‘যে নাম বাজে শ্রাবণ-ধারায়’

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৪২৭ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাস এসেছে করোনাভাইরাসের কারণে গুঞ্জরিত কান্নার সাথে বৃষ্টির বিষন্ন বিলাপে। বৃহস্পতিবার পহেলা শ্রাবণের শুরুর দিনটিতে বর্ষা ঋতুর বৈভবশালী রূপ-সুধা হৃদয় স্পর্শ করলেও পাশাপাশি মহামারি করোনার প্রতাপও বিশ্ববাসীকে নানাভাবে তাপিত ও পীড়িত করছে।

শ্রাবণ মাসটি প্রকৃতির পাশাপাশি অসংখ্য গানে ও কবিতার উজ্জ্বল আভায় বিচ্ছুরিত। শ্রাবণকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ও বৈচিত্র্যময় গান, কবিতা রচনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলার শ্রাবণকে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন আরবের জমিনে। 'নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহমদ বোল’- এই নাত-ই-রাসুলটির তৃতীয় বা শেষ অন্তরাতে ‘শ্রাবণ’কে এভাবে বাণীতে যুক্ত করেছেন নজরুল: ‘যে নাম বাজে মরু-সাহারায়/যে নাম বাজে শ্রাবণ-ধারায়।' 

বর্ষা ঋতু, আষাঢ় এবং শ্রাবণ মাস নিয়ে নজরুলের প্রায় দেড় শতাধিক গান রয়েছে। এর মধ্যে শ্রেণি-বিভাজন রয়েছে, যেমন, কাজরী ২৩, কাব্য-গীতি ৪১, রাগপ্রধান ২৪, খেয়াল ২৫, ঠুমরি ২, আধুনিক ২৯, ঝুলন ৪, চৈতী ৩ এবং ৪ খানি হিন্দি গান।  পুরো বর্ষাঋতুর দেড় শতাধিক গানের মধ্যে শ্রাবণ মাস নিয়েই রয়েছে নজরুলের অনবদ্য ষাটটি গান।

প্রেম, প্রকৃতি, ধর্ম, দর্শন মিশিয়ে শ্রাবণ তথা শাওন মাসকে বিস্তৃত ও নান্দনিক পরিসরে  উদযাপন করেছেন নজরুল। এর মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি গানই বিপুল জনপ্রিয়। যেমন, 'শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে', 'শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না' ইত্যাদি অন্যতম।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বসন্ত ঋতুরাজ হলেও বৈচিত্র্যময়তা ও  বর্ণ বিভায় উজ্জ্বলতম বর্ষা। আর বর্ষার রাণী হলো শ্রাবণ। কারণ আষাঢ়ের একটানা বর্ষণের পর শ্রাবণ আসে মায়াবী জলকণার পরশ নিয়ে। বৃষ্টির সহনীয়তায় প্রকৃতিকে সাজায় বর্ণাঢ্য সাজে।

বৃষ্টির যে কত রকমের প্রকাশ, তা অনুভব করা যায় শ্রাবণে। কখনো ঝমঝম, কখনো ইলশেগুঁড়ি, কখনো ঝড়কে সাথে করে মুষলধারের বৃষ্টি শ্রাবণকে ভরিয়ে দেয়। কখনো টিপটিপ বৃষ্টিতে নুপুরের নিক্কণ তুলে শ্রাবণ-ধারা।

শ্রাবণের বৃষ্টিতে প্রকৃতির বহুমাত্রিক রূপও উদ্ভাসিত হয়। বৃষ্টি হওয়ার পূর্বের প্রকৃতির একটি রূপ থমথমে-গম্ভীর-এই বুঝি কিছু হয় আবার ঘন কালো হয়ে আকাশ ছেয়ে বিদ্যুৎ-বজ্র সাথে পৃথক এক রূপ ধারণ করে প্রকৃতি। আবার বৃষ্টি-পরবর্তী প্রকৃতির বৃষ্টিস্নাত রূপ মনকে উতলা করে তোলে। রৌদ্রকে সাথে নিয়ে খেলায় মাতে মেঘের ভেলা। মেঘে, বৃষ্টিতে রৌদ্রছায়ায় শ্রাবণ পুরো আকাশে বিছিয়ে দেয় রঙের মহোৎসব।  

যদিও গ্রাম-বাংলা ক্রম-অবলুপ্তির দিকে। দিগন্ত প্রসারিত মাঠে, বিপুল নদী তীরে, বাংলার সবুজে-শ্যামলে বর্ষার মাতাল দাপট দেখার সুযোগ কমছে দিনে দিনে। শাওনের দিন ও রাত্রিগুলোতে বৃষ্টির আবাহন শোনারও সুযোগ হ্রাস পেয়েছে। পরিবর্তমান গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতির অপরূপ পালাবদল অবলোকন করাও প্রায়-অসম্ভব হয়ে গেছে।

অন্য দিকে, শহুরে নগর জীবনের শব্দ, কোলাহল, ভিড়, বসতিতে পরিস্থিতি আরো বেদনাবহ। প্রকৃতি এখানে কোণঠাসা ভুল ও বিকৃত নগরায়নের দানবিক প্রকোপে। শ্রাবণের জলমগ্ন সুষমার বদলে নগর জীবনে যুক্ত হয়েছে শত দুর্ভোগ।

তবুও শ্রাবণ-ধারায় ভেসে ভেসে বৃষ্টির সাথে দেখা যায় জীবনের জলছবি। বৃষ্টির সমান্তরালে শোনা যায় দিনযাপনের টুপটাপ ধ্বনিপুঞ্জ। বাস্তবে না হলেও শ্রাবণ ক্যালেন্ডারের চিত্রিত পাতায় থাকেই। থাকে স্মৃতির দিনগুলো জুড়ে। আকাশে মেঘের গর্জনে আর বৃষ্টির বুনো উল্লাসে মনে করিয়ে দেয় শাওন রাতের জল ছলছল আবহ আর কারো আসা, না-আসার আখ্যান। শ্রাবণ এলে কেন জানি বুকে বাজে প্রিয় কোনো নাম; বৃষ্টির মিতালিতে শোনা যায় প্রিয়তম পদশব্দ!