আফগানিস্তানে কুড়ি বছরে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি



লুৎফে আলি মহব্বত, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
আফগানিস্তানে কুড়ি বছর হতে চলেছে আমেরিকার। সংগৃহীত

আফগানিস্তানে কুড়ি বছর হতে চলেছে আমেরিকার। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিগত কুড়ি বছরের প্রতিদিনই রক্তাক্ত আফগানিস্তানের ঘটনা ছিল সংবাদ শিরোনামে। তারও আগে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসী বাহিনির আফগানিস্তান দখলের পর থেকেই দেশটিতে চলছে যুদ্ধাবস্থা। আক্রমণ,  পাল্টা-আক্রমণ, দখল, পুনঃদখলে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত হয়ে আফগানিস্তান বিগত ৪২ বছর ধরে (২০২১-১৯৭৯)।  তবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিগত কুড়ি বছরের দায়িত্ব নিয়ে দেশটি থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দুইদিন আগে মার্কিন সৈন্যদের কবরগাহে শ্রদ্ধা জানানোর সময় আফগানিস্তান থেকে সৈন্য  প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক ও সাহসী ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, 'আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য পাঠানোর পর চারজন প্রেসিডেন্ট কার্যকাল শেষ করেছেন। এদের দুইজন রিপাবলিকান এবং দুইজন ডেমোক্রেট। আমি হলাম চতুর্থ জন। আমি সমস্যাটিকে পঞ্চম জনের জন্য রেখে যাবো না, শেষ করবো।'

বাইডেনের ঘোষণা বাস্তবসম্মত। কারণ আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকার প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর তালিকায় লম্বা। তদুপরি এই দীর্ঘ ও প্রলম্বিত সঙ্কট থেকে বের হওয়ার সম্মানজনক পথ বের করতেও মার্কিনিরা বার বার ব্যর্থ হচ্ছিল। ফলে বাইডেনকে একটি উদ্যোগী ও সমাধানমূলক পন্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে আফগানিস্তানের 'লোকসানি প্রকল্প' নিস্তার পাওয়ার স্বার্থে।   

ঘটনার সূচনা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। তাসের ঘরের মতোই ধসে পড়েছিল আমেরিকার টুইন টাওয়ার। সব মিলিয়ে প্রাণ গিয়েছিল ৩ হাজার মানুষের। আহত হয়েছিলেন আরও ২৫ হাজার। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং পেন্টাগনে আল-কায়দা হানার ঠিক পরেই 'ওয়ার এগেইনেস্ট টেটর' নামে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশ। আফগানিস্তানের শান্তি ফেরাতে মূলত তালিবান-বিরোধী অভিযানেই সেনা নামিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারপর পেরিয়ে গেছে ১৯টা বছর। তবে রক্তক্ষয় আর না, জানিয়ে দিলেন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন। ঘোষণা করলেন, ৯/১১-র কুড়ি বছর পূর্তির আগেই আফগানিস্তান থেকে সমস্ত সেনা প্রত্যাহার করে নেবে আমেরিকা।

বুশের শাসন কালের পর বারাক ওবামার দায়িত্বে থাকাকালীন ২০০৯ সালে হোয়াইট হাউস আরও সেনাসংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলত সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো’র সম্মিলিত সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লক্ষ। ২০১৪ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইতি টানে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। তবে তার পরেও সেনা সরানো হয়নি সম্পূর্ণভাবে। প্রতিশ্রুতি দিয়েও আফগান প্রেসিডেন্টের অনুরোধেই সেনা-প্রত্যাহারের সময়সীমা বর্ধিত করেছিলেন ওবামা। শাসনের একেবারে শেষলগ্নে এসে ট্রাম্প সেই পথে হাঁটলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারে।

পরিসংখ্যানগত হিসাব বলছে, বিগত ২০ বছরের যুদ্ধে আফগানিস্তানে নিহত হয়েছেন ২২০০-র বেশি মার্কিন সেনা। আহতের সংখ্যা কুড়ি সহস্রাধিক। আর দুই দশক-জুড়ে চলতে থাকা এই অভিযানে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এককথায়, তালিবানকে শায়েস্তা করতে গিয়ে যে বেশ বড়ো অঙ্কের ক্ষতি হয়ে গেছে মার্কিন মুলুকে, তাতে সন্দেহ নেই মোটেও। আর সেখান থেকেই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নতুন নেতা বাইডেনের।

তবে শুধু আফগানিস্তানই নয়, আল-কায়দা এবং আইসিসের বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, তাও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনবেন বাইডেন। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নিজের প্রভাব কমিয়ে নিরস্ত্র হওয়ার পরিকল্পনাই করছেন তিনি, তা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্টই।

বস্তুত সেনা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করলেও, পারতপক্ষে আফগানিস্তানে অবস্থানের সময়সীমা খানিকটা বাড়িয়েই নিলেন বাইডেন। এর আগে ট্রাম্প ঘোষণা করে গিয়েছলেন ২০২১ সালের মে-র মধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হবে সমস্ত সেনা। কিন্তু ৯/১১-র বর্ষপূর্তির আগে হচ্ছে না তেমনটা। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে হঠাৎ সেনা প্রত্যাহারে তালিবান আক্রমণের শিকার হতে পারেন অবস্থানরত মার্কিন সেনারা। পাশাপাশি তালিবানকে হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখা হয়েছে, আক্রমণ করলেন প্রত্যাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে।

তবে আমেরিকার নিষ্ক্রিয়তার পুরো ফায়দা তুলতে প্রস্তুত আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। আফগানিস্তানে নিজেদের শাসন ক্ষমতায় আসতে তৈরি হচ্ছেন বিভিন্ন গোত্র ও মতাদর্শের নেতারা। তৎপর হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রশাসনও। বিশেষত ভারত ও পাকিস্তান সব সময়ই আফগান সঙ্কট থেকে নিজেদের ফায়দা হাসিলে ছিল তৎপর। আবার দেশ দুটি আফগান পরিস্থিতির গতিশীলতার প্রসঙ্গে কান খাড়া করে চলছে।

এদিকে, আফগানিস্তান প্রসঙ্গে আমেরিকার অবস্থানকে তুরস্ক সমর্থন করেছে। এ মাসের ২৪ তারিখ আফগানিস্তান বিষয়ক শান্তি সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়েছে তুরস্কে। সেই সম্মেলনে উপস্থিত থাকবে বিশ্বের মোট ২০টি শক্তিধর দেশ, যা আফগানিস্তানের ইস্যুতে  আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন পালাবদলের ইঙ্গিতবহ।