নিহত রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম সহদেব জনগণের কাছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ পছন্দের ছিলেন। ফলে ঘটনাটি নেপালের জাতীয় ক্ষেত্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নেপালে ঘটনাটি নিয়ে চাপা উত্তেজনা ও নানা গুজব শুনতে পাই। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিশ্বের প্রায়-সকল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতোই নেপালের রাজপ্রাসাদ হত্যাযজ্ঞও রহস্যের চাদরে আবৃত থাকে।

নেপালের ক্ষেত্রে সুপ্রাচীন রাজবংশ ছিল ঈশ্বরের অবতার স্বরূপ। প্রাসাদের ভেতরের সব কিছুই ছিল জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু জানা যায়, হত্যাকারী হিসেবে নাম আসে রাজা বীরেন্দ্রর বড় ছেলে ক্রাউন প্রিন্স দীপেন্দ্রের নাম। আরো আসে তার প্রেম ও বিয়ে সংক্রান্ত নানা তথ্য। শোনা যায় প্রেমিকা দেভয়ানি রানার কথাও, যিনি ঘটনার পর পালিয়ে যান ভারতে।

ঘটনার পর পরই দীপেন্দ্র আত্মহত্যা করেন বলে জানানো হয়। কিন্তু তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়নি। ঘটনারও কোনো তদন্ত হয়নি। কারণ নেপালের আইনে রাজপ্রাসাদের ঘটনার তদন্ত করার নিয়ম নেই। ফলে অনেক কিছুই রহস্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে।

কিন্তু মানুষের মনে সন্দেহ ও প্রশ্ন থেমে থাকে না। কেন গোলাগুলি শুরু হবার পরেও প্রাসাদের নিরাপত্তাকর্মীরা কিছু করেনি, এমন প্রশ্ন সামনে আসে। রাজা বীরেন্দ্রর ভাই জ্ঞানেন্দ্র ঘটনার পর রাজা হন। তাকে নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। সবাই হাজির তাকলেও সেদিন পার্টিতে তিনি কেন অনুপস্থিত ছিলেন?

অনেকেই মনে করেন, জ্ঞানেন্দ্রর রাজ সিংহাসনে বসার একটি মাত্র উপায় ছিল। রাজা বীরেন্দ্র ও তার দুই ছেলে দীপেন্দ্র ও নিরঞ্জনের মৃত্যু। সেদিন দীপেন্দ্র বাবা, ভাইদের সাথে বোন ও তাদের স্বামীদেরও হত্যা  করে। সবাইকে হত্যা করতেও জ্ঞানেন্দ্রর কিছু হয়নি। কারণ, ঐদিন জ্ঞানেন্দ্র নিজে ছিলেন অনুপস্থিত, তার স্ত্রীর হাতে গুলি লাগলেও অন্যদের তুলনায় তার আঘাত ছিল খুবই সামান্য। এমনকি জ্ঞানেন্দ্রর ছেলে পরশ কোনো প্রকার আঘাত ছাড়াই বেঁচে যান, যা সবাইকে ভীষণ অবাক করে।

জ্ঞানেন্দ্র ও পুত্র পরশ দুজনই জনগণের কাছে খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। তবু তারাই ক্ষমতায় আসেন। মানুষের মধ্যে প্রেম-প্রণয়ের ইস্যুর পাশাপাশি নেপালের ক্ষমতার রাজনীতি ও বহিস্থ নানা ইস্যু গুঞ্জরিত হয়।

কারণ, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে চীনপন্থী মাওবাদীরা সরব ছিল এবং রাজা বীরেন্দ্র তাদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার নরমপন্থার অনুসারী ছিলেন। এজন্যই তাদের সরে যেতে হয় বলে ধারণা অনেকের।

তবে জ্ঞানেন্দ্র রাজা হয়েও নেপালের রাজতন্ত্র রক্ষা করতে পারেননি। রাজহত্যা নেপালের শাসন কাঠামোকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়। এবং সুপ্রাচীন রাজতন্ত্রের প্রতি জনগণ আস্থা হারায়, যদিও নেপালে রাজতন্ত্র ছিল ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ। শেষ পরিণতিতে বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাজতন্ত্রের অবসান হয়ে নেপালে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়। 

প্রায় দুই যুগ হতে চললেও বিশ্বের বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো নেপালের রাজপ্রাসাদ হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কেও প্রকৃত তথ্য মানুষ জানতে পারেনি। যারা সব বলতে পারতেন, তাদের সবাই সেদিন মারা যান। ফলে পুরো বিষয়টিই রয়ে গেছে রহস্যের অন্তরালে।

তবে, এই হত্যাকাণ্ড রাজতান্ত্রিক নেপালের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে অনুঘটকের কাজ করে। সপরিবারে নিহত হয়ে রাজা বীরেন্দ্র নিজেই রাজতন্ত্রের সমাধি রচনা করেন আর গণতান্ত্রিক নেপালের পথ উন্মোচন করে দেন। রাজতন্ত্র না থাকলেও নির্মমভাবে নিহত নেপালের এই রাজাকে মানুষ ভুলতে পারেনা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা 'সার্ক' গঠনের সময় রাজা বীরেন্দ্র ঢাকায় এসেছিলেন মধ্য আশি দশকে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে তিনি রোপণ করেছিলেন একটি বৃক্ষ, যা এখন অনেক বড় হয়েছে তার স্মৃতিকে বুকে নিয়ে।            

আপনার মতামত লিখুন :