মালদ্বীপ: নীড় ছোট, ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়



সুমন ভট্টাচার্য...
মালদ্বীপে দ্বিতীয় প্রধান ভাষা বাংলা। ছবি: বার্তা২৪.কম

মালদ্বীপে দ্বিতীয় প্রধান ভাষা বাংলা। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সদ্যপ্রয়াত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর একসময়ের বহু পুরস্কারজয়ী সিনেমা 'চরাচর'-এর ওপেনিং সিকোয়েন্সটা বহুবছর ধরে আমার মাথায় গেঁথে আছে| একটা সমুদ্রের তীরে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে নামছে, আবার উড়ে যাচ্ছে| সমুদ্রের নীল জল আর তার উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা পাখি উড়ে আসার দৃশ্য জীবনের একটা অন্য দ্যোতনা তৈরি করে| 'চরাচর' সিনেমার নায়ক,আমাদের যৌবনে বলিউডের থিঙ্কিং হিরো রজিত কাপুর একসময় এই সমুদ্র আর পাখিকেই জীবন বলে মেনে নেন|

মালদ্বীপের অসংখ্য দ্বীপের উপর দিয়ে চক্কর মারতে মারতে বিমান যখন নীল সমুদ্রের মাঝে হঠাৎ করে ভেলানা বিমানবন্দরে নামে, আমার তখনও 'চরাচর' সিনেমার ওই শুরুর দৃশ্যটার কথা নতুন করে মনে পড়ে যায়| মালদ্বীপের মতো দ্বীপও তো আসলে আমাদের সমুদ্রের সঙ্গে সহবাসের তালিম দেয়| পরিযায়ী হতে শেখায়|

প্রথম যে বার মালদ্বীপে গিয়েছিলাম, মনে আছে রাত্রিবেলা কোথা থেকে খাবার আনা যায়, সেই খোঁজ করতে গিয়ে আমার সঙ্গে 'ভাই ভাই ক্যাফ'র পরিচয়| মজিদি মাগু, রাজধানী মালের যেটা প্রধান রাজপথ, যে রাস্তাটা শহরের এক মাথা থেকে অন্য মাথা,আসলে পড়ুন এক সমুদ্রতীর থেকে আরেক সমুদ্রতীর পর্যন্ত গিয়েছে, সেই মজিদি মাগু থেকে গলিপথ দিয়ে একটু ঢুকে একটা রেস্তোরার গায়ে সব বাংলায় লেখা দেখে যতটা অবাক লেগেছিল, ততটাই ভাল লাগা তৈরি হয়েছিল ঢের বেশি। মাইকেল মধূসূদন দত্তের লাইনটা মনে পড়ে গিয়েছিল...প্রবাসে দৈবের বশে....।

 সরকারি তরফে কোভিডের জন্য সতর্কবার্তা যখন দেওয়া হয়, তখনও যেমন বাংলায় তা দিতে হয়, তেমনই দোকানে, বাজারে, রেস্তোরাতেও বাংলায় বিজ্ঞপ্তি ঝোলানো থাকে

এই প্রবাসে এমনভাবে মাতৃভাষার সঙ্গে মোলাকাৎ হয়ে যাওয়াটা সত্যিই একটা ওয়েলকাম সারপ্রাইজ ছিল| তার উপরে যখন 'ভাই ভাই ক্যাফ'র চাচা গম্ভীর মুখে জিগাইলেন, ভারতীয় পাঁঠার মাংস দেব না বাংলাদেশি পাঁঠার মাংস, তখন বুঝেছিলাম, বিস্ময়ের সবে শুরু, শেষ নয় মোটেই|

এখন বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়মিত মালদ্বীপ যাওয়ার পর জেনে গিয়েছি, এই দ্বীপপুঞ্জের নিজস্ব ভাষা দিভেহীর পর সবচেয়ে বেশি চলে বাংলাভাষা| সেইজন্য সরকারি তরফে কোভিডের জন্য সতর্কবার্তা যখন দেওয়া হয়, তখনও যেমন বাংলায় তা দিতে হয়, তেমনই দোকানে, বাজারে, রেস্তোরাতেও বাংলায় বিজ্ঞপ্তি ঝোলানো থাকে| অর্থাৎ ভেবে নিতে পারেন, সমুদ্রের মাঝে দিভেহী ভাষী মালদ্বীপ যদি অনেক দ্বীপের সমাহার হয়, তবে তার বুকে বাংলাভাষীদের একটা দ্বীপও ভেসে ভেসে থাকে| আমার মতো বাঙালিদের যা হৃদয়ের একূল, ওকূল ভাসিয়ে দেয়|

এমনিতে স্বাভাবিক সময়ে মালে যেহেতু আড্ডা মারতে বেরোয় মাঝরাতে, আর ডিনার করার কথা ভাবে ভোর তিনটে নাগাদ, সেহেতু আপনিও যদি সমুদ্রের নোনা জল আর গিটারের ধুনের মতো মালের এই জীবনচর্যাকে আলগোছে শরীরের উপর ফেলে রাখতে পারেন, তাহলেও আপনার এটাই অভ্যাস হয়ে যাবে| সেই অভ্যাসের বশে শহরের এক প্রান্তে, জেটির ধারে ফুড কোর্টে হয়তো রাত তিনটেতেই গিয়ে পৌছলাম, অমনি এক হ্যাংআউট থেকে কেউ চাচা বলে ডাকবে তো অন্য রেস্তোরা থেকে পায়েস খাওয়ার আমন্ত্রণ আসবে| ভোর রাতে টুনা মাছের চমৎকার কোনো পদ অথবা ভুনা খিচুড়ি খেতে খেতে কুমিল্লা কিংবা পাবনার জীবন, ফেলে আসা ভালোবাসার মানুষদের কথা শুনতে শুনতে আবার হয়তো মাথার ভিতর 'জামাইকা ফেয়াওয়েল'-এর লাইনগুলোই প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে|

এই দ্বীপপুঞ্জের নিজস্ব ভাষা দিভেহীর পর সবচেয়ে বেশি চলে বাংলাভাষা

এটা সত্যি মালদ্বীপের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশই মুসলিম| কিন্তু শুধু ধর্মীয় কারণ বোধহয় কুমিল্লা, পাবনা, চট্টগ্রাম থেকে এইরকম পরিযায়ী মানুষদের এই দ্বীপে নিয়ে এসে ফেলেনি| নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি, বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা কাজের সন্ধানে এই দ্বীপরাষ্ট্রে এসে পৌছেছে, নেপাল থেকেও মানুষ এসেছেন| আসলে গত কুড়ি বছরে যেভাবে মালদ্বীপ এশিয়ার অন্যতম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিলাসবহুল পর্যটনের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছে, তেমনই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মানুষদের জন্য অন্যতম কাজ খোঁজার ঠিকানাও হয়ে দাঁড়িয়েছে| মালদ্বীপের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো  ডলার, পাউন্ড, স্টার্লিং এর যে অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়েছে, তাতে এই দ্বীপরাষ্ট্রের শহরগুলোরও অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে| আর সেই সূত্র ধরেই মালদ্বীপে আজ এত বাংলাভাষীদের ভিড়|

লাতিন আমেরিকার সমুদ্র, জীবনের উদ্দামতা আর অপার রহস্যময়তা আমাদের ম্যাজিক রিয়্যালিজম শিখিয়েছে| মালদ্বীপের সমুদ্র, দ্বীপের জীবনচর্যা, নীল, নীল জল আর সাদা বালুকাবেলার মোহতে গোটা বিশ্বের পর্যটকদের আগমন, সেই পর্যটকদের পিছু পিছু যে পশ্চিমী আদবকায়দার লম্বা ছায়া, তাও আসলে এক কুহকী বাস্তবতা তৈরি করে| সেই কুহকী বাস্তবতায় আমরা বারবার নিজেদের সেঁকে নিই বাংলাভাষার ওমে|

মালদ্বীপের উইকএন্ড এ হয়তো শহরের প্রান্তে 'রাসফানু'র কৃত্রিম বিচে গিয়েছি| উইকএন্ড এ সমুদ্রের পাড়ে সাধারণত ভালই ভিড় হয়| বোরখা পড়া রমণী যেমন তাঁর সন্তানকে নিয়ে আসেন, তেমনই সপ্তাহের কাজের শেষে একটু জিরোতেও অনেকে আসেন| আমিও সমুদ্রের ধারের পাথরের প্রাচীরে বসে সামনে দিয়ে চলে যাওয়া বিলাসবহুল ইয়টের আলোর বিন্দু দেখি, স্পিড বোটের গতির ধাক্কায় ফেনিল জলে বুঁদ হয়ে যাই| কখনো সেই পাথরের প্রাচীরে, মানে সমুদ্রের গার্ড রেলে আমার পাশে এসে বাংলাদেশের কোনো তরুণ এসে বসে| বুঝতে পারি স্মার্ট ফোনে সে কারও সঙ্গে কথা বলছে| তারপরে যখন সে গান শোনে, আমি তাঁর দিকে তাকাই| সেই তরুণ হেসে বলে, ভাইয়া শুনবেন? আপনার দেশের গান| আমি হেডফোন গুঁজি| শুনতে পাই, 'নীড় ছোট,ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়|'

সুমন ভট্টাচার্য, কলকাতার বিশিষ্ট সাংবাদিক। কবি ও কথাশিল্পী।