ইসলামে চিন্তা গবেষণার গুরুত্ব

মুফতি কাজী সিকান্দার, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলামে চিন্তা গবেষণার গুরুত্ব, ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে চিন্তা গবেষণার গুরুত্ব, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

যেকোনো কাজের জন্য মানুষ প্রথমে চিন্তা করে, কল্পনা পরিকল্পনা করে এরপর তার বাস্তবায়ন ঘটায়। এই যে, চিন্তা করা হলো এ চিন্তাটি যদি কোনো ভালো কাজের জন্য করা হয় তবে তা ভালো হবে। আর যদি কোনো খারাপ কাজের জন্য করা হয় তা খারাপ হবে। যেকোনো জিনিস তৈরি করা নিত্যনতুন জিনিস বা পথ ও পন্থা আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজন ফিকির চিন্তা-ভাবনা। আজ পর্যন্ত কোনো কাজ করা হয়েছে বা মানুষ সফলতা পায়নি চিন্তা করা ছাড়া। চিন্তার মাধ্যমে মানুষ অচেনা-অজানা জিনিস আবিষ্কার করে। দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার মূলেই রয়েছে চিন্তা।

চিন্তা বা গবেষণা কী? চিন্তা বা গবেষণা হলো- এমন কয়েকটি জানা বিষয়কে সমন্বয় করে তৃতীয় কোনো জিনিস জানা বা উৎপন্ন করা। পৃথিবীর আজকের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে সব আবিষ্কারই হলো- এ চিন্তা ও ফিকির করার মাধ্যমে। যেমন- মধ্য আকর্ষণ। আপেলটি চেনা জানা একটি বস্তু এবং ওপরে নিক্ষেপ করা, কোনো দিকে ছুড়ে মারা সেটিও একটি জানা বস্তু। এখন চিন্তার বিষয় আপেলটি ওপরে নিক্ষেপ করার পর সেটি ওপরের কোথাও হারিয়ে না গিয়ে নিচের দিকে কেন এলো? এ চিন্তার ফলে আবিষ্কার হলো মধ্যাকর্ষণ। এ চিন্তা ও ফিকিরের ফলে আজকে আমাদের সামনে বিস্ময়কর অনেক জিনিস কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট, বিভিন্ন আকাশ যান।

এগুলো কিন্তু সত্যি একেকটি বিস্ময়। তবে বাস্তব সত্য হলো, এগুলো মানুষই আবিষ্কার করেছে। কিভাবে? একেকটি বস্তুকে কাজে লাগিয়ে। সেটি হলো চিন্তা, গবেষণা। তাহলে আমরা বুঝতে পারলে আজকের দুনিয়ার সব সফলতার চাবিকাঠি চিন্তা বা গবেষণা। এ চিন্তা ফিকিরের বিষয় ইসলাম কী বলে?

আল্লাহতায়ালা বলেন, আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বা উপমাসমূহ বর্ণনা করেন, হয়তোবা তারা গভীর চিন্তা করবে। -সূরা ইবরাহিম: ২৫

আল্লাহতায়ালা আসমান, জমিনসহ সব বিষয়ে উপমা দেন যাতে মানুষ এগুলোর ওপর চিন্তাভাবনা করে সঠিক পথ বের করতে পারবে। তাহলে এখানে বোঝা যাচ্ছে সঠিক পথ নির্ণয় করা বোঝা এটি চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভর। যেমন এখানে একটি বিষয় বলা যায়, আখেরাত। এটি আল্লাহতায়ালা স্থায়ী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এটি জানা বিষয়, আরেকটি জানা বিষয় হলো, যে জিনিস স্থায়ী বা দীর্ঘ মেয়াদ পর্যন্ত টিকে থাকবে মানুষ তাই গ্রহণ করে।

এখানে চিন্তা করে তৃতীয় বিষয় বের করা যে, তা হলে মানুষ দুনিয়া ছেড়ে আখেরাতের সম্বল তৈরি করার পেছনে সময় দেবে অর্থাৎ আখেরাতকেই প্রাধান্য দেবে। কারণ আখেরাত স্থায়ী আর স্থায়ী বস্তুই গ্রহণীয় সুতরাং আখেরাত গ্রহণীয়। এটি গেল আখেরাতের ব্যাপারে চিন্তা-ফিকিরের ফল। এখন আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, নিশ্চয় আসমান ও জমিনের সৃষ্টি কৌশলে এবং একের পর এক দিবানিশির আগমনের মধ্যে জ্ঞানী লোকদের জন্য দলিলসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। যাদের অবস্থা এ যে, তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, উপবিষ্ট অবস্থায় এবং শায়িত অবস্থায় আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি রহস্যের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে যে, হে আমাদের পালনকর্তা আপনি একে অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আমরা আপনাকে পবিত্র মনে করি। অতএব, আমাদিগকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচান। -আলে ইমরান: ১৯০ ও ১৯১

এখানে আল্লাহতায়ালা আসমান, জমিন সৃষ্টি করা এবং সৃষ্টির কৌশল সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার কথা বলেছেন। এ চিন্তাভাবনা থেকে দুনিয়ার বিষয়ও উন্নতি করার অনেক রহস্যের জট খুলবে, তেমনি আখেরাতের সফলতারও দ্বার খুলবে। যেমন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহ কতই না বড় যে আল্লাহ এতবড় আসমান সৃষ্টি করেছেন। এত সুন্দর করে জমিন সাজিয়েছেন। এখানে আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ব প্রকাশ পায়। তাই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহকে খুশি ও রাজি করা উচিত সব বান্দার। এখানে আসমান ও জমিনের চিন্তার ফল হবে এটি। আরেকটি বিষয় ফল আসবে যে আসমান ও জমিনের ওপর চিন্তা করে তার সৃষ্টির ওপর চিন্তা করে মানুষ দুনিয়াতে বসবাসের জন্য বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করবে। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদন করবে। ফলে মানুষের জীবনধারণ হবে সহজ। তাহলে আল্লাহতায়ালার একটি কথায় সব সমস্যার সমাধানের পথ খুলে যাচ্ছে। ইসলাম এ চিন্তা ফিকিরের প্রতি অতি গুরুত্ব দেয়। তাই আল্লাহতায়ালা বারবার বলেছেন, তোমার চিন্তা ফিকরি করো। তবে বুঝতে পারবে।

তবে আজকের মুসলিম আমরা এ চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছি। দুনিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করছি না এবং আখেরাতের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা করছি না। দুনিয়ার ব্যাপারে আমাদের কোনো গবেষণা বর্তমানে হচ্ছে না, তাই আমাদের সফলতাও এখানে নেই। আমাদের পূর্বসূরি যারা ছিল তারা দুনিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করেছেন তাই তারা যথেষ্ট অবদান রেখেছেন দুনিয়া তাদের কাছে ঋণী। ইবনে খলদুন, ইবনে সিনা, এমন হাজারও নাম আসবে।

তবে বর্তমানে আমরা কী করছি। অপর দিকে আমাদের কোরআনের তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছে ভিন্ন জাতি। তাই তারা আজ আমাদের ওপর প্রভুত্ব করছে। অন্য দিকে, আমরা আখেরাতের দিকেও চিন্তা-ভাবনা করা ছেড়ে দিয়েছি। তাই আজ আমাদের সুদ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ সব অনিয়ম গ্রাস করেছে। অবলীলায় হারাম কাজ করছি আমরা। ব্যভিচার, হত্যা, লুণ্ঠন করছি সাবলীলভাবে। কারণ আমরা আখেরাতের চিন্তা ছেড়ে দিয়েছি। এখন মোবাইলে, ফেসবুকে কয়েক সেকেন্ড মিনিট লিখে আমাদের সব দায়িত্ব ও চিন্তা ফিকিরের অবসান ঘটাচ্ছি। আমাদের এ অসহায়ত্ব জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের চিন্তার গভীরতায় পৌঁছাতে হবে এবং এ চিন্তার গবেষণার মাধ্যমে দুনিয়ার সব চাহিদা পূর্ণ করতে হবে, আখেরাতের সব আজাব থেকেও বাঁচতে হবে। তবে আমরা পরিপূর্ণ সফল হবো।

আপনার মতামত লিখুন :