আজি দুর্দিনে ফিরানু তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে

নিনি ওয়াহেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চলে গেল মনজুর আলী ননতু। তার শেষ বিদায়ে নির্ধারিত ও প্রাপ্য আয়োজনটুকুও শেষ পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেছে কঠিন নিরবতার মোড়কে। কারণ একটাই করোনাভাইরাস। যার তান্ডবে সমগ্র মানবজাতি আতঙ্কিত, ভীত ও সন্ত্রস্ত।  এ কথা ভাবতে গিয়েই হোঁচট খেলাম, জীবিতকালেও ননতুর উপস্থিতি কী কখনও সরব ছিল এই প্রবাসে-নাকি তা ছিল মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে? প্রায় এক দশকে ওর প্রবাস জীবনটিতে ছিল না ওর বর্নাঢ্য গৌরবময় জীবনগাঁথা নিয়ে কোথাও কোন প্রকার আলাপ-আলোচনা বা কোন আয়োজন। ওর ত্যাগ অগাধ দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা-দায়বদ্ধতা, আদর্শ নিষ্টার কথা অজনা থেকে গেছে প্রাবাসীদের কাছে। রণাঙ্গনের সম্মুখসারির লড়াকু এ বীর মুক্তিযোদ্ধা একজন নিভৃতচারী মানুষ। সাম্যবাদের মূল্যবোধে গভীরভাবে বিশ্বাসী এ মানুষটির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল সংস্কৃতির চর্চা ও সাধনা। তাই প্রায় সে একটি কথা বলতো- ‘রাজনীতি তার সঠিক গতিপথ হারালে সংস্কৃতি পারে পথ নির্দেশ করতে’। উদার সংস্কৃতিমনা এ মানুষটি ব্যক্তি জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে নিউ ইয়র্কে প্রথম সাক্ষাৎ ননতুর সঙ্গে। ২০১১ সালে ইমিগ্রান্ট হয়ে তখন সে ইউনিয়র্ক এসেছে। প্রথম সাক্ষাতে আমি এক নতুন ননতুকে আবিষ্কার করি। আমার প্রায় অর্ধ শতাব্দীর পুরনো বন্ধু মনজুর আলী ননতুকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মেলাতে পারছিলাম না এক সময়ের বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন ও সংস্কৃতি আন্দোলনের মাঠে-ঘাটে দাপিয়ে বেড়ানো সেই মানুষটিকে। কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটে গেছে। যেমন, ননতুও নিউইয়র্কের এই নরম নিনির সাথে আগের নিনির মিল খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানিয়েছিল। যদি এই সময়ের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি তথা বাংলাদেশের রাজনতিতে ঘটে গেছে বহু উত্থান পতন যার সঙ্গে সংক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল ননতুর জীবন দর্শন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে পৃথিবীতে মার্কসবাদে বিশ্বাসী  মানুষদের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের ভাবান্তর। বিশেষ করে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙনের প্রক্রিয়াটি বহু ত্যাগী নেতা কর্মীদের এক দিকে যেমন হতাশায় নিমজ্জিত করেছে, অন্যদিকে ভেঙে গেছে তাদের সুন্দর পৃথিবী গড়ার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ব্যক্তিজীবন রাজনীতি, সংস্কৃতি ও  অর্থনীতি নানা বিষয়ে সেদিন কথা বলেছে ননতু। জানিয়েছে ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথাও। তবে একটি জিনিস লক্ষ্য করেছি ওর অনমনীয় দৃঢ়তায় কোন ভাটা পড়েনি, গভীর আত্মপ্রত্যয়ী সে। এরপর কথা হয়েছে টেলিফোনে, দেখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রায়শই ওকে জড়িয়ে পড়েছি, একদিন বলেছিলাম কীবা হলো বলতো? আমাদের মার্কসবাদী তত্ত্ব দিয়েও।

খানিক থেমে ওর স্বভাব সুলভ জবাব ছিল ‘তত্ত্ব বাদ দিলেও একটি সত্য আমার তোমার মতো মানুষ অস্বীকার করতে পারি- জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি বৈষম্যহীনস মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র কি আমাদের কাম্য নয়? সত্যিই তাই উত্তর আমেরিকা তথা বিশ্ব জুড়ে করোনা তান্ডবের মধ্যে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন দেখে ননতুর কথাগুলো বার বার মনে পড়েছে। ‘ব্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন’ তো তত্ত্বহীন এ মানবিক জীবনের জন্য লড়াইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তত্ত্ব দিয়ে বা যেভাবে তাকে মূল্যায়ন করি না কেন- এটাই আজকের কঠিন বাস্তবতা। প্রথম দিন থেকেই ননতু আমাকে ওর স্বপ্নের কথা শুনিয়েছে। ননতু প্রায় বলতো ‘যে মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে না সে মানুষ বেঁচে থাকতেও পারে না, স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।’ তাই বোধহয় ওর চোখে মুখে সর্বদায় ছিল স্বপ্নের তীব্র হাতছানি। ওর সমস্ত কাজ  সমস্ত চিন্তাই ছিল সমাজ মুক্তি তথা সমাজ প্রগতির জন্য নিবেদিত।

শৈশব থেকে মেধাবী ছাত্র মনজুর আলী ননতু। সেই সঙ্গে কীর্তি ফুটবল খেলোয়ার নাট্যকর্মী ও সংগীত শিল্পী হিসেবেও ছিল ওর পরিচিতি। স্বল্পতম সময়েই রংপুর জেলা স্কুল ছাড়িয়ে ওর সেই খ্যাতি সমগ্র জেলাবাসীর দৃষ্টি আর্কষণ করেছিল। স্কুলে থাকাকালীন জুনিয়র ক্যাডেট কোচের কমান্ডারের দায়িত্ব পালনকালে ওর সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় মেলে। ১৯৬৮ সালে কৃর্তিত্বের সাথে মাধ্যমিক পরীক্ষা উর্ত্তীণ হয়ে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয় উচ্চ মাধ্যমিকে। ঢাকায় এসেই রংপুরের এই কীর্তি ফুটবলার ওয়ান্ডার্স ক্লাবে যোগ দেন। এবং নজরুল একাডেমিতে সংগীতে তালিম নিতে শুরু করে। কিন্তু, অচীরেই এই প্রগতিমনা তরুণ সম্পৃক্ত হয় রাজনীতিক ও সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। যোগদেয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে। গত শতকের সেই সময়টি ছিল উপমহাদেশের বাঙালির স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার অর্জন ভেঙে বেরিয়ে আসার এক উন্মাতাল পরিবেশ-পরিস্থিতি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন পীড়নমূলক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রদর্শনের বিরুদ্ধে তরুণ ননতুর তীব্র প্রতিবাদ ফুঁসে ওঠে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন’ গঠিত বিশেষ গেরিলার বাহিনীর সদস্য হিসেবে ননতুর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। কুমিল্লার বেতিয়ারায় হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয় সে। বেতিয়ারায় ওর ১১ জন বীর সহযোদ্ধা শহীদ হন। বেতিয়ারায় গেরিলাদের সাহসী ও প্রবল প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। আর তারই অংশীদার ছিল মনজুর আলী ননতু। সম্প্রাদিয়কতা , মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ যখন দেশে তরুণ  সমাজকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে  তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, ঠিক সেই সময়ের প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনজুর আলী ননতুর ভূমিকা আজও স্মরণীয়।

তাই তার সম্পৃক্ততা ছিল ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও উদীচীর মতো সংগঠনের সঙ্গে। প্রগতিশীল পিতার  দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে উপলদ্ধি ননতু গ্রহণ করেছিল তা ওর পরবর্তী জীবনধারার সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ওর পারিবারিক উত্তরাধিকার রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাথে ওর সম্পৃক্ততা ধারণের সহায়ক শক্তি ছিল।

ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্কের সূচনা ১৯৭২ সালের শেষভাগে এবং তা ছাত্র ইউনিয়নের সুবাদেই। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক। ননতুও তখন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা মহানগর শাখার সংরক্ষিত সম্পাদক। ইতিমধ্যে আমি দৈনিক সংবাদে যোগ দিয়েছি। মনে পড়ে সে সময়ের জাঁদরেল একজন সাংবাদিক তোজাম্মেল আলী যাকে সকলেই  ‘জেনারেল তোজা’ নামে ডাকতো- তিনি একদিন আমাকে জানালেন, মনজুর  আলী ননতু তার ছোট ভাই। নয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়  এবং ননতুর স্থান সপ্তম । এখানে উল্লেখ করতে চাই-ননতুর আরেক বড় ভাই চারুকলার ডিন মতলুব আলী যার স্ত্রী রেহানা মতলুব রেখা আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তারা নিউ ইয়র্ক প্রবাসী।

পরিচয়ের পরে ননতুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তরতরিয়ে এগিয়ে গেল রাজপথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সভা-সমাবেশ আর মিছিলে। রাজপথে কত সংখ্যক মিটিং মিছিল , প্রতিবাদ –প্রতিরোধে এক সাথে হেঁটেছি অথবা স্লোগানে মুখর হয়েছি তা ও যেমন বলতে পারবে না, তেমনি ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে রাজনীতিসহ  নানান বিষয়ে আড্ডা আর তর্কের কোন হিসেবেও জানা নেই। তবে সাংবাদিকতা পেশায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগের পাশাপাশি ইউনিয়েনের কর্মকাণ্ডের সাথেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ায় আমার সকল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধু সুহৃদের সাথে ক্রামান্বয়ে দূরত্ব তৈরি হয়। ননতুর সঙ্গেও ঘটেছে তা একইভাবে এবং সাথে যুক্ত হয়েছে আমার দেশের বাইরে চলে আসা।

কিন্তু তা সত্ত্বেও চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের অভিন্নতা কখনই বন্ধুত্বের মৌল কাঠামোয় আঘাত হানতে পারেনি।

বাংলাদেশে ছত্রিশ বছর বয়সের ফেলে আসা আমার ছাত্র রাজনীতি ও কর্মজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই ব্যক্তিটির সাথে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পুনরায়  এই নিউইয়র্ক শহরে আমার দেখা মিলেছে- আর যে সম্মান ভালোবাসায় তারা আমাকে জড়িয়ে রেখেছে, তাতেই আমার প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত ২৭ বছরের প্রবাস জীবন বাসযোগও সহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রায় বিশ বছর পরে ননতুকে খুঁজে পাওয়ার ব্যতিক্রম ছিল না।  বরং সম্মান ও ভালোবাসার পাশাপাশি যুক্ত  নানা বোঝাপাড়ায় আমাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় ও গাঢ় হয়েছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় জ্বলন্ত অবলম্বন- অগণিতক স্মৃতি- আমার সেই স্মৃতিতে চির উজ্জ্বল সৃহৃদ মনজুর আলী ননতু।