পরিবারতন্ত্রের রাজনীতিতে ভারতের সিন্ধিয়া মডেল

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সিন্ধিয়া পরিবারের পাঁচস্তম্ভ: বিজয়রাজে, বসুন্ধরা রাজে, যশোধরা রাজে, মাধবরাও, জ্যোতিরাদিত্য

সিন্ধিয়া পরিবারের পাঁচস্তম্ভ: বিজয়রাজে, বসুন্ধরা রাজে, যশোধরা রাজে, মাধবরাও, জ্যোতিরাদিত্য

  • Font increase
  • Font Decrease

ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের দাপট নতুন নয়। পুরো উপমহাদেশ জুড়েই অসংখ্য পরিবার ও বংশ বছরের পর বছর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি ইত্যাদি পদ-পদবি ও ক্ষমতা কাঠামো আবর্তিত হচ্ছে এসব পরিবারের বলয়ে।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু, জিয়া পরিবার, ভারতে গান্ধী, নেহেরু পরিবার, পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবার, মিয়ানমারে অং সাং পরিবার, শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েক পরিবারের কথা বহুল প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষ অধিক অবহিত হলেও এ অঞ্চলের রাজনীতিতে বহু প্রভাবশালী পরিবারের অস্তিত্ব রয়েছে। বিশেষত, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র নামে পরিচিত ভারতের ক্ষমতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে একাধিক পরিবার, যাদের নিয়ন্ত্রণে দেশটির কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি।

গান্ধী, নেহেরু পরিবার ছাড়াও ভারতের উল্লেখ্যযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষমতাবান পরিবারের মধ্যে রয়েছে হরিয়ানার দেবীলাল পরিবার, মহারাষ্ট্রের ঠাকরে ও পাওয়ার পরিবার, পাঞ্জাবের বাদল পরিবার, তামিলনাড়ুর করুণানিধি পরিবার, উত্তর প্রদেশে মুলায়াম সিং যাদব পরিবার, উড়িষ্যার পট্টনায়েক পরিবার, বিহারের লালু পরিবার এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া পরিবার।

বলা বাহুল্য, এইসব রাজনৈতিক পরিবার ছাড়াও ভারতে আরও অনেকগুলো ছোট-বড় ক্ষমতাধর পরিবার আছে, যারা ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি 'পাওয়ার-পলিটিক্স'র পালাবদলে অনুঘটকের কাজ করে। প্রায়শই মিডিয়ায় এসব পরিবারের কথা আলোচিত হয়, যেমন এখন হচ্ছে সিন্ধিয়া পরিবারের প্রসঙ্গ।

ভারত বা বাংলাদেশে নয়, সিন্ধিয়াদের কথা আমি প্রথম শুনি নেপালে, ২০০১ সালে। সে বছর সেপ্টেম্বরের পুরো মাস একটি প্রোগ্রামে অংশ নিতে অবস্থান করেছিলাম কাঠমান্ডু, নাগরকোট, ললিতপুর-পাটান এলাকায়। নেপালে কিছুদিন আগে রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে নিহত হন রাজা বীরেন্দ্র। চারিদিকে এ নিয়ে নানা কথা ও কাহিনী। মূলহোতা জ্ঞানেন্দ্র ছাড়াও মানুষের মুখে মুখে এক সুন্দরী আলোচিত হচ্ছিলেন, যিনি হত্যাকাণ্ডের পর পরই পালিয়ে যান ভারতের মধ্যপ্রদেশে মামাদের বাড়ি গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া পরিবারে।

নেপালের বহু উচ্চবর্ণ পরিবারের সঙ্গে ভারতের বহু পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্কের বিষয়টি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। নেপালি কংগ্রেস যে সামাজিক শক্তি ও আঞ্চলিক সমর্থনে ক্ষমতার প্রধান অংশীদার হতে পেরেছে। দিব্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত আমার 'রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে' গ্রন্থে সেসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পরের বছর (২০০২ সালে) আবার সিন্ধিয়া পরিবারের নাম মিডিয়ায় আসে বিমান দুর্ঘটনায় মাধবরাও সিন্ধিয়ার মৃত্যুর কারণে, যিনি ছিলেন ইন্দিরা-পরবর্তী কংগ্রেসের অন্যতম কর্ণধার। আরও খোঁজ নিয়ে জেনেছি, শুধু কংগ্রেস নয়, বিজেপি রাজনীতিতেও এ পরিবারের বিরাট প্রভাব রয়েছে।

আসলে গোয়ালিয়র জায়গাটিই ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রদেশের অংশ হলেও জায়গাটি উত্তর প্রদেশ সংলগ্ন এবং মধ্যযুগের ভারতবর্ষের রাজধানী আগ্রার নিকটবর্তী। আগ্রা শহরের কেন্দ্রস্থলে বিভিন্ন শহরে যাওয়ার যে দিকনির্দেশনা রয়েছে, তাতে দিল্লি, জয়পুর ও গোয়ালিয়র রয়েছে। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর গোয়ালিয়রকে চিহ্নিত করেছেন 'হিন্দুস্থানের রত্ন' নামে।

হিন্দু ধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রাচীন নিদর্শন, দুর্গ রয়েছে গোপাচল পাহাড় বেষ্টিত গোয়ালিয়রে, যা সুদীর্ঘকাল শাসন করে মুঘলরা। কিন্তু ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের বিয়োগান্ত পরিণতিতে মুঘল সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে আর ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা হয়। উত্তর ও মধ্য ভারতে মুঘল, স্বাধীনতাকামী সিপাহি, ঝাঁসির রানি, তাতিয়া টোপি প্রমুখের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাহায্য করার পুরস্কার স্বরূপ সুদূর মারাঠা অঞ্চলের সিন্ধিয়া পরিবারকে বসানো হয় গোয়ালিয়রের ক্ষমতায়।

পুরো ব্রিটিশ আমল মারাঠা সিন্ধিয়া পরিবার মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র রাজ্য শাসন করে এবং ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর ভারত প্রজাতন্ত্রের অংশে পরিণত হয়। রাজতন্ত্র না থাকলেও সেই রাজপরিবার ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়ও প্রভাব বজায় রাখে।

ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে মধ্যপ্রদেশের মারাঠা রাজবংশের সর্বশেষ ‘মহারানি’ ছিলেন রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া। ১৯৫৭ সালে গুণা লোকসভা আসন থেকে কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে বিজয়ারাজে হারানো রাজতান্ত্রিক ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক লেবেল লাগাতে সক্ষম হন, যদিও অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ চম্বল-গোয়ালিয়রে সিন্ধিয়া ও অন্যান্য উচ্চবর্গের লোকেরা একধরনের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনই চালু রাখেন, যার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ স্বরূপ এ অঞ্চলের দস্যু ফুলন দেবির উত্থান ঘটেছিল।

সামাজিক বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ঠিকই কব্জা করে রাখে সিন্ধিয়া পরিবার। তবে, ১৯৬২ সালে কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচন করলেও দলটির শীর্ষ ক্ষমতায় ইন্দিরা গান্ধীর উত্থানের জেরে দূরত্ব বাড়তে থাকে বিজয়রাজে সিন্ধিয়ার। ফলে ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি এবং কিছু দিনের মধ্যে যোগ দেন জনসঙ্ঘ পার্টিতে। বিজেপি গঠনেও ভূমিকা রাখেন তিনি।

এরপরের ঘটনা বেশ চাঞ্চল্যকর। নিজের ছেলে মাধবরাও সিন্ধিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন তিনি। তবে ১৯৭৭ নাগাদ মাধবরাওয়ের সঙ্গে জনসঙ্ঘের সম্পর্কে ভাঙন ধরে যায়। কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০২ সালে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কংগ্রেসেই শীর্ষস্থানীয় একজন ছিলেন মাধবরাও।

পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসেন বিদেশে পড়ালেখা করা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। উপনির্বাচনে পিতার আসনেই ৩০ বছর বয়সী জ্যোতিরাদিত্যকে প্রার্থী করে কংগ্রেস। বিপুল ব্যবধানে জিতে জ্যোতিরাদিত্য লোকসভায় পৌঁছান। ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে আসন ধরে রাখার পুরস্কার হিসেবে তিন বছর পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও করা হয় তাকে।

২০০১ সালে রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া মারা যান। কিন্তু তার দুই মেয়ে বসুন্ধরা রাজে এবং যশোধরা রাজে ততদিনে বিজেপিতে জায়গা করে নেন। বসুন্ধরা রাজস্থানের রাজনীতিতে আর যশোধরা রয়েছেন মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায়।

ভাতিজা কংগ্রেসে পিতৃঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ছেড়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহে বিজেপিতে যোগ দেন। এমনকি, মধ্যপ্রদেশে কমলনাথের কংগ্রেস সরকারের পতনের ব্যবস্থাও করেন তিনি আরও কয়েকজন কংগ্রেস সাংসদকে সঙ্গে নিয়ে এসে।

জ্যোতিরাদিত্য কংগ্রেস থেকে পদত্যাগের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ফুপু যশোধরা রাজে বলেছেন, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। তিনি বলেন, যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে স্বাগত জানিয়েছেন তাতে রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার প্রতিই তাদের সম্মানই প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত সবারই আত্মমর্যাদার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন মাধবরাও সিন্ধিয়া (জ্যোতিরাদিত্যের বাবা) যখন গোয়ালিয়র থেকে নির্বাচনে দাঁড়ান তখন তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেখানে প্রার্থী দেয়নি বিজেপি। জ্যোতিরাদিত্যকেও একই সম্মান দেখাবো। এই পদক্ষেপ জাতীয় স্বার্থে।

তবে, জাতীয় স্বার্থ আর পরিবারের স্বার্থের সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কোনও স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে, তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। গণতান্ত্রিক ভারতে পরিবারতন্ত্রের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, তা-ও জানা যাবে আগামী দিনগুলোতে।

আরও পড়ুন: কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া

আপনার মতামত লিখুন :