মানবতার কাঠগড়ায় ‘ফলেন আইডল’ সুচি!

ফাতিমা তুজ জোহরা, আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
অং সাং সুচি/ছবি: সংগৃহীত

অং সাং সুচি/ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার গল্পে খুব কম মানুষই জয়ী হন। এই গল্পের ব্যতিক্রমী ‘চরিত্র’ হতে পারলেন না মিয়ানমার নেতা অং সান সুচি! বিশ্বখ্যাতি ‘অর্জন’ করে তা ‘রক্ষা’ করার যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন তিনি। খোঁপায় সাদা গোলাপ আর মুখেবাঁকা হাসি হেসে যিনি কিছুদিন আগে শান্তিতে নোবেল জয় করে বিশ্বে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন সেই তিনিই এখন মানবতা রক্ষার পটভূমিকায় খলনায়িকা।

অং সান সুচি, ২০১৩ সালে শান্তিতে নোবেল পান। এই স্বীকৃতির সঙ্গে মুক্তি পান দীর্ঘদিনের বন্দী জীবন থেকে। আন্তর্জাতিক চাপ থেকে দায় এড়াতে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ধীরে ধীরে খোলস পাল্টাতে থাকে। শিথিল হতে থাকে সুচির ওপর নিষেধাজ্ঞা। মুক্তির দুই বছরের মাথায় বিশাল ব্যবধানে জয় একই সঙ্গে তার অবস্থান রাতারাতি পাল্টে দেয়। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার তাকে ‘নেলসন মেন্ডেলা’র উত্তরসূরি খেতাব এনে দেয়। পশ্চিমা দেশে বেড়ে যায় ‘সুচি চর্চা’। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রশংসার জোয়ারে ভাসতে থাকে সুচি’র নাম। যদিও তার এই প্রাপ্তিতে সব সময় বাধ সেধেছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা। তাদের দাবি ছিলো- পশ্চিমা হাওয়ায় উড়ছেন সুচি। আর কূটনীতিবিদের এমন সমালোচনার গোমর খুলতে খুব বেশি দেরিও হলো না!

চলতি সপ্তাহে আলোচিত-সমালোচিত এই মানবতার নায়িকা উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের কার্যালয় হেগ-এ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন নিজের দেশ, নিজেকে রক্ষা আর কাঁধে রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার দায় নিয়ে। তার স্বভাব সুলভ মলিন মুখ যেন বলেই দিচ্ছিল সামাল দিতে পারেননি রাজনীতির সরল অঙ্ক। সুচি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অর্থাৎ এই আসনে বসে দেশ পরিচালনা। রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি সামরিক সরকারের তৈরি সংবিধান বলে।

দৃশ্যত মিয়ানমার গণতান্ত্রিক দেশ মনে হলেও এর ভাঁজে সুচিকে সন্তুষ্ট করতে হয়েছে সামরিক বাহিনীকে এবং পশ্চিমাদেরকেও। একইসঙ্গে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অসম্ভব বটে!

সম্প্রতি ‘দ্যা হিডেন হিস্ট্রি অফ বার্মা’ বইতে মিয়ানমানের ইতিহাসবিদ থান্ট মিন্ট ইউ বলেছেন- ‘লুকিয়ে থাকা তিতা সত্য’। সামনে আসে সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহীদের মধ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার, তখন কৌশলে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার প্রেক্ষাপট। সংঘর্ষকে রূপ দেওয়া হলো দাঙ্গায়। তবে এই গল্প ছিল একদিক থেকে সুন্দরও মানবিক বটে! যখন আরবের সরকার বিরোধী আন্দোলন সহিংসতার পথে হাঁটছিল তখন বার্মা (মিয়ানমারের পূর্ব নাম) আমাদের নৈতিকতার কেচ্ছা শোনাচ্ছিল। ২০১৫ সালে সুচি ক্ষমতায় আসার পর মুখোমুখি হন সেই সব চ্যালেঞ্জের যেগুলো মিয়ানমার ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ছিল। মিয়ানমারের ঔপনিবেশিক শাসকরা দ্বন্দ্ব তৈরি করে আসছিল তাদের নিজেদের স্বার্থেই। মিয়ানমারে বসবাসরত মানুষের মধ্যে ধর্মের সুক্ষ্ম প্রাচীর টেনে। এক কথায় জাতিগত দ্বন্দ্ব।

সুচির পিতা 'জেনারেল অং সান' যিনি মিয়ানমারের মুক্তির নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সাং, চীন এবং কচিন গোষ্ঠীদেরকে বার্মা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।তবে এই ফল খুব বেশি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখেনি। কট্টরপন্থি কমিউনিস্ট এবং ক্যারেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাষ্ট্রে বিদ্রোহ শুরু করে। ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ বছরের মধ্যে সুচি বিরোধী নেতা হিসেবে বেশ শক্তপোক্ত অবস্থানে চলে আসেন। তবে এর পিছনে ছিল তার পারিবারিক ঐতিহ্য এবং পশ্চিমা মিত্র অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ।

থান্ট মিন্ট তার বইতে জানান, কর্তৃত্ব এবং বার্মার জাতিগত জটিল আন্তঃসম্পর্কের শেকড় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়নি। এমনকি দেশের অতীত ইতিহাস এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিচ্ছবিও ঢাকা পড়েছিল।

মূলত মিয়ানমার হলো সামরিক আইনে গণতন্ত্রের বলি হওয়া একটি দেশ। যেখানে সুচি মূলত নিজের দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নয় বরং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তার ভাবমূর্তিকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। খুব কম রূপকথার পৌরণিক চরিত্র গল্প হয়ে টিকে থাকতে পারে, আর সুচি ব্যতিক্রম কোনো গল্প রচিত করতে পারেননি। তাই আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত পেয়েছেন 'ফলেন আইডল' (পতিত প্রতিমা) হিসেবে। তার অসংখ্য ত্রুটি একসময় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল যা আজ মাটি ফুঁড়ে ওপরে উঠে এসেছে। আর একসময় উড়তে থাকা সুচি চেপে রাখা ভুলের মাটিতেই পতিত হয়েছেন। তিনি শান্তির প্রতীক ছিলেন তবে মুসলিমদের ওপর তার বিপরীত ভাবমূর্তি দেখিয়েছেন। মানবিকতার অবস্থান থেকে সরে এসে একইসঙ্গে উন্মোচন করেছেন অতীতের গোপন সহিংসতার সব গল্প।

মিয়ানমারের নিপীড়িত সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার দায় নিয়ে হাজির হয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে থাকা স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি তার প্রতিনিধিদলকে মিয়ানমারের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আইসিজেতে নেতৃত্ব দেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক হত্যা, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগসহ জাতিগত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে গাম্বিয়া ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৫৭ সদস্যের সমর্থন নিয়ে আইসিজেতে একটি মামলা দায়ের করে।

আর এত সব অপরাধ স্বত্তেও সুচির নিশ্চুপ অবস্থান তাকে দাঁড় করিয়েছে অপরাধীর কাঠগড়ায়। অথচ তিনি হতে পারতেন সংখ্যালঘু ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কণ্ঠ, মানবতার আওয়াজ তুলে অধিকার আদায়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের ভাষা!

আপনার মতামত লিখুন :