জার্মানি: দেয়াল ভাঙলেও বৈষম্য ভাঙেনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বার্লিন ওয়াল ভাঙার দৃশ্য

বার্লিন ওয়াল ভাঙার দৃশ্য

  • Font increase
  • Font Decrease

জার্মানিকে বিভক্ত করে দীর্ঘ ২৮ বছর দাঁড়িয়ে ছিল বার্লিন ওয়াল। শুধু জার্মানির ভূখণ্ডকে বিভক্ত করেনি এ দেয়াল। ১৯৬১-১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটির জাতিসত্ত্বা, মানুষ, ভালোবাসা, অর্থনীতি, রুচি, সামাজিক মর্যাদা সহ অন্যান্য সবকিছুকেই বিভক্ত করেছে কনক্রিটের এ দেয়াল। যা ইতিহাসের পাতায় বার্লিন প্রাচীর নামে খ্যাত।

তবে জার্মানিকে পূর্ব পশ্চিমে বিভক্ত করা এ প্রাচীর ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ৩০ বছর পরে এসে এখনো প্রশ্ন জাগে, দেয়াল ভাঙলেও কি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সে বৈষম্য কি ভেঙেছে? এখনো বৈষম্যের একটি অদৃশ্য দেয়াল দেশটিতে বিরাজ করছে। বার্লিন ওয়াল পতনের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শনিবার (৯ নভেম্বর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদ সংস্থা সিএনএন।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জার্মানিকে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি নামে ভাগ করে দেওয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের আদলে পরিচালিত হয় পূর্ব জার্মানি। আর পশ্চিম জার্মানি চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদ নীতিতে। এমনিতে দেশ দুটির মধ্যে জাতিগত পার্থক্য অনেক আগে থেকেই।

এদিকে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে ছিল পশ্চিম জার্মানি। এছাড়া অন্যান্য দিক থেকেও পূর্বের তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে ছিল পশ্চিম জার্মানি।

ভাগ হওয়ার পর থেকে দেশ দুটির সরকারের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। পূর্ব জার্মানির নাগরিকরা পশ্চিমে এসে কাজ করত অর্থ উপার্জনের জন্য। এতে একটা সময় পশ্চিম জার্মানিতে যাওয়া নিষিদ্ধ করে পূর্ব জার্মানি কমিউনিস্ট নেতারা। আর এর প্রেক্ষিতে দেশটির জনগণ আন্দোলন শুরু করে। অবশেষে আন্দোলনের ফল হিসেবে ভেঙে ফেলা হয় বার্লিন ওয়াল। প্রাচীর ভাঙার কিছুদিন পর দুই দেশ একত্রিত হয়ে এক জার্মানি হিসেবে পথ চলা শুরু করে।

তবে প্রাচীর ভাঙার তিন দশক হয়ে গেলেও দেশ দুটির মধ্যে অনেক পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। একত্রিত হলেও তাদের মধ্যে রয়ে গেছে জাতিগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য। যা জার্মানি নেতাদের দেখলেই বোঝা যায়। এই তিন দশকে পূর্ব জার্মানির কোনো নেতা এখনো দীর্ঘ সময়ের জন্য জার্মানির ক্ষমতায় আসতে পারেননি। অনেক সমালোচনার পর ক্ষমতায় আসলেও তা ছিল খুব সীমিত দিনের জন্য।

পশ্চিম জার্মানির লোকদের মতে, তাদের মাঝে আর কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু যদিও বেশিরভাগ পূর্ব জার্মানরা বলেন, পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

এ বিষয়ে বার্লিনের হাম্বল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক স্টিফেন মাও এর মতে, পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে এখনো বৈষম্য বিদ্যমান। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সিএনএনকে বলেন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার মধ্যে এখনো তাদের তীব্র পার্থক্য রয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ব জার্মানের অর্ধেকেরও বেশি নাগরিক এখনো নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে মনে করে।

হালা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায়, জার্মানির ৫০০ বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৩৬টির প্রধান কার্যালয় পূর্ব জার্মানিতে অবস্থিত।

আর দেশটিতে যত ধনী রয়েছে তার অধিকাংশই পশ্চিম জার্মানির। দেশটির পূর্ব অংশে রয়েছে ১২.৫ মিলিয়ন জনগণ। অন্যদিকে, পশ্চিমে ৬৬ মিলিয়ন লোক বাস করে।

এক হওয়ার এতদিন পরেও দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় পার্থক্য রয়ে গেছে। পূর্বের জার্মানিদের চেয়ে পশ্চিমাদের শিক্ষার হার অনেক বেশি।

দেশটির জাতিগত পার্থক্যগুলো খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। এক গবেষণায় দেখা যায়, পশ্চিমারা মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি পছন্দ করে। আর অন্যদিকে পূর্বের লোকজন মাংস খেতে পছন্দ করেন।

এদিকে খেলাধুলায়ও এগিয়ে রয়েছে পশ্চিম জার্মানি। অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, পশ্চিম জার্মানির তিন লাখ ৯০ হাজার মানুষের প্রতি একজন অলিম্পিক মেডেল পেয়েছেন। আর পূর্ব জার্মানি ছয় লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রেক্ষিতে একটি মেডেল রয়েছে। এছাড়া নারীদের কাজের দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে পশ্চিম জার্মানি।

তবে জীবন ধারণের খরচের দিকে দিয়ে এগিয়ে রয়েছে পশ্চিম জার্মানি। যেখানে একজন মানুষের পশ্চিম জার্মানিতে জীবন ধারণের খরচ পড়ে ২৬২০ ইউরো। আর পূর্ব জার্মানিতে খরচ পড়ে ২১২৪ ইউরো।

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর