রোহিঙ্গা ইস্যু: ফেরত যায়নি একজনও, হয়েছে শুনানি

খুররম জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাখাইন থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুই বছর পার হলো। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি হয়েছে। তবে কক্সবাজারে যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের একজনকেও গত দুই বছরে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়নি।

সবশেষ গত ২২ আগস্ট সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম তারিখ ঠিক হয়েছিল। দুই প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে, ফেরত যায়নি একজন রোহিঙ্গাও।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, এর আগেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিল এবং মিয়ানমার তাদের ফেরত নিয়েছে। মিয়ানমার বন্ধু রাষ্ট্র, আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো। প্রতিবেশী সকল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রাখে। আমি আশাবাদী মিয়ানমার অতিসত্বর রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। তবে তারা মাঝে মাঝে রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার বিষয়ে যে কথা বলে তা মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই না। একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি।

২২ আগস্টের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপাচ্ছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সব প্রস্তুতি মিয়ানমারের ছিল এবং তাদের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে অপেক্ষায় ছিল বলে দাবি করে দেশটি।

মিয়ানমারের এমন দাবির প্রতিবাদও জানিয়েছে বাংলাদেশ। গত ২৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রসঙ্গে প্রতিবাদ জানানো হয়।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমাজ সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা সফরে এসে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালিস্টার বার্ড ও দেশটির এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড অভিমত ব্যক্ত করেন।

নিজ মাতৃভূমি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জর্মানির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। গত ১৮ অক্টোবর জার্মানি সফরকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাসকে এ অনুরোধ জানান তিনি। একটি টেকসই পদ্ধতিতে সুরক্ষা এবং মর্যাদা দিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জার্মানির সমর্থন চান ড. মোমেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং গত ২৪ নভেম্বর বলেছিলেন, চীন রোহিঙ্গা ইস্যুর গুরুত্ব দেয়, এই ইস্যুতে সক্রিয় রয়েছে এবং এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সার্বভৌম দেশ, তাই চীন কাউকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে না।

রাষ্ট্রদূতের এমন বক্তব্য দেওয়ার ১৩ দিনের মাথায় নিজেদের নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে ফেলে চীন। রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানিতে যাওয়ার আগে ৭ ডিসেম্বর অং সান সু চির আমন্ত্রণে দুই দিনের মিয়ানমার সফরে যান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর ওয়াং ই।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা মামলার শুনানি শুরুর ঠিক আগে অং সান সু চির আমন্ত্রণে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ববহ।

ধারণা করা হয় দ্য হেগে গণহত্যা মামলার বিচারের শুনানি নিয়ে সু চির সঙ্গে আলোচনা করতেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই সফর করেছিলেন। ২০১৭ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে চীন।

কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন সবসময় মিয়ানমারের প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থন প্রদর্শন করেছে। কারণ মিয়ানমার কৌশলগত ও ভৌগলিকভাবে চীনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই মিয়ানমার বিপদে পড়ুন চায় না চীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলে বেইজিংয়ের স্থায়ী আসন এবং ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা মিয়ানমারের পক্ষে শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) দায়ের করা রোহিঙ্গা  গণহত্যা মামলায় ঘরে-বাইরে প্রচণ্ড চাপে পড়ে দেশটি। এমন চাপের ফলেই গত ২১ নভেম্বর মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ থেকে নিজ সরকারের পক্ষে লড়ার ঘোষণা দেন। দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দেশটির আইনি দলকে নেতৃত্বও দেন সু চি।

মিয়ানমারকে জবাবদিহিতায় আনতে আইসিজেতে গাম্বিয়া'র পদক্ষেপের বিষয়ে কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস ৯ ডিসেম্বর এক যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আইসিজেতে নিয়ে যাওয়ায় গাম্বিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বহাল রাখা এবং দায়মুক্তি রোধে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস গাম্বিয়াকে এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মিয়ানমার  গণহত্যামূলক কাজ করেছে বলে অভিযোগ করা হয় ওই মামলায়। দ্য হেগ শহরে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ১০, ১১ ও ১২ ডিসেম্বর।

রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘু নিপীড়নের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ চার সামরিক কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরা হলেন—মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইন, ৯৯ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ও এবং ৩৩ লাইট ইনফানট্রি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট গত ১০ ডিসেম্বর এই চার সেনাকর্মকর্তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে।

অন্যদিকে ১৪ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)৷ তবে মিয়ানমার বলছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের এই উদ্যোগ কোনভাবেই আইনসঙ্গত নয়। কারণ, মিয়ানমার এখনও আইসিসি সনদে স্বাক্ষর করেনি, তাই দেশটি এই ট্রাইব্যুনালের সদস্যও নয়। কিন্তু আইসিসি বলছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ সংস্থাটির সদস্য হওয়ায় এই তদন্তের এখতিয়ার তাদের রয়েছে।

আইসিজেতে গাম্বিয়া যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, মিয়ানমার ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে শুদ্ধি অভিযানের নামে ধারাবাহিকভাবে এবং ব্যাপকভাবে নৃশংসতা চালিয়ে গেছে, যেটি গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে। গাম্বিয়ার আইনজীবীরা মিয়ানমারে গণধর্ষণ, হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ও রোহিঙ্গা শিশুদের হত্যার বিবরণ আদালতে তুলে ধরেন।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা অসম্পূর্ণ এবং সঠিক নয়। তার কথায়, ওই সেনা অভিযানের পেছনে গণহত্যা চালানোর অভিপ্রায়ের কোন প্রমাণ নেই।

গাম্বিয়ার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার শুনানির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপে পড়বে মিয়ানমার। বিশেষ করে দেশটির সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকার এখন থেকে রোহিঙ্গা বিষয়ে সঠিক পথে থাকতে বাধ্য হবে। কোনো বিতর্কিত কাজ করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পার পাওয়া আর সম্ভব হবে না। আবার রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতির উন্নতিতে মিয়ানমার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সেটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাতে হবে নিয়মিত বিরতিতে। অন্যদিকে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়বে মিয়ানমার। পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন হারাবে তারা। আসতে পারে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা নিষেধাজ্ঞা।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুঃখজনক যে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হওয়ায় আজ বিষয়টি আমাকে পুনরায় উত্থাপন করতে হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি উল্লেখ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত চার দফা প্রস্তাব:

এক. রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্তীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে।

দুই. বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে।

তিন. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

চার. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :