করোনা ও আম্পানে কলকাতার ঈদ



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
কলকাতা রেড রোডের ঐতিহাসিক ঈদ জামাত এবার দেখা যাবে না, ছবি: সংগৃহীত

কলকাতা রেড রোডের ঐতিহাসিক ঈদ জামাত এবার দেখা যাবে না, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজভবন, ইডেন গার্ডেন হয়ে ময়দানের সামনে দাঁড়িয়েছি। হেঁটে হেঁটে কলকাতার হৃদপিণ্ড নামে খ্যাত এই সবুজ অংশে ঘুরে দেখতে আমার বেশ ভালো লাগে। ভ্রমণের শেষ হয় গঙ্গার তীরে।

ময়দানে তখন সন্ধ্যার আবছায়া। ২০১৯ সালের শীতকালটিও বেশ জাঁকালো। আমাদের সামনে কলকাতার বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ঘরগুলোর প্যাভিলিয়নের কুয়াশা-মাখানো আলো জ্বলছে।

ময়দানের একেক অংশে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মোহামেডান ক্লাবের প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম চলে। কলকাতা শহরের সামাজিক বিন্যাসটিও ফুটবল বিভাজনের মতো। ইস্টবেঙ্গল পূর্ববাংলা থেকে আগত রিফিউজি বাঙালদের ক্লাব, মোহনবাগান ঘঁটি হিন্দু বাঙালিদের আর মোহামেডান মুসলিম বাঙালিদের। এখন অবশ্য হিন্দিভাষী হিন্দু-জৈন মাড়োয়াড়ী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের বড় পৃষ্ঠপোষক আর কলকাতায় বসবাসকারী উর্দুভাষী উত্তর ভারতীয় মুসলমানরা মোহামেডানের জোরালো সমর্থক।

'মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে ইমাম সাহেব কলকাতার বিখ্যাত ঈদ জামাতের খুতবা দেন', জানালেন সহযাত্রী সাবির গাফফার। কলকাতা পার্ক সার্কাস এলাকার সাবিরকে চিনি কুড়ি বছর ধরে। মানবাধিকার বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে পরিচয়ে নেপালে। সেই থেকে কলকাতা গেলেই দেখা হয় বর্তমান শেকসপিয়ার সরণি বা আগের থিয়েটার রোডের সাবিরের সঙ্গে।

বৃহত্তর পার্ক সার্কাস মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। ওদিকেই বাংলাদেশ দূতাবাস, লাইব্রেরি। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের অনেক কিছু মিশে আছে থিয়েটার রোডের চারপাশে। অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান নেতা সোহরাওয়ার্দীর অনেক সম্পত্তি আছে সেখানে, যেগুলো এখন চ্যারিটি, ওয়েলফেয়ার বা ওয়াকফের অধীনে জনসেবামূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সাবির কলকাতার ঈদের বিবরণ দিতে গিয়ে ময়দানের বুকে রেড রোডের জামাতের কথা বলেন। মোহামেডান ক্লাবে দাঁড়ানো ইমাম সাহেবের পেছনে আট-দশ লাখ মানুষের ঈদ জামাত পুরো ময়দান ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী এসপ্ল্যানেড, ধর্মতলা, চৌরঙ্গী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতার এই প্রধান জামাতে শুভেচ্ছা জানাতে মূখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রায়-সকল রাজনীতিবিদগণই আসেন।

কলকাতা উৎসবের জন্য প্রসিদ্ধ শহর। দুর্গাপূজার সময় যেমন এক বর্ণিল কলকাতার দেখা পাওয়া যায়, ঈদের সময়ও তেমন চিত্র দেখা যায়। মধ্য কলকাতায় প্রধান ও সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হয় ময়দানের রেড রোডে। উত্তর কলকাতায় বড়বাজার-চিৎপুরের নাখোদা মসজিদে হয় আরেক বৃহত্তম জামাত। নাখোদা মসজিদ কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ, যেখানে লাখ মানুষের নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে। দক্ষিণ কলকাতায় সবচেয়ে বড় জামাত হয় টালিগঞ্জের টিপু সুলতান মসজিদে।

কলকাতায় টিপু সুলতান মসজিদ একটি নয়, দু'টি। একটি দক্ষিণে টালিগঞ্জে। অন্যটি মধ্য কলকাতার ধর্মতলায়, সেখানেও ঈদ জামাত হয়। প্রধান প্রধান ঈদ জামাত ছাড়াও কলকাতার মুসলিম অঞ্চলে অনেকগুলো ঈদ জামাত হয়। যার মধ্যে উত্তরে দমদমের কৈখালী, আটঘরা, উল্টোডাঙ্গা, গোবরা, রাজাবাজার, তালতলা, মানিকতলায়। মধ্য-পূর্ব কলকাতায় তিলজলা, পার্ক সার্কাস ময়দান, তোপসিয়া, কসবায়। দক্ষিণে আলীপুর, মেটিয়াবুরুজ, মোমিনপুর, ঢাকুরিয়ায়।

এ বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে কলকাতার চিরচেনা ঈদ জামাত দেখা যাবেনা। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের প্রায়-সকল দেশেও ঈদ জামাত হবে সীমিত আকারে। কারণ ২৪ বা ২৫ মে ঈদ হবে লকডাউনের মধ্যে চরম করোনার প্রকোপজনিত পরিস্থিতিতে ।

বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে কলকাতার রেড রোডের বিখ্যাত ঈদের নামাজ স্থগিত করে দিয়েছে আয়োজক খিলাফত কমিটি। এ বার মসজিদ বা মাঠে-ময়দানে ঈদের নামাজ স্থগিত রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ৪০ হাজারের বেশি মসজিদের কাছে নোটিস পাঠানো হচ্ছে বলে ওয়াকফ বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে।

খিলাফত কমিটির কলকাতা শাখার সম্পাদক সৈয়দ মহাম্মদ সাঈদ মিডিয়ায় বলেন, ‘রেড জ়োনের আওতায় থাকা কলকাতায় করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। তাই পারস্পরিক দূরত্বের বিধি না-মেনে রেড রোডে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে ঈদের নামাজ পড়াটা বড় ঝুঁকি হয়ে যাবে। তাই তা স্থগিত রাখা হচ্ছে।’ মুসলিমদের উদ্দেশে তার আবেদন, ‘আপনারা দীর্ঘ এক মাস কষ্ট করে মসজিদে না-গিয়ে বাড়িতে নামাজ পড়ছেন। ঈদের নামাজটাও একটু কষ্ট করে নিজের নিজের বাড়িতে সপরিবারে বা এলাকায় সীমিত পরিসরে পড়ুন।’

একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতার নাখোদা মসজিদ এবং ধর্মতলা ও টালিগঞ্জের টিপু সুলতান মসজিদ। রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান, হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আব্দুল গনি এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেন, ‘আগামী কয়েক মাস বড় চ্যালেঞ্জ। করোনা থেকে বাঁচতে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখাটা ভীষণ জরুরি। তাই ঈদে মসজিদ বা ময়দানে জমায়েত না-করে পাড়ায়, বাড়িতে নামাজ পড়ার জন্য ওয়াকফ বোর্ডের তরফে রাজ্যের প্রায় ৪০ হাজার মসজিদে নোটিস পাঠানো হচ্ছে।’

ঈদের দিনে রেড রোডে অন্তত আট-দশ লক্ষ মানুষ নামাজ পড়েন। কিন্তু এ বার সেখানে নামাজ হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হলে করোনা ভয়াবহ আকার নেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

তাছাড়া নাখোদা মসজিদে এবং সংলগ্ন রাস্তা মিলিয়ে অন্তত ৬০ হাজার থেকে এক লক্ষ মানুষ ঈদের নামাজ পড়েন। ওই মসজিদের ট্রাস্টি নাসের ইব্রাহিম মনে করেন, 'বড়বাজার এলাকা কলকাতার সর্বাধিক বিপজ্জনক জায়গা। এই তল্লাটের নাখোদা মসজিদে ঈদে বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েত করাটা বড় ঝুঁকি হয়ে যাবে। তাই এ বার বড় আকারে মসজিদে ইদের জমায়েত হবে না।’

একই মনোভাব জানিয়ে ধর্মতলা ও টালিগঞ্জের টিপু সুলতান মসজিদের কো-ট্রাস্টি তথা টিপু সুলতান পরিবারের সদস্য শাহিদ আলম বলেন, ‘ঈদে এই দুই মসজিদে মিলিয়ে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের সমাগম হয়। করোনা এড়াতে এ বার তা সীমিত করা হয়েছে। সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ কামরুজ্জামানও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা পৃথিবীকে স্তব্ধ ও নিঃশব্দ করেই ক্ষান্ত হয়নি, মানুষের পারিবারিক, সামাজিক জীবন এবং ধর্মচর্চা আর উৎসবকেও সীমিত করে দিয়েছে। করোনার কারণে এমন অভূতপূর্ব ও অচেনা পৃথিবীর কথা ইতিহাস ভুলতে পারবেনা কোনদিনও।

অথচ উপমহাদেশের যেসব শহর ঐতিহ্যবাহী ঈদ উৎসবের জন্য খ্যাত, কলকাতা তার অন্যতম। দিল্লি, আগ্রা, আজমির, লক্ষ্ণৌ, লাহোর, হায়দারাবাদ, ঢাকার মতো কলকাতার ঈদও বর্ণিল আয়োজনে সমৃদ্ধ। কিন্তু করোনার প্রকোপের মধ্যেও স্মরণকালের ভয়াবহ সাইক্লোনের আঘাতে চরমভাবে আক্রান্ত মহানগর কলকাতা। তছনছ হয়ে গেছে সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগর বিন্যাস। লণ্ডভণ্ড পুরো মহানগরী।

কলকাতায় এই প্রাকৃতিক আঘাতের কারণ ঘূর্ণিঝড় আম্পান, থাই ভাষার প্রকৃত উচ্চারণে যা উম পুন, যার তাণ্ডবে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে আর কলকাতাতেই মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। বৃহস্পতিবার (২১ মে) এ তথ্য জানান স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শতাব্দী প্রাচীন কলকাতার ইতিহাসে অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের ঝড়ে ভেঙেছে চার্চের টাওয়ার, গঙ্গা থেকে নৌকা গিয়ে আছড়ে পড়েছে ডাঙ্গায়, যে কারণে শহরের একটি জায়গার নাম উল্টোডাঙ্গা। তদুপরি অতীতে প্লেগে, মন্বন্তরে, মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে কলকাতায়।

তবে, এবার করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে আম্পান নামক সাইক্লোনে রাজ্যের সমুদ্র তীরবর্তী দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ এবং রাজধানী কলকাতার অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে। দমবন্ধ ভয়ের মধ্যে কেটেছে তিলোত্তমা কলকাতার নাগরিকদের সাইক্লোন কবলিত একটি দিন।

সাইক্লোনের প্রচণ্ড আঘাতে দমদমের নেতাজি সুভাষ বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার ভেঙে গেছে আর রানওয়েতে থৈথৈ করছে পানি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় উপড়ে পড়েছে শত শত গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ অনেক ছোটবড় স্থাপনা। শতাধিক মানুষের মৃত্যু আর সম্পদের ধ্বংসের মাধ্যমে করোনাকালে অমোচনীয় ছাপ রেখে সাইক্লোন আম্পান।

২০২০ সালে করোনার আগ্রাসী পরিস্থিতিতে সাইক্লোন আম্পানের প্রচণ্ড আঘাতে তিলোত্তমা মহানগর কলকাতায় যে চরম দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ঈদুল ফিতরের আনুষ্ঠানিকতা পালন অসম্ভব বিষয়। তবে শত বিরূপতাতেও ঈদের প্রীতি, শুভেচ্ছা, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার স্পর্শ থাকবে মানুষের অন্তরে অন্তরে।