'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'র ১৩৪ বছর

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম 
'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'র ১৩৪ বছর

'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'র ১৩৪ বছর

  • Font increase
  • Font Decrease

ঠিক ১৩৪ বছর আগের ঘটনা। ৪ জুলাই ১৮৮৬ সাল। ফ্রান্সের তরফে একটি বিশাল প্রতিমূর্তি উপহার দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' নামে বিশ্ববিখ্যাত নান্দনিক ভাস্কর্যটি  এখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম 'সিম্বোলিক আইকন'।   

'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'কে স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের লিবার্টি আইল্যান্ডে হাডসন নদীর মুখে, যেখানে জাহাজ নোঙর করে। যে স্থানটি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনকারী এবং অন্য দেশ থেকে ফিরে আসা আমেরিকানসহ সকল পর্যটকদের স্বাগতম জানায়।

তামার তৈরি 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উপহার হিসেবে আসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে। ঘটনাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শতবর্ষপূর্তির। সে উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উৎসর্গ করা হয়েছিল ভাস্কর্যটি ।

জুলাই মাসে পাঠানো হলেও বিশাল শৈল্পিক স্থাপনাটি পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা পায় একই সালের (১৮৮৬) অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখ। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামোটির নকশা প্রণয়ন ও তৈরি করেছিলেন ফেডরিক বারথোল্ডি। আরো জড়িত ছিলেন গুস্তাভ আইফেল, যিনি 'সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা'র স্মারক ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারেরও নকশাকার ছিলেন।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জুলাই মাসটি অবশ্য নানা রাজনৈতিক কারণে ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়েছে। ১৭৭৬ সালের জুলাই মাসে পরাধীন দেশটিতে এসেছিল মুক্তি ও স্বাধীনতার বার্তা।

২ জুলাই ১৭৭৬ সালে সামারের রৌদ্রস্নাত দিনে তৎকালীন রাজনীতিবিদগণ দেশটির জন্য স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিলেন। তারপর ৪ জুলাই কংগ্রেসের সমাপনী অধিবেশনে উচ্চারিত ও স্বীকৃত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা।

জুলাই মাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য  বিষয় হলো, এ মাসের ৪ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রেসিডেন্ট যথাক্রমে জন অ্যাডামস এবং টমাস জেফারসনের মৃত্যু হয়। ১৮২৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্তির দিনে উভয়েই মৃত্যুবরণ করেন।    

তবে ২০২০ সালের জুলাইয়ের মতো মর্মান্তিক মাস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত আর আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস কবলিত হয়ে শীর্ষ-আক্রান্ত দেশ। লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও আক্রান্তের ঘটনায় পুরো দেশটিই ভয়াবহতম বিপদে।

বিশেষত নিউইয়র্ক শহর, যা যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব ও গৌরব ধারণ করে এবং 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'র আবাসস্থল,  সেখানে বর্তমানে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজমান। মৃত্যু ও আতঙ্কের ভূতুড়ে নগরের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে সদা-জীবন্ত নিউইয়র্ক শহরকে। 

১৩৪ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় নিউইয়র্ক শহর এবং 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' প্রত্যক্ষ করেছে অসংখ্য ঘটনা। দেখেছে গৃহযুদ্ধের চাপা ছাই। দাসবৃত্তির উত্থান ও পতন। দেখেছে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের নিধন ও অভিবাসীদের বিস্তার।

দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব পাড়ি দিয়েও নিউইয়র্ক শহর এবং 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' টিকে থেকে স্বাক্ষী হয়েছে অনেক ঘটনাপ্রবাহ ও পালাবদলের। দেখেছে ইহুদি রিফিউজি, ব্ল্যাক কমিউনিটি, এশিয়ান ডায়াসপোরা, লাতিন আমেরিকার অবৈধ অভিবাসীদের স্রোত। তথাপি শত পটপরিবর্তনেও  স্থির ও অবিচল নিউইয়র্ক শহর এবং 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি'।

কিন্তু ২০২০ সালের জুলাই মাসে এসে চলমান করোনাভাইরাসের চরম আগ্রাসন ও তাণ্ডবের মতো বিপুল মানবিক বিপর্যয় আর কখনোই দেখেনি এই শহর, এই ভাস্কর্য । গভীর শোক ও বেদনাময় এই তীব্র হাহাকার ও সঙ্কুল পরিস্থিতিতে নিউইয়র্ক শহর এবং 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে শতবর্ষের সবচেয়ে কঠিনতম অধ্যায়।