দণ্ড ছাড়িয়েছে আগের আইনকেও



নাজমুল আহসান রাজু, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জরিমানার (অর্থদণ্ড) পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জরিমানাকে। সংশোধিত আইসিটি আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা ও এক কোটি টাকা জরিমানা ছিল। ডিজিটাল আইনে সাজা বেড়ে যাবজ্জীবন হয়েছে। আর একই অপরাধ দ্বিতীয় বার করলে যাবজ্জীবনের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ৫ কোটি কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আর্থ সামাজিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইন প্রণয়ন করা উচিত। সাজার বিধান করলেই হবে না, দণ্ডিত হলে তা পরিশোধের সামর্থ রয়েছে কিনা- তাও দেখতে হবে। তবে কেউ কেউ বলছেন, এটি হচ্ছে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে সতর্কতামূলক বিধান। এতে সাজা ও অর্থদণ্ড অপরাধ প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করবে।

প্রতিবেশী ভারতে সাইবার অপরাধ রোধে তথ্য প্রযুক্তি অ্যাক্ট ২০০০ প্রণয়ন করা হয় ওই বছরের ১৭ অক্টোবর। আট বছর পর এ আইনে দ্বিতীয় দফা সংশোধন আনে লোকসভা। ভারতের আইনের ছয় বছর পর ২০০৬ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশে প্রণীত হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬। ভারতের আইনের সাজা ও জরিমানার বিধান হুবহু অনুসরণ করা হয় বাংলাদেশের আইসিটি আইনে।

আরও পড়ুন:‘মানহানি’তে হাতিয়ার এখন সাইবার আইন

পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টেই শেষ ৩৩৪ মামলা

ভারতের আইনে কম্পিউটারে বেআইনি অনুপ্রবেশে শাস্তির বিধান রয়েছে ৬৫ ধারায়। শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ রুপি অর্থদণ্ড। এটি আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। ৬৬ ধারা হ্যাকিং অপরাধের, শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ রুপি অর্থদণ্ড। ৬৭ ধারায় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অশ্লীল তথ্য প্রকাশ করা হলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ রুপি অর্থদণ্ড। ৭১ ধারায় মিথ্যা তথ্য প্রদানের শাস্তি দুই বছর এবং ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য প্রকাশের শাস্তি বর্ণিত আছে ৭২ ধারায়, শাস্তি দুই বছর ও ১ লাখ রুপি অর্থদণ্ড। প্রতারণার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল সনদের জালিয়াতির সাজা দুই বছর ও এক লাখ রুপি জরিমানা। ভারতের আইনে মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মতো অপরাধ অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

২০১৩ সালে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাসহ চারটি ধারায় সাজার পরিমান সর্বোচ্চ ১৪ এবং অন্যূন সাত বছর ও এক কোটি টাকা জরিমানা বিধান অন্তর্ভূক্ত করে সরকার।

কানাডার হেলিফ্যাক্স ভিত্তিক সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড ডেমোক্রেসির বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকারের সবধরণের মানদণ্ডের সঙ্গে আইনটি অসঙ্গতিপূর্ণ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইনের বড় একটি সমস্যা হলো- ডিজিটাল নিরাপত্তা বলতে সবধরণের নিরাপত্তাকে আওতাধীন করা হয়েছে। বেআইনি প্রবেশকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যেখানে বৈধ প্রবেশও অপরাধ। এমনকি কেউ তার কম্পিউটার যতবার বন্ধ করবে ততবারই অপরাধী হতে পারে। ম্যালাওয়ারকেও এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যা একটি বড় ভুল। এতে করে আইনের অপব্যবহার হতে পারে।

আরও পড়ুন:হয়নি আপিল ট্রাইব্যুনাল, ভরসা হাইকোর্ট

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডিজিটাল আইন, ২০১৮ এর গুরুতর আপত্তির দিক হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির ব্যাপক ক্ষমতায়ন। আইনের সঙ্গেসঙ্গে বিধি প্রণয়নের কথা থাকলেও তা হয়নি। যেখানে আইন কার্যকরের জন্য তদারককারী এজেন্সির ক্ষমতা নির্ধারিত হবে বিধি দ্বারা। আরেকটি সমস্যা হলো অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন। ১৮টি অপরাধের মধ্যে ১৪টি আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য। আমলযোগ্য অপরাধ হেতু পুলিশ যে কাউকে বিচারিক পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে। এতে সাংবাদিক ও নাগরিকরা বেশি হয়রানির শিকার হবেন। অজামিনযোগ্য অপরাধে একজন গ্রেফতার হওয়ার পার যতক্ষণ পর্যন্ত না আদালত তার সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে কারাগারে থাকতে হবে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন অপরাধের সাজা দুর্ধর্ষ অপরাধের সাজার মতো কঠোর করা হয়েছে। হ্যাকিং করা (ধারা ৩৪) আর কাউকে হত্যাচেষ্টা এখন সমান অপরাধ। আইনের ২৯ ধারার অপরাধ দণ্ডবিধির মতো একই ধরণের হলেও সাজার পরিমাণ বেশি।দণ্ডবিধিতে মানহানির সাজা দুই বছর। কিন্তু ডিজিটাল আইনের তা তিন বছর। সঙ্গে রয়েছে পাঁচ লাখ টাকার জরিমানা। দ্বিতীয় বার এ অপরাধ করলে সাজা পাঁচ বছরের। জরিমানা ১০ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ড। ধারা ২৮ এ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধে সাজার বিধান রয়েছে পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা। অথচ দণ্ডবিধিতে এ সাজা মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড।

এছাড়া ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ৩০, ৩২, ৩৩ ও ৩৪- এই ১৩টি ধারাই আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। ২২ থেকে ২৪ ধারা প্রতারণা ও জালিয়াতি সম্পর্কিত। দণ্ডবিধিতে এ দুই অপরাধের সাজা তিন বছর কারাদণ্ড। ডিজিটাল আইনে এ সাজা বাড়িয়ে করা হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। ১৭, ১৮, ৩২, ৩৩ এবং ৩৪ ধারা তথ্য ও কম্পিউটারে বেআইনি প্রবেশ সম্পর্কিত। ক্ষতির উদ্দেশ্যে ইচ্ছকৃতভাবে বেআইনি প্রবেশ রোধ করার বিষয় বলা হলেও ক্ষতির কারণগুলো স্পষ্ট করা হয়নি আইনে। ৩৪ ধারা অনুযায়ী হ্যাকিং একটি অপরাধ। এখন কেউ নিজস্ব কম্পিউটারের তথ্য পরিবর্তন করলেও হ্যাকিংয়ের আওতায় পড়বেন। হ্যাকিংয়ের সাজা ১৪ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক এক কোটি টাকার অর্থদণ্ড। দ্বিতীয়বার পুন:পুন অপরাধ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আরও পড়ুন:একমাত্র ট্রাইব্যুনালে সারা দেশের চাপ

৩২ ধারায় সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ হিসেবে অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট ১৯২৩ অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ ধারায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে তৃতীয়পক্ষকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে, যা ঠিক নয়। এর ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তথ্য অনুসন্ধানে নিয়োজিত সাংবাদিকের ১৪ বছরের সাজা ও ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে পড়ার ঝুকি তৈরি হয়েছে। পুন:পুন (দ্বিতীয়বার) অপরাধ করলে সাজার পরিমান বাড়িয়ে যাবজ্জীবন এবং অনধিক ১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে ধারাটিতে। সম্পুর্ণ আইনের ইতিবাচক দিক হলো ৩৮ নম্বর ধারা। যেখানে তথ্য উপাত্ত প্রাপ্তির বন্দোবস্ত করার কারণে সেবাপ্রদানকারী দায়ী হবেন না।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, অপরাধকে নিরুৎসাহিত করতে সাজা ও জরিমানার বিধান করা হয়েছে। দিনে দিনে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। এটাকে সামাল দিতে শক্ত আইন প্রয়োজন ছিল। সাজার যে বিধান করা হয়েছে তা সতর্কতামূলক। এতে অপরাধ সংঘটনকে নিরৎসাহিত করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কেউ অযথা হয়রানি না হন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, সাজা ও জরিমানা দিয়ে অপরাধ রোধ করা যায় না। দেখা গেছে, আইন আছে কিন্তু সেই আইনের অপরাধ কি কমেছে। সাজার পরিমাণ বাড়ানো হলেও যে অপরাধ কমবে তা ঠিক নয়। যারা আইন প্রণয়ন করেন তাদের বিষয়টি চিন্তাভাবনা করতে হবে।