করোনা: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় স্বস্তি

বিল্লাল বিন কাশেম ও তাহমিনা শারমিন, অতিথি লেখক, ইসলাম
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিতে পারে করোনা থেকে স্বস্তি, ছবি: সংগৃহীত

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিতে পারে করোনা থেকে স্বস্তি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভয়াবহ করোনাভাইরাস বিশ্ববাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। ভাইরাসটি ছড়ায় মূলত অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা শিষ্টাচার বহির্ভূত জীবনযাপনের দরুণ। জনসমাবেশ, পরিবেশ ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাসটি অন্যকে আক্রান্ত করে।

আর এসব জটিল পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় ইসলামের বিধানে আছে সুস্পষ্ট কিছু রীতিনীতি। মানুষের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে ইসলাম সর্বদা গুরুত্ব প্রদান করেছে। স্বাস্থ্যবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখাকে ইসলাম শুধু উত্তম অভ্যাস হিসেবে বিবেচনা করে না বরং একে ঈমানদারদের জন্য অনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করেছে। একজন মুসলিমের জন্য তার প্রতিদিনকার ইবাদতের পূর্বে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন। এছাড়া প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের পর ভালোভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা এবং সর্বাবস্থায় অজুর সঙ্গে থাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।

করোনা ভাইরাসটি অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা থেকে সৃষ্ট বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই এই মহামারি থেকে বাচঁতে যে সব নিয়মাবলী অনুসরণ করার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা তাদের মূল কথা হচ্ছে- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।

মূলত অপরিচ্ছন্ন বাজার, পরিবেশ, অস্বাস্থ্যকর খাবার আর জীবন-যাপন ব্যবস্থার নোংরামি থেকেই ভাইরাসটি ধীরে ধীরে মহামারিতে পরিণত হয়েছে। আর এ থেকে বাচঁতে সবাইকে সুস্থ থাকার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে। জীবন যাপনে সতর্কতা অবলম্বন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম মনে করে, শুধু জীবন যাপনে সুস্থভাবে বাচঁতে নয়, ইবাদত-বন্দেগিতেও একজন সুস্থ মানুষের মূল্যায়ন বেশি।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ইসলামের নির্দেশ ও গুরুত্বারোপ মানবজীবনের জন্য এক মাইলফলক। এসব বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনাগুলো হলো-

পবিত্রতা ঈমানের একটি অংশ। সাহাবি হজরত আবু মালিক আল আশআরি রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধাংশ।’

পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাকে মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছে ইসলাম। এ সংক্রান্ত আরও অনেক হাদিসে রয়েছে।

চিকিৎসা নেওয়াকে উৎসাহিত করেছেন হজরত নবী করিম (সা.)। হজরত উসামা ইবনে শারিক (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদা আমি রাসূল (সা.)-এর নিকট আসলাম, তার সাথীগণ তখন এমন শান্তভাবে বসেছিল যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। আমি সালাম দিয়ে বসে পড়লাম। মরুভূমির কিছু আরব লোক আসলো আশপাশ থেকে। অতঃপর তারা রাসূলকে (সা.) জিজ্ঞেস করলো, আমরা কি কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবো? তিনি উত্তর দিলেন, চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ প্রতিকার ছাড়া কোনো অসুখ তৈরি করেননি, শুধু একটি রোগ ব্যতীত- আর তা হলো বার্ধক্য।’ –সুনানে আবু দাউদ

এভাবে ইসলাম স্বাস্থ্যবানের ইবাদতকে দুর্বলের তুলনায় আল্লাহতায়ালার নিকট বেশি প্রিয় বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে অতিরিক্ত খাওয়াকে অস্বাস্থ্যকর বলে চিহ্নিত করে তা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে।


মোটকথা, সুস্বাস্থ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছে। যেখানে কিছু কিছু জাতি আধ্যাত্মিকতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নিজের যত্ন নেওয়া পরিত্যাগ করেছে সেখানে ইসলাম এটাকে প্রতিদিন নামাজের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। মানুষের স্বাস্থ্যবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখাকে ইসলাম শুধু উত্তম অভ্যাস হিসেবেই বিবেচনা করে না বরং একে ঈমানদারদের জন্য অনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করেছে।


‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। নিজেকে সুস্থ রাখার প্রথম এবং প্রধান উপায় হচ্ছে- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রাখলে অনেক মূল্যবান জিনিস মূল্যহীন হয়ে যায়। জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য এটাই যে, পশুরা যেমন খুশি তেমন চলে; তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ধার ধারে না। আর মানুষ পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষার বিষয়টিকে সাধারণত মানুষ স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করলেও ঈমানদার মুসলমানেরা এটিকে ইবাদতরূপে গণ্য করে থাকেন। কেননা নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।’ –সহিহ মুসলিম

আমরা জানি, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ইসলাম কিন্তু সবসময় এ নির্দেশ দিয়ে এসেছে। কেননা, ধর্মপ্রাণ মুসলমান কম করে হলেও প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পূর্বে পবিত্রতা অর্জনের জন্য অজু করেন। তিনি দৈনিক পাঁচ বার অজু করার জন্য পনোরো বার হাত, পা, নাক, মুখ ও চোখ পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করেন। সময়মতো দিনে একবার গোসল করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ সবসময় ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার রাখেন। ঈমানদার লোকের বসত বাড়ি ও ঘরের আঙিনা পরিচ্ছন্ন থাকে।

এ প্রসঙ্গে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতাকে পছন্দ করেন, তিনি পরিচ্ছন্ন এবং তিনি পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন।’ –সুনানে তিরমিজি

দৈহিক রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে দেহ পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানব দেহের প্রধান শত্রু। এ জন্য ইসলাম সুন্দর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার বিধান দিয়েছে। পরিষ্কার কাপড়-চোপড় ও পবিত্র দেহ ছাড়া নামাজ হয় না। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্রতাকে নামাজের চাবি বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলাম ধর্মে পবিত্রতার প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, (হে নবী!) তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো।’ -সূরা আল মুদ্দাসসির: ৪

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন পরিচ্ছন্নতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার সব কাজকর্ম ছিল গোছানো। তিনি ঘরের সবকিছু পরিপাটি করে রাখতেন। শয়নের পূর্বে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বিছানা পরিষ্কার করে নিতেন। জুতা, কাপড় ইত্যাদি পরিধানের পূর্বে তিনি ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করতেন। তিনি সুগন্ধি পছন্দ করতেন। সৌন্দর্যের প্রতীক ফুলও তার খুব প্রিয় ছিল। তিনি রাতে ঘুমানোর পূর্বে এবং ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াক করতেন। -যাদুল মায়াদ

নামাজি ব্যক্তি নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহারের কারণে অসংখ্য রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি পায়। জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও তিনি মিসওয়াক করার জন্য বারবার ইশারা করছিলেন। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টদায়ক না মনে করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজের অজুর সঙ্গে তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ –সহিহ বোখারি

নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘মিসওয়াক মুখকে পরিষ্কার করে, আর আল্লাহর কাছে এ আমল বেশি পছন্দনীয়।’ –নাসায়ি

লেখক:
বিল্লাল বিন কাশেম, উপ-পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
তাহমিনা শারমিন, সাংবাদিক