ভুয়া পরোয়ানা কাণ্ডে এক শীর্ষ দৈনিকের প্রতিবেদক

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এক ‘মিথ্যা মামলায়’ জামিন না হতেই নতুন কোন ‘গায়েবি মামলায়’ আবার পরোয়ানা! এভাবে টানা ৬৮ দিন দেশের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে কাটিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অফিসার আওলাদ হোসেন। তার অপরাধ কী তা তিনি নিজেও জানেন না।

সীমাহীন হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে শেষ পর্যন্ত ‘প্রতিকার চেয়ে’ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন আওলাদ হোসেনের স্ত্রী শাহনাজ পারভীন। হাইকোর্ট বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট-সিআইডি)। হাইকোর্টের আদেশে নিবিড় তদন্ত শুরু করে সিআইডি।

এ ঘটনায় গত বছরের ৯ ডিসেম্বর একটি শীর্ষ দৈনিকের প্রথম পাতায় গুরুত্বের সঙ্গে ‘ভুয়া পরোয়ানার চক্করে আওলাদ, হাইকোর্টে স্ত্রী’ শিরোনামের খবরটি প্রকাশিত হয়। তখনো দৈনিকটির শীর্ষ ব্যক্তিরা জানতেন না, এর নেপথ্যে খোদ তাদেরই এক সাংবাদিক জড়িত।

সিআইডি তদন্তে দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে সাভারে কর্মরত নিজস্ব প্রতিবেদকের জড়িত থাকার প্রমাণ পায়। এ ঘটনায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি সিআইডির তত্ত্বাবধানেই আশুলিয়া থানায় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী আওলাদ হোসেন।

আসামিরা হলেন- সাভারের বাজার নোয়াদ্দার ইয়াসিন ঢালীর ছেলে দানেশ ঢালী, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার লক্ষ্মীপুরের আলমগীর খান, আশুলিয়ার টাকসুর পশ্চিম পাড়ার আক্কাছ আলীর ছেলে ফরহাদ হোসেন, চাকলগ্রামের হোসেন আলীর ছেলে হানিফ আলী, পূর্ব ডেন্ডাবরের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে দেলোয়ার হোসেন, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার রাধানগর গ্রামের প্রয়াত উৎপল রায়ের ছেলে সাংবাদিক অরূপ রায় ও আইনজীবী সুমন আলী।

দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৪৬৬/৪৬৮/৪৭১/৩৪৩/৩৪ ধারায় এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-৪০ তারিখ-১১/০২/২০২০।

মামলার কপি, ছবি: সংগৃহীত


আদালতের আশুলিয়া থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বার্তা২৪.কমকে জানান, ওই মামলায় আইনজীবী সুমন আলী ও আলমগীর খানকে গ্রেফতার করে সিআইডি। মামলাটির তদন্ত চলছে।
আগে তিনি দৈনিকটির মানিকগঞ্জে জেলা প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে পত্রিকাটির তৎকালীন সাভার প্রতিনিধিকে বাদ দেওয়া হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন অরূপ রায়। সেখানেই তিনি জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধী চক্রের সঙ্গে। আর এসব অপকর্মে পত্রিকাটির সাভার অফিসকেও যুক্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে আশুলিয়ার বাইশমাইল এলাকায় প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ জমি নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে সাভারের সৌদি প্রবাসী দানেশ ঢালীর সঙ্গে আওলাদের বিরোধ চলে আসছিল। সেই দানেশ ঢালীর সাভারের বাড়ির ভাড়াটিয়া অরূপ রায়। সেই বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক আইনজীবি সুমন আলী, দানেশ ঢালীর দুই ভাগ্নে দেলোয়ার ও জসিম এবং অপর ভাড়াটিয়া ফরহাদ ও হানিফ পরস্পর যোগসাজশে ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে বাদীকে হয়রানি করেন।

আওলাদ হোসেন জানান, গত বছরের ৩০ অক্টোবর মানবপাচারের অভিযোগে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভুয়া ওয়ারেন্টে তাকে গ্রেফতার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এ মামলায় জামিনের আগেই বাগেরহাটের একটি আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে আরেকটি ওয়ারেন্ট আসে। তাকে বাগেরহাটে নেওয়া হলে প্রমাণ হয় যে পরোয়ানাটি ভুয়া। সেখান থেকে মুক্তি পেতে না পেতে তাকে ফের গ্রেফতার দেখানো হয় শেরপুর আদালতের একটি ফৌজদারি মামলায়। তাকে পাঠানো হয় শেরপুরে।

আওলাদের স্ত্রী শাহনাজ পারভীন বলেন, এভাবে রাজশাহী ও ঢাকায় পর পর পাঁচটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে দুর্বিসহ করে তোলা হয়েছিল আমাদের জীবন।

ভিকটিমের স্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অফিসার আওলাদ হোসেনকে ভুয়া ওয়ারেন্টে জড়ানোর ঘটনা তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আদালতের আদেশের পর ভুয়া ওয়ারেন্ট কোথা থেকে ইস্যু হয় ও কারা ইস্যু করেন, তা খুঁজে বের করতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে সিআইডি।
কমিটির সদস্যরা হলেন- সিনিয়র পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা, অতিরিক্ত এসএসপি ফারুক আহমেদ, সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেজাউল হক ও পুলিশ পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান।

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, অরূপ রায়ের সহযোগিতায় মামলার অপর আসামিরা মিলে বিভিন্ন আদালতের বিচারকদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া ওয়ারেন্ট বের করে আওলাদ হোসেনকে দিনের পর দিন আটকে রেখেছেন।

ওই মামলায় সুমন নামে এক আইনজীবী এবং আলমগীর নামে অরূপ রায়ের এক সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

আপনার মতামত লিখুন :