অংক কষে বছর পার

শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিদায় নিতে যাচ্ছে ২০১৯ সাল। রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটনাবহুল এই বছরটি বিদায় বেলায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে অনেক স্মৃতি। নানা জল্পনা কল্পনার পর বছরের গোড়ার দিকে যখন একাদশ সংসদ গঠিত হয় তখন থেকে চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষতে শুরু করেন সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। ঠিক যেন অংক কষার মতো।

বছরের একবারে শুরুর দিকে অর্থাৎ ৩ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু হয় একাদশ সংসদের। এখানেও মিলল চাওয়া পাওয়ার হিসেব। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি যখন নির্বাচনে অংশ নিলো তখনও ছিল তাদের চাওয়া পাওয়ার হিসেব। ক্ষমতার মসনদে বসতে গঠন করলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তবে নির্বাচনে ফল বিপক্ষে গেলেই বেকে বসলেন। অভিযোগ-নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আর এ অভিযোগে তাদের নির্বাচিত সদস্যরা জানালেন, শপথ নেবেন না।

একাদশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের শপথ

তাই ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের সদস্যরা শপথ নিলেও বয়কট করেন বিরোধী জোটের নির্বাচিত ৮ জন। এটি ছিল সংসদে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। অবশেষে যখন পুনরায় নির্বাচনের দাবি তুলে ব্যর্থ হলো বিএনপিজোট, তখন নতুন হিসেবের খাতা খুলে বসলেন তাদের বিজয়ীরা। নির্বাচিত হয়ে সংসদে না গিয়ে কোনো দাবি আদায় করা যাবে না, বা শপথ না নিলেই এমন কি করতে পারবে এসব হিসেব কষতে কষতে ‘মান ভেঙে ’ দফায় দফায় শপথ নিলেন বিএনপি ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা।

তাদের হিসেব ছিল সংসদে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়ে দাবি তুললে সরকার নরম হবে। এ নিয়ে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদসহ অন্যান্যরা সংসদে দাবিও তুলেছেন একাধিকবার কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বিএনপি’র সাংসদরা যখন শপথ নিয়ে সংসদে কথা বলছেন, তখন শেষ মুহূর্তে শপথের সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যদিও তিনি শপথ নেবেন বলে সংসদে একটি চিঠি ইস্যুর গল্পও চাউড় ছিল। মহাসচিব শপথ নিলে দলের কর্মীদের রোষানলে পড়বেন এই ভেবে হিসেব মেলাতে পারেনি ফখরুল।

একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ

এবার আসা যাক সরকারের মিত্র দল জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের বিষয়ে। দশম সংসদের শরিকরা হিসেব করেছিলেন এবারও ঠাঁই হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায়। যখন সকল শরিককে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচিতদের নিয়ে সরকার গঠন করা হয় তখন মন খারাপ হতে থাকে শরিকদের। সবকিছু হারিয়ে জাতীয় পার্টি ভাবল অন্তত বিরোধী দলের চেয়ারটি শক্ত করি। যদিও বিরোধী দলের অবস্থানে তাদের শক্তিমত্তা এখনও পরীক্ষাধীন।

সবশেষে আসি সরকারি দলের সদস্যদের বিষয়ে। এবার যেভাবে নিরষ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ তা অতীতে কখনো এমনটি ঘটেনি। তাই নবীন প্রবীণ অনেক আওয়ামী লীগ নেতাই আসায় বুক বেঁধে ছিলেন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হচ্ছে। কিন্তু যখন পুরনো সেটআপ পরিবর্তন করে নতুনত্বে মনোযোগী হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তখন অনেক বড় বড় নেতা হিসেব কষলেন এতো ত্যাগ করে কি পেলাম।

একাদশ সংসদ আরো কিছু বিষয়ের জন্য আলোচিত। এবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিএনপি যখন শপথ নেবেন কি নেবেন না এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তখন ইচ্ছে থাকলেও সংসদে আসা হয়নি সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের। তিনি শপথ না নিয়েই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আবার শপথ নিয়েও সংসদে কথা বলা হয়নি বিরোধী দলীয় নেতার।

একাদশ সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ এক দুই দিন সংসদে গেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে কথা বলা হয়নি তার। দশম সংসদে নিজের ভুলে বিরোধী দলের নেতা হতে পারেননি এরশাদ। তাই এবার চেয়েছিলেন সংসদে মূল বিরোধী দল হিসেবে কঠোর ভূমিকা পালন করবেন সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।

হুইল চেয়ারে করে সংসদে এরশাদ

একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে শুরু হয় ৩০ জানুয়ারি। বিদায়ী বছরে মোট ৫টি অধিবেশন হয়। তারমধ্যে প্রথম অধিবেশনের কার্য দিবস ছিল ২৬ দিন। এছাড়া দ্বিতীয় অধিবেশনের কার্য দিবস ৫ দিন, তৃতীয় অধিবেশন ছিল ২১ দিনের, চতুর্থ অধিবেশন ৪ দিনের এবং সবশেষ ৫ম অধিবেশনের মেয়াদ ছিল মাত্র ৫ দিন। এক বছরের মোট ৬১ কার্যদিবস।

বিদায়ী বছরে সংসদে আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল প্রথমবারের মতো সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সংসদে বাজেট উপস্থাপন। যা আগে কখনো ঘটেনি। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অসুস্থ থাকায় একাদশ সংসদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সারাদেশে দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযানে যখন রাজনীতির মাঠ টালমাটাল তখন সংসদেও এর আঁচ লাগে। কয়েকজন সংসদ সদস্যের ব্যাংক হিসাব জব্দের মধ্য দিয়ে কালিমা লাগতে থাকে একাদশ সংসদের গায়ে। কালিমার শেষটুকু লাগান আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত সংসদ সদস্য তামান্না নুসরাত বুবলি। বিএস পাস দেখাতে গিয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ায় সমালোচনার তীর নিক্ষেপ হয় সংসদের দিকে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি মঈনুদ্দিন খান বাদল। তার অকাল প্রয়াণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি।

এই এক বছর নানা ঘটনার সাক্ষী সংসদ। প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্তিত্বের সঙ্কট, উপর্যুপরি দুর্যোগের ভয়াবহ আঘাত, জীব-বৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি এবং সম্পদের অমিতাচারী ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে আনীত গ্রহজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা’র সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। তাই বছর শেষে এখনও সরকারি দল, বিরোধী দল হিসেবে কষছেন একাদশ সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে কি পেলাম। আর কি হারালাম।

আপনার মতামত লিখুন :