রোজার উপকারিতা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমানে রোজার বহুবিধ উপকারিতা সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্র নানাবিধ তথ্য উপস্থাপন করছে। বহুমুত্র ও উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি মারাত্মক রোগের মতোই অম্ল, ক্ষুধামন্দা প্রভৃতির উপশমের জন্য মাঝে মাঝে উপবাস করার কথা বলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এতেই রোজার ব্যাপক উপকারিতা শেষ হয় না। কারণ, আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা মানুষের শারীরিক ও আত্মীক কল্যাণের জন্যই রোজাকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে রোজার উপকারিতা অপরিসীম, যেমনভাবে নামাজ ও অন্যান্য আমলের বহুবিধ স্বাস্থ্যগত ও অন্তরগত এবং ইহ ও পরকালীন উপকারিতা রয়েছে। মোদ্দা কথায় মানবজীবনে রোজা অত্যন্ত উপকারী একটি আমল।

রোজার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, রোজা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের অনেক বড় মাধ্যম। পাশাপাশি রোজা মানুষকে গোনাহ থেকে রক্ষা করে। মনের খেয়াল, একগুয়েমী, নাফরমানি ইত্যাদির বিষয়ে লাগাম টানে রোজা। যে কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে ইরশাদ করেছেন:

‘হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যার বিবাহ করার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে নেয়। কারণ, বিবাহ দৃষ্টি অবনত করার এবং লজ্জাস্থান সংরক্ষণের পক্ষে অধিকতর সহায়ক। আর যে ব্যক্তি বিয়ে করতে অক্ষম, সে যেন রোজা রাখে। এটি যৌনতা নিবারণে সহায়ক’ (বোখারি শরিফ: ৫০৬৫)।

এ হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজাকে বিবাহের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। কারণ, রোজা মনের ও রিপুর কুপ্রবৃত্তি দূর করে। শরীর ও মনের উপর কৃচ্ছ্বতার প্রভাব পড়ে রোজায়। রোজার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে একটি পবিত্রতা ও সুস্থতার বিকাশ ঘটে শরীর ও মনের উপর।     

রোজার অন্যতম উপকারিতা হলো, সময় সচেতনা সৃষ্টি করে, যার কারণে অধিক ইবাদত ও গঠনমূলক কাজ করা যায়। রোজার কারণে একদিকে অনেক বেহায়া ও অশ্লীল কাজে যেমন যুক্ত হওয়া যায় না, তেমনিভাবে ভালো কাজে ও ইবাদতে মগ্ন হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কারণ, রোজায় মানুষের অনেক প্রাত্যহিক কাজ, যেমন খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি করতে হয় না। হাট-বাজার, চা-নাস্তা, আড্ডা ইত্যাদি কাজেও রোজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হ্রাস পায়। ফলে ইতিবাচক কাজ, ইবাদত এবং দ্বীন ও দুনিয়ার জরুরি কাজে মনোনিবেশ করার পরিবেশ সৃষ্টি করে রোজার মাস রমজান।

রোজা রাখার ফলে যে কষ্ট সহিষ্ণুতা ও কৃচ্ছ্বতা পালন করা হয়, তাতে শরীর ও মনে কনফিডেন্স বা আত্মশক্তির বিকাশ লাভ করে। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা রোজাকে মন বা কলবের সঞ্জীবনী শক্তি বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, অনেক সময় বৈধ খাওয়া-দাওয়া, ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েমের আধিক্যের ফলে শরীর আরামপ্রিয় ও মন নরম হয়ে যায়। তখন অনেক কষ্টকর কাজ ও ইবাদত করার আগ্রহ থাকে না। কিন্তু রোজা মানুষের শরীর ও মনে কষ্ট সহিষ্ণুতা ও আত্মশক্তি বৃদ্ধি। সে কারণে শরীর ও মন মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসে। আর আধুনিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞান তো সব সময়ই সুনিয়ন্ত্রিত তথা পরিমিত আহার ও বিশ্রামের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করার তাগিদ দেয়, যা নানা রোগ থেকে বাঁচার ও সুস্থতার পূর্বশর্ত। আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার রোজার মাধ্যমে মানুষের শারীরিক ভারসাম্য ও সুস্থতার ব্যবস্থা করেছেন। রোজায় শরীর ও মন হালকা হয়। শরীরের গতি বৃদ্ধি পায়। শরীর থেকে বাড়তি মেদ ও অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বের হয়ে যায়। এতে বছরের বাকী মাসগুলোও সুস্থতার ছোঁয়া পাওয়া সম্ভব হয়।

রোজাই একমাত্র আমল, যা মানুষকে বিবেক বোধ জাগ্রত করে ও বাস্তবতার উপলব্ধি দেয়। কারণ, রোজার সময় অভাবী, ক্ষুধার্ত, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রকৃত কষ্টকর-বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যায়। না খেতে পাওয়ার কষ্ট উপলব্ধি করা যায়। ফলে রোজা মনুষ্যত্ববোধ, পরহিত ও অভাবী মানুষের জন্য ভালোবাসা ও সহমর্মিতা জাগায়। এতে মানুষের স্বার্থপরতা, ক্ষুদ্রতা লোপ পায় এবং অপরের জন্য কল্যাণ চিন্তা বৃদ্ধি পায়। রোজা এমন নানা মানবিক-সামাজিক-আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে রোধ করে এবং মানবিকতা ও কল্যাণ বোধ জাগ্রত করে বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারের মাধ্যমে পরিণত হয়।