সাইক্লোন আম্পানে তছনছ কলকাতা

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
আম্পানে আক্রান্ত কলকাতার হাওড়া ব্রিজ, ছবি: সংগৃহীত

আম্পানে আক্রান্ত কলকাতার হাওড়া ব্রিজ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

স্মরণকালের ভয়াবহ সাইক্লোনের আঘাতে চরমভাবে আক্রান্ত মহানগর কলকাতা। তছনছ হয়ে গেছে সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগর বিন্যাস। লণ্ডভণ্ড পুরো মহানগরী।

কলকাতায় এই প্রাকৃতিক আঘাতের কারণ ঘূর্ণিঝড় আম্পান, থাই ভাষার প্রকৃত উচ্চারণে যা উম পুন, যার তাণ্ডবে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে আর কলকাতাতেই মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। বৃহস্পতিবার (২১ মে) এ তথ্য জানান স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শতাব্দী প্রাচীন কলকাতার ইতিহাসে অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের ঝড়ে ভেঙেছে চার্চের টাওয়ার, গঙ্গা থেকে নৌকা গিয়ে আছড়ে পড়েছে ডাঙ্গায়, যে কারণে শহরের একটি জায়গার নাম উল্টোডাঙ্গা। তদুপরি অতীতে প্লেগে, মন্বন্তরে, মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে কলকাতায়।

তবে, এবার করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে আম্পান নামক সাইক্লোনে রাজ্যের সমুদ্র তীরবর্তী দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ এবং রাজধানী কলকাতার অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে। দমবন্ধ ভয়ের মধ্যে কেটেছে তিলোত্তমা কলকাতার নাগরিকদের সাইক্লোন কবলিত একটি দিন।

সাইক্লোনের প্রচণ্ড আঘাতে দমদমের নেতাজি সুভাষ বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার ভেঙে গেছে আর রানওয়েতে থৈথৈ করছে পানি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় উপড়ে পড়েছে শত শত গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ অনেক ছোটবড় স্থাপনা।

কলকাতার পার্ক সার্কাসের শেকসপিয়ার সরণির সাবির গাফফার বার্তা২৪.কমকে জানান, আশেপাশের বহু প্রাচীন বৃক্ষ উৎপাদিত হয়েছে। পার্ক সার্কাস ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বালিগঞ্জ, মৌলালি, এন্টালি, মল্লিকবাজার, তোপশিয়া এলাকা তছনছ হয়ে গেছে।

যোগাযোগ করা হলে রাজারহাট-চিনার পার্ক এলাকার ডা. রফিক হাসান জানান, এতো প্রলঙ্করী ঝড়ের অভিজ্ঞতা নগরবাসীর জন্য ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে। জলমগ্নতার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি পরিসেবা ব্যবস্থায় বিশেষ ক্ষতি হয়েছে।

দমদম ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের বাসিন্দা মোবারক আলি মোল্লা বার্তা২৪.কমকে বলেন, শহরতলীর দক্ষিণ পাশের ভাঙুর, বারাসাত, ক্যানিং ইত্যাদি এলাকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। কলকাতা শহরের প্রায়-সকল এলাকার রাস্তাঘাটে গাছ পড়ে ও জল জমে চলাচলের অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে।

কলকাতার একাধিক বাসিন্দা বার্তা২৪.কমকে বলেন, মহানগরের উপর দিয়ে ঝড়ের যে ভয়াবহ দুর্যোগ বয়ে গেছে, তা বর্ণনাতীত। কলকাতাবাসী এমন মহাপ্রলয়ের স্মৃতি সহজে ভুলতে পারবেনা।

এদিকে, আম্পান-পরবর্তী রাজ্যের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আহ্বান জানান মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একের পর এক জেলা থেকে বিপর্যয়ের খবর শুনে সচিবালয় 'নবান্ন'র কন্ট্রোলরুমে বসে দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আর্জি জানান তিনি। চরম ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণবঙ্গে ত্রাণ ও পুনর্গঠনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তাঁর সেই আর্জিতে সাড়া দিয়ে টুইট করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানান, 'গোটা দেশ পশ্চিমবঙ্গের পাশে আছে।'

মোদী আরও বলেন, 'পশ্চিমবঙ্গে আম্পান যে ভাবে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, সেই দৃশ্য দেখেছি। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে গোটা দেশ পশ্চিমবঙ্গের পাশে আছে। রাজ্যের মানুষের শুভ কামনা করছি।' তিনি আরও জানান, 'এই চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে সব রকম ভাবে সহযোগিতা করা হবে বাংলাকে।' পরে আরও একটি টুইট করে মোদী বলেন, 'জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কাজ করছে। শীর্ষ আধিকারিকরা গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করতে চেষ্টার কোনও কসুর করা হবে না।'

করোনার কালে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন আম্পান কলকাতার বুকে যে বিভীষিকাময় ক্ষতির চিহ্ন রেখে গেছে, তা মারাত্মক। শতাব্দী প্রাচীন মহানগর কলকাতা এমন প্রলয়ের কথা বহুদিন মনে রাখবে বলেও অভিজ্ঞজনেরা মনে করছেন।

ক্যাপশান

আপনার মতামত লিখুন :